রূপা

রূপা
৫১বছর আগে অনিচ্ছা শর্তেও রূপাকে বিয়ে করে ঘরে এনেছি।আমি তো পছন্দ করতাম আমার বন্ধুর খালাতো বোন চিত্রাকে।শুধু পছন্দ বললে ভুল হবে আমাদের ছিল গভীর প্রেম।দুজনের এত গভীর প্রেমের সম্পর্কটাকে বিয়ে অবধি নিয়ে যেতে পারিনি।
আমি তখন কলেজ পড়ুয়া ছাত্র।কোনো বাবা তার মেয়েকে জেনে শুনে একজন বেকারের হাতে তোলে দিতে পারে
না।আর তাই অন্য কারো সাথে চিত্রার বিয়েটা হয়ে গেল। ১ম বার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর বিয়েই করব না।বিয়ে করে কি লাভ!চিনি না জানি না মেয়ে একটা বিয়ে করে ঘরে আনব।তাকে বুঝতে বুঝতে আমার অর্ধেক জীবন চলে যাবে।আর তখনো চিত্রাকে আমি ভুলতে পারিনি।প্রথম প্রেম কেউ কখনো ভুলতে পারে কিনা আমার জানা নেই!
চিত্রার বিয়ের বছর খানেক পর আমার কপালে একটা চাকরি জুটে।চাকরি পাওয়ার কিছুদিন পরপর পরিবারের সবাই পিছনে লেগেছে বিয়ে করার জন্য।পরিবারের জোরাজোরিতে মেয়ে একটাকে দেখতে গেলাম।মেয়েটা শাড়ি পড়ে মাথায় কাপড় দিয়ে আমার সামনে এসে মুখোমুখি হয়ে বসেছে।পাত্রীর দিকে আমার তেমন মন নেই।সে সুন্দর না অসুন্দর সেটাও আমি বুঝতে পারছি না।মোট কথা তার দিকে আমার কোনো মনোযোগই নেই।আমি ছাড়া আমার বাবা, বড় আপু,আর মা এসেছে মেয়ে দেখতে। মেয়ে দেখা শেষ হলে আমরা বাসায় চলে আসি।বাসায় ফিরতেই সবার এক প্রশ্ন মেয়ে কেমন লেগেছে?আমি বললাম তোমাদের যা লেগেছে আমারো তাই লেগেছে।আমার তো এমনিও বিয়েতে মত নেই।সবাই যখন মেয়ে দেখা নিয়ে কথা বলছে সবার মাঝখানে বাবা এসে জানালেন রূপাকে নাকি তার অনেক ভালো লেগেছে।তার সাথে আমার বিয়েটা ফাইনাল।আমাদের পরিবারের সব সিদ্ধান্ত আমার বাবা নেন।তার কথা’ই শেষ কথা। কি এক অবস্থার মধ্যে যাচ্ছে দিনকাল। আমার বিয়েতে নাকি আমি “না” বলতে পারব না।
যাই হোক রূপার সাথে আমার বিয়েটা হয়ে গেল।বিয়ের পর রূপা যেদিন প্রথম গোসল করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
একটা গামছা দিয়ে চুলগুলো ঝেড়ে ঝেড়ে মুছার চেষ্টা করছিলো সেদিন’ই প্রথম রূপার প্রেমে পড়ে যাই।২য় বার রূপার প্রেমে পড়েছি যখন সে শাড়ি পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে মোটা করে কাজল দিয়ে কপালের বাঁকা টিপটা ঠিক করছিল তখন।যদিও তাকে বুঝতে দিইনি।এইভাবে বেশ কয়েকবার রূপার প্রেমে পরেছি। খুব অল্প সময়ে রূপা আমাকে আর আমার পরিবারটাকে নিজের করে নিল।মেয়েটা মানুষকে খুব সহজে মায়ায় জড়াতে পারে।রূপা যদি দুইদিনের জন্য তার বাবার বাড়ি বেড়াতে যায় সবার মুখে একটাই কথা রূপাকে ছাড়া তাদের ভালো লাগছে না।আমার মা তো রূপাকে ছাড়া একেবারেই একা হয়ে যায়।আর বাবার কথা কি বলবো নিজের মেয়েকেও এতটা ভালোবাসেন না যতটা রূপাকে ভালোবেসেছেন।রূপা হচ্ছে আমার বাবার সব চেয়ে প্রিয় মানুষটা।আমার কথা আর কি বলবো!
মেয়েটা ভীষণ শান্ত।একেবারে চুপচাপ স্বভাবের।এত শান্ত মানুষ আমি আমার জীবনে প্রথম দেখেছি।রূপাকে কখনো রাগতে দেখিনি।তাই একদিন ভাবলাম রূপাকে একটু রাগায়। আমার শার্টের বোতামটা ছিঁড়ে গেছে রূপা সুঁই সুুতো দিয়ে বোতামটা লাগাতে বসেছে।আমি আসতে করে তার পাশে গিয়ে বসলাম।তারপর বলছি জানো রূপা!বিয়ের আগে আমার সাথে একটা মেয়ের সম্পর্ক ছিল।মেয়েটা খুব ভালো ছিল।আমাকে খুব ভালোবাসত।রূপা কথা গুলো শুনেও না শুনার ভান করছে।তারপর আরো একটু বাড়িয়ে বললাম মেয়েটার নাম ছিল চিত্রা কি মিষ্টি নাম তাই না!আমাদের মধ্যে চিঠি আদান প্রদানও হতো। সে কি প্রেম আমাদের বলতেই রূপার হাতে সুঁইয়ের খোঁচা লাগে।সুঁইটা প্রায় আঙ্গুলের মাংস অবধি চলে যায়।বুঝতে পারছি সে খুব ব্যথা পেয়েছে।
রূপার খুব কাছে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে বলছি একটু দেখে কাজ করবে তো।দেখো তো কতটা ব্যথা পেয়েছ।রূপার ব্যথা নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই।সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমি বলছি কি?তাকিয়ে আছো কেন!একটু কান্না জড়ানো কণ্ঠে রূপা বলছে তোমাকে দেওয়া চিত্রার চিঠি গুলো আলমিরার তিন নম্বর তাকে তুমি যত্ন করে লুকিয়ে রেখেছিলে সেখান থেকে নিয়ে চিঠি গুলো আমি পড়েছি।তোমাদের দুইজনের সম্পর্কের পরিধিও আমি বুঝতে পেরেছি।কিন্তু কি বলো তো এই যে আমার সামান্য সুঁচের খোঁচা সহ্য করতে না পেরে তুমি ছুটে এসেছ এমন অনুভূতি কখনো চিত্রার জন্য তৈরি হয়েছে? উত্তরটা আমাকে দিতে হবে না তুমি নিজেকে নিজে দিও এই কথা বলে শার্টটা আমার পাশে রেখে রূপা চলে গেলো।আমি মনে মনে ভাবছি তাই তো।এমন অনুভূতি তো কখনো চিত্রার জন্য আমার মনে তৈরি হয়নি।
আমি আরো অবাক হচ্ছি এই ভেবে আমি যদি চিত্রাকে নিয়ে রূপার সাথে কথা না বলতাম তাহলে তো জানতেই পারতাম না যে রূপা চিত্রার কথা জানে।মেয়েটা বেশ অদ্ভুত তো! আমার সাথে রূপার ভীষণভাবে মনের মিল ছিল।আমার ঝাল পছন্দ রূপাও ঝাল খেতে ভালোবাসে আমার কদম ফুল প্রিয় রূপার ও কদম প্রিয়।সবটা খাপে খাপে মিল।কখন যে রূপাকে ভালোবেসে ফেলেছি নিজেও বুঝতে পারিনি। বিয়ের কয়েক বছর পর আমাদের দুইটা সন্তানের জন্ম হয়।প্রথম সন্তান ছেলে আর দ্বিতীয় সন্তান মেয়ে। বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ করে রূপার বুকে ব্যথা শুরু হয়।এত বেশি কষ্ট পাচ্ছিলো সে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
তাড়াতাড়ি করে রূপাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম।ডাক্তার রূপাকে দেখে বলল অপারেশন করাতে হবে।অনেক পরীক্ষা নীরিক্ষা করে তার হার্টের সমস্যা ধরা পরে।টাকা হাতে ছিল না তখন।আর হুট করে অপারেশন করানোটা আমার ভালো লাগেনি। রূপার হার্টের অপারেশনের জন্য কিছুদিন পর তাকে আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম।অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার আগে রূপা যখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে ছিল আমি তার পাশে গিয়ে বসেছি।আমার হাতটা সে শক্ত করে ধরে বলছে আমি যদি নিঃশ্বাসটা নিয়ে আর তোমার কাছে ফিরতে না পারি বাচ্চাগুলোর জন্য আরেকটা নতুন মা আনবে।পারলে ২য় চিত্রাকে বিয়ে করে ঘরে আনবে বলেই রূপা মজার ছলে হাসছে কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি হাসির আড়ালে রূপা কষ্টটাকে লুকাচ্ছে।চোখের কোণে কয়েক ফোটা পানিও জমেছে।
রূপাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেল আমি বাইরে একটা চেয়ারে বসে আছি।বুকের ভিতর চিনচিন ব্যথা করছে।ইচ্ছে করছে আমিও ভিতরে গিয়ে দেখি আমার রূপাকে ডাক্তাররা বেশি কষ্ট দিচ্ছে কি না!এমন অনুভূতি এই নিয়ে তিনবার হয়েছে যখন আমার প্রথম আর দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়েছিল তখন আর এখন! রূপার প্রতি আমার এই গোপন অনুভূতি গুলো সে কখনো জানবে না।চিত্রাকে যখন ভালোবেসেছিলাম তখন তাকে সবটা বলে দিতে পারতাম বুকের ভিতর কিছুই জমা রাখতাম না।কিন্তু কেন যেন রূপাকে কিছুই বলতে পারি না।কোনো অনুভূতির কথা’ই না।
অপারেশন শেষ করে ডাক্তার বের হতেই আমি ডাক্তারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করছি রূপা কেমন আছে?একটু পর কথা বলছি বলে ডাক্তার চলে গেল।ভিতরের ভয়টা যেন আরো কামড়ে ধরছে আমাকে।রূপা আমার জীবনে নেই সে কথা কখনো আমি ভাবতেও পারি না।দম বন্ধ হয়ে আসে।আমি মাথায় হাত দিয়ে নিচের দিকে মাথা ঝুকিয়ে অসহায়ের মত আবার চেয়ারটাতে বসে আছি।একটু পর ডাক্তার সাহেব আমাকে ডাক দিলেন আমি ডাক্তারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করছি রূপা ঠিক আছে তো?ডাক্তার বললেন রূপা পুরোপুরি সুস্থ।এই কথা শুনে মনে যেনো একটা অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে।
একটু পর রূপার কাছে গিয়ে তার হাত ধরে বসে আছি।রূপা বলছে চিত্রাকে আর বিয়ে করতে পারলে না তাই তো!রূপা কথাটা বলে সে নিজেও হাসছে আমিও হাসছি। তার কিছুদিন পর বাবাটাও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।বাবা মারা যাওয়ার পর রূপা মাকে অনেক যত্নে সামলে রেখেছে।বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর মা ও মারা গেলেন।এখন বড় আপু মাঝে মাঝে এসে আমাদের দেখে যায়। সেদিনের পর থেকে রূপা একেবারে সুস্থ।দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর আমি আর রূপা হাত ধরাধরি করে পার করে দিলাম।আমাদের মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছি ছেলেটাকেও বিয়ে করিয়েছি।সবাইকে নিয়ে আমি আর রূপা বেশ ভালো আছি।
আমাদের বিয়ে হয়েছে এখন ৫১ বছর চলে।রূপা আমার খেয়াল রাখে আর আমি রূপার।মাস খানেক আগে রূপার বুকের ব্যথাটা বেড়েছে।এইবার আর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়নি।হাসপাতালে যাওয়ার আগেই রূপার নিঃশ্বাসটা বন্ধ হয়ে যায়।আমাকে এই পৃথিবীতে একা রেখে রূপা পরপারে পাড়ি জমিয়েছে।শেষ বারের জন্যও রূপাকে বলা হয়নি “বড্ড বেশি ভালোবেসেছি রূপা তোমাকে” রূপা চলে যাওয়ার এক মাস তিনদিন পর ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে বেলকনিতে রূপার একটা ছবি দুই হাত দিয়ে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ইজি চেয়ারে বসে আছি।সে কি আমার চশমার কাচটা তো ঝাপসা লাগছে।কাপা কাপা হাতে চশমাটা নামিয়ে চোখের পানি গুলো মুছতে মুছতে ভাবছি আমাদের জীবনে হাজারো চিত্রা আসে পরিস্থিতি হোক কিংবা ভাগ্যের জোরে টিকে থাকে কেবল রূপারা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত