জটিল অংক

জটিল অংক
গায়ে হলুদের আসর ছেড়ে পালিয়ে নীলা রায়হানের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে হলুদ শাড়ী আর ফুলের গয়না। হাত জোড় করে কেঁদে কেঁদে নীলা বলছে,
— রায়হান, দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে দিও না। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, তোমাকে ছেড়ে আমি অন্যের ঘরে শান্তি পাবো না কখনো। তোমার কাছে কখনো কোন আব্দার করবো না। তুমি যেভাবে রাখবে আমি তাতেই খুশী থাকবো। এইসব বলতে বলতে নীলা রায়হানের পা জড়িয়ে ধরে। রায়হান চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব শুনে। এরপর নীলাকে উঠিয়ে বলতে লাগলো, তোমাকে আগেও বলেছি এখনো বলছি আমার পক্ষে এখন বিয়ে করা সম্ভব না। আমার চেয়ে তোমার হবু বরের ইনকাম, অবস্থা অনেক ভালো , সেখানে তুমি অনেক ভালো থাকবে। নীলা যখন বুঝতে পারলো রায়হান তাকে বিয়ে করবে না তখন হাত দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে বেশ গম্ভীর হয়ে বলতে লাগলো,
— বিয়েই যখন করবে না তখন কেন ঘর বাধার স্বপ্ন দেখিয়েছিলে, কেন ভালোবাসতে এসেছিলে। কেন মিথ্যে আশ্বাসে আমার মন নিয়ে খেললে। আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু মনে রেখো আজকের মতো তোমাকেও একসময় আমার মতো কাঁদতে হবে। তখন কেউ এসে দেখবে না, কেউ এসে দেখবে না।
আচমকা ঘুম ভেঙে লাফিয়ে উঠে হাপাঁতে লাগলো রায়হান। কাঁপা কাঁপা হাতে চশমা খুঁজতে লাগলো। এরমধ্যেই ফজরের আজান শুনতে পেলো। চশমা পড়ে জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে খাওয়ার পর কিছুটা স্বাভাবিক হয় রায়হান। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে জানালা খুলে বাহিরে তাকিয়ে দেখে দূরে পূবের আকাশে একটু একটু করে আলোক রেখা ফুটে উঠছে। সকাল ৮টার দিকে রায়হান রুম থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে আস্তে আস্তে হেঁটে ডাইনিং রুমে গেল। সেখানে নাশতা শেষ করতেই এক ছেলে দৈনিক পত্রিকা দিয়ে গেল। পত্রিকা হাতে নিয়ে একটা নিউজের হেডিং দেখে কয়েকজন বৃদ্ধ বেশ হাসাহাসি করতে লাগলো।
রায়হান পত্রিকাটি হাতে নিয়ে দেখলো প্রথম পাতায় বেশ বড় করে লেখা “যেসব সন্তানরা বৃদ্ধ বাবা-মার ভরণপোষণ করবে না, তাদের বিরুদ্ধে সরকার নতুন আইন করতে যাচ্ছে”। রায়হান লেখাটি দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি দিতেই পাশ থেকে এক বৃদ্ধ বলে উঠলো, আপনি এই খবর দেখে কি করবেন রায়হান সাহেব, আপনার তো আর বাচ্চাকাচ্চা নেই। রায়হান পত্রিকা রেখে বারান্দায় কিছুটা সময় পায়চারী করে বাগানের দিকে এগিয়ে যায়। বাগানে আম গাছের গোড়া সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো বসার জায়গাটা রায়হানের খুব প্রিয়, প্রায় সে এই জায়গাটায় বসে দিনের বেশীরভাগ সময় কাটায়। সেখানে বসে রায়হান শেষ রাতের কথা ভাবতে লাগলো অনেক দিন পর সেই স্বপ্নটা আবারো দেখলো, সেই সাথে নীলাকেও। হঠাৎ শরীর খারাপ লাগায় রায়হান উঠে গিয়ে নিজের রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই রায়হান ফিরে গেল ৪০ বছর আগের সময়ে। রায়হান তখন ২২ বছরের টগবগে তরুণ।
ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে বেশ ফুরফুরে ভাব নিয়ে সব সময় চলতো। দু’চোখ ভরা তখন শুধু স্বপ্ন আর স্বপ্ন। স্বপ্নের মতোই কাটছিলো সময়। তখন কেবল ৩য় বর্ষে উঠেছে রায়হান একদিন ইউনিভার্সিটিতে নতুন ভর্তি এক মেয়ে এসে খুব নীচু গলায় বললো, ভাইয়া একটু হেল্প করবেন। রায়হান তখন বেশ হিরো হিরো ভাব নিয়ে জানতে চায় কিসের হেল্প লাগবে। মেয়েটি কোমল কন্ঠে বললো, আমি এখানে আজ প্রথম এসেছি, কোন বিল্ডিংয়ে আমার ক্লাস সেটা বুঝতে পারছি না। এরপর রায়হান ডিপার্টমেন্টের নাম জেনে মেয়েটিকে ওর ক্লাসে এগিয়ে দিয়ে আসে। একই ডিপার্টমেন্ট হওয়ায় মাঝে মাঝে মেয়েটির সাথে দেখা হতো রায়হানের। এরই মাঝে জানতে পারে মেয়েটির নাম নীলা। লাজুক চাহনি আর নম্র স্বভাবের জন্য খুব তারাতাড়ি নীলার প্রতি রায়হান বেশ দূর্বল হয়ে পড়ে।
একসময় সে নীলাকে প্রপোজ করে। নীলাও সায় দেয়। রায়হান চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার সময় ওর বাবা হঠাৎ করে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। রায়হান কোন রকম পরীক্ষাটা দেয় তারপর ওর বাবাকে নিয়ে অনেক হাসপাতালে যায় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু ওর বাবা মাস তিনেক পর হঠাৎ করে মারা যায়। রায়হান পড়ে গেল অকূল পাথারে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছিলো না। ছোট ছোট তিনটা ভাইবোন, মা অসুস্থ আবার এদিকে বাবার চিকিৎসার জন্য জমানো টাকা শেষ করে ধার করা হয় বেশ। রায়হান হন্যে হয়ে চাকরী খুঁজতে লাগলো। একটা ছোট চাকরী পেয়ে যায় কিন্তু বেতন অনেক কম থাকায় রায়হান অফিস ছুটির পর কিছু টিউশনি করতে লাগলো। ফিজিক্স নিয়ে পড়লেও রায়হান গণিতে খুব ভালো ছিলো। টাকা বাঁচানোর জন্য পায়ে হেঁটে অফিসে, টিউশনিতে যেত। লাঞ্চ টাইমে এক কাপ চা আর একটা সিগারেট টেনে ক্ষুধাটাকে দমিয়ে রাখতো, সন্ধ্যার দিকে আবার কড়া এক কাপ চা খেয়ে রাতের খাবারের রুচি নষ্ট করে ফেলতো।
এভাবে নিজের উপর অত্যাচার করে সংসারের জন্য টাকা জমাতে লাগলো। এর মধ্যে একদিন নীলা জানালো ওর বাসা থেকে বিয়ের জন্য তোরজোর শুরু করেছে। রায়হান যেন কিছু একটা করে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে রায়হান নীলাকে অনেকটা এড়িয়ে চলতো। ও চাইছিলো না নীলা এই সংসারে এসে কষ্ট করুক। নীলার বিয়ের কথা শুনেও রায়হান আরো উদাসীন ভাব দেখাতে শুরু করলো। অবশেষে হলুদের দিন নীলা পালিয়ে আসে রায়হানের বাড়িতে কিন্তু রায়হান চুপচাপ থেকে নীলাকে ফিরে যেতে বলে। নীলা অনেক কান্নাকাটি করে ফিরে যায় ঠিকই কিন্তু ও চলে যাওয়ার আগের কথাগুলো রায়হানের কলিজায় এসে কাঁটা হয়ে বিঁধে । মায়ের কাছে বসে সারারাত খুব কাঁদে রায়হান, ওর মা মাথায় হাত দিয়ে বার বার স্বান্তনা দেয় সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন।
হঠাৎ কেয়ারটেকারের ডাকে ঘুম ভেঙে যায় রায়হানের। উঠে বসতেই কেয়ারটেকার বেশ বিরক্ত হয়ে বলতে লাগলো, রাতের খাবারের সময় হইছে, তারাতাড়ি খাবার খাইয়া সবাই যার যার মতো রুমে আইসা পড়েন। রায়হান আস্তে আস্তে ডাইনিংয়ে যেয়ে খুব অল্প পরিমাণ কিছু খেয়ে আবার রুমে এসে বিছানায় বসে পড়ে। রায়হানের রুমে আরো একজন থাকে। সে আসার পরে দুইজনে কিছুক্ষণ দেশের সমসাময়িক অবস্থা নিয়ে গল্প করলো। বেচারার মনে খুব কষ্ট , চারজন সন্তানের কেউই মাসে একবার এসে তার সাথে দেখা করার সময় পায় না। অথচ নিয়মিত তারা শ্বশুরবাড়ি, বন্ধু – বান্ধবের বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছে। এক রাশ অভিমান নিয়ে সন্তানদের গালমন্দ করতে করতে বেচারা বেশ হতাশ হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। রায়হান বালিশের তলা থেকে একটা হাতঘড়ি বের করে দেখতে লাগলো যেটা নীলা গিফট করে। হাতঘড়ি দেখতে দেখতে হঠাৎ রায়হানের ঝিমুনী এসে যায়।
সে রাতের পর নীলার সাথে রায়হানের আর কোনদিন দেখা হয় নি। স্বপ্ন ছিলো নীলাকে একটা নীল রংয়ের জামদানী শাড়ী কিনে দেবে কিন্তু সেটা স্বপ্নই রয়ে যায় রায়হানের জন্য । ভাইবোনদের মানুষ করার জন্য রায়হান বিয়ে করবে না বলে ঠিক করে। ছোট দুই ভাই সময় মতো বিয়ে করে নেয়। ছোট বোনটার বিয়ে দেয়ার পর অনেকেই রায়হানকে বিয়ে করে সংসার করতে বলে কিন্তু রায়হানের আপত্তি পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই লোককে এখন কে বিয়ে করবে। একদিন ছোট ভাইদের অনেক অনুরোধে রাজি হয় কিন্তু রায়হানের শর্ত থাকে মেয়ের বয়স যেন মিনিমাম চল্লিশ হয়, শিক্ষিতা, শর্ট ডিভোর্স বা কোন কারণে বিয়ে হতে দেরি হচ্ছে এমন পাত্রী যেন দেখে। যথারীতি পাত্রী দেখতে যেয়ে রায়হান কিছুটা ঘাবড়ে যায়। কারণ পাত্রীর বয়স দেখে মনে হচ্ছে ২৫/২৬ বছর। কথা বলার সময় ভাষার অসংগতি দেখে রায়হান জিজ্ঞেস করলো কতটুকু লেখাপড়া, মেয়েটি একটু চুপ থেকে বললো ডিগ্রি পর্যন্ত পড়েছে। রায়হান ব্যাপারটা আরো শিওর হওয়ার জন্য আস্তে করে মেয়েটিকে এ প্লাস বি হোল স্কয়ারের সূত্র জিজ্ঞেস করে। মেয়েটি হঠাৎ করে রেগে উঠে বলে আমারে বলা হইছে শুধু পাসের কথা জিগাইবো আর ডিগ্রি পাস করছি সেইটা কমু, কিন্তু এখন দেখতাছি ব্যাটা আমারে বইয়ের প্রশ্ন জিগায়তাছে।
সারাজীবন বাসাবাড়ির কাম করছি বইয়ের চেহারা দেখি নাই কোনদিন। রায়হান সব দেখে কি বলবে কিছু বুঝতে পারছে না, মেয়েটির হাতে পাঁচশত টাকা দিয়ে চলে আসে আর ভাইদের কড়া করে বলে দেয় তার বিয়ের কথা আর না তোলে। সেদিনের পর থেকে নীলাকে নতুন করে খুব মিস করতে থাকে রায়হান। একজনের মাধ্যমে নীলার খোঁজ করে জানতে পারে বিয়ের পর থেকে স্বামীর সাথে তেমন বনিবনা হচ্ছিলো না নীলার, বেশীর ভাগ বাবার বাড়ি থাকতো । বছর পাঁচেক হলো একটা রোড এক্সিডেন্টে মারা যায় নীলা। নীলার খবর শুনে রায়হান বেশ দমে যায় পুরোনো করে তাকে আবার হারাবার ব্যথা জেগে উঠে। এদিকে ছোট ভাইদের ব্যবহার দিন দিন যেন কেমন হয়ে উঠছে, সবার মাঝে একটা বিরক্তকর ভাব। ছোট ভাতিজা সেদিন বললো, চাচ্চু, মা চায় না কোন শিক্ষিত মহিলাকে তুমি বিয়ে করো।
এইজন্য আমাদের বাসার কাজের বুয়া রহিমা খালার ভাগ্নীকে সেদিন তোমাকে দেখাতে নিয়ে যায়। যাতে বিয়ের পর ঘরের সব কাজ মা ওই মহিলাকে দিয়ে করাতে পারে। ছোট্ট ভাতিজার কথা শুনে রায়হান মনে মনে খুবই কষ্ট পায় কিন্তু কাউকে কিছু বলে না। এক সময় রায়হান অফিস যাওয়ার সময় জুতা, ছাতা এগিয়ে দেয়ার জন্য ভাইরা মারামারি করতো কে আগে দিবে আজ সেই ভাইরা রায়হানকে উটকো বোঝা মনে করছে। এর মধ্যে একদিন দুজনে আব্দার করলো যেহেতু রায়হানের কোন সন্তান নেই তাই গ্রামের বাড়িতে তার ওয়ারিশের জমিটুকু যেন ছোট ভাইদের লিখে দেয়। রায়হান বুঝতে পারছিলো না করবে তারপরও রায়হান অনেকটা বাধ্য হয়ে জমিটুকু লিখে দেয়। জমি লিখে নেওয়ার পর রায়হান ভাইদের আসল চেহারা দেখে। তাকে আর কেউ বাড়িতে রাখতে চাচ্ছে না৷ ভাইরা বেশ কর্কশ ভাষায় কথা বলছে আর ভাইয়ের বউরা চিল্লাচিল্লি করছে তাদের স্বামীদের সাথে। রায়হান খুব কষ্ট পায় আর ভাবে কাদের জন্য নিজের পুরো জীবনটা শেষ করলো। ঠিক করলো আর কারো বোঝা হয়ে থাকবে না।
ছোট বোনকে খবর দিয়ে আনলো তাকে যেন শহর থেকে দূরে কোন বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। তিন লাখ টাকা জমানো ছিলো সেটা ওর বোনকে দিয়ে দেয়। রায়হানের বোনটা খুব কান্নাকাটি করে।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই বৃদ্ধাশ্রমে আছে রায়হান। আগে মাঝে মধ্যে ছোট বোনটা দেখতে আসতো এখন সেও আসে না অনেকদিন হলো। প্রতিদিনের মতো ঘুম ভেঙে জানালা খুলে দূরের আকাশটা দেখতে দেখতে ভাবতে থাকে ছাত্র পড়াতে গিয়ে অনেক জটিল অংকের হিসাব মেলাতে পেরেছে অথচ নিজের জীবনের অংকের হিসাবটাই মিলাতে পারলো না রায়হান । সংসারে বড় ভাই হয়ে জন্ম নেয়া আর্শীবাদ না অভিশাপ তা আজও বুঝে উঠতে পারেনি রায়হান।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত