আজ আমার খুশির দিন

আজ আমার খুশির দিন
-কথাটা তুমি আমাকে আরো আগেই বলতে পারতে৷ বলো পারতে না? অরু মাথা নিচু করে রাখলো৷ কিছু বলল না৷
-এই কয়টা দিন আমাকে এভাবে কষ্ট না দিলেও তো হতো। তুমি জানো? প্রতিটা মুহূর্ত কতো কষ্টে কেটেছে আমার? কষ্ট বুঝো তুমি?
অরু এবারেও নিশ্চুপ৷ মেয়েটা শেষ বিদায় কি কথা না বলেই দিবে? আমি কিছু সময় মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম৷ সত্যি বলতে আমার বুকের ভেতর কাঁপছিল৷ হঠাৎই কেমন চাপা একটা যন্ত্রণা আমার ভেতরটা তোলপাড় করে দিচ্ছিলো৷ ভেতরে ভেতরে আমি খুন হয়ে যাচ্ছি৷ আমি স্পষ্টই টের পাচ্ছি আমার পাঁ কাঁপছে৷ অবশ লাগছে। কেমন অস্থির লাগছে আমার৷ অথচ উপরে নিজের স্বরটা শুনেই নিজেই অবাক হচ্ছি৷ কেমন স্বাভাবিক স্বর৷ একটা মানুষের ব্রেকাপের সময়টায় তার স্বর এতোটা স্বাভাবিক থাকে না৷ সে উন্মাদের মতো আচরণ করে৷ গালাগালি-চিল্লাচিল্লি করে৷ অথচ আমি তেমন কিছুই করতে পারছি না৷ কেমন স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছি। এমন ভাবে বলছি যেন এই দেড় বছরের সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাওয়াতে আমার তেমন কোনো দুঃখবোধ হচ্ছে না। অরু আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমি ভালোই থাকবো। অনেকটা সময় পর অরু বেশ কোমল স্বরে বলল,
-তোমাকে বলবো বলবো করেই বলা হচ্ছিল না আসলে। ভয়ে ছিলাম তোমার রিয়েকশন নিয়ে। কেমন বিহ্যাভ করবে তা নিয়ে।
-তুমি কি ভেবেছিলে আমি পাগলামি করবো? উদ্ভ্রান্তের মতো আচরণ করবো?
-হু।
-এমনটা ভেবেছিলে কেন?
-জানি না। আমার মন বলছিল তুমি এমন করবে। তুমি ভেঙ্গে পড়বে।
-তুমি কি চাও আমি ভেঙ্গে পড়ি? অরু দ্রুত মাথা নাড়ালো।
-না, চাই না।
-তাহলে ছেড়ে যাচ্ছো কেন? তুমি তো জানোই তোমাকে ছাড়া আমি ভালো থাকবো না। ভেঙ্গে পড়বো।
-আমি আসলে আর এডজাস্ট করতে পারছি না।
-এডজাস্ট করতে পারছো না? তাহলে এই দেড় বছর কীভাবে ছিলে? অরু মাথা নিচু করে রাখলো। বললাম,
-বলো? এতোদিন কীভাবে ছিলে?
-আমি জানি না। আমি খানিকটা সময় চুপ থেকে স্বরটা একটু গাঢ় করে বললাম,
-অরু, তোমার উচিৎ ছিল একটা স্ট্রং রিজন বের করা। খুবই স্ট্রং রিজন। যেটা শুনে আমার কাছে সত্য মনে হবে।
-এটা কি তোমার কাছে স্ট্রং মনে হচ্ছে না?
-অবশ্যই না।
-কেন?
-কারণ, তুমি যদি আসলেই এডজাস্ট করতে না পারতে তাহলে এতোটা দিন আমার সাথে থাকতে পারতে না। বলো এটা কি সত্য নয়? অরু জবাব দিলো না। চুপ করে তাকিয়ে থাকলো। আমি বললাম,
-মানুষের অপশান প্রয়োজন। এমন একটা অপশান যেটা অত্যন্ত সুখের এবং আনন্দের হবে। আগের গুলো থেকে অনেক বেটার। আমার মনে হয় তুমি সেটা পেয়ে গিয়েছো। অরু আমার দিকে তাকিয়েই থাকলো। তার দৃষ্টি এবার কিছুটা উৎসুক হয়েছে। একটু আগ্রহ জমেছে যেন। বললাম,
-অনিক অবশ্যই একটা ভালো অপশান। বাট সেও তো তোমার মতোই। তাকে বুঝে উঠতে পারবে?
অরুর ভ্রু’টা এবার কুচকে এলো। কিঞ্চিৎ রাগ যেন তাকে আবেশ করতে শুরু করেছে। স্বরটা খানিক কঠিন করে বলল,
-কী বলতে চাইছো তুমি?
-যা সত্যি আমি তাই বলতে চাইছি।
-সত্যিটা কী?
-সেটা তুমিই ভালো জানো।
-বুঝতে পারছি না। কি সব বলছো তুমি। মাথা ঠিক আছে তোমার? আবোলতাবোল বলছ কেন? আমি মৃদু হাসলাম। বললাম,
-তুমি রেগে যাচ্ছো অরু? তোমার তো রাগার কথা না। রাগার কথা আমার। তুমিও তো তাই ভেবেছিলে। বলো ভাবোনি? অরু কেমন অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো। আমি হাসি স্থির রেখে বললাম,
-আমাকে কেন ছেড়ে যাচ্ছো সেটা তুমি স্পষ্ট জানো না; এটা আসলে মিথ্যা কথা। তুমি সবই জানো। আর তাছাড়া যে আমার কোনো দিন ছিলই না সে আবার আমাকে ছেড়ে যাবে কীভাবে? সে তো ছিল টাকার। বিলাশিতার।
-স্টপ! প্লীজ স্টপ! আর একটা বাজে কথাও বলবে না সাদিক। একটাও না৷ অরু এবার সত্যি সত্যিই রেগে গেল। রাগে তার মুখটা লাল হয়ে আছে। সে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলো। তাকে হঠাৎ কেমন জানি লাগলো আমার। কেমন অচেনা। একটা মানুষ কতো দ্রুত অচেনা হয়ে যেতে পারে সেটা অরুকে না দেখলে বোঝাই যেতো না। অরু বলল,
-তুমি কষ্ট পাবে বলে নিজে ব্যাপারটা তোমাকে বুঝিয়ে বলতে এসেছি। ভেবেছিলাম এতে তোমার কষ্ট একটু কম হবে। এখন দেখছি আমার এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে। মহা অন্যায় হয়েছে। অরুর সাথে আর কথা বাড়ানো যাবে না। বাড়ালেই সে রেগে যাবে। রেগে গিয়ে ঝামেলার সৃষ্টি করবে। সিনক্রিয়েট করবে৷ আমি এই মুহূর্তে এসব চাচ্ছি না। কষ্টের ঝড়ো আঘাতে এমনিতেই ভেতরটা অনেক ক্লান্ত হয়ে আছে। আমি চাইনা সেটাকে আরো ক্লান্ত করতে। আর সুপুরুষরা অবশ্যই ঝগড়া করে না। সব কিছুর একটা নির্দিষ্ট সমাধান বের করে এবং তা মেনে নেয়। ছাই সেটা তার জন্যে দুঃখের হোক কিংবা সুখের। সত্যকে সহজ ভাবেই মেনে নেয়া উচিৎ। আমি স্বাভাবিক স্বরে বললাম,
-তুমি এখন ব্রেকাপ চাচ্ছো। তাই তো? অরু জবাব দিলো না। আমি বললাম,
-বেশ। তাই হবে। আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের ব্রেকাপ হয়ে গেলো। আমার জন্যে চিন্তা করো না। আমি ভালোই থাকবো।
কথাটা বলে আমি চুপ থাকলাম। অরু আমার দিকে তাকালো। এবং তাকিয়েই থাকলো কিছু সময়। তার দৃষ্টিটা কেমন জানি ছিল। বুঝতে পারছিলাম না। আমি দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে অন্য দিকে ফেরালাম। অরু কিছু বলল না আর। নিশ্চুপ হয়ে উঠে চলে গেল। চলে গেল? সত্যিই চলে গেল? যেই মেয়েটা একটা সময় আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না সে আজ এভাবে মায়াহীন ভাবে আমাদের দীর্ঘ সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে, আমার পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে চলে গেল? কীভাবে পারলো মেয়েটা? কীভাবে? অরু চলে গিয়েছে এই ব্যাপারটা যেন আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। কেমন অবিশ্বাস্য লাগছে। আমি স্থির হয়ে বসে থাকলাম। কেমন জানি লাগছিল আমার। হাসফাস লাগছিল। দম বন্ধ বন্ধ লাগছিল। আমি উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। পাঁয়ের সমস্ত বল যেন হারিয়ে ফেলেছি। অদ্ভুত এক যন্ত্রণা আমার হৃদয়ের মধ্যখান হতে সমস্ত দেহে ছড়িয়ে পড়তে থাকলো। আমার সমস্ত দেহকে কেমন শীতল করে তুলল। অবশ করে তুলল। আমি হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডাকলাম। বললাম,
-এক কাপ কফি দিন। ওয়েটার কফি নিয়ে এলো। কফিতে চুমুক দিতেই মনে হলো আমার এই মুহূর্তে কফি খেতে ইচ্ছে করছে না। আমার বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে। রুম অন্ধকার করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। আমি শাহেদকে ফোন দিলাম। কল রিসিভ হতেই বললাম,
-কোথায় তুই?
-আমি বাইরে। হাঁটছি। কেন? কী হয়েছে?
-কিছু না। তুই কি একটু স্কাইভিউ ক্যাফেতে আসতে পারবি?
-পারবো না। আমি এখন ব্যস্ত আছি। কী হয়েছে বলতো?
-কই কী হবে? কিছুই হয়নি।
-আসলেই তাই? অরুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলি না?
-হ্যাঁ।
-দেখা হয়েছে?
-হয়েছে।
-সব মিটমাট?
-তুই কি আসবি?
-আগেই তো বলেছি ‘না।’ ব্যস্ত আছি।
-আচ্ছা। ফোন রাখ তাহলে।
আমি কল কেটে দিলাম। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরতেই দেখলাম শাহেদ দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছুটা অবাক হলাম বললাম,
-তুই এখানে?
-হ্যাঁ। আমিই এখানে।
-এখানে কী করছিস?
-হাঁটতে আসলাম। ক্যাফেতে অনেকেই অনেক উদ্দ্যেশ্য নিয়ে আসে। আমার উদ্দেশ্য হলো হেঁটে হেঁটে দেখা।
আমি কিছু বললাম না। ওর পাশ কাটিয়ে চলে এলাম। পেছন থেকে কে জানি ডেকে বললো,
-স্যার, বিলটা?
আমি পেছন ফিরে দেখলাম ওয়েটার দাঁড়িয়ে আছে। তখনই মনে হলো কফির বিলটা দেওয়া হয়নি। লজ্জায় পড়ে গেলাম। আমার দ্বারা সাধারণত এমন ভুল হয় না। আজ কেন জানি হয়ে গেল। বিলটা মিটিয়ে বেরিয়ে আসতেই শাহেদ বলল,
-একটা ধাঁধার উত্তর দিতে পারবি?
-পারবো না।
-কেন?
-এসব ধাঁধা টাঁধা আমার ভালো লাগে না।
-আরে ভালো লাগবে। সমস্যা নেই। শোন, একটা ছেলে তার প্রেমিকার সাথে দেখা করতে গেল।…
-শাহেদ প্লীজ, আর একটা কথাও বলবি না। আমার ভালো লাগছে না।
-আরে শোন ব্যাটা। ভালো অবশ্যই লাগবে। আমার মনে হয়ে এই ধাঁধাটা কেবল তুইই সলভ করতে পারবি। তুই ছাড়া এই পৃথিবীর আর কেউই পারবে না। আমি কিছু বললাম না। চুপচাপ হাঁটতে থাকলাম। শাহেদ বলল,
-তো ছেলেটার সাথে তার প্রেমিকার দেখা হয়। তাদের মধ্যে বেশ কিছু সময় কথা হয় এবং একটা সময় দেখা যায় ছেলেটার প্রেমিকা চলে যায়। সে একা হয়ে যায় এবং কফির অর্ডার করে। তারপরই তার এক বন্ধুকে ফোন করে আসতে বলে। বলতো সে কেন তার বন্ধুকে ফোন করে আসতে বলে? আমি অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে শাহেদের দিকে তাকালাম। বললাম,
-এটা আবার কেমন ধাঁধা?
-যেমনই হোক বল উত্তরটা কী?
-আমি জানি না।
-জানিস না মানে? অবশ্যই জানিস৷ এই উত্তরটা কেবল তোরই জানা থাকার কথা। আমাকে বল উত্তরটা কী?
-বলেছি না বলতে পারবো না। ফোর্স করছিস কেন?
শাহেদ থতমত খেয়ে গেলো। আমি যে এভাবে থমক দিবো সেটা হয়তো বেচারা ভাবেনি। আমি খানিকটা সময় চুপ থেকে বললাম,
-সরি। সরি দোস্ত। শাহেদ কিছু বলল না। রিক্সা ডাকলো। আমাকে ধরে রিক্সায় উঠালো। বলল,
-তোকে বেশ দূর্বল লাগছে।
আমি কিছু বললাম না। চুপ করে থাকলাম। বাসাতে এসেই আমি বিছানার উপর উপড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। আমি কিছুই ভালো লাগছিল না। কেমন জানি লাগছিল। অদ্ভুত এক শূণ্যতা আমাকে গিলে খেতে শুরু করেছিল। বুকের বাঁ পাশটা কেমন খালি খালি লাগছিল। আমি ভাবলাম শুয়ে থেকে আমার ভালো লাগবে। ঘুম চলে আসবে। অথচ আমার ঘুম এলো না। চোখে ঘুম নেই। চোখের মধ্যে কেবল স্মৃতি ভাসে। অরুর স্মৃতি। মেয়েটাকে কতোটা পাগলের মতো ভালোবেসেছি। অথচ তার প্রতিদানে আমাকে এমন ভাবে আঘাত দিলো?
আজ থেকে বিশ্বাস করতে হবে অরু নেই। সে আমার কেউ না। আমি তাকে জানি না। যা ছিল সব অতীত। ভুল। এসব ভুলে যাওয়াই শ্রেয়। এসব মুখে বলাই সহজ। বাস্তবটা অনেক কঠিন। স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেয়াই যায় এবং আমি তাইই করেছি। তবে তার শূণ্যতা যে দলা পাকিয়ে বুকের ভেতর বসে আছে সেটা কীভাবে দূর করবো? সেটা কি দূর করা যায়? যায় না৷ যখন তার কথা মনে পড়ে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক যন্ত্রণা হয়। যন্ত্রণা সহ্য করার ব্যাপার। তবে আমি কি তা সহ্য করতে পারবো? আমি জানি না, আমার অতোটা সহনীয় ক্ষমতা আছে কি না। যা আছে, তা যদি একদিন ফুরিয়ে যায় তবে আমার পক্ষে এই ব্যাথাটা সয়ে নেয়া মুশকিল হবে। আমার বেঁচে থাকাটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। আমি কি বাঁচবো? বেঁচে থাকতে পারবো? আমি জানি না। কিছুই জানি না। আমার বুদ্ধিশক্তি লোপ পেয়েছে। আমি কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি যেন৷ সব যেন ফিকে লাগে। নির্মম লাগে।
দু’দিন বেশ অশান্তিতে পেরিয়ে গেল। পাগলের মতো লাগছিল নিজেকে। নিজের রুম, রুমের বারান্দা এবং বাসার ছাদটাকেই আপন করে নিয়েছি। এসবেই সময় কাটে। কারণ এই জায়গা গুলোতেই মিশে আছে অরু৷ তার সাথে ফোনে কথা বলার মুহূর্ত। মুহূর্ত কখনই বন্দী করা যায় না৷ তবে সেই মুহূর্তের স্মৃতি গুলো আজীবন বন্দী হয়ে থাকে মস্তিষ্কে, মনে। যেগুলো পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া কষ্টকর। যে এই কষ্টকর কাজটি করতে পেরেছে সেই জীবনে সফল হয়েছে। এটা আমার কথা না৷ আকাশ ভাইয়ের কথা।
আকাশ ভাই আমাদের রুম মেট। উনিই আগে এই বাসাতে ছিলেন। আকাশ ভাইয়ের নিজস্ব একটা রুম আছে। তিনি সেখানে থাকেন। অন্য রুমটায় আমি আর শাহেদ। আমার দেখা অদ্ভুত এক মানুষ হচ্ছেন আকাশ ভাই। তার অপর নাম মেঘ। কেউ ডাকে আকাশ বলে, আবার কেউ ডাকে মেঘ। তিনি এই বাসায় ভাড়া থাকেন বললে কিছুটা ভুল হবে। কারণ মাসের প্রায় চব্বিশ পঁচিশ দিন এই লোকের চেহারা দেখা যায় না। মাসের শেষ দিকে আসবে। কয়েকদিন থেকে বাসা ভাড়া দিয়ে চলে যাবে। আবার নিরুদ্দেশ। কেউ জানে না এই লোক কী করে, কোথায় যায়। তবে অনেক লোকই তাকে চিনে। কেউ আকাশ নামে তো কেউ মেঘ নামে। বড় অদ্ভুত এক প্রাণি। তবে মানুষটা বেশ ভালো। খুবই মিশুক ও বুদ্ধিমান একজন মানুষ। তবে তাকে বোঝা মুশকিল। এই যা সমস্যা।
ছাদের একদম উত্তর দিকটায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। আকাশে স্নিগ্ধ মায়া নিয়ে চাঁদটি বসে আছে। গোল চাঁদ। মিষ্টি আলোর কোমল আবরণ আমাকে ঘিরে রেখেছে৷ আমি চাঁদের আলোয় আবৃত হয়ে আছি। অন্য দিন হলে এই সময়টা আমার জন্যে খুবই আনন্দের হতো। কানের পাশে ফোন গুঁজে অরুর সাথে কথা বলা যেত। কতো মধূর আলাপ হতো! হঠাৎ মৃদু শীতল বাসাসে শিহরিত হতাম। তার আহ্লাদী রাগে আমার অনিন্দ্য কিছু অনুভূতি হতো৷ তার সাথে আমি অনুভূতির রাজ্যে হারিয়ে যেতাম৷ অথচ আজ সে নেই। নেই বলেই এই শূণ্যতা। একাকিত্ব। চাঁদের আলোও আজ ফিকে লাগে। বিশেষ মনে হয় না। অনুভূতিটাও কী অদ্ভুত। যখন সে জেগে থাকবে তখন সব কিছু অপরূপ করে মনের মাঝে ফুটিয়ে তুলবে। তা দেখে নিজের ভেতরে খুশির জোয়ার উঠবে৷ অথচ সে যখন ঘুমিয়ে পড়বে তখন সব কিছুই ফিকে লাগবে। মৃত লাগবে৷
-আপনার কী হয়েছে? আমি খানিকটা চমকে উঠলাম। হঠাৎ এমন একটা মেয়েলি স্বর ভেসে আসবে ভাবিনি। কে এই অসময়ে ডাকলো? মেয়েটি আবারও বলল,
-আপনার কী হয়েছে বলুন প্লীজ। আমি মুখ বাড়িয়ে দেখতে চাইলাম। তবে চিনতে পারলাম না। মেয়েটির কণ্ঠ অবশ্য পরিচিত লাগলো। বললাম,
-কে?
-আমি।
-আমি কে?
-বাহ! এখন চিনতেও পারছেন না?
-পরিচয় না দিলে চিনবো কী করে? মেয়েটা খানিকটা চুপ থেকে বলল,
-আমি অতোশি। আমি ভ্রু কুচকে বললাম,
-তুমি? তুমি এখানে কী করছো? মেয়েটা যেন রেগে গেল। কঠিন স্বরে বলল,
-আপনার মাথা করছি। দেখা হলেও খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন। বেশি কথা বলবেন না। যা জিজ্ঞেস করেছি তার জবাব দিন।
-তোমার সাহস কতো বড়! তুমি আমাকে থ্রেট দিয়ে কথা বলছো?
-অবশ্যই বলছি। আপনি এমন কেউ না যে আপনাকে থ্রেট দেওয়া যাবে না।
-অতোশি, তোমার বাবার কাছে বিচার দিবো আমি।
-দিন দিন৷ আপনি তো কেবল এটাই পারেন।
-ভার্সিটি গিয়ে দেখছি তুমি খুব বেয়াদপ হয়ে গিয়েছো। টিচারকে কীভাবে রেস্পেক্ট করতে হয় সেটা পর্যন্ত ভুলে গিয়েছো। এই শিক্ষা দিয়েছি তোমাকে আমি? অতোশি বেশ দ্রুত আমার দিকে এগিয়ে এলো। একদম আমার মুখের কাছে চলে এলো তার মুখ। তার আর আমার মাঝে এক আঙ্গুলের পার্থক্যও নেই। সে বেশ কঠিন স্বরে বলল,
-আপনি আমার টিচার ছিলেন এক সময়। এখন আর নেই। আর কথায় কথায় এই প্রসঙ্গ টেনে আনবেন না। সারাক্ষণ কেবল টিচার টিচার করেন। এটা কেমন বাজে অভ্যাস? আপনাকে না আমি বলেছি, আমি আর আপনাকে শিক্ষক মানতে পারবো না। বলুন বলেছি কি না?
-তবুও, একটা রেস…
-জি না। তবুও কোনো রেস্পেক্ট দিতে পারবো না আপনাকে। কোনো মতেই না৷
আমি কিছু বললাম না আর। তর্ক করার ইচ্ছে নেই। আমি রেলিংয়ের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অতোশির চেহারা দেখা যাচ্ছে না। তার মুখভঙ্গিমা কেমন তাও বলা যাচ্ছে না। কিছু সময় বেশ নীরবতায় কাটলো। অতোশি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমি একটু সরে দাঁড়ালাম। অতোশি আরেকটু চেপে এলো আমার দিকে। আমি এবার আর সরে দাঁড়ালাম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। অতোশি আরেকটু সরে এলো। আমার গায়ের সাথে তার গা লাগলো। আমি এবার সরে যেতে চাইলাম। মেয়েটা আমার জামা টেনে ধরলো। আমি খানিকটা বিরক্ত হলাম। তবে জামা ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম না। জানি করেও লাভ হবে না। এই মেয়ে যেমন আছে তেমনই থাকবে। কোনো কথাই তাকে ধরবে না। অতোশি আমার বাম বাজুর কাছে একদম মিশে গেল। বাজুর কাছে তার মাথা ঠেকলো যেন। হঠাৎ আমার মনে হলো মেয়েটা কাঁদছে। তার ফোপানোর শব্দ আসছে। আমি বললাম,
-কাঁদছো কেন? মেয়েটা ভেজা স্বরে বললো,
-আপনি একটা বদ লোক। খারাপ লোক। আমি কিছু বললাম না। চুপ করে থাকলাম। মেয়েটা আবার বলল,
-আপনি আমার সাথে খুব খারাপ করেছেন। অন্যায় করেছেন। আমি এবারেও চুপ থাকলাম। কিছু বললাম না। অতোশি চট করেই আমার হাতটা ধরে ফেললো। ভেজা স্বরে বলল,
-আপনার মনে কি আমার জন্যে একটু দয়াও নেই? একটু কি মায়াও হয় না? আমি দ্রুত ওর হাত ছাড়িয়ে নিলাম। বললাম,
-খবরদার! আমার হাত ধরবে না৷ কোনো দিনও এই কাজ করবে না। আমি তোমাকে আগেও একবার বলেছি, এখনও বলছি, আমি তোমাকে পছন্দ করি না। একটুও না। এতোটুকু বলে খানিকটা থামলাম। আবার বললাম,
-অতোশি, আর কীভাবে বললে কথাটা বিশ্বাস করবে তুমি বলো? কীভাবে বললে বিশ্বাস করবে? অতোশির কান্নার বেগ বেড়ে গেল। সে ভেজা স্বরে বলল,
-আমি আপনার কাঁধে মাথা রাখতে চেয়েছি। আপনাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছি। আপনাকে ভালোবেসে সারাটা জীবন আপনার পাশে থাকতে চেয়েছি। বলুন, এটা কি আমার অপরাধ? বলুন প্লীজ! আমি একটু সরে এলাম। বললাম,
-তুমি আর কখনই আমার সামনে আসবে না। কখনোই না। অতোশি ভেজা স্বরে বলল,
-আই হেইট ইউ সাদিক। আই হেইট ইউ।
কথাটা বলেই মেয়েটা কাঁদতে শুরু করলো। কী তীব্র কান্নার বেগ তার৷ আমি দ্রুত সেখান থেকে চলে এলাম। মেয়েটার সাহস বেড়ে গিয়েছে। সে আমার নাম ধরে বলছে! কতো বড় স্পর্ধা। আমি দ্রুত বাসায় ফিরে এলাম। বাসায় ঢুকতেই দেখলাম আকাশ ভাই দাঁড়িয়ে আছে। বললাম,
-আসসালামু আলাইকুম ভাই। ভালো আছেন? আকাশ ভাই হাসলেন। বললেন,
-ভালো আছি। তোর খবর কী? আমি মৃদু হেসে বললাম,
-ভালো।
-ফ্রেশ হয়ে নে। এক সাথে ডিনার করবো।
-আমার খেতে ইচ্ছে করছে না ভাইয়া৷
-কেন?
-এমনিই। ভালো লাগছে না। সন্ধ্যায় নাস্তা করেছিলাম পেট ভরে। এ জন্যে খাওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই।
-তাই নাকি? কি এমন নাস্তা করেছিস শুনি? আমি থতমত খেয়ে গেলাম। কী বলবো ভেবে পেলাম না।
-বার্গার খেয়েছি ভাইয়া।
আকাশ ভাই কিছু বললেন না আর। আমি নিজের রুমে চলে এলাম। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুই ভালো লাগছে না আমার। সবই অসহ্য লাগছে। এক বন্ধু খবর জানালো অরুকে নাকি অনিকের সাথে দেখেছে। দু’জনেই নাকি রিক্সায় চড়ে ঘুরছিল। এই কথা আমার ভেতরটা আরো ভেঙ্গে দিলো। বিষের মতো আমার সমস্ত হৃদয়ে একটি সুপ্ত ঈর্ষান্বিত বেদনা চালান করে দিলো। রাগে আমার সমস্ত শরীর জ্বলছিল যেন। কী যে কষ্ট হচ্ছিল বলে বোঝানো যাবে না! হঠাৎ করেই আকাশ ভাই এলেন রুমে। আমি চট করেই চোখ মুছে নিলাম। আকাশ ভাই এসেই কিছু বললেন না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি কী বলবো ভেবে পেলাম না৷ হঠাৎই আকাশ ভাই বললেন,
-বুকের বাঁ পাশটা খুব ভার লাগছে তাই না? আমি কিছু বললাম না। চুপ করে থাকলাম। উনি আবারও বললেন,
-তোর দেহে যদি কেউ ব্লেড দিয়ে এঁকেও দেয় তুই তেমন কষ্টবোধ করবি না৷ বরং আনন্দ পাবি। এমনটা মনে হচ্ছে না? আমি এবারেও চুপ থাকলাম।
-সে অন্য একজনের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে শুনে তুই আরো বেশি হতাশ। তীব্র এক যন্ত্রণা তোকে আঁকড়ে ধরে আছে। তোর মরে যেতে ইচ্ছে করছে। বল করছে না? আমি চুপ থাকলাম।
-কথা বল। করছে না? আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম,
-হু।
-তো মরবার প্ল্যান করছিস নাকি? আমি জবাব দিলাম না। আকাশ ভাই বললেন,
-আমার তোকে এতোটা দূর্বল মনে হয় না। কাপুরুষেরা ভেঙ্গে পড়ে। ভেঙ্গে পড়াটাই তাদের স্বভাব। কারণ তারা কখনই উঠে দাঁড়ানোর কথা চিন্তা করেনা। এরা একবার ভাঙ্গলে আজীবন সেভাবেই থেকে যায়। শেষমেশ স্রষ্ঠার দোষ দিয়ে দড়িতে ঝুলে পড়ে। তুইও ঝুলবি নাকি? আমি খানিকটা ভেজা স্বরে বললাম,
-আমি ওকে ভালোবাসি ভাই৷ প্রচণ্ড ভালোবাসি।
-তোর ভালোবাসায় কোনো খুঁত ছিল?
-না ভাই। সে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার একটা সলিড রিজন পর্যন্ত দিতে পারেনি। সে নিজেও বুঝতে পারছিল না আমাকে কী বলে বিদায় দিবে!
-তাহলে? দোষটা কার? তোর নয় নিশ্চয়। রাইট? আমি চুপ থাকলাম।
-ভালো জিনিসের দাম মানুষ সহজে দিতে পারে না৷ সে তোকে সহজে পেয়ে গিয়েছে বলেই তোর দাম দিতে জানেনি। একটা কথা মনে রাখবি, নিজেকে কখনই সস্তা করে দিবি না। তাহলে নিজের মূল্যটা হারিয়ে ফেলবি। একটা মেয়ে দাম দেয়নি। সেটা অতি স্বাভাবিক। তাই বলে এটা ভাবা ঠিক নয় যে তুই মূল্যহীন। আশেপাশে তাকিয়ে দেখ, মানুষের মাঝে তোর কতো মূল্য। আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। কিংবা কি বলা উচিৎ তাও বুঝে উঠলাম না।
-ঠিক মতো খাচ্ছিস না কতোদিন?
আমি ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তিনি কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ইনাকে মিথ্যা বলা যাবে না। কারণ তিনি অলরেডি সব জেনেই নিয়েছেন। বললাম,
-তিন দিনে মতো হবে।
-বাড়িতে ফোন দিচ্ছিস না কেন?
-কথা বলি তো!
-আগের মতো তো না। আমি মাথা নিচু করে নিলাম।
-বাইরে বের হচ্ছিস না কেন?
-ইচ্ছে হচ্ছে না।
-ইচ্ছে কেন হচ্ছে না?
-তা জানি না।
-কী জানিস? অরুকে ভালোবাসিস৷ এটাই জানিস কেবল? আমি চুপ করে থাকলাম।
-শোন, জীবনকে জটিল করে দেখবি না। সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে নিলেই দেখবি ভালো লাগছে৷ কোনো কিছুর প্রতি তীব্র আশা রাখবি না। যেখানে তীব্র আশার ফুল ফুটবে সেখানেই এসিড বৃষ্টি হবে। বুঝতে পেরেছিস?
-হু।
-বাবা-মায়েরা কতো কষ্ট করে সন্তানদের লালন পালন করে। অথচ সেই সন্তানেরা তাদের ভুলে কোথাকার কোন অচেনা মেয়ের জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়। স্টুপিড পোলাপান। কবে যে এদের আক্কেল হবে? আমি জবাব দিলাম না। আকাশ ভাই খানিকটা চুপ থাকলেন। তারপর আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
-উঠে দাঁড়া প্লীজ। এভাবে ভেঙ্গে পড়িস না। বিচ্ছেদে হৃদয়ে দাগ হয়ে৷ সেই দাগটা সারিয়ে নিতে হয় সাদিক। নিজেকে শক্ত করতে হয়। উঠে দাঁড়িয়ে সেই মেয়েকে দেখিয়ে দে যে তাকে ছেড়ে তুই ভালোই আছিস। তোর সময় খারাপ যাচ্ছে না। এই পৃথিবীতে কেউই চিরদিনের জন্যে আসে না। সবাইই আসে চলে যাবার জন্যে। এবং এটাই বাস্তব। বাস্তবটা সহজ ভাবে মেনে নেয়াই মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। ব্যাথা আজ আছে কাল থাকবে না। এটা স্বাভাবিক। মুছে যাবে। মুছে দেবার মানুষ জুটে যাবে৷ চিন্তা করিস না। আর মুখটা এমন মলিন রাখিস না। কান্না আসলে কাঁদবি। পুরুষদের কাঁদতে হয় না এসব বাজে কথা। এগুলো বিশ্বাস করবি না। দেখি এদিকে আয়।
আকাশ ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন,
-কাঁদ। এবার কান্না কর।
আমার কি হলো জানি না। আকাশ ভাইকে জড়িয়ে ধরতেই আমার তীব্র কান্না পেল। আমার এতোদিনের জমে থাকা দুঃখ গুলো যেন বেরিয়ে আসতে থাকলো। আমি উনাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো করে কান্না করতে থাকলাম। এরপর প্রায় অনেকদিন কেটে যায়। আমি বিচ্ছেদ নামক গভীর অন্ধকার কূপ থেকে উঠে আসি। স্থির হই। নিজেকে আবার সাজিয়ে নেই। আবার শুরু করি সব কিছু। এই পৃথিবীতে উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ সকলেই পায় না। যে পায় ভাগ্যবান। তার উচিৎ সেটা কাজে লাগানো। জীবনের শেষ সম্ভাবনাটুকু পর্যন্ত হাত ছাড়া করা যাবে না৷ কে জানে, সফলতা হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে৷ আমি সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে গেলাম। জীবনকে নতুন করে উপভোগ করতে শুরু করলাম। এসব বেশ ভালোই যাচ্ছে সব৷ রিক্সায় বসে কথা গুলো ভাবছিলাম। ভার্সিটি থেকে ফিরছিলাম তখন। ফেরার পথেই দেখলাম অতোশিকে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। শপিং করেছে। রিক্সার অপেক্ষা করছে বোধহয়। রিক্সা দাঁড় করিয়ে বললাম,
-আসো৷ মেয়েটা যেন শুনলোই না। এমন একটা ভাব করলো। আমি বললাম,
-অতোশি? উঠে আসো? সে যেন আমাকে দেখেইনি। এমন একটা ভাব। বললাম,
-প্লীজ! বাসায় যেতে হবে দ্রুত। খুব ক্ষুদা লেগেছে৷ জলদি করে উঠে পড়ো?
-না, আমি উঠবো না।
-কেন? উঠলে কী হবে?
-অপরিচিত মানুষদের রিক্সায় আমি উঠি না।
অতোশি কথাটা বলার পরই আমার চোখ গেল ওর পেছনে। আমি অবাক হয়ে অরুকে দেখলাম। মেয়েটার কী বাজে অবস্থা! চেহারার এমন হয়েছে কেন? আমার বুকের ভেতরটা নড়ে উঠলো যেন। ঠিক এমন মুহূর্তে অরুর চোখ পড়লো আমার উপর। সে স্থির হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। এবং তাকিয়ে থাকলো। ব্যাপারটা হয়তো অতোশির চোখে পড়লো। সে চট করে রিক্সায় উঠে বসলো। আমি খানিকটা থতমত খেয়ে গেলাম। অতোশি আমার দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলল,
-আপনার চোখ দুটো উপড়ে ফেলবো আমি। আমি অবাক স্বরে বললাম,
-কেন?
-কেন জানেন না? বলেন জানেন না? আমি কিছু বলতে পারলাম না। দেখলাম অরু এগিয়ে আসছে। অতোশি চট করেই বলে উঠলো,
-এই মামা, চলেন তো! ঠিক তখনই অরু ডাক দিলো,
-সাদিক? আমি কী বলবো ভেবে পেলাম না৷ অতোশি আবারও বলল,
-মামা দ্রুত চালান! রিক্সা চলতে থাকলো। আমার খুব ইচ্ছে হলো পেছন ফিরে তাকাই। একবার তাকালে কী হয়? কী এমন ক্ষতি হবে? অতোশি পাশ থেকে বলে উঠলো,
-ভুলেও পেছনে তাকাবার কথা ভাববেন না। তাকালে আপনার সাথে জীবনেও কথা বলবো না আমি। এতো বড় ছ্যাঁকা খাওয়ার পরও তার আক্কেল হয়নি। আমি কিছু বললাম না। চুপ থাকলাম। আড় চোখে অতোশিকে দেখলাম। তার চেহারা কেমন লাল হয়ে আছে৷ কাজল কালো চোখ দুটোয় কেমন অভিমান জমে আছে। আমি অদ্ভুত ভাবে লক্ষ্য করলাম অতোশি মেয়েটাকে দারুণ লাগছে। ভীষণ সুন্দরী লাগছে৷ আমার মনে হলো মেয়েটা অরুর থেকেও বেশি সুন্দরী। আশ্চর্য! আগে তো এই ব্যাপারটা চোখে পড়েনি? আমি বললাম,
-ওইদিন রাতের জন্যে সরি। মন ভালো ছিল না বলেই এমন করেছিলাম। মেয়েটা অন্য দিকে তাকিয়ে বলল,
-মন যেমনই হোক, আমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করা যাবে না৷ কখনোই না।
-কেন?
-কেন মানে? আপনি এমনিতেই আমাকে কম কষ্ট দেননি। সেই ইন্টারের সময় থেকে আমি একটা কষ্ট বুকে চাপা দিয়ে এসেছি। এই কষ্টটা যে কি তা জানলে আপনি কখনই এমন করতে না আমার সাথে।
-আশ্চর্য! তখন তো আমি রিলেশনে ছিলাম। মেয়েটা চট করেই জবাব দিলো না। অল্প কিছু পর নিজ থেকেই বলল,
-রিলেশন না ছাই৷ ফালতু একটা মেয়ের সাথে খামখা এতোটা সময় পার করলেন।
-অরু ফালতু মেয়ে?
-তা নয়তো কী? আপনার কাছে তো এখনও সে ধোয়া তুলশি পাতা। যান না। গিয়ে আবার ছ্যাঁকা খান গিয়ে৷ সে এখন সিঙ্গেলই আছে৷ অনিক ছেলেটা পথে বসিয়ে গিয়েছে। আপনি গিয়ে তাকে কোলে করে উঠিয়ে নিয়ে আনুন৷ যান!
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম। খানিকটা হেসে বললাম,
-এই খবর তুমি জানলে কী করে?
-তা জেনে আপনার কাজ কী? আমি হাসলাম। কিছু বললাম না।
-তা আমার পেছনেও কি গুপ্তচর লাগিয়েছো নাকি? অতোশি চট করেই কিছু বলল না। খানিক সময় নিয়ে বলল,
-অর্পা মেয়েটি কে? আমি হতভম্ব হয়ে বললাম,
-তুমি অর্পাকে চেনো নাকি?
-তা জেনে আপনার লাভ নেই৷ বলুন সে কে?
-বান্ধুবি।
-শুধুই বান্ধুবি?
-আপাতত বান্ধুবি। পরবর্তীতে হয়তো অতোশি কঠিন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। এমন ভাবে তাকালো যেন আস্ত গিলে ফেলবে আমায়৷ আমি মৃদু স্বরে বলল,
-এতোটা চাও কেন আমায়? মেয়েটার গলা দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। চেহারাটা খানিক সরল হয়ে এলো তার। বলল,
-আমি নিজেও জানি না৷ প্রথমে ভেবেছি আকর্ষণ। বয়সের পাগলামি। কিন্তু অসুখটা এতো মারাত্মক ভাবে আঁকড়ে ধরলো আমায় যে প্রতি বেলায় তোমার কথা না ভেবে থাকাই যেতো না। কেমন পাগল পাগল লাগতো নিজেকে। বিশ্বাস করবেন না, এতোদিন, আপনি ফিরবেন এমন একটা সুপ্ত ইচ্ছে নিয়ে বেঁচে ছিলাম। তা না হলে আমি চট করেই ওর হাত ধরে ফেললাম। বললাম,
-আর কিছু বলো না। তোমার চোখ দেখেই বোঝা যায় অনেক কিছু৷ অতোশি দ্রুত আমার দিকে তাকালো। এবং তাকিয়েই থাকলো। আমিও তাকিয়ে থাকলাম। হঠাৎই চোখে কেমন ঘোর ধরলো যেন। আমার মনে হলো এই অতোশিকে আমি চিনি না। আগে কখনই দেখিনি। অতোশি বলল,
-আপনি কি রিক্সার হুডটা একটু তুলে দিবেন। আমি কান্না করবো। আমি অবাক হয়ে তাকালাম তার দিকে। কী সহজ সরল ভাবে কথা বলছে মেয়েটা৷ রিক্সাওয়ালা মামা নিজেই এসে হুড ঠিক করে দিলেন। তাকে আলাদা করে বলা লাগল না। অতোশি চট করেই আমার কাঁধে মাথা রাখলো। কাঁদতে থাকলো মেয়েটা। নিঃশব্দে কান্না৷ সে কান্না করতে করতে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো। কাঁধের কাছে নিজের মুখটা লুকিয়ে নিলো। ভেজা স্বরে বলল,
-আজ আমার খুশির দিন। পৃথিবীবাসিকে জানিয়ে দিন। আজ আমি পৃথিবীর স্রেষ্ঠ একজন সুখি মানুষ। অতোশি কেঁদেই গেল। কাঁদতে কাঁদতে বার কয়েক আমার কাঁধে চুমু খেল। আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আমায়৷ এই পৃথিবীতে ভালোবাসার মানুষের অভাব হয় না। আসলেই হয় না। আপনি একজনের জন্যে কাঁদবেন। অথচ দেখবেন অন্যজন আপনার জন্যে কেঁদে যাচ্ছে। জীবনটা খুব কঠিন নয়৷ আপনার দেখার দৃষ্টিটাই হয়তো খুব কঠিন।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত