প্রাপ্তি

প্রাপ্তি
দশ লাখ টাকার বিনিময়ে একটা ধর্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে আসলাম। আমার বাবা-মা,আত্মীয় স্বজন সবাই বিয়েটা খুশি মনেই মেনে নিয়েছেন। আমিও মেনে নিয়েছি। যেখানে দশ লাখ টাকার মামলা সেখানে মেনে না নিয়ে উপায় আছে?
মেয়েটার পরিবারও অনেক বড় একটা আপদ বিদায় করতে পেরেছে। সেজন্য সবাই অত্যন্ত আনন্দিত। যখন মেয়েটাকে বিদায় দিলেন,তখন তাঁর বাবা মার চোখে জল দেখার বদলে তাদের চোখে খুশির বন্যা বয়ে যেতে দেখেছি। মনে হয়েছে মেয়েটাকে বাসা থেকে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। বাসর ঘরে ঢুকেই মেয়েকে সোজাসুজি বলে দেই। আমি কখনোই একজন ধর্ষিতাকে নিজের বউ হিসেবে মেনে নেবো না। আপনিও আমাকে কখনো স্বামী ভাববার বৃথা চেষ্টা করবেন না,কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করবেন না। আমি আপনাকে বিয়ে করেছি শুধু টাকার জন্য। আমার পরিবার দশ লাখ টাকার দেনা ছিল। সেজন্যই আপনাকে বিয়ে করতে হয়েছে। বউ হিসেবে অধিকার দিবো,ভালোবাসবো,আদর করবো এসবের জন্য আপনাকে বিয়ে করিনি। আমি জানি মেয়েটাকে হাজার কটু কথা বললেও সে কিছু বলবেনা। কারণ তাঁর আর যাওয়ার জায়গা নেই। তাঁর বাবা মা তাকে আর তাদের বাড়িতে আশা করেনা। সেটা তাদের আনন্দে ভরা মুখ দেখেই বুঝেছিলাম।
বাসর রাতে নিজের বউ এর চোখে জল দেখে হয়তো অনেকের খারাপ লাগতে পারে। তবে আমার লাগেনি। মেয়েটাকে যখন দেখলাম চোখে অনবরত বৃৃষ্টি ঝরছে। তখন তাঁর চোখের জল মুছে দিতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু আমি পারিনি। সে যেমন অনেক আশা নিয়ে,তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই রাতটির জন্য বহুকাল ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে। আমিও তেমনি দিনের পর দিন,মাসের পর মাস,বছরের পর বছর এই মধুমাখা রাতটির জন্য অপেক্ষা করেছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি একজন ধর্ষিতা আমার বউ হবে। মেয়েটা ওই রাতে ঘুমাতে পারেনি সেটা আমি জানি। সে আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন বুনেছিল নিজের হৃদয় মন্দিরে। ভেবেছিল স্বামীর ভালোবাসায় তাঁর অতীতের সমস্ত বেদনা,হতাশা সবকিছু ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করবে। কিন্তু আমিও তো আমার স্বপ্ন ভঙ্গের রাতটা তে ঘুমাতে পারিনি।
বিয়ের দুদিন যেতে না যেতেই মেয়েটার জীবন সংগ্রাম শুরু হয়। সাধারণ একটা মেয়েকেও প্রথম কিছুদিন শ্বশুর বাড়ি সংগ্রাম করতে হয়। সেখানে একটা দাগ লাগা মেয়েকে একটু বেশিই সংগ্রাম করতে হবে। পরিবারের সবাই টাকার জন্য তাকে বউ করে এনেছে। আমার না হয় তাকে ভালো লাগেনা,কারণ তাঁর সাথে আমার রাত থাকতে হয়। কোন মানুষই চাইবেনা একজন ধর্ষিতা মেয়ের সাথে এক বিছানায় থাকতে। কিন্তু আমার পরিবার কেনো তাকে দেখতে পারেনা,ভালোবাসেনা সেটা আমার জানা নাই। তাঁর টাকা ভালো লাগে কিন্ত তাকে ভালো লাগে না।
যে ছেলেটাকে নিয়মিত পতিতালয়ে যেতে দেখেছি। সেই ছেলেটাও আমাকে দেখে মুখ বাকা করে। বুঝাতে চায় টাকার বিনিময়ে আমি একজন ধর্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করেছি। অফিসে যেতে ভালো লাগেনা,খেতে ভালো লাগেনা। কোনো কিছুই ভালো লাগেনা। কোথাও ঘুরতেও যেতে পারিনা। পাছে কে জানি বলে ফেলে,ওই দেখ মেয়েটা ধর্ষণের স্বীকার হয়েছিল। পরে টাকার বিনিময়ে তাকে বিয়ে করেছে। কালদিন পর একটা পার্টি আছে,যেখানে আমার সব বন্ধু,বান্ধবীরা আসবে। সবাই সবার ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে আসবে। কিন্তু আমি কাকে নিয়ে যাবো? নিজের বউকে? যাকে আমি কখনো ভালোবাসিনি। তবুও আমি আমার বউকে নিয়েই পার্টিতে যোগ দিলাম। সে যেতে চেয়েছিল না। বিয়ের পর থেকে সে বাড়ির বাহিরে কখনো বের হয়নি। হয়তো বা ওই দিনের ভয়টা এখনো তাঁর মাঝে কাজ করে। আমিই তাকে জোর করে নিয়ে এসেছি।
এককোণে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। আমি আমার বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করছিলাম। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম মেয়েটা যেখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলাম সেখানে নেই। পাঁচ মিনিট খোঁজার পর দেখলাম সে আমার বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। ভালোই লাগছিল,ভাবলাম কারো সাথে কথা বলে মনটা হালকা হলে খারাপ কি? কিন্তু একটু এগিয়ে যখন তাঁর কাছে গেলাম তখন দেখলাম তার কালো চোখ দুটো জলে ভিজে গিয়েছে। আমি কাছে যেতেই আমার এক বান্ধবী বলল,তুমি শুধু টাকাটাই দেখলে? আর এজন্যই বুঝি জেনে শুনে একটা ধর্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করলে। একজন স্বামী হিসেবে সবাই চায় তাঁর বউ পবিত্র হোক। সে ব্যতীত আর কেউ যেনো তাকে স্পর্শ না করে। কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে তো পুরাই আলাদা। দেখে শুনেই অপবিত্র একটা মেয়েকে বিয়ে করলে।
আর এক বন্ধু তো বলেই ফেলল। মেয়ে যদি ভার্জিন না হয় তাহলে বাসর রাতে মজা পাওয়া যায়না। তুমি বন্ধু জীবনে অনেক বড় একটা ভুল করেছো। একবার সেখান থেকে চলে আসতে চাইলাম। আবার মনে হলো আমার জন্য সহজ সরল একটা মেয়েকে অপমানিত হতে হলো। সেতো আসতে চেয়েছিল না। আমিই জোর করে নিয়ে এসেছি। তাই কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল। বান্ধবী তুমি কি বললে? প্রতিটি স্বামীই চায় তাঁর বউ যেনো একবারে দুধে ধোয়া হয়। তোমার স্বামী কি সেরকম একটা মেয়েকে পেয়েছে? যেমনটা তুমি বললে। তুমি কতোগুলো ছেলের সাথে রুমডেট করেছো সেটা আমি ভালোই করেই জানি। একবার নাকি প্রেগন্যান্টও হয়েছিল? এটা সত্য নাকি? আমার বান্ধবী একটা কথাও বলেনি। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর বন্ধু তুমি কি বললে?
ভার্জিন না হলে মজা পাওয়া যায়না। সত্যি করে বলো তো, তুমি কি সেই মজাটা পেয়েছো? যেটার কথা আমাকে বললে। সে চুপ। কোনো কথা বলেনি আর। তুমি তোমার বউ এর ডিএনএ টেস্ট করিয়ে দেখো। তারপর আমাকে বইলো,তোমার বউ আমার বউ থেকে ভালো নাকি খারাপ। এসব বলেই আমি আমার বউকে নিয়ে চলে আসি। চলে আসার সময়ও আমার বন্ধু আর বান্ধবীর মুখ থেকে কোনো কথা বের হয়নি। আমার জন্যই আপনাকে সবার সামনে ছোট হতে হলো। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি কোনো কথা না বলে তাঁর হাত ধরে ফেলি। আমি এতোদিন বুঝতে পারিনি। না বুঝে তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি,খারাপ ব্যবহার করেছি। সেজন্য আমি তোমার কাছে লজ্জিত।
কথা দিচ্ছি আজ থেকে তুমিই আমার সব। তোমাকে নিয়েই আমি আমার বাকিটা জীবন পাড়ি দিতে চাই।
মেয়েটা ভয়কে জয় করে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমিও তাকে জড়িয়ে না ধরে থাকতে পারিনি। আমি মেয়েটার চোখে পৃথিবীর সমস্ত সুখ দেখতে পাচ্ছি। আমার মনে হলো মেয়েটা আমার কাছে বেশি কিছু চায়না। শুধু একটু ভালোবাসা চায়। আর আমি কিনা এতোদিন সেই ভালোবাসাটাই দিতে পারিনি। যেটা পাওয়ার অধিকার শুধু তাঁরই ছিল।
নোটঃ ধর্ষিতাকে নয় ধর্ষককে ঘৃণা করা উচিত

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত