যৌতুককে না বলুন

যৌতুককে না বলুন
°প্রায় ৮ বছর আগের কথা। অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে জ্যামে আটকে থাকার বোরিং ভাবটা কাটানোর জন্য রেডিওতে সরাসরি প্রচারিত একটি সক্ষাৎকার শুনছিলাম। ব্যতিক্রমী মনে হওয়ায় তা শোনায় মনোনিবেশ করলাম। একজন নারীকন্ঠি সাবলিল ভাষায় তার জীবনের এক চরম পরিস্থিতির বর্ণনা দিচ্ছিলেন।
°তার বর্ণনা অনুসারে বিয়ের আসরে পাত্রপক্ষ যৌতুক দাবি করায় প্রতিবাদস্বরূপ তিনি বিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। প্রতিপক্ষ উপস্থিত না থাকায় বক্তব্য একপেশে মনে হলেও তাকে সন্দেহ করার মত তেমন কিছু আমার কাছে ধরা পড়েনি। হঠাৎ তার কথাগুলো কেন যেন মনে পড়ে গেল। তাই আজ চেম্বার শেষে বাসায় গিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবুক মনে ডেক্সটপের কি-বোর্ডে আঙ্গুল ছোঁয়ালাম। জানিনা, কেন যেন নিজেকে বেশ আবেগপ্রবণ লাগছিল। কেউ কেউ হয়ত আমার এই আবেগী অন্তরকে অন্য চোখে দেখতে পারেন। সে দেখুক-গে।
°যে বিষয়গুলোকে আমি খুবই খারাপ চোখে দেখি, জ্ঞানত অত্যন্ত নিচ কাজ বলে মনে করি, সব সময় প্রতিবাদ করার চেষ্টা করি, নিজে তো বটেই সেই সাথে কাছের মানুষদের সাবধান করি, সেই স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মধ্যে অন্তত একটি যেন তার কথা ও কর্মে ভিন্ন এক মাত্রা পেয়েছিল। তার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে অন্তরের চাপা কষ্টটা প্রকাশ পাচ্ছিল। কিন্তু তার প্রতিবাদী ভাষায় নুতন এক সাহস ও সম্ভাবনার ইংগিত ছিল। বিশেষ করে এমন একটি কঠিন মুহুর্তকে তিনি মহান স্রষ্টার পরীক্ষা হিসেবে অকপটে স্বীকার করে নিলেন। সুশিক্ষিত স্বচ্ছ অন্তর ও স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস আছে বলেই যথাসময়ে তিনি ভবিষ্যতকে আঁচ করতে পেরে নিজেকে সামলে নিতে পরেছিলেন।
°সে সময় তিনি কেবলি অনার্স পাশ করে একটা চাকরীতে ঢুকেছিলেন। শুধু উচ্চশিক্ষা গ্রহণই নয়, বাস্তবে তা কাজেও লাগিয়েছিলেন। অনেকেই যা সহজে পারেন না। শুধু তাই নয়, বিয়ে হয়ে যাবার পরও যৌতুকের বলি হবার হাত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তিনি যে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষয়টি ভেবে প্রথমে অবাক লাগলেও পরক্ষণে মনে হলো ভালই হয়েছে। বিয়ের পিরিতেই যে অশান্তি ও দ্বন্দ্ব দানা বেধেছে, তা সারা জীবনময় বয়ে বেড়ানোর কোন মানেই হয়না। মনে হচ্ছিল নারীদের অবলা বলার দিন শেষ হলো বলে। যদিও পথটি বন্ধুর, তথাপি কেন যেন মনে হলো সেই অন্ধকার পথটি হয়ত এতদিনে কিছুটা আশার আলো খুঁজে পেল।
°তার মতো একজন সচেতন নারীর নামে লোকেরা যে যাই বলুক, তিনি আমাদের পক্ষ থেকে নিশ্চয় সমর্থন ও শুভেচ্ছা পাবার যোগ্য। কারো উদ্দেশ্য যদি সত্যিই সৎ হয় এবং অন্তর হয় স্বচ্ছ, তাহলে তার হার নেই। এ ধরনের ঘটনা আপনার বা আমার, যেকারো পরিবারের মাঝেই ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। হয়তো তাই শুধু নিজের নয়, বাবা-মা, পরিবার, এমনকি গোটা নারী সমাজের কথা ভেবেই তিনি এরূপ ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন। সবার ব্যথাকে প্রতিবাদী ভাষায় প্রকাশ করতে পেরেছেন। তিনি যে সাহস দেখিয়েছেন তা কয়জনে পারে? তবে আমি বিশ্বাস করি যে, এখন থেকে অনেকেই এমনটি পারতে শিখবেন।
°বাস্তবে এ সমাজে যে নারীরাই অধিক নির্যাতনের শিকার তা অস্বীকার করার উপায় নেই। হতে পারেন তারা আমাদের আপনজন বা দূরের কেউ। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এবং সহমর্মী হয়ে তাদের প্রতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন ব্যক্ত করে মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছি।
°সুখময় বন্ধন রচনাই বিয়ের মূল উদ্দেশ্য। এর জন্য প্রথমত চাই সহমর্মী দুটি অন্তর। তারপর অন্যসব হিসেব-নিকেশ, মান-অভিমান, টানা-পড়েন; মনের প্রশান্তির জন্য এসব অবশ্যই গৌণ জ্ঞান করা চাই। তাই পাত্রী এবং পাত্রীপক্ষ উভয়কেই মনে রাখা উচিত, যে পুরুষ যৌতুক চায় বা নেয় তার মন মানসিকতা কখনই ভাল হতে পারে না। কারণ সেই পুরুষটি জীবন সঙ্গিনী পাবার জন্য সম্পর্ক করেন না, বরং টাকা-কড়ি, ধন-সম্পদের লোভে বিয়ের ফাঁদ পাতেন।নিঃসন্দেহে তারা স্বার্থপর, ছোট মনের মানুষ ও পুরুষ জাতির
কলঙ্ক।
স্বভাবগত কারণেই এরা নিজেরা যেমন সুখী হতে পারেন না, তেমনি অন্যকেও সুখী করতে পারেন না। অনেকের ক্ষেত্রে বিষয়টি তাড়াতাড়ি প্রকাশ পায়। আবার অনেকে ধীরে-সুস্থে প্রকাশ করেন। যখনই প্রকাশ পাক না কেন তাদেরকে প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়। একবার প্রশ্রয় পেলে তারা মাথায় চড়ে বসেন। তাদের লোলুপ দৃষ্টির ছোবল থেকে নিস্তার পাওয়া তখন বেশ কঠিন হয়ে যেতে পারে। °যৌতুকের কালো থাবা যে দিন দিন বিস্তার লাভ করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু অশিক্ষিত বা গরীব ঘরে নয়, অনেক নাম করা শিক্ষিত মহলও এই কুৎসিত মানসিকতা থেকে মুক্ত নয়। তাই যারা যৌতুক নেয় তারা যে নিকৃষ্ট মানসিকতার, এই প্রচার চালাতে হবে। তাদেরকে সামাজিক ভাবে বয়কটের জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সেই সাথে যারা যৌতুক চাইবে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।
°সবচেয়ে বড় কথা হলো, ‘নারী সমাজকে সচেতন হতে হবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে’। যেসব পুরুষ বা পরিবার যৌতুকের ইংগিত দেয়, তাদের সাথে সম্পর্ক না করে বরং পাত্রী পক্ষ থেকে সরাসরি না বলার মত সৎ সাহস দেখাতে হবে। নারীরা যতদিন পর্যন্ত না নিজেরা সচেতন ও আত্মনির্ভরশীল হবেন, ততদিন পাত্রী কিংবা তাদের পরিবার এরূপ সৎ সাহস দেখাতে পারবেন না। °আরকেটি বিষয় হলো, উভয় অভিভাবকের পক্ষ থেকে বিয়ের কথা পাকাপাকি করার আগে ছেলে-মেয়ের মাঝে কিছু সময়ের জন্য সাক্ষাৎ ও ভাব বিনিময়ের ব্যবস্থা করা উচিত।
তবে এ সময় আশেপাশে একটু ব্যবধানে ভাই-বোন বা কোন নিকট আত্মীয় উপস্থিত থাকা চাই। বিচক্ষণ পাত্র-পাত্রী হলে এ সময়ের মধ্যেই তারা একে অপরকে কিছুটা হলেও জেনে নেবার সুযোগ পাবেন।তাদের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে যা খুবই জরুরী। অভিভাবকের জন্যও এটি একপ্রকার স্বস্তির বিষয় হতে পারে। সবশেষে একটা কথা না বললেই নয়, যৌতুক প্রথাকে নির্মূল করতে চাইলে অন্তত বিয়ের সময় গিফট্-টিফট্ লেন-দেনের ব্যাপারে হিসেব-নিকেশের কালচারটাও দয়া করে বন্ধ করা দরকার। কারণ এসব কালচারই শেষে সমাজের অন্ত্রে আলসার হয়ে দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তা ক্যন্সারের রূপও ধারন করতে পারে বৈকি। কথাটা ভেবে দেখবেন কিন্তু।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত