হাড়ি আলাদা

হাড়ি আলাদা
বাবা, আমাদের হাড়ি আলাদা করে দিন। বিয়ের ২ মাসের মাথায় একদিন সন্ধাকালে, বাবা মায়ের সাথে একটা ব্যাপারে কিছু কথা বলছিলাম। এমন সময়,আবির ভাইয়া কোথা থেকে এসে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। আমি কিছুটা না, অনেকটা অবাক হয়েছি। কারণ, আবির ভাইয়া আর আমি, বাবা মায়ের অনুমতি ছাড়া কখনো তাদের ঘরে প্রবেশ করতাম না। কিন্তু ভাইয়ার আজ কি হলো?? এত বছরের অভ্যাস এই ১ দিনেই কিভাবে বদলে গেল?? কথাগুলো ভাবছি এমন সময় ভাইয়া অন্য কোন কথা না বলে ডিরেক্ট বাবাকে উপরের কথাটা বলে দিল। বাবা অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ভাইয়ার দিকে। মায়ের চোখে পানি। আর আমার চোখ তো ছানাবড়া হয়ে গিয়েছে। ভাইয়া এগুলো কি বলছে ?? বাবা কিছু সময় চুপ করে কি যেন ভাবলেন, তারপর আবির ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তুমি কি সত্যিই আমাদের থেকে আলাদা হতে চাও??
ভাইয়া মাথা নিচু করে হ্যা বলে দিলো। বাবা হালকা হাসার চেষ্টা করলেন কিন্তু অতি দুঃখে সেটাও করতে পারলেন না।
যাহোক, বাবা ওইদিন ভাইয়ার কথায় রেখেছিলেন।আর রাখবেই বা না কেনো??সারাজীবনে, উনি আমাদের একটা ইচ্ছাও অপূর্ণ রাখেন নি। যখন যেটার আবদার করেছি, বাবাকে বলতে দেরি হয়েছে কিন্তু বাবার সেটা নিয়ে আসতে দেরি হয় নি। বড় ভাইয়া ছোট থেকেই কেমন যেন একটু লাজুক আর চুপচাপ স্বভাবের ছিলেন। আমার আর ভাইয়ার বয়সের পার্থক্য মাত্র ২ বছরের। ছোট থেকে খুব বেশি চঞ্চল ছিলাম। বাবা মাকে আমার এই চঞ্চলতার আদলে করা কাজগুলোর জন্য অভিযোগও শুনতে হয়েছে। তবে তারা অভিযোগগুলো নিজেদের মনের ভেতরেই পুষে রাখতেন। আমাকে কখনো বলতেন না যে আজ ওমুক এসেছে তোমার নামে নালিশ দিতে। বাবা মায়ের থেকে না জানলেও ব্যাপার গুলো আমি তাদের থেকেই জানতাম যারা আমার বাবার কাছে নালিশ দিতো। শেষ বারের অভিযোগে নিজে মনে মনে পণ করেছিলাম যে, আমার জন্য অন্তত আর কোন অভিযোগ আমি এই বাড়িতে আসতে দিবো না। আর হ্যা, আমি সফল হয়েছিলাম।
ভাইয়া আলাদা হওয়ার ২ দিন পরেই আমাদের বাসা ছেড়ে ভাইয়া তার বড়লোক শ্বশুড়বাড়ি গিয়ে উঠল। ভাবি যেমন সুন্দরী ছিলেন তেমন ভাবির সম্পত্তিও কম ছিল না। আর ভাবির সম্পত্তি কম ছিল না এই জন্যই বলছি, ভাবির বাবা মায়ের মৃত্যুর পরে সকল সম্পত্তি ভাবি নিজে পাবে। কারণ, ভাবি ওনাদের একমাত্র সন্তান ছিলেন।
এত কিছু আল্লাহর তরফ থেকে একসাথে পেয়েছিল জন্য একটু না অনেক্ষানিই অহংকার বাসা বেঁধেছিল ভাবির মনে। ভাইয়া আর ভাবির আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে আমি এটুকু জেনেছিলাম, অসুস্থ মা, আমার পড়াশোনা, আর সাংসারিক যাবতীয় খরচ ভাইয়া একাই বহন করত বলে ভাবির এগুলো সহ্য হত না। ওনার কথা ছিল, আমার বর কেনো একাই এগুলো বহন করবে?? আমি কিন্তু আমার বাবা মাকে এই কথাগুলোর একটিও বলিনি। বললে তারা কষ্ট পাবে ভেবে। এর কিছুদিন পরঃ
মা অনেকদিন থেকেই অসুস্থ ছিলেন। আর এ ক দিনে এসব চিন্তাতে আরো বেশি কাহিল হয়ে পড়েছেন। বাবার অবস্থাও ভালো না। সবসময় কিছু একটা নিয়ে চিন্তায় থাকেন। কাজের বুয়া রাখা হলো ঠিকি। কিন্তু ও তো আর মায়ের সেবা করতে পারবে না। রান্না + বাসার সব কাজ করতে পারবে। আমি ততদিনে বাবার দোকানটাতে বসে পড়েছি। বাবা যেহেতু কাজে মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। সেজন্য আমাকেই তার দায়িত্বটুকু নিতে হয়েছিল। এদিকে এর কয়েকদিন পরে কোম্পানি থেকে আমার ডাক পড়ে। যেখানে কিছুদিন আগেই আমি এপ্লাই করে এসেছিলাম। এবার ২টো কাজের ভার আমার উপর এসে পড়ল। দিনেতে জব আর রাত্রেতে বাবার দোকান। সবকিছু ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু একদিন অফিসে থাকাকালীন সময়ে বাবা কল দিয়ে জানায় যে, মায়ের অবস্থা খুব খারাপ। আমি তাড়াতাড়ি করে বাসায় চলে আসি। ঐদিনের পর থেকে আম্মা আর উঠে বসতে পারতেন না। আমি যতটুকু সম্ভব মায়ের সেবা করতাম। কিন্তু তবুও কেমন যেন মায়ের শরীরের অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছিল না। এই নিয়ে অনেকটা টেনশনে থাকতাম। একদিন বাবা এসে বললেন,
–অভি, কিছু কথা ছিল।
—জ্বী বাবা, বলুন।
–না মানে আমার আর তোমার মায়ের ২ জনেরি ইচ্ছা, তুমি বিয়েটা করে ফেলো । আর তোমার মায়ের নাকি সঙ্কা হচ্ছে। ও নাকি প্রতি রাত্রেই উলটাপালটা স্বপ্ন দেখে। তো তোমার কি মত??
—আপনি যেটা ভালো মনে করেন সেটাই করুন বাবা।
–বাবা মুচকি হাসি দেয়ার বৃথা চেষ্টা করলেন।
এর ১৭ দিনের মাথায় অনুর সাথে আমার বিয়েটা হয়ে যায়। বিয়ের ১ম রাতেই অনুকে বলেছিলাম, তুমি আমায় ভালোবাসলে বাসবা নয়তো না সেটা তোমার ইচ্ছা। কিন্তু আমার বাবা মাকে ভালোবাসে তাদের মেয়ে হয়ে উঠার চেষ্টা করবা এটা তোমার কাছে আমার আদেশ না, অনুরোধ থাকবে। আর যদি মনে করো তাদের মেয়ে হয়ে ওঠা তোমার পক্ষে সম্ভব না, তো বলে দিতে পারো তোমায় মুক্তি দিয়ে দিবো।
–এগুলো তো আগেও বলতে পারতেন??অনুর প্রশ্ন ছিল।
–হুম পারতাম, কিন্তু সুযোগটা পায় নি।
–আপনার সমস্ত কথা মেনে চলার চেষ্টা করবো। অনু মাথা নিচু করে কথাটা বলেছিল।
আমি অনুর কথাতে আশ্বস্থ হতে পেরেছিলাম না ভাবির জন্য। আমার ভয় হচ্ছিল অনু যদি অমনটা হয়! এরপরের দিনগুলো পুরো স্বপ্নের মতো লাগছিল। কারণ আমাকে দেয়া অনু ওর কথা রেখেছিল। এমন কি শুধু মায়ের সেবা না। কাজের মেয়ের কাজও কমিয়ে দিত অনু। বাবা মায়ের কাছে ক দিনের মধ্যেই ও মেয়ে হয়ে উঠেছিল। ওর কথার উপর ভরসা করেই আমি বাবার দোকানটা একজন গরিব মানুষকে ভাড়া দেই। উনি প্রতি মাসে ভাড়াটা পরিশোধ করে দিতেন। সাথে ওনার নিজের অবস্থারও পরিবর্তন এনেছিলেন। বাবার মুখে এখন আমি হাসি দেখতে পাই। সাথে স্বস্থির নিশ্বাসের শব্দটাও শুনতে পাই।
নিজের মাথা থেকেও হাজারটা চিন্তার অবসান ঘটেছে একমাত্র অনুর কারণে। এখন অফিসে গেলেও বাসায় মায়ের সেবা, আর বাবার খাওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করতে হয় না। বলে রাখা ভালো, এতগুলো দিন পার হয়ে গেল, এর মধ্যে ভাইয়া একটা বারের জন্যও বাবা মায়ের খোঁজটুকুও নেয় নি। এরপর এক এক করে চলে যায় ৩০টা বছর। বাবা মা তো সেই কবেই গত হয়েছেন। প্রতি মৃত্যুবার্ষিকীতে, এতিমখানায় গিয়ে বাচ্চাদের পোশাক পরিচ্ছেদ আর খাবার দিয়ে আসি। কিন্তু এরপরও আমার মনে হতো বাবা মায়ের আমায় দেয়া ভালোবাসার কাছে এগুলো তুচ্ছ। এরমধ্যে আমার বড় ভাই গুনে মাত্র ৪ বার আমাদের সাথে কথা বলেছিল, সেটাও ফোনে।
১ম বারঃ যখন তাদের প্রথম সন্তান হয় তখন।
২য় বারঃ যখন ওনার শ্বশুড় মারা গিয়েছিল তখন। আর ৩য় এবং ৪র্থ বার যখন বাবা মা মারা যায় তখন। একটা মানুষ কতটা খারাপ হলে নিজ বাবা মায়ের শেষ বিদায়েও আসে না এসে থাকতে পারে সেটা আবির ভাইয়ের থেকেই বুঝেছিলাম। এরপর থেকে আমি আবির ভাইয়ের নামটা সহ্য করতে পারতাম না। কারণ যেই মানুষটা আমার বাবা মাকে কষ্ট দিয়েছে তাকে আমি কেমনে ক্ষমা করবো?? একদিন অফিসে বসে আছি। হঠাৎ ফোনটা বেঁজে উঠল। রিসিভ করতেই জানতে পারলাম আবির ভাইয়া নাকি আমাদের বাসায় এসেছে।অফিস থেকে তক্ষুনি চলে আসি। বাসায় প্রবেশ করেই দেখলাম ড্রয়িং রুমে জরাজীর্ণ পোশাকে কেউ একজন বসে আছে। কাছে গিয়ে তার চেহারাটা দেখেই আমি ব্যাগটা রেখে ফ্লোরে বসে পড়ি।
—ভাইয়া! আবির ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে মলিন মুখে পুনরায় মাথা নামিয়ে নিলো। পাশে বসে থাকা আমাদের ছেলে রবিন বলে উঠল,
—বাবা, কাকু আর কাকিমাকে রাসেল ভাইয়া(আবির ভাইয়ার ছেলে) সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়ে, বাসা থেকে বের করে আমাদের এই পাশের কলনিতেই একটা ছোট বাসায় থাকতে দিয়েছে। আমি ভাইয়ার দিকে শুধু তাকিয়ে ছিলাম। ভাইয়া বাবার সাথে প্রতারণা করলে কি হবে।বাবা কিন্তু তার সন্তানকে তার অংশ থেকে বঞ্চিত করেনি। ভাইয়াকে তার অংশটুকুর দলিলটা দিয়ে বললাম,
— এই নাও ভাইয়া। বাবার মৃত্যুর সময় আসলে তখনি পেয়ে যেতে। ভাইয়া আমার পায়ে পড়ে হাতজোড় করে বলল,
–ভাই, আমার এগুলোর কিছু দরকার নেই ভাই। আমায় শুধু এ বাড়িতে একটু থাকতে দে।
—ক্ষমা করবা ভাইয়া। বাবা এই অনুমতিটা আমায় দিয়ে যায়নি।
ভাইয়া আর ভাবি ঐদিনেই বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। রাত্রেঃ বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে ভাবছি পুরোনো দিনের কথাগুলো। অনু পিছন থেকে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলল,
–কাজটা ঠিক করলা??
—ভাইয়াও কাজটা ঠিক করেছিল না অনু।
আমার বাবা আর অসুস্থ মায়ের মৃত্যুতেও ওরা আসেনি। আমি তো ইচ্ছা করলে ওদের এই সম্পত্তিটুকুও দিতাম না। কিন্তু বাবার আদেশ অমান্য করতে পারবো না। তাই, অনু আমার হাতটা চেপে ধরল। বাবা মাকে খুব মিস করছি আজ। জানি না বাবা বেঁচে থাকলে আজ আমায় কি বলতেন। বড় ভাইয়ার সাথে এমন আচরণের জন্য বকা দিতেন নাকি বলতেন, অভি তুই একদম ঠিক করেছিস।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত