রিযিক

রিযিক
ঋতু খুবই খুশি বাসায় বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। বিরিয়ানি ঋতুর ভীষণ পছন্দের। স্কুলে যাওয়ার আগে আম্মু আর আপাকে রান্নাঘরে বিরিয়ানির আয়োজন করতে দেখে যায় সে। স্কুলে গিয়ে ক্লাশের পুরোটা মূহুর্ত আজ খুব মনোযোগ দিয়ে স্যারের লেকচার শুনে ঋতু। অন্যদিন স্যারের এই লেকচারকে বিটিভির সংসদ অধিবেশনের মতো বিরক্তিকর বক্তব্য লাগলেও আজ বেশ ভালো লাগছে। কারণ একটাই বিরিয়ানি। ঋতুর শত ঘন্টার মন খারাপের মন ভালো করার জন্য বিরিয়ানিই যথেষ্ট। স্কুল ছুটির পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসার দিকে এগোতে থাকে। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে ব্যাগটা রেখেই ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে যাবে।
কিন্তু,বাসার কাছে আসতেই কেমন যেন ছোট ছেলেমেয়েদের ভীড় দেখতে পেলো ঋতু। ছেলেমেয়ে গুলো কেউ কেউ ঋতুর থেকে বয়সে অনেক ছোট আবার কেউ বড়। সবার গায়ে মলিন ছেঁড়া জামা উসকোখুসকো চুল,কারোর কারোর পায়ে আবার স্যান্ডেলও নেই। বোঝায় যাচ্ছে এরা রাস্তায় ফুটপাতে থাকা ছেলেমেয়ে। ঋতুর বড় আপা মিতু সেই সব ছেলেমেয়েদের হাতে একটা করে প্যাকেট দিচ্ছে। ঋতুর আর বুঝতে বাকি রইলোনা বাসায় রান্না করা বিরিয়ানি গুলো আপা ওদের বিতরণ করছেন। আর তখনই যেন ঋতুর মধ্যে একপ্রকার হিংস্রতা জেগে উঠলো। একে তো সব নোংরা অপরিষ্কার ছেলেমেয়েগুলো এরপর আপা এদের ভালোবেসে বিরিয়ানি খাওয়াচ্ছে।
ঋতু দেখলো একটা ছেলে এক প্যাকেট বিরিয়ানি নেবার পরেও আবার মিতু আপাকে অনুরোধ করছে আরেক প্যাকেট দিতে। আপা আরেক প্যাকেট দিতে যাবে তখনই ঋতু বলে ওঠে আপা তুমি তো মাদার তেরেসা হয়ে যাবে খুব শ্রীঘই এইভাবে বিতরণ করলে। আপা ঋতুর দিকে তাকিয়ে হেসে বললো তুই কখন আসলি? যা ভিতরে যা আমিও আসছি। ঋতু দেখলো অতিরিক্ত এক প্যাকেট চাওয়া ছেলেটি তখন ও দাঁড়িয়ে আছে। ঋতু অসম্ভব রেগে ছিলো এবার যেন আরো রাগ বাড়লো এক প্রকার চেঁচিয়ে বলে উঠলো, এইসব ছোটলোকদের যত দেওয়া যাবে এরা তত নেবে। এদের এই স্বভাবের জন্য এদেরকে ছোটলোক বলা হয়। ঋতুর বড়বোন মিতু ঋতুর এই আচরণে যথেষ্ট অবাক হলো। অতিরিক্ত এক প্যাকেট বেশি চাওয়া ছেলেটি মুখ কাচুমাচু করে বললো, আমার জন্য চাই নাই ঐ রাস্তার শেষের গলিতে এক পঙ্গু কাকা ভিক্ষা করে তার লাইগা চাইছি। কারণ কাকার সাথেই আমি থাকি তারে থুইয়া ক্যামনে খাই কন। ছেলেটির কথা শুনে আর বিলম্ব না করে অতিরিক্ত আরেক প্যাকেট বিরিয়ানি দিয়ে দেয় মিতু আপা। ঋতু ছেলেটির দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে যত্তসব ছোটলোক বলে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে যায়।
খাবার বিতরনের পর মিতু আপা ও বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে এবং দেখতে পায় ঋতু মুখকালো করে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। সামনে বিরিয়ানির প্লেট রাখা কিন্তু ঋতু খাচ্ছে না। মিতু আপা গিয়ে ঋতুর পাশের চেয়ার টেনে বসলো এবং মাথায় হাত বুলিয়ে বললো কিরে খাচ্ছিস না যে? ঋতু এক ঝটকা দিয়ে মাথা থেকে মিতু আপার হাত সরিয়ে বললো, একদম মাদার তেরেসা হতে আসবেনা আমার সামনে। তোমার এই অতিরিক্ত মানবদরদী আর সবার কাছে ভালো লাগলেও আমার কাছে ন্যাকামি লাগে। মিতু আপা ছোটবোনের এমন আচরণ দেখেও শান্ত গলায় বললো,কেন রাগ করছিস? ওরা তো আমাদের মত মানুষ। আর এছাড়া তোর জন্য তো পর্যাপ্ত বিরিয়ানি আছে। তাহলে অন্যকে দিলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা আছে আপা ঋতু বেশ চেঁচিয়েই বললো। তুমি আমার ফেভারিট আইটেম রান্না করে একইসাথে আমাকে আর বস্তির ছেলেমেয়েদের দিতে পারোনা। তাহলে ওদের আর আমার মধ্যে পার্থক্য কোথায় বলতে পারো আপা? মিতু আপা বরাবরের মতোই শান্ত-ভাবে বললো, তোর আর ওদের মাঝে পার্থক্য নেই তো ঋতু!
মিতু আপার এই কথা শুনে রাগে ক্ষোভে ঋতু এবার কান্না শুরু করলো,কান্না করতে করতে সে বললো তুমি এটা বলতে পারলে আপা? ঐ রাস্তার ছেলেমেয়ে আর তোমার বোনের মাঝে কোন পার্থক্য নেই? মিতু আপা হেসে বললো না নেই কোন পার্থক্য। তুই আমার ছোট বোন তোর প্রতি আমার ভালোবাসা অনেক বেশি তা অস্বীকার করবো না। কিন্তু তুই যেভাবে বলেছিস তাতে তোর আর ওদের কোন পার্থক্য নেই। তুই ওদের দেখেছিস ময়লা,নোংরা,অগাছালো ভাবে তোর দৃষ্টিতে ওরা ঠিক। আর আমি তোকে দেখেছি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার আড়ালে নোংরা আবর্জনাময় মনের এক আস্তাকুঁড়ের ডাস্টবিন। তাই তোর আমার দৃষ্টিতে তোর সাথে ওদের কোন পার্থক্য নেই। তুইও ওদের মত একই।
এরপর ও যদি পার্থক্য জানতে চাস তাহলে বলবো, ওদের পোশাকে শারীরিক পরিচ্ছন্নতায় সমস্যা। আর তোর মনের ভিতরে ময়লা আবর্জনা যা পরিষ্কার করা কঠিন। এছাড়া রিযিক একটা বলে জিনিস আছে। যার যেখানে রিযিক সেইটা সে পাবেই। সামান্য বিষয়েই দেখ, তুই খাবার প্লেট সামনে নিয়েও তুই খেতে পারছিস না। আবার যাদের খাওয়ার কথায় ছিলোনা তারা ঠিকই খেয়েছে। আর একেই বলে রিযিক।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত