বেঁচে থাকার গল্প

বেঁচে থাকার গল্প
বাবার অনুরোধে ফুফুকে নিয়ে গেলাম মেয়ে দেখতে। গ্রামের একটা সাধারন মেয়ে। ক্ষেত একটা। পোশাকে নেই কোন আভিজাত্য। শ্যামলা চেহারা,নাকটা লম্বা বটে। প্রসাধনীর কোন লেশমাত্র নেই সর্বাঙ্গে। অথচ আমি শহরের কোন এক মডার্ন মেয়েকে ডিজার্ভ করতাম। মীরার সাথে ব্রেকআপটা না হলে ওকেই বিয়ে করতাম আমি। মেয়েটা কোন কারন ছাড়ায় ব্রেকআপ করলো। এই মেয়েকে বিয়ে করা আমার পক্ষে কোন মতেই সম্ভব নয়। ফুফু আমাদের আলাদা কথা বলার ব্যবস্থা করে দিলেন। একচালা টিনের একটা ঘর। রোদের সব তীব্রতা আমার শরীরে। আচ্ছা আপনার কি আমার পছন্দ হয়েছে? মেয়েটির দিকে তাকিয়ে কথাটা বললাম। মেরুন রংয়ের একটা সালোয়ার কামিজ পড়া। যত দেখছি তত অস্বস্থিকর মনে হচ্ছে আমার কাছে। জ্বী। বাবা বলেছে আপনার সম্পর্কে। আপনার নামটা? নিশিতা,সবাই আমাকে নিশি বলে ডাকে। উফ এতো ক্ষেত হয় কেমনে মেয়েটা। মনে হচ্ছে আশির দশকের।
পরমুহূর্তে ওখান থেকে বেরিয়ে আসলাম। ফুপি কোন মতেই ঐ মেয়েকে আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব না। তুমি বাবাকে বলো আমার পছন্দ হয়নি। বাবা রাশেদ তোর বাবা আজ পর্যন্ত তার পছন্দের কোন কিছুই তোর ওপর চাপিয়ে দেয়নি।দুইদিন পর ধুমধাম করে বিয়েটা হয়ে গেল। বাসর ঘরে লাল টুকটুকে একটা শাড়ী পড়ে বসে আছে সে। আমি একটু এগিয়ে বললাম, এভাবে ক্ষেত মার্কা শাড়ী কে পড়তে বলেছে? আর হ্যা শোনেন বিয়েটা আমার অমতে হয়েছে,বাবার মন রক্ষার্থে। আশা করি বুঝতে পেরেছেন কি বলতে চাইছি। আমার দিকে মুখ তুলে তাকালো একটু,,চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম টপটপ করে জল পড়ছে। একরাশ অস্বস্থি নিয়ে শুয়ে পড়লাম সেদিন।
এভাবে চলতে লাগলো কয়েকটা দিন। আমি রাত করে বাসায় ফিরি, কথা বলিনা ওর সাথে। কথায় কথায় অপমান করি। তবু একটুও প্রতিবাদ করেনা মেয়েটা। সব সয়ে যায়। আজ এক মাস পর ওর বাবা এসেছে ওকে নিতে। দুপুরে খেয়ে শুয়ে আছি। নিশির পায়ের শব্দ শুনতে পারছি আমি। ঘুমের ভান করে রইলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার পায়ে দুহাত দিয়ে স্পর্শ করে মৃদু স্বরে কেদে উঠলো। নেকামিও পারে মেয়েটা। যতসব সেকেলে কারবার। ও চলে যাওয়াতে বাড়িটা শুন্য লাগছে বটে। রোজ তাহাজ্জুদ, ফযরের নামায পড়ে তারপর ঘুমায় মেয়েটা। সকাল বেলা উঠে নাস্তা রেডি করা। সারা বাড়ীর কাজ সে একাই করতো। ভালোই হয়েছে কিছুদিন একা থাকা যাবে।
তিনদিন পর সূর্য তখন ঠিক মাথার উপরে,বিপরীত দিক দিয়ে একটা ট্রাক আমার বাইকের উপর সজোরো আঘাত করলো। যখন জ্ঞান ফিরলো নিজেকে আবিষ্কার করলাম হাসপাতালে। আমার সামনে বরাবর নিশি দাড়িয়ে আছে। পাশে বাবা,ফুপি,আর নিশির বাবা মা। কেবলই নিশির চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াতে লাগলো। বাবা হাউমাউ করে কাদতে লাগলেন। আমার একটা পা আর হাত সম্পূর্ণ ভেঙ্গে গেছে। ডান পাশের পুরোটা অকার্যকর। সারা রাত দিন অসহ্য কষ্ট। মনে হতো এই বুঝি প্রানটা বেরিয়ে গেল। হাসপাতালে কেবিনে কেবল নিশিই থাকতো আমার সাথে। পুরো একটা মাস। ঠিক মত খেতে পারতোনা মেয়েটা। প্রতিদিন জায়নামাযের বিছানায় কান্নাকাটি করতো। একদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি,নিশি আমার পায়ের কাছে মাথা দিয়ে বসা অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর চোখটা ভেজা ভেজা। যে মানুষটাকে আমি এতো অপমান করেছি সেই মানুষটা আমার জন্য এতকিছু করছে! আমি ডুকরে কেদে উঠলাম। নিজেকে খুব নিঃস্ব লাগছিলো।
১মাস ৭ দিন পর আজ বাসায় আসলাম। ডাক্তার বলেছে বাকিটা জীবন হয়তো আমাকে হুইল চেয়ারে কাটিয়ে দিতে হবে। আবার ঠিকমত ব্যায়াম আর সেবা করলে সুস্থ হতেও পারি। এভাবেই নিশির সেবায় দিন পার করতে লাগলাম। আমাকে খাইয়ে দেওয়া, গোসল করানো, সবকিছু।আমি একটা ডাক দিলেই ভয়ার্ত মন নিয়ে হাপাতে হাপাতে ছুটে আসতো। আমার কি লাগবে,সব বুঝে যেত কেন জানি। মেয়েদের কি এই শক্তিটা জন্মগত? আমি জানিনা। আজ দুইমাস পর নিশির বাবা মা এসেছে দেখতে। ওনারা বাবার সাথে কথা বলছেন পাশের রুমে। পাশে নিশি দাড়িয়ে। আসলে বলছিলাম কি বেয়াই সাহেব এভাবে তো আমার মেয়ের জীবনটা নষ্ট করতে পারিনা। আমি চাচ্ছিলাম আমার মেয়েকে সাথে করে নিয়ে যেতে। এভাবে আমার মেয়েটা দিনের পর দিন শেষ হয়ে যাচ্চে। বাবা বললেন,আপনারা যেটা ভালো মনে করেন। নিশি সবাইকে অবাক করে দিয়ে সোজা জানিয়ে দিলো,এটা আমার স্বামীর ঘর। এই ঘর ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। তার ভালো সময়, খারাপ সময়ে আমি পাশে থাকতে চাই।
আমি সহ্য করতে পারিনা ওর কথা শুনে। পাগলের মত বিলাপ করতে থাকি। সন্ধ্যা বেলা আমি নিশিকে কাছে ডাকি। জ্বী কিছু লাগবে আপনার। বলেন কি লাগবে? আমি ওর চোখে চোখ রাখি। দুচোখের জলে গাল বুক ভেসে যাচ্ছে আমার। কি হলো আপনি কাদছেন কেন? আমি কি কোন ভুল করে ফেললাম। বলেন আমাকে। আমি ইশারায় কাছে ডাকি। এই প্রথম। ও ভয়ে ভয়ে কাছে আসলো। বুকের মধ্যে পুরে নিলাম ওকে। ডুকরে কেদে উঠলো মেয়েটা। আমার বুকে ওর চোখের জল গড়াতে লাগলো। মনে হলো আমাকে বাচতে হবে বহুদিন। আমাকে সুস্থ হতে হবে। ওর সাথে একটা দিনের জন্য হলেও পাশাপাশি হাটতে হবে।
এভাবে চলতে লাগলো আমার উঠে দাড়ানোর সংগ্রাম। একদিন বিকালে খুব কষ্টে উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করলাম। আর আমি আশ্চার্যজনকভাবে উঠে দাড়ালাম। নিশি এই নিশি,নিশি। নিশি রান্নাঘরের সব কাজ ফেলে ছুটে আসলে আমার দিকে। দেখ নিশি আমি উঠে দাড়িয়েছি,আমি হাটতে পারছি। নিশি চিৎকার করে বাবাকে ডাকতে লাগলো। বাবাও ছুটে আসলো। বাবা দেখেন আপনার ছেলে উঠে দাড়িয়েছে। ও হাটতে পারছে বাবা। বলেই বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে কাদতে লাগলো ও।
বাবাও সেদিন খুব কান্না করলো। আজ আমি সুস্থ। সবকিছু স্বাভাবিক। নিশি আমার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। রাত তখন গভীর। আস্তে আস্তে উঠলাম।বাবার রুমে উকি দিয়ে দেখলাম বাবা ঘুমাচ্ছে। প্রশান্তির ছায়া চোখেমুখে। সন্তানের সুস্থতার ঝিলিক তার চোখে মুখে। বেলকোনির দিকে এগিয়ে গেলাম,বাড়ন্ত অর্কিডটা দুলে উঠলো মৃদু বাতাসে। আকাশে দিকে তাকালাম। শ্বেতশুভ্র আকাশ। জানালা দিয়ে উকি দিয়ে দেখলাম নিশির ঘুমন্ত মুখটা। মেয়েরা সত্যিই ভিন্ন এক জাতি। সর্বসংহা। শান্ত সাবলীল, বিন্দু পরিমান মুখটা মাঝে মাঝে এক বিশ্বব্রাহ্মান্ডের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত