শাড়ি

শাড়ি
নিধির আব্বা মারা গিয়েছে আজ উনচল্লিশ দিন। অথছ বাসার যেখানেই দৃষ্টি ভীড়ছে মনে হচ্ছে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তার অবয়ব। ঘড়িতে সন্ধ্যে ছয়টার ঘন্টাধ্বনি শুনলেই বুকের ভেতরটায় ছ্যাঁত করে ওঠে। মাগরিবের নামায শেষ করে ঠিক এসময় চা চাইতো মানুষটা। রাত দশটায় ব্লাড প্রেশারের ঔষধ। আবার সকাল ন’টার মাঝে টেবিলে রুটি ভাজি থাকা চাই। সহ্য করতে না পেরে আমি বড় দেয়াল ঘড়িটার ব্যাটারি খুলে রেখে দিয়েছি। আসলে এই তিরিশ বছরের সংসার জীবনে ঘড়ির কাঁটা গুনে সব কাজকর্ম করেছেন নিধির বাবা। আর আমিও যারপরনাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম সেই রুটিনে। তাই উনি চলে যাবার পর এই ঘড়িকেই মনে হচ্ছে চির শত্রু। ভুলে থাকতে চাইলেও ঢং ঢং করে ঘন্টা বাজিয়ে সব মনে করিয়ে দেয় এই হতচ্ছাড়া ঘড়িটা।
– ভাবিজান, ও ভাবিজান
ইজি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে শুয়ে কেমন তন্দ্রার মতো এসেছিল। শরীফা বুয়ার ডাক যেন ছোঁ মেরে আমাকে সে স্মৃতির জলাশয় থেকে টেনে তুললো।
– হু, বলো।
-নিধি মা কল দিতাছে অনেকক্ষন ধইরা। আফনে ধরতাছেন না দেইখ্যা আমারে কল দিছে। হেরা কাল সকালে পেলেনে উঠবো।
– ঠিক আছে শরীফা। আমি কথা বলছি। যাবার সময় ফ্যানটা বন্ধ করে দিয়ে যেও। শীত করছে।
– দেহী কপালডা, জ্বর মর আহেনাই তো আবার।
– না, কিছু হয়নি। তুমি বরং এক কাপ চা করে আনো। মাথাটা ধরেছে।
– এই অবেলায় শুইয়া আছেন। ছাদে গিয়া একটু হাঁটাহাঁটি করলেও তো পারেন।
– আচ্ছা যাবো।
কথা বাড়াতে আর ইচ্ছে করেনা আমার। আসলে এই বিরতিহীন অখন্ড অবসর আমার গলায় ফাঁস হয়ে ঝুলে আছে।
শরীফা বুয়া এ বাড়িতে আছে আজ প্রায় বারো বছর। স্বামী পরিত্যাক্তা এক সন্তানের জননী। এই মহিলার জীবনী শক্তি দেখলে বড় বেশি হীনমন্যতায় ভুগি আজকাল। নিধির বাবার প্রতি ভালোবাসা আমাকে নির্ভরতা শিখিয়েছে ঠিকই সেই সাথে নিজের আত্নবিশ্বাসও কমিয়ে দিয়েছে অনেকখানি। তার শুণ্যতা তাই কাঁটার মতই পায়ে পায়ে ফুঁড়ছে এখন। ভালোবাসাটা যখন দৈনন্দিন অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। তখন সেই অভ্যাস দূর করার আর কোনো উপায় থাকেনা। আমি সেই অভ্যাসের দোষে দুষ্ট। ফোনটা বাজছে অনেকক্ষন ধরে। ধরতেই ওপাশে নিধির কান্না মেশানো গলা। সাথে অবশ্য উচ্ছাস ও রয়েছে কিছুটা।
– হ্যালো আম্মা।
– হু বল, কাল কি আসবি শিওর?
– হ্যাঁ আম্মা, ট্রানজিটের ঝামেলা নেই এবার। একটানে ঢাকা। এখন তো উবার আছে। তোমাকে কষ্ট করে নিশানকে দিয়ে গাড়ি পাঠাতে হবে না।
– ঝুমঝুমিকে নিয়ে পারবি তোরা সব সামলাতে? তার ওপর লাগেজপত্র।
– পারবো মা। আব্বাকে বলো বাজার থেকে জিয়ল মাছ এনে রাখতে। নিধিটা যে কি? ওর আব্বা যে আর নেই মেয়েটা কেনো যেন ভুলে যায়। নাকি ভুলে থাকতে চায়? মৃত্যু কি ভুলে থাকা যায়? যায়না।
– নিধু মা, আমি নিশানকে দিয়ে সব আনিয়ে রাখবো।
– আম্মা, ও আম্মা, আম্মা।
ফোঁস ফোঁস করে মেয়েটা কাঁধছে। মেয়ে কাঁদুক কিন্তু মায়ের কাঁদতে মানা। মায়েদের মন গ্রানাইট পাথরের মতো শক্ত হতে হয়। আঘাতে আঘাতে বিদীর্ণ হবে কিন্তু এতোটুকুও টলবেনা।
– নিধু মা, শান্ত হ। তোর বাবা তোকে কাঁদতে দেখলে খুব কষ্ট পেতো মনে নেই? আমি ফোন রাখছি এখন কেমন।
শেষ বিদায়ের সময়ও বাবার মুখটা একনজর দেখতে পায়নি নিধি। টিকেট ম্যানেজ করতে কী নাজেহাল হতে হয়েছে ওদের। না দেখতে পেয়ে অবশ্য ভালোই হয়েছে।বাবার জীবন্ত হাসিখুশি মুখটাই না হয় বেঁচে থাকুক ওর ভাবনায়। সেখানে সাদা কাফনের চিহ্নটুকু না থাকুক।
বিকেলের রোদ এক লাফে সজনে গাছের মাথার ওপর থেকে বারান্দায় এসে নেমেছে। এই নৈঃশব্দ্যময় বাড়িটা ওরা এলে যদি কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। নিশান তো সেদিনের পর থেকে কারো সাথে তেমন কথাই বলেনা। সাংসারিক বাজার সদাই কিংবা আত্নীয় পরিজনের আপ্যায়ন কী নিপুন হাতে করে যাচ্ছে। হঠাত করেই যেনো ষোল বছরের ছেলেটা এক ঝটকায় ছাব্বিশ বছরের যুবক হয়ে গেলো। বেড রুমে বসে আছি। আজ বাসায় অনেক মানুষের আনাগোনা। নিধি আসবে শুনে অনেকেই এসেছে। আমার জায়েরা, ভাইয়ের বউ, বোন আরো অনেকেই। নিধিরা এখনো এসে পৌঁছায়নি। আমি মনে মনে কিছুটা চিন্তিত হলেও চুপচাপ বসে আছি। আমার ছোট বোন রিমি হঠাত বলে উঠলো,
– আপা, তোর আলমারিটা খোল। শাড়িগুলি দেখি। দুলাভাই তো এতো এতো শাড়ি কিনে দিয়েছে তোকে। সেগুলোতো বেশিরভাগই রংচঙে। পরে পরে নষ্ট হবে। তারচে সবাইকে বরং দু একটা করে দিয়ে দে। আমি আচমকা ওর এমন কথায় কি উত্তর দিবো ভেবে পাইনা। তবে ওর কথাটাকে সমূলে উড়িয়েও দিতেও পারিনা। নিজের পরনের সাদা শাড়ির দিকে চোখ সরিয়ে আনি। নিধির বাবা বুঝি আমার জীবনের সবটুকু বর্ণিল রঙ নিয়ে ওপারে চলে গেলো। সাদা শুভ্র রঙের এই বারো হাতের শাড়ি একটা বিষাক্ত অজগরের মতো যেনো প্রতি মুহুর্তে গিলে খাচ্ছে আমাকে।
উঠে গিয়ে আলমারীর চাবি ঘোরাই। তাকের পর তাক সার করে রাখা শাড়ি। কোনটায় ঢাকাই জামদানী। কোনটায় হাতে আঁকা মসৃন মসলিন। কোনও তাকে আলাদা করে রাখা একটু বেশি দামের চওড়া জরি পাড়ের গাদোয়াল অথবা মিহি সূঁতোর বেনারসি। অন্যান্য তাকে উঁকি দিচ্ছে দেশি তাঁত, হাফসিল্ক, টাঙাইল,তসর আরো নানান বাহারের শাড়ি। বেশিরভাগই নিধির বাবার কিনে দেয়া। অফিসট্যুরে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়া হতো তার। অথবা কখনো কোথাও বেড়াতে গেলে কিংবা ঈদ পূজা পার্বনে। আর কিছু কিনুক না কিনুক। লোকটার শাড়ি কিনতে ভুল হতোনা।
আমাকে মজা করে বলতো,
– নীলিমা তোমাকে শাড়িতে লাল পরীর মতো লাগছে। মনে হচ্ছে এই মাত্র লাল শাড়ি পরে টুক করে আকাশ থেকে পড়লে। ওমা, আঁচলের নিচে কি লুকিয়ে রেখেছো ওগুলো? ডানা নাকি?
– এই এক কথা আর কত হাজার বার বলবে নিধির আব্বা। এবার নতুন কিছু চেষ্টা করো।
– তা তো করতেই পারি। কিন্তু গনিতের মাষ্টার মশাইয়ের মাথায় সাহিত্য ঠিক আসেনা। এই আর কি। তুমি তো সবই বোঝো।
– হুম আচ্ছা সাহিত্য কথা ক্ষান্ত দিয়ে এবার টেবিলে এসো। গরম ভাত বেড়েছি।
আপা, এই আপা, কোথায় হারিয়ে গেলি? রিমি নিশ্চই অনেকক্ষন ধরেই আমাকে ডাকছিল। এখনো হাতে লাল দোপাটির মত টুকটুকে সোনালি জরির শাড়িটা ধরা। নিধি যে বছর জন্মালো ঠিক সে বছর নরসিংদীত তাঁতি পাড়া থেকে এ শাড়িটা এনেছিলো নিধির বাবা। আজো এত বছর পর সেদিনের মতই মিষ্টি একটা সুগন্ধ রয়ে গেছে এর গায়। সময় সব মুছে দিতে পারলেও স্মৃতির সুঘ্রাণ মুছতে পারেনা। রিমি ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে নিয়ে নিলো শাড়িটা। তারপর জ্বলজ্বলে চোখে আবদারের সুরে বললো,
– আপা, শাড়িটা কী সুন্দর। এটা আমায় দিয়ে দে না প্লীজ।
– এত পুরনো শাড়ি দিয়ে তুই কি করবি?
– তুমি কিচ্ছু জানিসনা আপা।
পুরোনো শাড়ি মানেই আজকাল ক্লাসি। তাছাড়া শাড়ির সাথে ম্যাচ করে যদি পার্লের অর্নামেন্টস পরি। তাহলে তো দারুন এলিগেন্ট একটা লুক দিবে। রিমি গলায় উচ্ছাস দেখে বুকের ভেতর একটা চাপা নিশ্বাস আড়াল করলাম। কি লুক নিয়ে কথা হচ্ছে এখানে? ওমা নিধির গলা না? দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। মুখটা বিবর্ণ। চোখদুটো ফোলা আর বড় বেশি ক্লান্ত। গোলগাল মায়াবী শ্যামবর্ণা মুখটাকে দেখে মনে হচ্ছে নীড় হারা পাখির মতই বিধ্বস্ত। তবে চোখে জল নেই। কন্ঠস্বর দৃঢ়। রিমি ধরা গলায় উত্তর দিলো।
-নিধি মা, আমাদের বৈদেশি কন্যা এতদিনে আসার সময় হলোরে। দুলাভাইকে তো এক নজর শেষ দেখাও দেখতে পেলিনা রে মা। নিধিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে রিমির রীতিমতো হেঁচকী উঠে গিয়েছে। আমার আর কান্না আসেনা। পাথর চোখে শুধু চেয়ে আছি। কিন্তু কিছুক্ষন আগের শাড়ি নিয়ে মাতামাতি করা রিমিটা এখন নিধির বুকে মাথা গুঁযে আকুল হয়ে কাঁদছে। ওর এই শোক যে লোক দেখানো সেটা আমি বুঝি। কারো শোক কারো সুখে হয়তো সাময়িক ব্যাঘাত ঘটায়। কেউ কেউ আবার কাঁদার জন্য স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধ পেতে দেয়। কিন্তু শেষতক যার যার কষ্ট তার তারই থাকে। চোখের জল সহজে সবার মন স্পর্শ করেনা। নিধি এবার ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
– তুমি না কিছুক্ষন আগে আম্মার শাড়ি দেখছিলে খালা। কোনটা নিবে বাছাই করছিলে।
– হ্যাঁ তাই তো। আসলে আপা তো সাদা বা ফিকে রঙ ছাড়া এখন আর ওসব পরবেনা।
– কেনো? রঙিন শাড়ি পরলে কি হয়?
– তুই বিদেশে থাকিস দেখে দেশের এসব রীতিনীতি বুঝিসনা। বিধবারা কি রঙ চঙে শাড়ি পরে ঘুরবে নাকি। তাছাড়া মানুষ কি বলবে।
– হুম, বুঝি খালা সবই বুঝি। নিজের চেয়েও মানুষের বাঁকা কথা শোনার চিন্তাটাই আমাদের অন্তরটাকে খুন করে ফেলছে দিনকে দিন। অথছ এই মানুষ গুলো কিন্তু উড়ে এসে জুড়ে বসেনি। আমাদের কাছের লোকেরাই।
যাদের আমরা বলি আপনজন। নিধির কথায় অদৃশ্য খোঁচাটা মনেহয় টের পেলো রিমি। থমথমে মুখ করে কাজের বাহানায় অন্য ঘরে চলে গেলো। নিধি এগিয়ে এলো আমার দিকে। হাত টেনে একটা কাগজের প্যাকেট ধরিয়ে দিলো। তারপর বললো,
– আম্মা, এক্ষুনি এই শাড়িটা পরে আসো। আমি দেশে ল্যান্ড করে সবার আগে তোমার জন্য এই শাড়ি কিনতে গিয়েছি। যাও আম্মা প্লীজ। নিধির গলার স্বরে কিছু একটা নিশ্চই ছিলো। ঘরভর্তী এত মানুষের মাঝে আমি শাড়ি পাল্টাতে গেলাম। আসমানি রঙের মনিপুরী তাঁতের শাড়িটা পরে যখন বের হয়েছি তখন সবাই আমাকে দেখছে। গালটিপে হেসে কেউ বলছে ‘ আদিখ্যেতা ‘। কেউ বলছে, ‘ দুই দিনেই শোক ভুলে গিয়েছি’ আরো নানান কথা। আমি তবুও চুপ থাকি। ঝুমঝুমি দৌড়ে এসে পা জড়িয়ে ধরে বলে, ইউ লুক লাইক আ স্কাই নানু। একদম আকাশের মতো। ওর নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে আমি ভাবি, মানুষ কি সত্যিই আকাশের মতো হয়? উদার, পরিচ্ছন্ন আর ক্লেশমুক্ত। হয় নাহ্! মুহুর্তেই ভাবনার রেশ কেটে যায়। নিধি ত্রস্ত পায়ে কাছে এগিয়ে এসে বলে,
-আম্মা, সাদা শাড়িটা আমাকে দাও তো ।
– কি করবি তুই?
– নিজের কাছে রেখে দিবো।
– কেনো?
– যে শাড়ির আঁচলে তোমার এত এত চোখের জল। যা তুমি সবার আড়ালে মুছেছো এত গুলো দিন। তার চেয়ে মুল্যবান আর কোনো শাড়ি কি পৃথিবীতে আছে আম্মা? নেই।
নিধির এই সামান্য কথাটায় কি ছিলো জানিনা। কারো সামনে চোখে জল ফেলবোনা বলে প্রতিজ্ঞা করা আমি নিধিকে জড়িয়ে হু হু করে কেঁদে চলেছি। একটা প্রবল কষ্টের ঢেউ আজ কিছুতেই যেনো বাঁধ মানতে চাইছেনা। তবে নিধি শান্ত হয়ে আমাকে সামলাচ্ছে। কাঁধছেনা একটুও। আসলে, মায়েদের কাঁদতে নেই। মায়েদের মন গ্রানাইট পাথরের মতো শক্ত হতে হয়। আঘাতে আঘাতে বিদীর্ণ হবে কিন্তু এতোটুকুও টলবেনা। নিধি যেনো আজ আমার মা। মেয়েরা তো মা ই হয়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত