ক্রস কানেকশন

ক্রস কানেকশন
নিদান স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয়বারের মতো প্রেমে পড়ে গেছে সে! ব্যাপারটা সে নিজেই মানতে পারছে না। এমনতো নয় যে, স্ত্রী রাখিকে সে ভালোবাসে না। রাখি যথেষ্ট ভালো মেয়ে এবং তাদের দাম্পত্যজীবন ও অনেক সুখের। তবে এই দ্বিতীয় প্রেমের মানে টা কি?? রাখির সাথেও নিদানের প্রেমের বিয়ে। দূর্লভ মূর্তির ব্যাবসা নিদানের। বাড়ির পাশে বড় একটা মূর্তির দোকানও আছে তার। আর রাখি শুরু থেকেই মূর্তিপ্রেমী। নিদানের দোকানে লেনিন এর মূর্তি কিনতে এসেই তার সাথে পরিচয়। সময়ের ব্যবধানে সেটা পরিনয়ে গড়ায়। গতমাসেই ধুমধাম করে তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকী পালন করেছে তারা। শেষ নিঃশ্বাস পযন্ত একসাথে থাকার দোয়া চেয়েছে সবার কাছে। তখন পর্যন্ত সব ঠিকই ছিলো। লাস্ট ট্রিপে গিয়েই গন্ডগোলটা হলো। মূর্তি সংগ্রহের কাজে নিদানকে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জেলায় যেতে হয়। গতবার কক্সবাজার গিয়েই দেখা হলো মিরার সাথে।
মেয়েটা ঢাবির ছাত্রী। কক্সবাজার বান্ধবীর বাসায় এসেছিলো বেড়াতে। সে রাখির মতো অতটা সুন্দরী না হলেও চলাফেরায় অনেক স্মার্ট। প্রথম দিকে নিদানের ওকে দেখতে ভালো লাগতো। একবার দেখলে বারবার দেখতে মন চাইতো। ধীরে ধীরে এ ভালোলাগা অস্থিরতায় পরিনত হলো। মিরাকে না দেখে একটা দিন কাটানোও মুশকিল হলো তার। আগেও একবার প্রেম হবার কারনে এ অস্থিরতার কারন সহজেই বুঝতে পারলো নিদান। বুঝতে পারলো সে আবারও প্রেমে পড়ে গেছে! তাই বিবাহিত জানার পরও আগ বাড়িয়ে যখন মিরা তাকে ভালোবাসার কথা বললো, ফিরিয়ে দিতে পারেনি সে। তারপরের যে কয়েকটা দিন ট্রিপে ছিলো সেদিনগুলো নিদানের জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন ছিলো। পুরোটা সময় একত্রে ছিলো তারা। হোটেলের শান্ত রুমে একান্তে সময় কাটিয়েছে দুজন। প্রকৃতির আদিম খেলায় মেতে শান্ত পরিবেশ অশান্ত করে তুলেছে। রাখি শান্ত, বুদ্ধিমতি, বাধ্য স্ত্রী। মিলনের নতুন নতুন কলাকৌশল তার অজানা। কিন্তু এক্ষেত্রে বিছানায় মিরার জুড়ি মেলা ভার।তার সাথে কাটানো প্রত্যেকটা মুহূর্ত নিদানের সার্থক মনে হয়।
কিন্তু মিরাকে একেবারের জন্য পেতে হলে রাখিকে হারাতে হবে তার। সেটা সে কি করে করবে? এতো কষ্ট কিকরে দেবে রাখিকে? মেয়েটা তাকে ছাড়া জীবন কাটানোর কথা ভাবতেও পারবে না। গত কয়েকদিন ধরে একটানা ফোন করেও মিরার সাথে কথা বলতে পারছে না নিদান। তার এক কথা, কারো দ্বিতীয় স্ত্রী সে হতে পারবে না। রাখিকে ডিভোর্স দিতেই হবে। নয়তো সে আর যোগাযোগ রাখবে না নিদানের সাথে। কথাগুলো বলার সময় মেয়েটার কান্নায় নিদান ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলো সে কতটা ভালোবাসে তাকে। কিন্তু রাখিও তো ভালোবাসে তাকে। নিদান জানে, ডিভোর্সের কথা শুনে বিন্দুমাত্র আপত্তি করবেনা রাখি। যত কষ্টই হোক,নিদানের খুশিতেই তার খুশি।কিন্তু মেয়েটা জাস্ট মরে যাবে। স্বামীকে অন্যকারো সাথে দেখার মতো সাহস কোমলমতি রাখির নেই। নিদান বুঝতে পারছে না, কি করা উচিত তার? এ কোন উভয় সংকটে পড়লো সে?
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি প্রেমে পড়েছে রাখিও!! গতবার নিদান ট্রিপে যাওয়ার পরদিন সোহান নামে একটা ছেলে আসে রাখির কাছে। সে নাকি নিদানকে একটা “গ্যালিলিও” এর মূর্তির অর্ডার করেছিলো। দোকান বন্ধ দেখে পাশে লাগোয়া নিদানের বাড়িতে চলে এসেছে। প্রথম দেখাতেই সোহানকে অন্যরকম ভালো লেগেছিলো রাখির। সে বিবাহিত পতিব্রতা নারী। তাই তখনই লাগাম টেনেছিলো নিজের ভাবনায়। কিন্তু বেপরোয়া সোহানের সে বালাই নেই। সে এক নজরে তাকিয়ে ছিলো রাখির দিকে। সেদিন বাড়ির পেছন দিক হয়ে দোকানের পেছনের দরজা খুলে গ্যালিলিওর মূর্তি খুজতে গিয়েছিলো দুজন। মূর্তিটা একেবারে উপরের তাকে হওয়ায় নিতে পারছিলোনা রাখি। ঝাপ ফেলা আধো অন্ধকার দোকানে তখন বিনা সংকোচে রাখির কোমড় জড়িয়ে ধরে ওকে উপরে তুলে ধরেছিলো সোহান। পেটের উপর পড়া সোহানের উষ্ণ নিঃশ্বাসে অস্থির হয়ে উঠেছিলো রাখি, যেমনটা হয়েছিলো নিদানের প্রথম স্পর্শে। এরপর নিদান কক্সবাজার থাকাকালীন প্রতিদিন এসেছিলো সোহান। প্রথম দিকে বিরক্ত হলেও তার বেপরোয়া ভাব খুব তাড়াতাড়িই দুর্বল করে দেয় রাখিকে। বেশ কয়েকবার তার বাইকে চড়ে ঘুরতেও গেছে দুজন। নিজেদের বেডরুমে সোহানের সাথে স্বেচ্ছায় মিলিত হয়েছে রাখি! তার বেপরোয়া স্পর্শে শান্ত-শিষ্ট রাখি যেন এক উচ্ছল তরুণীতে পরিনত হয়েছিলো।
ভালোবাসার এক নতুন দুয়ার তার সামনে খুলেছিল সোহান। মিলনের চরম সুখের মুহুর্তে সে রাখিকে অনুরোধ করে নিদানকে ডিভোর্স দিয়ে তাকে বিয়ে করতে।তখন হ্যাঁ বলে দিলেও তারপর থেকে চিন্তায় অস্থির হয়ে আছে রাখি। সোহানকে ছেড়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়।কিন্তু কিকরে সে ডিভোর্স দিবে নিদানকে? সেটাও তো সম্ভব নয়।
নিদান ইন্ট্রোভার্ট চরিত্রের মানুষ। ব্যবসায়িক কাজে পরিচিত মানুষ ছাড়া তার ঘনিষ্ঠ কোন বন্ধু নেই। মা-বাবার সাথেও তার সম্পর্ক খুবই খারাপ। মামা-মামির কাছে বড় হওয়া এতিম রাখিকে বিয়ে করার ব্যাপারে কিছুতেই রাজি হননি নিদানের প্রভাবশালী বাবা। তাই মা-বাবাকে ছেড়ে রাখিকে বিয়ে করে এখানে চলে এসেছে নিদান। সেই নিদানকে কি করে ছেড়ে যাবে রাখি? সে ছাড়া যে নিদানের আপন বলতে কেউ নেই। রাখি সোহানকে ভালোবাসে জানলে হয়তো বাধা দেবেনা নিদান। কিন্তু সে থাকবে কিকরে একা একা? আত্নীয়-স্বজন,বন্ধুহী­­ন নিদান ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে। অহ্! আর ভাবতে পারছে না রাখি। এভাবে তীলে তীলে মারা যাওয়ার চেয়ে তো একেবারে মারা যাওয়াই ভালো!
রাখিকে ট্রিপে যাচ্ছে বলে মিরাকে নিয়ে সিলেট যাচ্ছে নিদান। মেয়েটার রাগ ভাঙাতে হবে। ভালোবাসার মানুষের রাগ বেশীক্ষন সহ্য করা যায়না! যত্ন করে নিদানের ব্যাগ ঘুছিয়ে দিচ্ছে রাখি। সেদিকে একনজরে তাকিয়ে আছে নিদান। আজকাল রাখিকে অনেক চিন্তিত দেখায়। সে কোনকিছু আঁচ করতে পারেনি তো? ভয়ে ভয়ে রাখির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সিলেট যায় নিদান। প্রেয়সীর কাছে ওয়াদা করে এবার ট্রিপ থেকে গিয়েই রাখিকে সংসার থেকে সরাবে সে। চোখের সামনে বারবার রাখির কোমল আদুরে মুখটা ভেসে উঠে। রাখিকে ডিভোর্স দিলে সেই অত্যাচারী মামা-মামীর কাছে আবার ফেরত যেতে হবে তাকে। তারা আবার রাখিকে উফ! থেমে যায় নিদান। সে কিছুতেই পারবে না রাখিকে সেই কষ্টে আবার ফেরত পাঠাতে।কিছুতেই না। প্রয়োজনে সে খুন করবে রাখিকে। হ্যাঁ,তাই করবে। নিজের সিদ্ধান্তে খুশি হয় সে।
নিদান সিলেট যাওয়ার পর সোহানকে ফোনে আসতে বলে রাখি। খেকিঁয়ে উঠে আসতে পারবে না বলে জানায় সোহান। রাখি আর নিদানের নোংরা বিছানায় রাত কাটাতে তার নাকি রুচিতে বাধেঁ। সে সাফ জানিয়ে দেয় আর লুকিয়ে প্রেম করবে না সে। যেভাবেই হোক, নিদানকে ডিভোর্স দিতেই হবে রাখির। ফোন রেখে খানিকক্ষন কান্না করে রাখি। সোহানের অবহেলা তার সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু নিদানকে একা একা মরার জন্য কি করে ছেড়ে দেবে সে? আচ্ছা, নিদান প্রতিরাতে দুধ খায় এক গ্লাস,দুধের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাইয়ে দিলে কেমন হয়? হ্যাঁ,এটাই করবে রাখি। অন্তত কঠিন দিনগুলো তো আর সামনা করতে হবে না তার প্রিয় স্বামীর! স্থিরমনে নিদানের আসার অপেক্ষা করতে থাকে সে।
সিলেট থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে রাখিকে এক কাপ কফি দিতে বললো নিদান। সোফায় বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে রাখির দিকে গভীরভাবে তাকালো সে। হালকা সেজেগুজে আছে রাখি। প্রতিবারই নিদান আসার দিন হালকা সাজে রাখি। আর এমন মেয়ের সাথে সে কি করতে যাচ্ছে? নিজেকে খুবই নোংরা মনে হয় নিদানের। সে আসলেই যোগ্য না রাখির স্বামী হওয়ার। ব্যাগ খুলে ৩০”লম্বা মার্বেল পাথরের একটা ভারী শেক্সপিয়রের মূর্তি বের করে রাখিকে দিলো সে। জানালো এটা বিক্রির জন্য না,রাখির জন্য এনেছে সে।
দেখা শেষ করে মূ্র্তিটা আলমারির উপর রেখে দিতে বললো নিদান। সেটা রাখতে গিয়ে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেলো রাখি। কত শখ করে বউয়ের জন্য উপহার আনলো নিদান। আর বউ হয়ে সে কি করছে? নিচু হয়ে চোখের একফোঁটা পানি মুছলো রাখি। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগালো নিদান। নিঃশব্দে গিয়ে রাখির হাত থেকে মূর্তিটা নিয়ে ওপর থেকে ওর মাথায় ছেড়ে দিলো সে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো রাখি!! যে কেউ দেখলে ভাববে উপর থেকে মুর্তি নামাতে গিয়ে মাথায় পড়ে মারা গেছে। পরিতৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে আবার সোফায় গিয়ে বসলো নিদান। প্রচন্ড ঘুম আসছে তার। কিন্তু এখন ঘুমালে তো হবে না। কফিটা শেষ করে মিরাকে ফোন করে সুখবরটা জানাতে হবে তো!!
পরিশিষ্টঃ ঘন্টা তিনেক পর নিদানের এক প্রতিবেশী এসে মৃত আবিস্কার করে দুজনকে। সবাই ধারণা করে স্ত্রীর হঠাৎ মৃত্যু সইতে না পেরে কফিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খেয়ে আত্বহত্যা করেছে নিদান। সকলে আরো বলে,তাদের চাওয়া পুরণ হয়েছে, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত একসাথে ছিলো দুজন!!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত