পরিবর্তনের মুহূর্ত

পরিবর্তনের মুহূর্ত
দোস্ত মেয়েটাকে দ্যাখ , কি জোস ! ক্যাম্পাসে আগে দেখিনি । এমন বোরখা ওয়ালি সুন্দরী মেয়ে আমাদের ক্লাসের সামনে আর আমরা চিনি না । রোহানের কথা শুনেই নিবিড় পেছন ঘুরে মেয়েটির দিকে তাকালো । বোরখা পরিধানরত লম্বা সুন্দর গঠনের একটি মেয়ে তাদের সামনে তিনটা মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। খুব মিষ্টি ভঙ্গিতে হাসছে। ভদ্র তার আচরণ দেখেই ভালো লাগছে । চোখের অংশ এবং হাতের কব্জি পর্যন্ত দেখেই মনে হচ্ছে খুবই ফর্সা রঙের অধিকারী সে । নিবিড় মেয়েটির দিকে তাকিয়ে খুবই মুগ্ধ হলো , সে রোহানকে বললো ,
– আরে কি সুন্দর যে লাগছে মেয়েটাকে । কিন্তু এইটাই বুঝছিনা আগে কেনো এই মেয়েটা কে আমরা দেখলাম না , এমন আনকমন একটি মেয়েকে শুধু আমার সাথেই মানায় । তোরা এক কাজ কর , ওর সাথে আমার বন্ডিংয়ের ব্যাবস্থা কর । আমি একটা চান্স নেই ।
– আরে বলিস কী গুরু? তাইলে ঝুমার কি হবে ? এই মেয়েকে দেখেই তোর পাশে পাওয়ার সপ্ন দেখছিস ? কিন্তু পুরো ক্যাম্পাস জানে তুই ঝুমাকে ভালোবাসিস ।
– আরে কিসের ভালোবাসা। ওর মতো উদ্ধত অভার স্মার্ট মেয়ে শুধু প্রেমিকা হিসাবেই প্রযোজ্য । ভাবলি কিভাবে ওরে আমি বিয়ে করবো ? সারাদিন শুধু আমাকে জালায় । ওর যা চলা ফেরা , দামি দামি শপিং ,ড্রেসআপ, রেস্টুরেন্ট , বন্ধু সার্কেল এইসব আমি কিভাবে হ্যান্ডেল করবো বল ? ও কোনো সংসারী মেয়ে না । অমন অভার স্মার্ট মেয়েকে আমি আমার বউ বানাতে চাই না । এই মেয়েকে পটিয়ে দিলে সিরিয়াসলি বলছি মামা , আমি ওকেই বিয়ে করবো ।
– নিবিড়ের মুখের কথাটা শুনে রোহানের শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে । সে বলল , দোস্ত কথা গুলো কি ভেবে বলছিস ?
– অবশ্যই । আমি এইটা সবসময় ভাবী। আর ঝুমা আমার পরিবারে গিয়েও কখনো এডজাস্ট করতে পারবে না । আমার আম্মুও বউ হিসাবে নামাজী , পর্দাশীল মেয়ে পছন্দ করে।
– রোহান মলিন চোখে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে তার কানের থেকে মাইক্রো ফোনটি নামাতে লাগলো।
– কীরে তুই হঠাৎ অমন স্ট্যাচু হয়ে গেলি কেন? কি সমস্যা ?
নিবিড় খেয়াল করলো বোরখা পরিধানকারী মেয়েটি তাদের সন্নিকটে এসে দাঁড়িয়ে আছে। নিবিড় কিছু বুঝার আগেই মেয়েটি মুখের নেকাবটি খুলে ফেললো , নিবিড় মোটামুটি হকচকিয়ে গিয়ে বললো ,
– তুমি ? তুমি এইখানে এইভাবে ?
ঝুমা , ভার্সিটিতে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী । ভার্সিটিতে যখন প্রথম পদার্পণ করে তখন অনেক ছেলেদের নজর কেড়েছিল তার অপরূপ সৌন্দর্য্য এবং স্মার্টনেসের জন্য। উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে বিলং করলেও প্রথম প্রথমই সে ভার্সিটিতে সবার সাথেই হাসি মুখে কথা বলেছে, মিশেছে । কখনো নিজেকে নিয়ে গর্ব করেনি বা বাবার টাকার গরম দেখায়নি । এইভাবেই অহরহ যুবককে প্রত্যাখ্যানের তালিকায় রেখে নিজের মন সমর্পণ করেছিল নিবিড়কে। মনের অজান্তেই নিবিড়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল, নিবিড়ের সহজ স্বাভাবিক আচরণ , নিবিড়ের অত্যাধিক মেধা , তার স্মার্টনেস সবটাই তাকে মুগ্ধ করেছিল ।
প্রেম নিবেদন করেছিল তার সামনে হাঁটু গেড়ে । বিষয়টা ইন্টারনেটেও প্রচুর ভাইরাল হলো। পুরো ভার্সিটি নিবিড় এবং ঝুমার প্রেমের কথা কথা । এক হিসাবে পারফেক্ট কাপল হিসাবে পরিচিত তারা। নিবিড়কে আকৃষ্ট করার জন্য ঝুমা প্রচুর সাজে ,অনেক দামি দামি পোশাক কেনে দুজনে একসাথেই। নিবিড় তার পছন্দের অত্যাধুনিক জামাকাপড়ের কথা বলতেই ঝুমা সেইগুলো কিনে ফেলে। ঝুমা নিবিড়কে অনেক উপহার দেই , দুজনে কাপল ড্রেস পড়ে । দামি দামি জুতা, হাই হিল ,স্টাইলিশ ব্যাগ, পার্স , হেয়ার রিবন্ডিং করা । মোটামটি ঝুমাকে দেখে যে কেও প্রেম নিবেদন করতে বাধ্য । কিন্তু ঝুমা শুধু নিবিড়কেই ভালোবাসে , তাকেই চাই । নিবিড়ের মধ্যবিত্ত বাবা মায়ের কথা শুনেও কখনো সে নিবিড়কে একটুও তার আন্তরিক ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেনি । প্রতিদিন নতুন নতুন সাজে সে নিবিড়কে চমকে দিতে পছন্দ করে ।
যদিও আজকের দিনটা তার জন্য বেশি স্পেশাল । নিবিড়কে তাদের ভালোবাসার দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে সারপ্রাইজ দিবে । সব বন্ধুদেরকে আগে থেকেই ঝুমা সব শিখিয়ে দিয়েছে। নিবিড়কে আজকে সে আরো নতুন ভাবে ভালোবাসতে চাই । সকালেই নিবিড়কে ফোনে বলেছে আজকে সে ক্যাম্পাসে আসতে পারবে না । মায়ের সাথে একটা কাজে গ্রামের বাড়ি যাবে । নিবিড় অনেক দুঃখ প্রকাশ করলো আজকে তাদের দেখা হবে না জেনে । সকালে কথা বার্তা সেরে নিবিড় ক্যাম্পাসে এসেছে । ক্লাসরুমের সামনে রোহানের সাথে দাঁড়িয়ে আছে । হঠাৎ বোরখা পরিহিত সুন্দর গঠন এবং সুন্দর চোখের মেয়েটাকে রোহান এক দেখাতেই সে তার অভিব্যাক্তি প্রকাশ করে ফেললো। এখন বোরখা পড়া মেয়েটি ঠিক তার সামনা সামনি এসে অবস্থান করছে । টানা টানা দুটি চোখ অশ্রু সিক্ত , টলমল করছে দুটি চোখ । সেও তার কান থেকে মাইক্রো ফোনটি খুললো ।
– ঝুমা বিশ্বাস করো আমিও জানতাম তুমি আমাকে সারপ্রাইজ দিতেই এসেছ , এইজন্যই আমিও মজা করছিলাম । আমি কিছুই সিরিয়াসলি বলিনি । আমাকে ভুল বুঝনা প্লিজ।
– ভুল বোঝার কি আছে বাবুই ? ভুল বোঝার সমুদ্রে আমি এতদিন অনায়াসে ডুবে ছিলাম । আজকে পাড়ে উঠলাম ।
– এই সামান্য বিষয় নিয়ে এমন করবে না প্লিজ। You are only mine dear .
– ইউ জাস্ট শাট আপ । আমার মন নিয়ে তুমি যেভাবে খেললে , খেলাটা ভালোই ছিল। আমি এত বোকা যে বোকার মতো সবসময় তোমার পছন্দের প্রাধান্য দিয়ে এসেছি , তোমাকে নিজের মতো পেতে সবকিছু করতে চেয়েছি । আর আজ সেই তুমি আমাকে ডাম্প করছো আজ আমি অত্যাধুনিক নিয়মে চলি এইজন্য ?
– প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড প্লিজ ।
– তুমি ভদ্র চলাফেরার মেয়েদের পছন্দ করতে আমাকে এক বার বলতে। দেখতে আমি কি করি , তোমার পছন্দের মতো চলি কিনা ? এতটা ঠুনকো বানিয়ে ফেললে আমার ভালোবাসাকে ? কি দোষ করছি ? তোমাকে ভালোবাসাটাই কী অপরাধ ? তোমাকে প্রেম নিবেদন করাটাই কি আমার অপরাধ। এর জন্য আমি উদ্ধত , খারাপ মেয়ে হয়ে গেলাম ? যাদের সাথে তোমাদের সমাজ শুধু প্রেম করতে চাই , বিয়ে করতে চাই না তাইনা ।
– এইসব কি বলছ ? আমাকে একটু কথা বলার সুযোগ দাও । ঝুমা নিবিড়ের মুখে কষে এইটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। এবং সে তাৎক্ষণিক কান্নায় ভেঙে পরলো ।
– নিবিড় ? তুমি কি জানো ? তোমাদের মতো মানুসিকতার কিছু পুরুষের জন্য পুরো পুরুষ জাতি খারাপ হয় । আসলেই ভালোবাসা পাওয়াটা হয়তো খুব সহজ , সুন্দর দর্শনের অধিকারী হলেই পাওয়া যায় । কিন্তু ভালোবাসা ধরে রাখাটা খুব কঠিন। এক জীবনে একজন মানুষের কতগুলো ভালোবাসার মানুষ লাগে বলতে পারো ? যে থাকে, তাকেই কি ভালোবেসে , ভেঙে চুরে নিজের মতো তৈরি করা যায় না ? আমার চলাফেরায় তোমার আপত্তি থাকলে সেইটা তুমি আমাকে বলতে বা তোমার পরিবার আমাকে লাইক না করলেও আমাকে বলতে আমি তোমাদের মতো তৈরি হতাম নয়ত না পারলে তোমাদের থেকে সরে যেতাম কিন্তু তুমি যা মনে মনে ভাবছ সেইটা পুরোটাই পাপ । এই পাপের মন নিয়ে আমি যতদূর জানি তুমি natural punishment অবশ্যই পাবে , পেতেই হবে তোমাকে।
তুমি যেমন প্রেম করার তালিকা আলাদা এবং বিয়ের তালিকা আলাদা করেছো , তোমার সহধর্মিণী তেমন মুখোশ ধারী হবে এইটাই প্রকৃতি থেকে তুমি পাবে। আর যদি আমার কথা বলো তবে হ্যাঁ , আমার জীবন ব্যাবস্থা যদি শুধু প্রেম করার জন্যই প্রযোজ্য হয় তবে আমি আজ থেকে এই জীবন পরিত্যাগ করে ধর্মীয় বিধিবিধান ভিত্তিক বেছে নিলাম , তোমাকে ধন্যবাদ নিবিড় , তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছো। আমি দ্বীনের পথে চলে লোক সমাজে একজন বিয়ে করার মতো পবিত্র পাত্রী তে রুপান্তর হবো । এই সমাজে অনেক ধার্মিক পুরুষ আছেন যারা খারাপ মানুষটিকে ভালোবেসে নিজের মতো তৈরি করে নেই।তারা ভুল মানুষটিকে শুদ্ধ হওয়ার সুযোগ দেয় এবং সেইটাই শুদ্ধ ভালোবাসা । শুভ কামনা তোমার জন্য , ভালো থেকো নিবিড় । নিজের মতো কাউকে খুঁজে নিবে আশা করি।
নিবিড় নিষ্পলক দৃষ্টিতে ঝুমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার শুদ্ধ ভালোবাসার কুরবানী হলো আজকে। মেয়েটি অনায়াসেই তার মনের উপর এক প্রতারকের চিহ্ন এঁকে দিয়ে গেলো। যা দারুন ভাবে তার সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিষের মতো । ঝুমা চলে যাচ্ছে । পায়ে একটি কমদামী চটি , কালো রঙের বোরখায় আবিষ্ট দেহ । ক্যাম্পাস গেটে পৌঁছতেই গাড়ির ড্রাইভার বললো ,
– ম্যাডাম দ্রুত চলুন, স্যারকে আনতে যাবো , স্যারের আজকেও মিটিংএ যেতে দেরি হয়ে যাবে । ।
– তুমি চলে যাও আজিজুর। আজকে থেকে আমাকে আর নামিয়ে দেওয়ার বা নিতে আসার ও দরকার নেই । আমি একাই চলে যাবো ।
ঝুমা কিছুদূর পায়ে হেঁটে এসে একটা রিকশায় উঠলো। আজকে শহরটা তার সাথে খুব অদ্ভুত লাগছে এক অপরূপ মায়া অনুভব করছে যা এসি গাড়িতে বসে কখনোই দে উপলব্ধি করেনি। সাধারণ পৃথিবীটা আসলেই সুন্দর।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত