হঠাৎ দেখা

হঠাৎ দেখা
আজ চায়ে চিনি কম আছে, খেতে পারিস…
——–আমি চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি অনুরাগ দা….
——–ওহ! তাহলে? কফি খাস?
——–কোনোটাই না।
——-কিন্তু মীরা তোর তো মাথা ব্যথা করতো চা না খেলে?
——-সময়ের সাথে সাথে পুরোনো অভ্যেস পাল্টে যায়,
অভ্যেস পাল্টে গেলে পুরোনো ব্যথা মরে যায় অনুরাগ দা, সময় সুযোগ বিশেষেও তেমন একটা টনটন করে ওঠে না। শুধু পুরোনো অভ্যাসের কথা মনে পড়লে নিজেকে বড্ড বোকা মনে হয়, ঠোঁটের কোনে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে….
——–যাকগে, কেমন আছিস মীরা? তোর মেয়েটা কত বড় হলো রে? শেষবার যখন তোর সাথে কথা হলো, শুনেছিলাম তুই মা হয়েছিস, তোর মেয়ে হয়েছে! তারপর তোর সাথে আর ইচ্ছে করেই যোগাযোগ করিনি, যোগাযোগ বাড়লে মায়া বাড়ে তোর মনে পড়ে মীরা! শেষবার যখন তোকে দেখেছিলাম, তুই হলুদ পাড়ের শাড়ি পরে, এক মাথা সিঁদুর মেখে বরের এসি গাড়িতে বসেছিলি! আমি পাশেই মোটর সাইকেলে ছিলাম, চোখ থেকে দুই এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছিল সেদিন, ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল চারিদিক, গলাটা বুজে আসছিল যাকগে, তোর মেয়ের নাম কী? আর হঠাৎ আজ এই পথে! মেয়েকে স্কুলে আনতে গিয়েছিলি বুঝি?
——-না, অন্য কাজে গিয়েছিলাম, টুকটাক বাজার করার ছিল। তুমি কোথায় গিয়েছিলে অনুরাগ দা?
——–আমি বাড়ির দিকেই যাচ্ছিলাম, আজ হাফ ছুটি অফিসে, অফিস থেকে ফিরছি! খুব ক্লান্ত…..
——-বাড়িতে নিশ্চই তোমার বউ অপেক্ষা করছে, বাড়ি ফিরলেই তোমার মাথা টিপে দেবে, সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে, যাও অনুরাগ দা তাড়াতাড়ি চা টা খেয়ে বাড়ি যাও….
——–হ্যাঁ যাচ্ছি, আজো তাড়িয়ে দিচ্ছিস! এতদিন বাদে তোর সাথে দেখা হলো, আজ একটু কথা বলি মীরা প্লিজ! তোর বর কেমন আছে?
——-সবাই খুব ভালো আছে, আমার দেরি হচ্ছে, এবার আমি যাই। অনেক কাজ আছে বাড়িতে, রান্না করতে হবে….
——–বাবাঃ! সংসারী হয়ে উঠেছিস যে!
যে মেয়েটা সামান্য জল গড়িয়ে খেতে পারতো না, সে রান্না করে এখন! যে মেয়েটা ভর দুপুরে বাড়ির থেকেই বেরোতে পারতো না, সে ছাতা না নিয়ে এই গনগনে রোদে ভারী বাজারের ব্যাগ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে যে মেয়েটা কাচাধোয়া ইস্ত্রিপাট চুড়িদার ছাড়া অন্য কিছু পরতো না, সেই মেয়েটা এরকম সস্তার সুতির শাড়ি পরে বাজারে বেরিয়েছে! সামান্য গালে একটা ব্রণ হলে যে মেয়েটা নিজেকে বারবার আয়নায় দেখতো, টেনশন করতো, নখ খুঁটতো, তার চোখের তলায় কালি কেন পড়েছে মীরা? এত রোগা কেন হয়ে গেছিস? তুই ভালো আছিস তো মীরা?
——তুমি ভালো থাকলে আমিও ভালোই আছি অনুরাগ দা….
——-এটা কোনো উত্তর নয় মীরা! কী হয়েছে?
তোর বর তোর খেয়াল রাখে তো? তোর যত্ন করে তো? তোর কান্না পেলে তোকে শান্ত করতে পারে তো? তোর অভিমান হলে তোকে নিয়ে ছাদে যায় তো? তোকে আচার কিনে দেয়? মাছের ঝোলে নুন বেশি হলে বকাঝকা দেয় না তো? জানি, তোর বর অনেক বড় লোক তোকে নিশ্চই নামিদামি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায়, গয়না কিনে দেয় অনেক! তুই তোর বরকে বলেছিস তোর কাঁচের চুড়ি বড্ড ভালো লাগে, হাত থেকে পড়ে গেলেই ভেঙে যায় তবুও তোর কাঁচের চুড়ির আওয়াজ খুব ভালো লাগে! তুই তোর বরকে বলেছিস কখনো, তোর মেঘলা দুপুর খুব ভালো লাগে! বৃষ্টির পর পাতার ফাঁক বেয়ে ওঠা চিকচিকে রোদ খুব ভালো লাগে! বিকেল বেলার শান্ত মাঠ তোর ভালো লাগে! অনাথ আশ্রমে গিয়ে বাচ্চাদের পড়াতে তোর খুব ভালো লাগে, এতকিছু বলেছিস তোর বরকে? সন্ধে বেলায় বেজে ওঠা শাঁখ আর আজানের স্নিগ্ধ আওয়াজ তুই শুনলে শান্তি পাস, বলেছিস তোর বরকে? রাতের বেলায় খিদে পেলে ফ্রিজের ভেতর মিষ্টি হাতড়ে বেড়াস, তোর বর জানে এসব কিছু?
———আমি বাড়ি যাই অনুরাগ দা, মা অপেক্ষা করছে, অনেক দেরি হলো। তুমিও যাও, তোমার বউ নিশ্চই অপেক্ষা করছে….
——-হ্যাঁ যাচ্ছি, একটা কথা বলবি প্লিজ? তুই ভালো আছিস তো মীরা?
———কেন বলো তো, অনুরাগ দা?
আমি ভালো না থাকলে তুমি বুঝি আমায় ভালো রাখার দায়িত্ব নেবে? তোমার এত কেন চিন্তা আমায় নিয়ে একটু বলবে? শুনতে চাও আমার জীবন সম্পর্কে অনুরাগ দা? আমার বর আর মেয়ে মারা গেছে এক্সিডেন্টে, বাবাও মারা গেল একবছরের মধ্যে মা অসুস্থ প্রায় এক বছর ধরে, বিয়ের পর আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলাম, অন্য কোথাও চাকরি পাইনি। সংসারটা আমায় চালাতে হয়, রান্নার কাজ করি, হোম ডেলিভারি, সন্ধেবেলায় বাচ্চাদের পড়াই….
আমি বিয়েটা করেছিলাম ভালো থাকবো বলে, বাবা চেয়েছিল বড়লোক বাড়িতে বিয়ে হোক আমার। বিয়ের পর শশুর বাড়ির থেকে আমার গান গাওয়াটা ছাড়িয়ে দিলো, আমি কবিতা লিখতাম, আমার লেখালেখি বন্ধ করিয়ে দিলো, বহুকাল গান গাই না, এখন গান শুনলেও বুক কেঁপে ওঠে মাঝেমধ্যে ছাদে গিয়ে দাঁড়াই বিকেল বেলায়, পাশের বাড়ির মেয়েটা গান করে, আমার দুই গাল বেয়ে অভিমানের জল ঝরে যায় সমানে। আচ্ছা অনুরাগ দা মরা মানুষের উপর অভিমান করা যায়? যদি বলো হ্যাঁ, তাহলে আমি আমার বাবার উপর এখনো অভিমান করে আছি বাবা কেন তোমার সাথে আমার বিয়েটা দিলো না! এত কান্নাকাটি করলাম, বাবাকে বোঝালাম, চারদিন না খেয়ে ঘরের ভেতরে গুমরে পড়েছিলাম, তবুও বাবা শুনলো না আমি রান্না করতে পারতাম না, কিন্তু কড়াই থেকে ছিটকে আসা গরম তেলের ছ্যাকা খেয়ে খেয়ে এখন রান্নাটা শিখে গেছি। এখন আমার গা থেকে আর কোনো দামি ব্র্যান্ডেড পারফিউমের গন্ধ বেরোয় না, বরং নুন হলুদ মশলার গন্ধ বেরোয়, এই হলো আমার গল্প…..
———মীরা বিয়ে করবি আমায়?
——–কি যা তা বলছো? তোমার বউ আছে তো?
——আমার কেউ কোনোদিন ছিলো না তুই ছাড়া।
তোর প্রতি ভালোবাসাটা আমার ফুরোয়নি এখনো পর্যন্ত, অন্য কাউকে কিভাবে ভালোবাসবো বল তো? তুই ভেবে নিয়েছিস আমি বিয়ে করেছি, আমিও তোর ভুলটা ভাঙাইনি তোর ভুলটা ভাঙাতাম না যদি না জানতে পারতাম যে তুই শুন্য খালি হাতে একা লড়াই করছিস, তোর পাশে কেউ নেই, তোর লড়াইয়ে আমি তোর পাশে থাকতে চাই, তোকে গানের স্কুলে ভর্তি করতে চাই বিয়ে করবি আমায় মীরা?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত