তোমাকেও ভালোবাসি

তোমাকেও ভালোবাসি
পাশের বাসার মেয়েটা আমার জ্বালায় বৃষ্টি ছুঁতে পারতো না। বৃষ্টি এলেই তার আগে আমি ছাদ দখল করে নিতাম। আমি মূলত ভিজতে নয়, কালো মেঘের বাতাস খেতে আসতাম। এরপর বৃষ্টি শুরু হলে চিলেকোঠার ছাউনির নিচে বসে বসে বৃষ্টি দেখতাম। আমি আগে ভাগে ছাদে চলে আসায় কেউ আর সেই স্থান দখল করতে পারতো না। প্রতিবার লক্ষ করতাম বৃষ্টি শুরু হলে কেউ একজন উল্লাসিত হয়ে সিঁড়িবেয়ে উপরে উঠে আসছে, আমার উপস্থিতি টের পেয়ে মাঝ পথে আবার ফিরে চলে যাচ্ছে। এমনটা বহুবার হয়েছে। কোনোদিন দেখতে পাইনি মেয়েটি কে। নিচ থেকে কেউ একজন উপরে আসছে বোঝা মাত্র যখনি দেখতে দুই এক সিঁড়ি নেমে আসতাম ততোক্ষণে হরিণের গতিতে লাফিয়ে কোথায় যেন সে মিলিয়ে যেত।
এভাবে পিছু নিয়ে একদিন বুঝতে পারলাম মেয়েটা আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের। সিঁড়িকোঠায় উপর থেকে সেদিন মেয়েটির মুখ দেখতে পাইনি, তবে হলদে ফর্সা এক জোড়া পা টুপটুপ করে নিচে নামতে দেখেছি, এরপর দরজা লাগানোর শব্দ অনুমান করে বের করেছি এটা আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের কোনো মেয়ে হবে। পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বছরের বেশিরভাগ সময় আমাকে হোস্টেলে থাকতে হয়েছে, আশেপাশে পাড়াপ্রতিবেশি সম্পর্কে ধারণা আমার খুবই কম ছিল। আমাদের তলায় মোট তিনটা ফ্ল্যাট, আমরা বাদে বাকি ফ্ল্যাটে এমন হারিণীর সংখ্যা মোটে তিন চারজন তো হবেই। জানিনা এই বৃষ্টি প্রেমী মেয়েটা কোন ফ্ল্যাটে থাকে। বাড়ি ফেরার পর থেকে দিন দিন মেয়েটির প্রতি আগ্রহ বেড়েই চলছিল। আচ্ছা আমি যখন বাসায় থাকতাম না এই মেয়েটা কি নিয়মিত ছাদে এসে বৃষ্টিতে ভিজে যেত? আমি ফিরে আসায় তার বৃষ্টিস্নানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি? এসব কৌতুহলী প্রশ্ন মাঝেমধ্যে মাথায় ঘুরপাক খেত।
এই বিশাল বিল্ডিং বানিয়েছেন আমার মামা। নানার জায়গা সূত্রে আমার মা তার অংশ অনুযায়ী দুটি ফ্ল্যাট পেয়ে যায়। এরপর থেকে এই বিল্ডিং এ আমাদের বসবাস। মামার বাড়ি বলে কথা, বাড়িওয়ালাদের মতন পুরো বিল্ডিং চোষে বেড়াতাম। তাই আমার জন্য কে বৃষ্টি ছুঁতে পারছে না এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কেউ ছিল না। সবাই আমাদেরকেও বাড়িওয়ালার চোখেই দেখতো। এছাড়া মামির করা নিয়ম অনুযায়ী ভারাটিয়াদের অকারণে ছাদে যাওয়ায় কঠোর নিষেধ ছিল। ছাদে উনার হাতে গড়ে ওঠা ছাদ বাগান রয়েছে, মূলত গাছের নিরাপত্তার জন্য এই বিশেষ নোটিশ জারি করেছিলেন।
একদিন আকাশে মেঘের গর্জন শুনতে পাই। সেদিন আমি বাসাতেই ছিলাম তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। কাজ শেষ হতে হতে অনেকটা দেরী হয়ে যায়। আকাশে কালো মেঘে ধেয়ে আসা বাতাস ততক্ষণে শেষ, ঝুম ঝুম বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করেছে। হঠাৎ মাথায় আসলো মেয়েটাকি আজ ছাদ ফাঁকা পেয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে এসেছে?! মেয়েটি কে? গিয়ে একবার দেখে আসলে মন্দ হয় না! আগ্রহ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকি। বুঝা যাচ্ছে ছাদের দরজা ঘেসে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে! নিচ থেকে আবছায়া কাউকে দেখতে পাচ্ছি। আর কয়েক ধাপ উঠলে দেখা পাব মেয়েটির। আরেকটু উপরে উঠতেই তাকিয়ে দেখি কেউ নেই! ওমা! মাত্রই দেখেছি কেউ একজন দাঁড়িয়ে ছিল। কাছে এগিয়ে দেখতে পাই বসার বেঞ্চির উপর কারো মোবাইল পড়ে আছে। নিশ্চিত হলাম মেয়েটি ছাদে রয়েছে।
ঝুম ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। মেয়েটিকে দেখার জন্য কৌতুহল নিয়ে ছাদে উঁকি দেই, তাকিয়ে আমার চোখ কপালে উঠে যায়! দেখতে পাই মেয়েটি খুব বেশি দূরে নয়, ছাদের দরজা ঘেষে পাশেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টিতে ভিজে থরথর করে কাঁপছে। হঠাৎ আমার মুখ দেখে চমকে ওঠে, আমারদিকে ড্যাবড্যাবিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। কি করবে বুঝতে না পেরে চিলেকোঠার সানসেটে ফিরে আসে। মেয়েটিকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই নিজ থেকে বলা শুরু করে দিল.. “দেখুন আমি জানি নোটিশে ছাদে যাওয়া নিষেধ আছে, আমি ছাদে ঘুরতে আসিনি শুধু একটু বৃষ্টি ছুতে এসেছিলাম” মেয়েটির মাথা ভিজে টুপটুপ করে পানি পড়ছে, গা তখনো পুরোপুরি ভিজেনি। বুঝাই যাচ্ছে মাত্রই ছাদে এসেছে। তবু মেয়েটি থরথর করে কাঁপছে। আমি হুট করে চলে আসায় ভয় টয় পেয়েছে হয়তো। আমি নরম সুরে বললাম..
– আরে ইটস্ ওকে, এটা কোনো ব্যাপার না, বৃষ্টিতে যে কেউই ভিজতে পারে মেয়েটি চট করে প্রতিউত্তরে বললো…
– ভিজতে নয়, শুধু দেখতে এসেছিলাম, আমাদের ফ্ল্যাটের প্রতিটা জানালা ঘেঁষে বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে, বদ্ধ জায়গা থেকে বৃষ্টি দেখে শান্তি নেই
– হুম, কিন্তু আপনি যে এইমাত্র বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন?! মেয়েটা কিছুটা ইতস্ততভাবে বলছে…
– আসলে নিজেও জানিনা কিভাবে যেন চলে গেলাম, কেউ একজন উপরে উঠে আসছে, ভাবলাব চিলেকোঠার স্টোররুমে কেউ হয়তো ঢুকবে, তাই ক্ষণিক আড়াল হতে ছাদে চলে গিয়েছিলাম মেয়েটি জড়তাহীন কথা বলে যাচ্ছে অথচ তার শরীরটা অনবরত কাপছে
– ওহ আচ্ছা, আম স্যরি, আপনাকে হয়তো খুব বেশিই ভয় পায়িয়ে দিয়েছি, প্লিজ রিলাক্স
– না আসলে আমি ঠিক আছি, বৃষ্টিতে ভেজা নিয়ে আমার একটু এলার্জি রয়েছে, বৃষ্টিতে ভিজতে ভয় পাই, বহু বছর পর বৃষ্টি পানি গায়ে লেগেছে তাই একটু অস্বস্তি লাগছে।
– বৃষ্টিতে এলার্জি অথচ অথচ আপনি এত আয়োজন করে বৃষ্টি দেখতে ছুটে আসেন? ইন্টারেস্টিং! মেয়েটা মিষ্টি হেসে উত্তর দেয়…
– আপনি জানেন না ডায়াবেটিসের রোগীরা মিষ্টি খেতে খুব পছন্দ করে? যার যেটাতে মানা সেখানেই দেয় হানা!
মেয়ের হাসির তালে তালে আমিও হেসে উঠি। এদিকে বাহিরে বৃষ্টি কমে এসেছে। “আচ্ছা আমি আসি” বলেই মেয়েটি তড়িঘড়ি করে সিঁড়িবেয়ে নামা শুরু করে দিল।
– এক্সকিউজ মি মাঝসিড়ি থেকে মেয়েটা ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে বলছে…
– কিছু বলবেন?
– মানে বলছিলাম আরকি আপনি চাইলে যেকোনো সময় বৃষ্টি দেখতে চলে আসতে পারেন,
আমিতো শুধু মেঘের টানে ছুটে আসি, বৃষ্টির আগ মুহূর্তটা আমার অনেক ভাল লাগে। মেঘলা হাওয়া শেষে বৃষ্টি না হয় আপনার জন্যই বাকি থাক, সমস্যা নেই আপনি আসলেই আমি বাসায় চলে যাবো মেয়েটা হ্যা না কোনো উত্তর না দিয়ে, মৃদু হেসে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। কথা শুনে বুঝতেপারলাম মেয়েটি আমাকে ভালো ভাবেই চেনে, অথচ আমি তাকে আজকেই প্রথম দেখলাম। কোন ফ্ল্যাটে কার মেয়ে বিস্তারিত কিছু জানতে পারিনি। প্রথম দেখা পেয়ে মেয়েটির মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম, অত শত প্রশ্ন মনেই ছিল না। ভাবলাম পরবর্তীতে দেখা হলে জেনে নেওয়া যাবে। অথচ প্রকৃতির কি শনির দশা শুরু হল.. দুই সপ্তাহ পেরিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির খবর নেই। কাঠফাটা রোদে সবকিছু শুকিয়ে চৌচির। এদিকে আমার মনটাতেও চির ধরা শুরু করেছে, এক পশলা বৃষ্টির খুব বেশি প্রয়োজন!
অবশেষে আকাশের কোণে কাঙ্খিত মেঘের দেখা, বুঝা যাচ্ছে আজ খুব করে বৃষ্টি হবে। আমি ওঁৎ পেতে বসে আছি ছাদে যাব বলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় দমকা বাতাস। আমি আর আমার মাঝে নেই, দৌড়ে ছুটে যাই খোলা আকাশের নিচে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হলে সেই চিলেকোঠার সানসেটের নিচে বসে রইলাম মেয়েটির অপেক্ষায়। মেয়েটি কি আসবে? বৃষ্টির গতি বেগ বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে অবশেষে শুনতে পেলাম সেই পায়ের ধ্বনি, সে উপরে উঠে আসছে, আজ নিশ্চয়ই সে মাঝপথে ফিরে যাবে না? শেষ পর্যন্ত ফিরে যায়নি! দুই সপ্তাহ পর দেখা পেলাম মেয়েটির সাথে। মৃদু হেসে দুই চার লাইন কুশল বিনিময় করে আমি নিচে চলে এলাম। সেদিনও মেয়েটির সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারিনি, সে যে এসেছে সেই খুশিতেই সব ভুলে গিয়েছিলাম। বৃষ্টি যেভাবে শুরু হয়েছে টানা দু চারদিন তো চলবেই। আস্তে আস্তে জেনে নেয়া যাবে। আমি বাড়ির বাইরে দূরে কোথাও যাওয়াই বন্ধ করে দিলাম! যত যাই হোক মুহূর্ত গুলো মিস করা যাবে না।
ধীরে ধীরে এভাবে বেশ কয়েকবার মেয়েটির সাথে দেখা হলো, দু’চার লাইন কথা হলো, জানতে পারলাম মেয়েটির নাম রিধি, আমাদের ফ্লোরে পশ্চিমের ফ্ল্যাটে থাকে, প্রায় একবছর হল এসেছে। খুব ঘরকুনো টাইপের মেয়ে এজন্য বাহিরেও তাকে একবারো দেখি নাই। বই আর বৃষ্টি নিয়েই তার সংসার। শুনেছিলাম মেয়েটা অসুস্থতার জন্য এবার ইন্টার পরীক্ষা দিতে পারেনি, সেকেন্ড টাইমের অপেক্ষায় আছে তাই কখনো কলেজেও যেতে দেখিনি। এভাবে প্রতিবার কিছুক্ষণ কথা বলা, আমার বেড়ে যাওয়া হৃদস্পন্দন, মেয়েটির লাজুক হাসি, সবকিছু মিলিয়ে অন্যএক দুনিয়াতে হারিয়ে গেলাম আমি। কয়দিনের মাঝে রিধির প্রেমে রীতিমতো হাবুডুবু খাওয়াশুরু করলাম। রিধি উঠতি বয়সী কলেজ পড়ুয়া মেয়ে, সে খুব ভালভাবেই বুঝে যায় আমি এখন তার অপেক্ষাতেই ছাদে বসে থাকি। রিধির মাঝেও আস্তে আস্তে বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।
একদিন চলে আসার সময় নিয়ম ভেঙে সাহস নিয়ে বলে উঠলাম… “আকাশে এখনো আমার কালো মেঘ রয়ে গেছে থেমে থেমে দমকা বাতাস বইছে, আমি কি কিছু সময় বসতে পারি?” রিধি এক সাইটে সরে বসে বেঞ্চিতে জায়গা করে দিল, আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো.. “সমস্যা নেই আপনি চাইলে বৃষ্টি দেখতে পারেন” এভাবে ধীরে ধীরে মেঘ বৃষ্টি দেখায় অজুহাতে দুজনে ভিন্ন নেশায় জড়িয়ে পরেছিলাম। দেখা করার নেশা, পাশে থাকার নেশা। অথচ কেউ কাউকে ভালবাসার কথা মুখে বলতাম না। রিধি প্রতিবার অপেক্ষা করে বসে থাকতো আজ বোধহয় তাকে আমি ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেব। বলি বলি করেও বলার সাহস পেতাম না। আমার অগোছালো কথা শুনে রিধি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মুখ চেপে অকারণে হেসে যেত।
একদিন ঘটে গেল মহা বিপদ। প্রতিবারের মতো দুজন বসে বসে বৃষ্টি দেখছিলাম আর গল্পে মেতে ছিলাম এমন সময় কেউ একজন উপরে উঠে আসছে। রিধি সাথেসাথে চমকে উঠে দাড়ালো “মনে হয় কেউ আসতেছে!” আমি বললাম.. হতে পারে পাঁচ তলার কেউ। তবুও তার ভয়.. যদি উপরে উঠে আসে! কেলেঙ্কারির বেধে যাবে। আমি একটু উঁকি দিয়ে দেখলাম সাইফুল চাচা, আমাদের বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকার, নিশ্চয়ই তিনি এখানেই আসবেন!
চিলেকোঠার স্টোররুমে মাঝেমধ্যেই যাতায়াত করেন, হয়ত কিছু নিতে আসছেন। রিধি শুনেই এক দৌঁড়ে ছাদে চলে যায়। আমি কি করবো বুঝতে না পেরে আমিও চলে গেলাম। দুজন চুপিসারে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি। বৃষ্টির বেগ এতটাই ছিল যে দুই মিনিটেই দুজন ভিজে চুবচুবে হয়ে গেছি, একটি পশমও ভিজতে বাকি নেই। রিধি প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে, আমি জানি তার বৃষ্টিতে সমস্যা আছে, সে অজান্তেই কখন যেন শক্ত করে আমার হাত ধরে ফেলেছে। সাইফুল চাচা স্টোর রুম খুলে কিছু একটা নিয়ে চলে গেলেন। রিধিকে বললাম ভিজেইতো গিয়েছি এখন আর চিলেকোঠায় ফিরে গিয়ে কি হবে চলো না ঐ পাশটায় গিয়ে কিছুক্ষণ বৃষ্টির নিচে বসে থাকি।
রাজি হতে নিয়েও সাহস পাচ্ছে না, আমি হাতে হাত রেখে বললাম কিচ্ছু হবে না আমি আছি। মেয়েটি কদম বাড়িয়ে দিল। এরপর দুজন মামীর ছাদ বাগানের ভেতর ঢুকে গেলাম, পরিষ্কার জায়গা খুজে নিচে বসে পড়লাম। রিধির ভেতর বৃষ্টির ভয় আর সংকোচ দুটোর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ধরে রাখা আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে সে এবার একা একা নিজের মাঝে সাহস যুগিয়ে নেয়। প্রবল বেগে বৃষ্টি ঝড়ে পড়ছে, বাতাসে ছোট বড় গাছ গুলি একে বেঁকে যাচ্ছে, বৃষ্টি ফোটা এলোমেলোভাবে গায়ে গেঁথে যাচ্ছে। রিধি দাড়িয়ে যায়, বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা সানন্দে গ্রহণ করে নেয়। মেয়েটা সেদিন বহুদিন পর প্রাণ খুলে বৃষ্টিতে ভিজতে পেরে অন্য জগতে হারিয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির মাঝেও মানুষ ভয় খুঁজে পায় ব্যাপারটা আমার অদ্ভুত লাগতো, তবে সেই ভয়টা তার একটু একটু করে কেটে যাচ্ছে দেখে বেশ ভালো লাগছিল।
এতো সুন্দর একটি মুহূর্ত হয়তবা আর নাও পেতে পারি, মনের কথা বলে দেওয়ার জন্য এর থেকে বেস্ট সিচুয়েশন আর হতেই পারে না। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আজ এমুহুর্তেই রিধিকে সব বলে দেব। সাহস নিয়ে রিধির পাশে গিয়ে দাড়াই, রিধি তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি স্নানে ডুবে আছে। আমি কোনোরকম ভণিতা না করে সরাসরি বলে দিলাম “তোমাকে ভালোবাসি” । রিধি এতটাই বৃষ্টির মাঝে ডুবে গিয়েছিল যে আমি পাশে এসে দাড়িয়েছি মেয়েটা বুঝতেই পারেনি, চমকে উঠে বললো.. “কিছু বললেন?” আমি দ্বিতীয়বার বললাম “ভালোবাসি তোমাকে” রিধি মুখ ফিরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আবারও বলছে.. “কি বললেন বুঝি নাই!” রিধি মুখ চেপে হাসি আটকে রেখেছে। প্রচন্ড শব্দে বৃষ্টি ফোটা পড়ছে।
আমি হাতের তালুতে বৃষ্টি পানি নিয়ে রিধির মুখে ছুড়ে মেরে জোর গলায় বলে উঠলাম “এই মেয়ে বললাম ভালোবাসি তোমাকে শুনতে পাও নাআআ…???” মেয়েটিও হেসে হেসে জোর গলায় উত্তর দিচ্ছে “নাআআ কিছুই শুনতে পাই নাআ..!!” একথা বলেই মেয়েটি চিলেকোঠার দিকে ছুটে যায়, পিছু নিয়ে যেতে যেতে দেখি মেয়েটি গায়েব! সিঁড়ি বেয়ে নিচে চলে গেছে। আমি জানতাম মেয়েটি এমনি মজা নিচ্ছে এরপরও প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল, এভাবে ঝুলে থাকা প্রচন্ড অস্বস্তিকর। একের পর এক মেসেজ দিয়ে গেলাম কোনও উত্তর দিচ্ছে না, অবশেষে রাতে মেসেজ পেলাম আবার যেদিন বৃষ্টি হবে সেদিন সে উত্তর জানিয়ে দেবে। বৃষ্টি মৌসুম তখন শেষের দিকে, আবার কবে বৃষ্টি হবে তার নাই ঠিক।
মনের কথা বলে দিয়ে আমি তখন নিরুপায়, চাতক পাখির মতন আকাশে চেয়ে থাকা ছাড়া আমার আর বিশেষ কিছু করার ছিল না। রিধির সাথে আমার বৃষ্টি ছাড়া কখনো দেখা হত না, ফোনেও কথা হত না, শুধু মাঝেমধ্যে মেসেজ আদানপ্রদান হতো এর বেশিকিছু না। এক সপ্তাহ পর। জরুরী একটি কাজে আমাকে গ্রামে যেতে হয়েছিল। আমি সেদিন বিকেলে গ্রাম থেকে বাসায় ফিরছিলাম। এমন সময় রিধির ম্যাসেজ আসে “কোথায় আপনি? আজ ছাদে আসেননি? আমি চিলেকোঠায় বসে আছি” “আমি বাসায় নেই, রাস্তায় আছি, বৃষ্টি হচ্ছে নাকি অইদিক?” “হ্যা… অনেক বৃষ্টি হচ্ছে অনেএএক” আমি সবেমাত্র রওনা দিয়েছি। সবমিলিয়ে প্রায় তিনঘন্টার পথ। মেজাজটা বিগড়ে যায় আমার। এই বৃষ্টি একদিন আগে কিংবা পড়ে আসলে কি এমন হতো? প্রচন্ড আফসোস হচ্ছিল।
পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা লেগে যায়। এলাকায় ঢুকে বুঝতে পারি আজ সত্যিই এদিক অনেক বৃষ্টি হয়েছে। বাড়ির সামনে পানি জমে আছে। জড়ো হয়ে আছে অপরিচিত অনেক মানুষের মুখ। বাড়ির গ্যারেজে ভীর জমে আছে। সাইফুল চাচাকে দেখতে পাচ্ছি পুলিশের সাথে কথা বলছে। ভেতরে ঢুকে আমার রক্তশূন্য হয়ে যায়। শুনতে পাই রিধি বেঁচে নেই! বিকেলে ছাদে তার লাশ পাওয়া গিয়েছে! আমি কোনো কিছুর হিসেব মেলাতে পারছি না। কয়েকঘন্টা আগেই রিধির সাথে যোগাযোগ হয়েছে, কীভাবে কি হল! এরপর বিস্তারিত জানতে পারি.. রিধি যে এলার্জির কথা আমাকে বলেছিল সেটি মূলত এপিলেপ্সি নামক একটি রোগ, যা এদেশে মৃগী রোগ নামে পরিচিত।
এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের বিভিন্ন কারণে হাত পা ঝাকিয়ে খিচুনি উঠে যায়। রিধির ছোটবেলা থেকে পানির প্রতি বেশ দুর্বলতা ছিল। বিশেষ করে বৃষ্টির পানিতে ভিজলে এই সমস্যাটা তার বেড়ে যেত। ছোটবেলার পর আর কখনও তাই বৃষ্টিতে ভেজেনি। সেদিন আমার সাথে ভিজে ছোটবেলার ভয়টা কেটে যায়। নতুন করে বৃষ্টি স্নানের প্রেমে পড়ে যায়। আজ ঝুম বৃষ্টি দেখে সেই লোভটা হয়তো সামলাতে পারেনি। রিধির লাশ দেখতে পেয়ে আমি আর ঠিক থাকতে পারি না। হলদে সাদা গায়ের রঙটা বৃষ্টির পানিতে ভিজে ফ্যাকাশে সাদা হয়ে আছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, দুফোঁটা চোখের জল ফেলার জায়গা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। লোকজন এড়িয়ে সোজা চলে যাই চিলেকোঠায়। বেঞ্চিতে বসে চোখ যতক্ষণ চাইলো হাউমাউ করে কেঁদে ভাসালাম।
মেয়েটিকে আমি বৃষ্টিতে ভেজার সাহস জুগিয়েছিলাম, আজ আমার জন্যে সে এখানে এসেছিল, অনেক কথা বাকি ছিল, অনেক কিছু বলতে চেয়েছিল, কেন আজকের দিনটাতেই আমি দূরে ছিলাম? হয়তো আজ পাশে থাকলে দৃশ্য সম্পূর্ণ পাল্টে যেতো, আমাদের জীবনে নতুন এক অধ্যায় রচিত হত।বিবেকের কাছে নিজেকে অপরাধী লাগা শুরু করে, আমি সাহস না যুগিয়ে দিলে সে কখনোই ভেজার সাহস পেত না। টানা কয়েক মাস আমি মানসিকভাবে অনেকটা অসুস্থ হয়ে যাই। বৃষ্টি দেখতে বসলে প্রতিমুহূর্তে রিধির পায়ের আওয়াজ শুনতে পেতাম, মনে হত রিধি সিঁড়িবেয়ে উপরে উঠে আসছে, কখনো মনে হতো মেয়েটি বৃষ্টিতে হেঁটে বেরাচ্ছে। আমি সাইকো থেরাপি নেওয়া শুরু করলাম, ডাক্তারের পরামর্শে বেশকিছু মেডিসিন চালিয়ে যাই।
একপর্যায়ে ইচ্ছেকরে মেডিসিন নেওয়া বন্ধ করে দেই! রিধির অস্তিত্ব যদি অনুভব করতে পারি মন্দ কি?! হোক যা হবার আমি এভাবেই থাকবো। ধীরে ধীরে আমি সেভাবেই কল্পজগতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। বৃষ্টি মৌসুম এলে রিধিকে প্রায়শই পাশে অনুভব করে যেতাম। কানে রবীন্দ্রসংগীত বাজিয়ে এক ধ্যানে চিলেকোঠায় বসে বৃষ্টি দেখতাম। একই গান বারবার বেজে যেত কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে তোমারে দেখিতে দেয় না মাঝে মাঝে তব দেখা পাই চিরদিন কেন পাই না ঠিক এভাবেই সেদিন মধ্য দুপুরে চিলেকোঠায় বসে গান শুনছিলাম, একই নিয়মে মেঘ বৃষ্টির খেলায় হারিয়ে গিয়েছিলাম। পেছন থেকে আমার মেয়েটা হঠাৎ ডেকে উঠলো.. “বাবা ভাত খাবে না? আম্মু ডাকছে তোমাকে”
“হুম, আসছি মামুনি একটুপর”
“না না এক্ষুণি চলো”
“মামুনি তুমি টেবিলে গিয়ে বসো, আমি একটুপরেই আসছি”
মেয়েকে বুঝিয়ে নিচে পাঠিয়ে দিলাম। রিধির সেই এক্সিডেন্টের পর বাসা থেকে আমাকে দ্রুত বিয়ে করিয়ে দেয়। আমার বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় ছয় বছর হয়ে গেল, এখন আমি এক সন্তানের বাবা! এতটা সময় পার হয়ে গিয়েছে তবু বৃষ্টি এলে আজও আমি ঘরে থাকতে পারি না। আমার স্ত্রী জানে মেঘ বৃষ্টির নেশা এটা আমার পুরনো অভ্যাস। একটা মেয়ে এতোটাও বোকা নয়, অভ্যাসের পেছনে আরও কিছু গল্প রয়েছে সে আমার চোখমুখ দেখেই বুঝে যায়, তবু কখনো মুখফোটে বাধা দেয়নি। আমি জানি এভাবে রিধিকে কল্পনায় রাখা আমার মোটেই ঠিক হচ্ছেনা।
জীবনটাকে এক বৃত্তে বেধে রেখে বাকি দুটি জীবনের সাথে অবহেলায় কাটাতে পারিনা। সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই আর কখনোই এভাবে একা বসে গান শুনবো না, বৃষ্টি দেখতে বসে আর কখনোই রিধিকে অনুভব করবো না। নিজের সাথে সংকল্প করে উঠে দাঁড়িয়ে যাই, প্রিয় গানটি ডিলিট করে দেই। নিচে যাওয়ার জন্য কয়েকধাপ সিঁড়ি নেমে আসি। মুহূর্তেই আমার হৃদস্পন্দন পরপর দুবার মিস হয়ে যায়! তাকিয়ে দেখি সিঁড়ির বাঁকে রিধি দাড়িয়ে আছে! বেগুনী রঙের জামা, সাদা ওড়না, পুরো শরীর বৃষ্টিতে ভিজে আছে, গা বেয়ে টপটপ পানি পড়ছে! শেষ দিন যে জামাটি পড়ে লাশ হয়ে পড়েছিল ঠিক সেই জামাটি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো ঝাপসা কখনো পরিষ্কার, তবে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মেয়েটি ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
এদিকে নিচ থেকে আমার মেয়েটা আমাকে আবারো ডাকছে.. “বাবা কই.. আসো না মেয়ের ডাক শুনে রিধি এক পলক নিচে তাকিয়ে আবার আমার দিকে তাকায়। এরপর এক পা দুই পা করে আমাকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। আমি দাঁড়িয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে ভাবছি এতোদিন শুধু অনুভব করে যেতাম, কখনো এমন হ্যালুসিনেশন হয়নি, আমিকি পুরোপুরি পাগল হয়ে গিয়েছি! রিধি বাহিরে বৃষ্টির দিকে এক হাত বাড়িয়ে দেয়, তখনও আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ঠোটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে হাতে জমানো বৃষ্টি পানি আমার দিকে ছুড়ে মারে! সরাসরি পানি আমার চোখে এসে লাগে। পানির ছেটায় মুখ ও শার্টের অনেকাংশ ভিজে যায়। আমি নিশ্চিত হই এটা কখনোই হ্যালুসিনেশন হতে পারে না, আমি সম্পূর্ণ বাস্তবের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি! পরক্ষণেই মেয়েটি ধেয়ে আসা বাতাসের সাথে মিলিয়ে যায়। আমি তৎক্ষণাৎ দৌড়ে ছাদে উঠে যাই, পুরো ছাদ চোষে বেড়াই, কোথাও কাউকে খুঁজে পাইনা।
সেদিনের পর থেকে আমি আর কোনোদিন রিধির অস্তিত্ব অনুভব করিনি। রিধি তার যথা স্থানে চলে গিয়েছে। যেতে যেতে রিধি তার না বলা কথাটি বলে গিয়েছে। ঠিক আমার মতো মুখে পানি ছিটিয়ে সেদিনের উত্তর নিঃশব্দে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছে…. “তোমাকেও ভালোবাসি!!” কিন্তু কী আশ্চর্য ব্যাপার, আমিও আজ তার মতন একই কথা বারবার আউড়ে বেড়াচ্ছি “কী বললে?? শুনতে পাইনি…!” তবে রিধির মতো লাজুক ভণিতা করে নয়,,, আমি সত্যি সত্যিই শুনতে পাইনি।।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত