অন্যরূপে এলে

অন্যরূপে এলে
পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে।মেজাজ খুব খারাপ।মা বলেছে পছন্দ না হলেও বিয়ে করতে হবে।আর বেশি দেরি করলে পাত্র পাওয়া যাবে না। মা একটা লাল শাড়ি পড়তে বলল।আমার ছোটবোন হালকা মেক আপ করে দিলো। কিছুক্ষন পর পাত্র এলে দরজার আড়াল দিয়ে পাত্রকে দেখেই মুখে হাসি ফুটে উঠে। এই ত আমার কলেজের ক্রাশ ছিলো। বলা হয়ে ওঠে নি কখনো। ভাগ্যে ছিল বলে আজ ওর সাথেই বিয়ের কথা হতে যাচ্ছে।আমি ত মনে মনে সেই খুশি। আবার ভয় লাগছে আমাকে পছন্দ হবেও কি না?আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো তাদের সামনে।আমি চোখ আড় করে আমার পছন্দের মানুষের দিকে তাকালাম।
নীল পাঞ্জাবিতে অনেক ভালো মানিয়েছে। সবাই কথা বললো। আমাকেও পাত্রে বাবা বলল—আদ্রকে কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে করে ফেলো মা।আদ্র নামটা শুনেই প্রথমে অবাক হয়ে যায়।ওর নাম ত নীল হওয়ার কথা ছিলো। তারপর বোনের দিকে তাকিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করি পাত্র কে?বোন বলে সাদা পাঞ্জাবি তে যে আছেন উনিই পাত্র।আমি আসলে উনাকে ওভাবে খেয়ালই করি নি।নীল পাঞ্জাবি পড়া সেই মানুষের দিক থেকে চোখ সরালে ত অন্য কাউকে দেখতে পাবো!মনের অজান্তেই চোখ দিয়ে দুফোটা জল বেয়ে পড়লো। এবার মা আস্তে আস্তে কানে বলল– কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে করে নে। আমি শুধু মাথা নেড়ে বুঝালাম –না কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।
পাত্রপক্ষ চলে গেলে মা কে চুপ চুপ করে বলি–মা আমার ছেলে কে না ছেলের ভাইকে পছন্দ হয়েছে।মা কথা শুনে হাসতে লেগেছে।বলছে–পাগল হয়ে গিয়েছিস নাকি?পাত্রের ভাইয়ের জন্য সমন্ধ এসেছে নাকি?তাছাড়া পাত্রের ভাই ত বয়সে ছোট।ওর সাথে তোর যাই নাকি?আমি বলি–মা আমি আর পাত্রের ভাই সমবয়সী। একসাথে কলেজে পড়তাম।দেখো না মা যদি কিছু করতে পারো। মা এবার একটু সিরিয়াস হয়েই বলল—দেখ মা।আমাদের আর্থিক অবস্থা ওতো ভালো না।যে সমন্ধ এসেছে অনেক ভালো ঘর থেকে এসেছে।আর উনারা বড় ছেলের বিয়ে রেখে কি ছোট ছেলের বিয়ে দিবে বল।তোর বিয়েটা হলে তোর বাবার চিন্তা কমবে আর ছেলের ও কোন দাবি দেওয়া নেই।
আমি আর কিছু বললাম না।মাথা নিচু করে বসে রইলাম।রাতের বেলা চুপি চুপি মায়ের ফোন থেকে ওদের বাড়ির নম্বর টা নিতে ফোন দিলাম।কি বলবো ভাবছি– আমার আপনাকে পছন্দ হয়নি।নাকি এটা বলবো যে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি। ফোন ধরেই ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো —হ্যালো আমি নীল।আপনি কে বলছেন। আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম।কি বলবো। ফোন কেটে দিলাম। মা বিয়ের শপিং এ যেতে বললেও মন খারাপ করে বলি–না যেতে পারবো না।তোমার যা মন চায় তাই এনো। দেখতে দেখতে বিয়েও হয়ে গেলো সেই অচেনা লোকটির সাথে যাকে বিন্দু মাত্র পছন্দ হয়নি আমার।আমি ভাবছি ওই বাড়িতে যখন বিয়েটা হচ্ছে তাহলে ছোট ছেলের সাথে হলেই ত পারতো।
বাসর রাতে মুখের অর্ধেক পর্যন্ত ঘোমটা টেনে রেখে মনের দুঃখে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছি।হটাৎ করে উনি রুমের ভেতরে এলেন।আমি উনার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিলাম।উনি এসে পাশে বসলেন।বলতে শুরু করলেন–হাসনাহেনা তোমার কিছু লাগবে?লাগলে বলতে সংকোচ বোধ করো না। হাসনাহেনা নাম শুনে ত সেই রাগ হলো। আমি বলি—দেখুন হাসনাহেনা নামটা ধরে ডাকবেব না দয়া করে।আমার নামটা একদম পছন্দ না।কেমন জানি সেকেলে ভাব আছে।আমাকে সবাই দিয়া বলেই ডাকে।আপনি ও দিয়া বলে ডাকলেই আমি বেশি খুশি হবো। আদ্র বলে—কিন্তু তোমার ভালো নাম ত হাসনাহেনা আর এই নামটা আমার ভারি পছন্দ হয়েছে।বলেই একটু হাসলো।
তারপর বলল–এত গরমে এগুলো কেমন করে পড়ে আছো। এসব খুলে সালোয়ার কামিজ পড়ে নাও।আমি লাগেজ খুলতেই দেখি সবার উপরে নাইটি রাখা।দেখেই মেজাজ গরম হয়ে গেলো।আবার লোকটাও দাঁড়িয়ে আছে পাশে।নাইটি টা দেখে উনি মুচকি হেসে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।আমি মনে মনে বলছি—কালকেই এই নাইটি টা আগুনে পুড়িয়ে ফেলবো। আমি গোসল করে সালোয়ার কামিজ পড়ে এসে খাটে শুয়ে পড়লাম।উনাকে নিজের কাছে আসার কোন সুযোগ দেওয়া যাবেই না। কিছুক্ষন ঘুমাতে না ঘুমাতেই মনে হলো ঘাড়ে হাত দিয়ে কেউ ডাকছে।আমি একটু চমকে উঠে যায়।উনি মুখে হাসি নিয়ে বললেন—ফজরের আজান দিচ্ছে।আমি ভাবছি নতুন জায়গা তুমি মনে হয় বুঝতে পারো নি।তাই উঠিয়ে দিলাম। আমার ঘুম এখনো কাটে নি।আমি আধো ঘুম চোখে হাবলার মতন উনার দিকে তাকিয়ে আছি। উনি আবার বলা শুরু করলেন—তোমার জন্য জায়নামাজ টা বিছিয়ে দিবো?নাকি তুমি নিজের জায়নামাজ এনেছো?
আমি এবার একটু রেগেই বললাম–আপনি নামাজ পড়ার জন্য কেন আমায় উঠিয়েছেন?আমি ত নামাজ পড়িই না।আর এত ক্লান্ত লাগছে বিয়ে বাড়ির এত ধকল। উনি কথাটা শুনে নিরাশ হয়েছেন বুঝতে পারছি।উনি পাশ থেকে উঠে জায়নামাজ টা নিয়ে বাইরে চলে গেলেন।আমি ও নিজের মত ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি ৯টা বাজে।আমার নতুন স্বামী আমার পাশে বসে হাবলার মতন তাকিয়ে আছে।আমি উনাকে ওভাবে দেখে একটু ভয় পেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি উঠে বসে বলি–আপনি এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন? উনি হেসে উত্তর দিলেন–আমার বউয়ের দিকে তাকাতে পারবো না বুঝি? আমি কথা ঘুরাতে বললাম –এত দেরি হয়ে গেছে আপনি অত্ত সকালে না উঠিয়ে ৭টার দিকে তুলে দিতেন।বাড়ির সবাই কি ভাববে! উনি বলে—কিচ্ছু ভাব্বে না।তুমি গোসল করে নিচে এসো।
গোসল করে নিচে গেলাম।রান্নাঘরে শাশুড়ী কাজ করছেন।আমি বলি—মা আমাকে বলেন কি করতে হবে।আপনি কেন সকালের নাস্তা করছেন? মা বলল—না বউমা তোমায় কিচ্ছু করতে হবে না।তুমি শুধু চা টা আদ্রের ঘরে দিয়ে এসো। আমি কিছু বললাম না।চা নিয়ে ঘরে চলে আসলাম।চা টা টেবিলে জোরে আওয়াজ করে রেখে দিলাম।শব্দ পেয়ে উনি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন–চা টা কি আমার জন্য এনেছ?তুমি বানিয়েছো?তার কোন প্রয়োজন ছিল না। উনি ত আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখছেন।আমি কোন দুঃখে চা উনার জন্য বানাতে যাবো।উনাকে থামিয়ে বললাম–আমি বানাই নি।আপনার মা বানিয়ে দিল।আমি শুধু এনে দিলাম। উনি কেমন রেগেই বললেন—আমি চা খাই না।বলেই ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি ওসব পাত্তা দিলাম না।
নিচে সবার সাথে টেবিলে বসে আছি।মা সবাইকে নাস্তা বেরে দিচ্ছে।কিন্তু আদ্রকে বাড়ির কাজের মেয়েটা নাস্তা বেড়ে দিচ্ছে।আমি অবাক হলাম।মনে ত হচ্ছে উনার মায়ের সাথে সম্পর্ক ভালো না।বিয়ের অনুষ্ঠানে উনার মাকে দেখি নি। আমি ওসব চিন্তা বাদ দিয়ে খাচ্ছি।কিন্তু হটাৎ নীল মানে আমার স্বামী ভাই চলে আসায় আর খাওয়াতে মন দিতে পারছি না।আর একই ভাবনা—আজ দিনটা অন্য রকম হতে পারত।আমি অনেক খুশি থাকতাম যদি নীলের সাথে বিয়েটা হয়ে যেত।একনজরে নীলের দিকে তাকিয়ে আছি।কিন্তু ও ভদ্র ছেলের মতন খেয়ে চলে গেল।বিয়ের পর নীলের সাথে একবার ও কথা হয়নি।আমার জানা মতে নীল ত সেই মিশুক।ও মনে হয় আমাকে চিন্তে পারেনি।আরে চিনবে কেমন করে,,,কলেজে ত ওর ফ্রেন্ড সাইকেলের কেউ ছিলাম না।
আমি নীলের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।ভাবছি নীলের সাথে গল্পের ছলে বলি আমি আর ওই একই কলেজে পড়তাম।ঘরে নক না করেই ঢুকে পড়াতে নীল একটু বিরক্ত হলো বুঝতে পেরেছি।চেয়ার থেকে উঠে এসে বলল—ভাবি আপনার কিছু লাগবে?আমি বলি–আরে ভাবি বলছো কেন?আমি দিয়া।আমরা একই কলেজে পড়তাম। নীল বলে—আপনাকে দেখি নি আগে কখনো বলেই মাথা নিচু করলো।আমার ও লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে।আমি কিছু না বলেই বেরিয়ে এলাম রুম থেকে। নিজের রুমে এসে ভাবছি—আমি ও গাধা।ও ত আমাকে দেখেও নি খেয়াল করে আগে কখনো। আর আমি আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখতে ব্যস্ত। দুপুরে খাবার খেয়ে রুমে এলাম।খাটে একটু গা এলিয়ে চোখটা বন্ধ করতে যাব তখনই আমার গুনধর স্বামীর আগমন ঘটলো।
—আরে হেনা তুমি ঘুমিয়ে পড়লে কেন?নামাজ আদায় করে তারপর ঘুমিয়ো। আমি চোখ বড় বড় করে বললাম—আরে আপনাকে ত সকালেই বললাম আমি নামাজ পড়ি না। আদ্র বলল—আমি শিখিয়ে দিবো তোমায়।নামাজ মুসলমানদের উপর ফরজ করা হয়েছে।আগেই তোমার শিখা উচিত ছিলো। যাই হোক আমি শিখিয়ে দিব।
আমি বলি—নামাজ পড়তে যে দরূদ,দুয়া মাসূরা,তাশাহুদ লাগে আমি ত তার কিছুই জানি না।
আদ্র বলে–আমি তোমাকে বই দিচ্ছি এটা দেখে মুখস্ত করে ফেলো। আমি বইটা নিয়ে বিরক্ত ভরে একটু তাকালাম।তারপর বললাম–আমার মুখস্থ হতে অনেক সময় লাগে কিন্তু। ৭দিন লাগবে।
উনি বলে এসো তোমাকে ওজু করা শিখিয়ে দি।আমার দেখে দেখে নামাজ আদায় করা শিখে নাও।আমি ও না বলতে পারলাম না।বাথরুমে গিয়ে আদ্রের দেখে দেখে ওজু করলাম।ওর দেখে দেখে নামাজ পড়লাম। ঘুমিয়ে আছি। আবার কেউ ঘাড়ে হাত দিয়ে ডাকছে।আমি বুঝেছি কে ডাকছে।তাও না শুনার ভান করে ঘুমিয়ে রইলাম।আসরের নামাজ পড়া হলো না।আদ্র কয়েকবার চেষ্টা করে না পেরে চলে গেলো। সন্ধ্যার সময় উঠলাম।উঠেই গুনধর স্বামী কে দেখতে না পেয়ে নিচে চলে গেলাম।শাশুড়ী মা আর ননদ টেবিলে বসে আছে।কাজের মেয়েটা চা পাপড় চটপটি টেবিলে দিচ্ছে।আমি ও বাটি গুলো এনে টেবিল সাজিয়ে ফেললাম।
ননদঃভাবি ভাইয়া কই?
আমিঃনামাজ পড়ছে।তোমাদের নামাজ পড়া শেষ?
ননদঃনাহ ভাবি।আমি রেগুলার রি পড়ি না।আর এখন আমার ৭মাস ত তাই অনেক ক্লান্ত ভারি ভারি লাগে।চাইলে ও পড়তে পারি না। হঠাৎ আদ্র কোথা থেকে এসে বলছে—তোর নামাজ পড়া উচিত।এইসময় নামাজ পড়লে নেককার সন্তান জন্ম নেয়।বেশি অসুবিধা হলে কারো সাহায্য নিয়ে ওযু করে তারপর বসে বসে দরকার পড়লে আদায় করবি।
ননদঃভাইয়া তুই আগে এত নামাজি ছিলি না ত বছর ৩ আগে থেকে এসব শুরু করেছিলি হেন,,, ননদ কথাটা শেষ করতেই পারল না তার আগেই মা ওর হাত চেপে ধরেছে।আমি ঠিক খেয়াল করেছি।আর আদ্র কিছু না বলেই নিজের ঘরে চলে যায়।
আমি ওত মাথা না ঘামিয়ে বসে বসে চা খাচ্ছি।আদ্রের কাজিন রা এসেছে।সবাই বলাবলি করছে পরশু ত আদ্রর জন্মদিন।বাড়িতে একটা পার্টির আয়োজন করা যাক।শাশুড়ী মা বলে উঠে –দরকার নাই।আদ্র এসব পছন্দ করবে না। ভোরে ফজরের আজান দিচ্ছে।আমি শুনতে পাচ্ছি কিন্তু উঠতে মন চাইছে না।তারপর শুনতে পাচ্ছি আদ্র জোরে জোরে নামাজ পড়ছে।আমি বালিশ দিয়ে কান চেপে শুয়ে আছি।যত যাই করুক ওর মত করে চলতে বাধ্য নয় আমি।তারপর ওর শব্দের কাছে হেরে গিয়ে কষ্ট করে ওযু করে আসতে হলো। নামাজ পড়লাম।আবার একটু বিশ্রাম নিবো ভাবছিলাম কিন্তু না গুনধর স্বামী বলে বসে—হেনা আমায় একটু চা করে দিবা?
আমি বলি—আপনি বলে চা খান না?
আদ্র বলে—-আজ খুব ইচ্ছা করছে। প্লিজ আজকের জন্য বানিয়ে দাও আর কখনো বানাতে বলব না। রাগ হচ্ছিলো তাও যেতে হলো। চা বানাতে বানাতে মনে পড়লো আজ ত উনার জন্মদিন। বাড়িতে কি বিশেষ আয়োজন আছে নাকি কেউ ত কিছু বলে নি আমাকে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা কিন্তু না এমন সময় যেমন থাকে সবাই তেমনি।কেউ উনাকে উইশ ও করলো না।আমি ও কিছু না বলে চুপচাপ থেকে গেলাম। ২দিন পর ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে উনি আমাকে বললেন—হেনা,,,
আমি বলি–কি সুন্দর আপনি হেনা বলতে পারেন কিন্তু দিয়া নামটা বলতে কি মুখে বাঁধে আপনার?দুইটাই ত দুই অক্ষরের।
উনি বলে–হেনা নামের মাঝে আমার জন্য তোমার ভালোবাসা প্রকাশ পাই।
আমি বলি–হেনা নামটা খুব ঘিন্না লাগে আমার। উনি একটু মন খারাপ করেই বলল–হেনা তোমার এইচ এসসির রেজাল্ট কবে দিবে?
আমি বলি–জানি না
উনি বলে–চল তোমাকে কোচিং এ ভর্তি করে দি।ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চাইলে নীলের কোচিং এ ভর্তি করে দিবো।
আমার ওসবের শখ নাই।পড়তে আমার ভালোই লাগে না।তাই ত মা বাবা বিয়ে দিয়ে দিলো এই লোকের সাথে।এই লোক আবার পড়ালেখা করাতে চাই! তাও আমি মনে মনে খুশি হয়ে বললাম–এই ত সুযোগ নীলের সাথে সময় কাটানোর। ও ত সারাদিন বইয়ে মুখ গুজে থাকে।
আমি বললাম—আমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার খুব শখ।
আদ্র বলল–তোমার শখ পূরন করতে যা যা করার আমি করবো।
সকালবেলা উঠে উনি আমাকে সাধারণ জ্ঞান পড়াতে বসালেন।উনি বলে—ইঞ্জিনিয়ারিং এ না হলে মন খারাপ করো না কিন্তু আরও অপশান আছে জীবনে।আমি মনে মনে বলি—এত যখন বুঝেন তাহলে নিজে দোকানের মালিক হয়ে বসে আছেন কেন।এত ভালো বুঝলে ত চাকরি করতেন। বিকেলে কোচিং থেকে এসেছি তখন উনি বললেন মুখ হাত ধুয়ে এসো।আজ তোমায় অংক করাবো।
আমি মনে মনে ভাবছি এই দোকানদার কি অংক করাবে?সাধারন +-×÷..??এগুলো কি আর এডমিশনে আছে রে পাগলা?কিন্তু অবাক হয়ে যায় যখন উনি হায়ার ম্যাথের একটা কঠিন চ্যাপ্টার আমার বুঝিয়ে দিলেন। আমি মনে মনে ভাবছি–উনি ত ভালোই পারেন।ঠিক সময়ে আরেকটু চেষ্টা করলে ভালো কোথাও জব করতেন। মায়ের কাছে জানতে পারি আজ নীলের জন্মদিন। ভাবছি নীলকে একটু সারপ্রাইজ দেওয়া যাক।নীলের ক্ষির,কাস্টার্ড খুব পছন্দ। ওসব বানালাম।আর নীলের জন্য অনেক কষ্টে একটা নীল কালারের পাঞ্জাবি কিনলাম।নীলকে নীল রং এ খুবই মানায়। বাইরে থেকে কেক অর্ডার করা হয়েছে। আমি নীলের পাঞ্জাবি টা টেবিলে রেখে একটু ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম।হটাৎ দেখি আদ্র প্যাকেট টা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আমি ওকে দেখে ভয় পেয়ে যায়।
আদ্রঃপাঞ্জাবি টা ভারি সুন্দর। কার জন্য এনেছ?
আমি বুঝতে পারছি আদ্র অনেক আশা নিয়ে প্রশ্ন টা জিজ্ঞেস করেছে,,,ভাবছে ওর জন্য এনেছি মনে হয়।
আমি ওর সব আশায় পানি ঢেলে বললাম–এটা নীলের জন্য। আর ওর জন্মদিন তাই। আদ্র যে হাসি মুখ করে ছিল সেই হাসি ধরে রেখেই বলল–খুব ভালো করেছ।দেখো আমি কত পাগল।আজ আমার ভাইটার জন্মদিন আর আমি কিছুই আনি নি।দেখো কত পাগল আমি। আদ্র কথা গুলো তাড়াতাড়ি বলেই রুম থেকে চলে গেল।ঘরের বাইরে পা পড়তেই চোখে কোনের জল টা গড়িয়ে পড়ল।
আদ্রঃআমার জন্মদিনেও ত কিছু দিতে পারতো হেনা।আমি বিয়ের প্রথম দিন থেকেই বুঝেছি ও আমাকে পছন্দ করে না।তাহলে কি হেনা নীল কে,,, আমি কি হেনা আর নীলের মাঝে,,,,
আদ্রঃহেনা আজ নিজ হাতে পায়েস বানিয়েছে।কিন্তু নীলের ত পায়েস পছন্দ না।কিন্তু আমার পায়েস খুব পছন্দ।
দেখছি হেনা নীলকে বাটিতে পায়েস তুলে নিজেই দিয়ে আসছে।আমি যে গভীর আগ্রহে ওর বাটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম খেয়াল করে নি মনে হয়।আমি ও একটু হাসি দিয়ে নিজের পায়েস নিজেই তুলে নিলাম। হেনা নীলকে বাটি টা দিতেই নীল বলে—ভাবি আমার পায়েস পছন্দ না।আমি এটা খাবো না। হেনার হাসি মুখ টা কেমন শুকনা হয়ে গেলো।আমি বলি–তোর ভাবি যখন বানিয়েছে তখন নে না ভাই। আদ্রের কথা শুনে নীল এক চামচ মুখে দিলো। এটা দেখেই হেনার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
সবাই নীলকে গিফট দিচ্ছে।হেনাও গিফট দিলো।নীল গিফট টা খুলে বলে বসলো –ভাবি এটা অনেক কমন পাঞ্জাবি। আর এটা ১বছর আগে এই পাঞ্জাবি টা উঠেছিল,,,এমন কেঊ ছিল না যে নেয় নি।ভাবি আমি এ ধরনের কমন জামা কাপড় পড়ি না। আবার হেনার মুখ টা কালো হয়ে গেল।অনেক শখ করে এনেছিল।হেনা রুমে এসে পাঞ্জাবি টা মাটিতে ছুড়ে মারলো। আদ্র প্যাকেট টা মাটি থেকে তুলে বলল—হেনা পাঞ্জাবি টা অনেক পছন্দ হয়েছে।আমি কি এটা রাখতে পারি। হেনা বলল–আপনার যা খুশি করেন।এখন পাঞ্জাবি টা আমার কোন কাজের না। হেনাঃ
সকালে ঘুম থেকে উঠে যায় আজান শুনে।কিন্তু আজ প্রতিদিনের মত জোরে জোরে আদ্র নামাজ পড়ে নি।উঠে দেখি উনি নিশব্দে সালাত আদায় করছেন।আমি উনার পাশে বসে সালাত আদায় করলাম।সালাত শেষে উনাকে বলি—আমাকে ডাকলেন না কেন?
আদ্র বলে–দিয়া,,আমি ভাবছিলাম তোমাকে আর বিরক্ত না করি।সকালে উঠে কতটা বিরক্ত হও জানি ত আমি।
আমি উনার মুখে দিয়া নামটা শুনে অবাক হয়ে যায়।বলি—আপনি ত দিয়া ডাকা পছন্দ করেন না।তাহলে কেন দিয়া ডাকলেন।উনি বললেন–আমার পছন্দে কি আসে যায়।তোমার পছন্দই আসল।
রাতে আমি উনার কাছে অংক বুঝিয়ে নিতে আসলে উনি বলে—দিয়া আমি এত কঠিন অংক পারবো না।তুমি নীলের কাছে থেকে বুঝিয়ে নাও।তুমি ও না পারো দিয়া আমার মত দোকানদার কি আর এইসব অংক পারে!বলেই উনি হেসে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি নীলের রুমের সামনে গিয়েছিলাম।কিন্তু ওজানা এক কারনে ভেতর না ঢুকে চলে এলাম।নিজেই চেষ্টা করছি। ১০বাজে আদ্র এখন ও রুমে আসছে না।গেল কোথায়?বাড়ির কাজের মেয়েটা বলল আদ্র ছাদে।আমি ছাদে গেলাম।অন্ধকার চারিদিকে।উনি মাটিতে বসে রয়েছেন।লাইট উনার দিকে দিতেই উনি চোখের সামনে হাত ধরলেন।কাছে যেয়ে বুঝতে পারি উনার চোখ ভিজা।
আমি আদ্রকে উঠে দাঁড়াতে বলি।উনি কেমন জানি খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটছিলেন।আলো তে আসলে দেখতে পাই উনার পা কেটে রক্ত পরছে। আমি চিল্লিয়ে বলে উঠি—রাতে ছাদে আসলে ত এরকম আকাম হবেই।পেরেক টা পা থেকে বের করে ব্যান্ডেজ করে দিলাম। রাতের দিকে উনার জ্বর আসে।জলপট্টি দিতে হয়।ঠান্ডা পানির বাটি হাতে উনার সামনে দাঁড়ালে,,,উনি আধো আধো চোখ খুলা অবস্থায় বলে উঠল —হেনা,,,হেনা এসেছো?আমায় নিতে এসেছো?আমায় নিয়ে চলো তোমার সাথে প্লিজ প্লিজ,,বলেই উনি হাত টা ধরে ফেললেন।আর কিসব বলছিলেন যার কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না আমি।কিন্তু এখন এসব চিন্তা বাদ দিয়ে উনার সুস্থতার উপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
উনার সেবা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি খেয়াল নাই। আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙলে দেখি আদ্র ওযু করছে।আমি ও ওযু করলাম।একসাথেই নামাজ পড়লাম।আদ্র হটাৎ বলে ওঠে —দিয়া চোখের জল ফেলে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ কোনদিন তোমাকে ফিরাবে না।একচিত্তে কাউকে যদি চাও,,,তাকেও পেয়ে যেতে পারো,,,একবার আল্লাহর কাছে চেয়ে দেখোই না।মনের মানুষ কে পেয়েও যেতে পারো। কেন জানি আদ্রের কথায় অনেক বেদনা ছিলো। আমি দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম–আমার স্বামীর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দাও।আর যাকে কোনদিন পাওয়া সম্ভব না তাকে পাওয়ার প্রত্যাশা মন থেকে দূর করে দাও।
রান্না করতে করতে বাড়ির কাজের লোকের কাছে জানতে পারি– আদ্র ভাইয়ের আগে বিয়ে হয়েছিল।প্রথম বউয়ের নাম হেনা।অনেক ভালো ছিল।আদ্র ভাইয়া ত আগে নামাজ কালাম পড়ত না।হেনা ভাবি যখন ছিল তখন আদ্র ভাইয়া ধার্মিক জ্ঞান দেয়।।আপনার শাশুড়ী আদ্র ভাইকে অনেক ভালোবাসলেও হেনা ভাবিকে পছন্দ করতেন না।অনেক খাটাতন সারাদিন।।আদ্র ভাই হেনা ভাবিকে অনেক পছন্দ করত ।হেনা ভাবিও আপনার বয়সী ছিলো। ভাবির পড়ার শখ ছিলো। কিন্তু আপনার শাশুড়ী পড়াতে চাই নি।আদ্র ভাই ও মায়ের অবাধ্য হতে পারে নি।
একবার ভাবির অনেক অসুখ করেছিল,,,,, আপনার শাশুড়ী মা ওভাবে খেয়াল করে নি।অসুস্থ বউমা রেখে নীল ভাইকে নিয়ে কোচিং চলে যায়।এদিকে ভাবির অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসার অভাবে ভাবি মারা যায়।আর আদ্র ভাই ত অন্য শহরের কলেজে শিক্ষকতা করতেন।তাই ওই শহরে ছিলেন।ভাবি মারা যাওয়ার জন্য আপনার শাশুড়ী কে দায়ী করে।আর কলেজের চাকরিও ছেড়ে দেয়। এসব শুনে চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগলো।কি ভাবে আদ্রের পরিবার আমাদের ঠকালো।কেন কিছু বলে নি?কেন বলে নি আদ্রের আগে একবার বিয়ে হয়েছিলো। রুমে এসে আদ্রকে জিজ্ঞেস করি–আপনার আগের বউকে আমার মধ্যে পেতে চেয়েছিলেন।নিজে খুব নামাজ পড়ছেন আর সত্য কথা বলার শক্তি পাচ্ছেন না।মিথ্যা কথা বলে আমাকে বিয়ে করে আমার জীবন ধ্বংস করলেন কেন? আর এক মুহূর্ত এ বাড়িতে থাকব না। ব্যাগ গুছিয়ে সবার সামনে দিয়েই বেরিয়ে আসি।সবাই মাথা নিচু কিরে দাঁড়িয়ে আছে কেউ আটকানোর প্রয়োজনবোধ ও করলো না।
বাড়িতে এসে মা বাবা কে সব বলি।কিন্তু আমার আর্থিক সামর্থের সাথে ওদের বিরুদ্ধে লড়াটা সম্ভব না।তাছাড়া আদ্র ত বিয়ের পর কোন কিছু নিয়ে জোর করে নি আমাকে।আমাকে পড়াশোনা করাতে চেয়েছে।হয়তো বাপের বাড়িতে থাকলে আমার ভার্সিটি লেভেলে পড়ার সম্পর্ক শেষ হয়ে যেতো। আদ্র ভালো করে ওজু করে আজ দিয়ার দেওয়া পাঞ্জাবি টা পড়েছে।অবশ্য দিয়া আদ্র কে দেয় নি বরঞ্চ আদ্র নিয়ে নিয়েছে। নামাজ শেষে আদ্র দুহাত তুলে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করছে—দয়া করে আমাকে আমার ভালোবাসার মানুষের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। আজ আদ্রের খুব ক্লান্ত লাগছে।বেশ গরম ও লাগছে।সিজদা দেওয়ার সময় কেন জানি আদ্রের চোখ টা বন্ধ হয়ে এলো। অন্য দিকে আজ দিয়ার বুক টা কেমম করছে মনে হচ্ছে কিছু খারাপ হবে আজ।দিন টা ভালো ঠেকছে না।দিয়া ব্যাগ গুছিয়ে আবার শশুড় বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। কিন্তু বাড়িতে যেতেই কাজের মেয়েটা দরজা খুলে দেয়।
দিয়াঃবাড়িতে কেউ নেই?
কাজের মেয়ে—না ভাবি।আদ্র ভাইকে অজ্ঞান অবস্থায় জায়নামাজের উপর পড়ে থাকতে দেখে খালাম্মা।তারপর পানির ছিটা দিয়েও জ্ঞান ফিরানো না গেলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
দিয়াঃহাসপাতালে গিয়ে জানতে পারি,,,,আদ্রের হার্ট রক্ত পাম্প করার কার্যক্ষমতা হারিয়েছে।পেসমেকার বসাতে হবে। আমি শুধু আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা করছিলাম—একবার আমার স্বামী কে ফিরিয়ে দাও আমি সব ভুল সংশধন করবো। দীর্ঘ ৪৮ঘন্টা পড়ে উনি চোখ খুলেন।আমি উনার হাত ধরে বলি—এবারের মতন ক্ষমা করে দেন।আর আপনাকে কোন কষ্ট দিবো না। উনি বার বার মাথা নাড়াচ্ছেন।বুঝাতে চাইছেন যেন মাফ চাওয়া কথা না বলি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত