ফাও বিয়ে খাওয়া

ফাও বিয়ে খাওয়া
আমি ফিটফাট হয়ে সেজেগুজে ফাও বিয়ে খেতে এক কমিউনিটি সেন্টারে যাচ্ছি।ঢাকার এমন কোনও কমিউনিটি সেন্টার নেই যেখানে আমি যায়নি।ফাও বিয়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার কুড়ি বছরের।ইতিপূর্বে আমার বাবা-দাদাসহ চৌদ্দপুরুষ ফাও বিয়ে খেয়েছেন।আমিও আমার বংশের ঐতিহ্য বহাল রাখতে ফাও বিয়ে খেয়ে আসছি।এ নিয়ে আমার ফাও বিয়ে খাওয়ার সংখ্যা প্রায় হাজার পঞ্চাশ।আমি শুধু ফাও বিয়ে খাই তা না।পেট ভরে খেয়ে-দেয়ে প্যাকেট করে সঙ্গে নিয়েও আসি।
আপনাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে প্রায় দেরি হয়ে গেল।বেশি দেরি হলে আবার রোস্ট, রেজালা শর্ট পরতে পারে। আজকাল লোকজন কোনো অনুষ্ঠানে আসেই শুধুমাত্র খাওয়ার কথা চিন্তা করে। বড়ই আফসোসের বিষয়!
আমার প্রানপ্রিয় বন্ধুর ঠিকানা অনুযায়ী সোহাগ-১ কমিউনিটি সেন্টারের সামনে চলে আসলাম।এসেই মনে একটা খটকা বাঁধলো।শুনেছি এক ভদ্রলোকের একমাত্র মেয়ের বিয়ে।কিন্তু কমিউনিটি সেন্টারের সামনে কোনো বিয়ের গাড়ি নেই। হয়তো বরপক্ষ এখনো আসে নাই।এটা ভেবে সোহাগ-১ কমিউনিটি সেন্টারে প্রবেশ করলাম।ভিতরে ঢুকে দেখি পুরো কমিউনিটি সেন্টার লোকারন্য।চারপাশে মানুষজন গিজগিজ করছে। এখনো খাওয়া দাওয়া শুরু হয় নাই।সবাই খাবারের অপেক্ষার প্রহর গুনছে।আমি মনে হয় বেশি তাড়াহুড়া করে সময়ের অনেক আগেই চলে এসেছি।খাবার দিতে একটু দেরি হবে। সেজন্য দূরের একটা ফাঁকা চেয়ার দেখে বসে পড়লাম।সময় কাটানোর জন্য প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফেসবুকে পদার্পণ করলাম।
ফেসবুকিং করতে করতে চোখ গেল অদুরে দাঁড়িয়ে থাকা ২১/২২ বছরের এক রূপবতী রাজকন্যার দিকে।রাজকন্যাটি লালচে শাড়ি পড়েছে, চুলের গোছায় বেলি ফুলের মালা জড়িয়েছে।দেখতে বেশ চমৎকার লাগছে।
এমনিতে আমার অচেনা মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকার স্বভাব একদম নেই বললেই চলে। আমার অন্তর লজ্জা একটু কম হলেও চক্ষুলজ্জাটা অত্যন্ত বেশি! কিন্তু আজ চক্ষু লজ্জা সরিয়ে মেয়েটার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। পেটে খিদে থাকলেই আমি আবার ক্রাশ খাই!রীতিমতো এবারও ক্রাশ খেলাম।মেয়েটির প্রেমে পড়লাম।মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম মেয়েটিকে প্রপোজ করবো।আমি বিশটা বসন্ত পের করেছি অথচ এখন পর্যন্ত কোনো মেয়েকে প্রপোজ করি নাই।তাই একটু একটু ভয় করছিল।তবুও বুকে সাহস সঞ্চয় করে মেয়েটির কাছে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে আদুরে কন্ঠে বললাম,
— ‘হাই, তুমি তো আমার জিএফের মতো। আমি তোমাকে তুমি করে বলি?’
মুহুর্তে ঠাশ করে একটা আমার বাম গালে চড় পড়লো।চড় খেয়ে আমি থ’বনে গেলাম।গালে হাত রেখে বেকুব হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখি সবাই আমার দিকে এলিয়েন দেখার মতো তাকিয়ে রয়েছে।আবার কেউ কেউ খিলখিল করে হাসছে। পরক্ষণেই ৪ বছরের একটা বাচ্চা এসে মেয়েটিকে বলতে লাগলো,
-“অ্যাম্মু অ্যাম্মু, তুমি এ্যাংকেলকে তর মারলে কেন?
বাচ্চাটির কথা শুনে আমি এতোক্ষন অবাক হওয়ার সব লিমিট ক্রস করলাম।এতক্ষণ ধরে যে মেয়েটিকে সিঙ্গেল ভেবে প্রপোজ করতে এসে চড় খেলাম।সে মেয়েটি কি-না বিবাহিত।একটা বাচ্চাও আছে।ছি নয়ন ছি।তোর ভাবনা গুলো এমন কেন?নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পূর্বের জায়গায় এসে বসে পড়লাম। এদিকে ক্ষুধায় পেট চোঁ-চোঁ করছে।খাবার দেওয়ার কোনো নামগন্ধও নেই।খুবই বিরক্ত লাগছিলো। কিন্তু এই বিরক্তিকর মুহূর্তটা মুহূর্তেই মনোমুগ্ধকর হয়ে উঠলো যখন বেয়ারা ট্রেতে করে রোস্ট, পোলাও, চিংড়ি, ইলিশ ভাজি, রুই মাছ,গরুর মাংস, হাসের মাংস আরও অনেক কিছু নিয়ে আসলো। সেগুলোর কড়া ঘ্রাণে আমার ক্ষুদার্ত পেটটা জাগ্রত হয়ে উঠলো।আমি খাবারের মোহে পড়ে সব কিছু ভুলে গিয়ে আর আপেক্ষা করতে পারছি না।তাই খাবারের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছি।
হঠাৎ এক ভদ্রলোক আমাদের নিকট এসে নরম কন্ঠে বলল, ‘‘আপনাদের মধ্যে মেয়েপক্ষ কে কে দাঁড়ান তো।’’
আমাদের মাঝে কিছু লোক দাঁড়াল। ভদ্রলোকটি আবার বলল, “এবারে ছেলেপক্ষ আছেন কারা কারা দাঁড়ান।” এবার আমি ছেলেপক্ষ হয়ে আরও কিছু লোকদের সাথে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এবার ভদ্রলোকটি কিঞ্চিত বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘‘আপনাদের মাঝে ছেলেপক্ষ এবং মেয়েপক্ষ বাদে যারা আছেন তারা থাকুন আর এই দু’পক্ষের লোক দয়া করে চলে যান। কারণ আজ আমার ছেলের সুন্নতে খাৎনা।’’ কথাটা শুনে আমার মাথায় বাজ পড়লো।পাশে তাকিয়ে দেখি আমার মতো ফাও খেতে আসা লোকগুলো লজ্জায় লজ্জিত হয়ে ছানাবড়া হয়েছে।
ফাও বিয়ে খাওয়ার কুড়ি বছরের অভিজ্ঞতায় এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতির স্বীকার আমি একবারও হয়নি।তাহলে কি আমার বন্ধু আমাকে এ ভাবে ধোঁকা দিল? ভাবতে ভাবতে মাথা হেঁট করে ফাও বিয়ে খেতে আসা লোকগুলোর সাথে সোহাগ ১ কমিউনিটি সেন্টার থেকে বেরিয়ে আসছি আর একটু পর পর আমার চোখের সামনে নানা পদের খাবারগুলে ভাসছে।ইলিশ ভাজি আর বিরিয়ানি আমার খুব প্রিয় অথচ একটুও খেয়েও দেখা হলো না,কি আফসোস!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত