মায়ের চুমু

মায়ের চুমু
ঘরে মাকে না পেয়ে রান্না ঘরে গেলাম। সেখানেও নেই। ডাক দিতেই মা বলল..’কলের (টিউবওয়েল) পারে আয়।’ গত বৃহস্পতিবার হাঁট থেকে বাবা এক মন ধান কিনে নিয়ে এসেছিল। মা ধান সিদ্ধ করে টিউবওয়েল পারে পাতিল ধুচ্ছে। বড় পাতিলের তলাতো, তাই বেশ কালো হয়েছে। মা তার আধপুরোনো কাপড়ের আঁচল কোমড়ে গুজে খড় দিয়ে পাতিলের কালো দাগ উঠানোর চেষ্টা করছে। আমি বললাম….
–মা টেকা লাগব।
-ক্যান?
–খাতা নাই, খাতা কিনতে অইবে।
-টাকাতো নাই, তর বাপে সক্কালেই সব টেকা লইয়া বাজারে গেছে।
–আমার খাতা কেনা লাগবই, অংক না করলে স্যারে মারে।
-স্যাররে কইস কালকে খাতা কিনবি।
–না, আমারে আইজকাই খাতা কিনা দাও।
মা আমার দিকে তাকালো। মা তার কপালের সামনে থাকা অবাধ্য চুল গুলো সরিয়ে দিলো। পাতিলের কালি হাতে থাকার থাকার ফলে মা’র কপালের অর্ধেকাংশতে কালি লাগলো৷ মা উঠে বলল….
-আয় ঘরে আয়।
আমি পিছুপিছু গেলাম। বাক্স খুলে সেখান থেকে শীতের জন্য তুলে রাখা মা’র নতুন কাঁথার ভাজ থেকে টাকা দিয়ে বলল….
-নে খাতা কিনগা।
–১০ টাকায় অইবনা।
-কেন?
–কলমও নাই, কলম কিনতে অইবে। মা কিচ্ছু বললনা৷ টাকা হাত থেকে নিয়ে কাথার ভিতর থেকে ২০ টাকার নোট বের করে বলল….
–একবারে দুইটা খাতা কিনগে, আর চাইবিনা।
-তোমার টেকা লাগবনা? আমারতো একটা খাতা লাগব।
–বারবার কেনা লাগে, একবারে কিন যা।
আমি হাসিমুখে স্কুলে যাই। একবারে দুটো খাতা কিনে কি যে সুখী লাগছিলো বোঝাতে পারবনা। মনেমনে মা’কে অনেক ধন্যবাদ দিয়েছিলাম। তখন গ্রামাঞ্চলে ফেরিওয়ালা আসে। ছল্টু ফেরিওলার বেশ পরিচিত তখন আমাদের কাছে। তার কাছে গিয়ে একটাকায় দু’টাকায় করে বাঁশি কিনতাম। আমি তাকে দাদু বলতাম। খাতা কলম কিনে অবশিষ্ট টাকা থাকে ৫ টাকা। ছল্টু দাদা তখন চিপস আনতো। ২ টাকা করে পেকেট। তার ভিতরে আবার ছোট একটা কাগজ থাকতো। কাগজ গুলোর মধ্যে মারবেল, একপাতা টিপ, বাঁশি এগুলো লেখা থাকতো। সেদিন বাঁশির বদলে যখন টিপ পেলাম মেজাজ খুব খারাপ হয়েছিলো। টিপ দিয়ে আমি কি করব। আমি কি মেয়ে যে টিপ পরব! টিপের পাতা পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম। স্কুল ছুটি হলো। বাসায় আসার পথে আমিন মুন্সির জামগাছ সামনে পরে। সবার আগে দৌঁড়ে গিয়ে জাম গাছের নিচে গিয়ে সব জাম কুড়িয়ে নিলাম। হাতে সব গুলো নিতে পারলাম না। খাতার সর্বশেষ পেজটা ছিরে সেটায় জামগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে আসলাম। মা ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে, আমি বললাম….
–ওমা…!
-ক।
–ভাত দেও।
-রান্ধন ঘরে দেখ, খাঁচির উপরে গামলায় আছে। অর্ধেক খাইয়া অর্ধেক তোর বাপের জন্য রাখ।
–আইচ্ছা।
আমি রান্না ঘরে গেলাম। ভাতে পানি দেওয়া৷ তবে দুপুরে পান্তা ভাত খাওয়াই মজা বেশি। পেঁয়াজ, মরিচ সাথে একটু সরিষার তেল দিলে বেশ লাগে। গোয়াল ঘরের পিছে ছোট মরিচ গাছ থেকে মরিচ ছিড়লাম। পেঁয়াজের অর্ধেক কাটাই ছিলো। নিজেই পেয়াজ মরিচ সরিষার তেল মিশিয়ে পান্তা ভাত খেলাম। খাওয়া শেষ, মা ঘরের দরজার চৌকাঠের উপর বসে আছে। হাতে আয়না, আয়নার নিচের অংশটুকু ভাঙ্গা। মা কপালে, গালে থাকা কালো দাগ গুলো কাপড়ের আঁচল দিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। মা কপালে ছ্যাপ (থুতু) লাগিয়ে কাপড়ের আচল দিয়ে ঢলা দিলো কালো দাগ উঠানোর জন্য। বললাম….
–কলে পারে যাইয়া সাবান দিলেইতো অয়…!
-সাবান নাই।
বলেই মা আয়না দেখে কালো দাগ গুলো উঠানোয় মনোযোগ দিলো। দরজার পাশে থাকা ১০ টাকা দিয়ে কেনা ম্যাজিক বল নিলাম। খেলতে যাব, স্কুল ড্রেস তখনো খুলিনি। খেলতে যাব, মা ডাকলো….
–ড্রেস খুইলা থুইয়া যা।
-পারুমনা।
–ময়লা অইব, পরে ধুইয়া দিমুনা।
আমি অগত্যা মন খারাপ করে শার্ট খুললাম। তখনই মনে হলো ছল্টু দাদাতো এক পাতা টিপ দিছিলো। আমি পকেট থেকে টিপ বের করে মাকে বললাম….
–দেহি মা আয়না সরাও।
-ক্যান?
–আগে সরাও…
মা আয়না সরালো আমি একটা টিপ নিয়ে মা’র কপালে দিয়ে দিলাম। আমি ভালো করে দেখলাম, টিপটা বাঁকা হয়েছে। আবার সেটা তুলে মাঝখানে দিলাম। মা তখন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। টিপ পরানোর শেষে মা মুচকি হেসে বলল….
-টিপ কই পাইলি।
–ছল্টু দাদার চিপসের লটারিতে পাইছি, তোমারে ভালো দেহা যায় এহন। আমি গেলাম…
বলেই দৌড়াতে যাব, মা ডাকলো। আমি বিরক্তি নিয়ে মার কাছে গেলাম। চিরুনি দিয়ে মা চুল সিথী করে দিলো। তারপর কপালে চুমু দিয়ে বলল…’যা খেলতে যা। আর তাড়াতাড়ি বাসায় আহিস।’ সেদিন মায়ের মুখে কেমন যেন একটা প্রতিচ্ছবি ছিল। সেদিন বললে ভুল হবে, সেই সময়টায় যখন আমি টিপ দিয়ে দিলাম। সেটা আমার কিশোর মন হয়তো বুঝেনি। তবে এখন খুব হাসি পায় সেই কথা মনে হলে। উচ্চস্বরে নয়, মনেমনে। কতদিন মা এই কপালে চুমু দেয়না। মা’র জন্য অনেকগুলো টিপের পাতা কিনেছি চুমু নিব বলে। মা যদি বলে…
-ক’টা চুমু লাগবে তোর? আমি হাসব খুব। সেদিন নাহয় উচ্চস্বরেই হাসলাম। মা বেশ অবাক হলে বলব….
–এক সমুদ্র সমান চুমু লাগবেগো মা।
মা’র কপালে টিপ পরিয়ে দিব। যা বলা হয়নি কখনো তাই বলব মাকে, ভালোবাসি মাগো, আমার মা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত