অনুতপ্ত

অনুতপ্ত
বড় ভাইয়ার বাসা থেকে ৬ মাস পর মা আজ আমাদের বাসায় এসেছে। মা আসাতে আমি আর আমার স্ত্রী শ্রাবণী খুশি হওয়ার চেয়ে বিরক্ত হয়েছি বেশি। মা বাসায় থাকা মানে উটকো ঝামেলা।সারারাত কাশির শব্দে ঘুমাতে পারবো না। বাসার জিনিস এটা ওটা ভেঙে ফেলবে।মাঝে মধ্যে বিছানায় প্রস্রাব করে দিবে আরো কত কি। যেহেতু আমরা দুইভাই সেহেতু মা ৬মাস ভাইয়ার কাছে আর ৬মাস আমার কাছে থাকেন। আমি আর ভাইয়া চেয়েছিলাম মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে দেই কিন্তু সমাজের মানুষ কি বলবে সেই ভয়ে আর দিতে পারি নি মা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
~বাবা, তুই ভালো আছিস? আর এত শুকিয়ে গেছিস কিভাবে? চিন্তা করিস না আমি এখন থেকে তোর প্রিয় খাবার গুলো রান্না করে খাওয়াবো দেখবি তুই আগের মত মোটা হয়ে গেছিস মা’র কথা শুনে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললাম,
— আছি ভালো আর স্বাস্থ্য ইচ্ছে করেই কমিয়েছি তা নাহলে শেষ বয়সে তোমার মত সারাবছর অসুস্থ থাকবো
আমার কথা শুনে মা হাসতে হাসতে নিজের রুমে চলে গেলো এমন সময় শ্রাবণী আমায় ইশারা করলো একটু সাইডে আসার জন্য। আমি সাইডে আসতেই শ্রাবণী আমাকে বললো,
– মাকে এই রুমে থাকতে দিবো না। রুমটা আমি নিজ হাতে সাজিয়েছি। তাছাড়া বিছানায় নতুন জাজিম রাখা। আত্মীয় স্বজন আসলে এইখানে থাকতে দেই। তোমার মা এই রুমে থাকলে রুমের ১২টা বাজিয়ে দিবে আমি একটু চিন্তিত হয়ে বললাম,
— তাহলে মা থাকবে কোথায়? শ্রাবণী বললো,
– স্টোর রুমটা আমি কাল একটু পরিষ্কার করে বিছানা পেতে দিবো।তুমি কালকে তোমার মাকে বলবে সেখানে গিয়ে থাকতে সকালে ঘুম ভাঙলো শ্রাবণীরর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে। আমি ঘুম ঘুম চোখে বিছানা থেকে উঠে শ্রাবণীর কাছে যেয়ে দেখি শ্রাবণী মা’র সাথে চিৎকার চেঁচামেচি করছে।আমি তখন শ্রাবণীকে বললাম,
— কি ব্যাপার, এত সকাল সকাল চিৎকার করছো কেন? শ্রাবণী রেগে গিয়ে আমায় বললো,
– চিৎকার তো এমনিতেই করছি না। আমার নতুন জাজিমে তোমার মা প্রস্রাব করে দিয়েছে আমি নাকে আঙুল চেপে মাকে বললাম,
— রুমের সাথে বাথরুম তবুও বিছানায় প্রস্রাব করে দাও কেন? আজ থেকে তুমি এইরুমে আর থেকো না মা তখন বললো,
~তাহলে থাকবো কোথায়? আমি মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে বললাম,
— স্টোর রুমে বিছানা করে দিয়েছি সেখানেই থেকো মা হাসি মুখে তখন বললো,
~ঠিক আছে মা যখন খাবার টেবিলে খাবার খেতে আসলো তখন শ্রাবণী মাকে বললো,
— আপানার এইখানে খেতে হবে না। ভাত ফেলে পুরো টেবিল নোংরা করে ফেলবেন পরে আমার পরিষ্কার করতে হয়। আপনার খাবার আপনার এইখানে দিয়ে আসবো মা কিছু বললো না। শুধু একটু হেসে চুপচাপ চলে গেলো বাজার থেকে কিনে আনা বড় কাতল মাছটা দেখে মা শ্রাবণীকে বললো,
~বউমা, মাছের মাথাটা দিয়ে আমি মুরিখন্ড রান্না করবো। পিয়াস আমার হাতের মুরিখন্ড খেতে খুব পছন্দ করে
শ্রাবণী বিরক্ত হয়ে বললো,
– আপনার নোংরা হাত দিয়ে কিছু রান্না করতে হবে না। প্রস্রাব পায়খানা করে হাত ঠিক মত পরিষ্কার করেন কিনা কি জানি তাছাড়া রান্না করলে দেখা যাবে এটা ওটা ভেঙে ফেলেছেন মা কিছু বললো না। শুধু আমাদের দিকে মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেলো
-৫ বছর পর…দুপুরের দিকে ফোন দিয়ে শ্রাবণী আমায় বললো অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে। আমি আতংকিত হয়ে বললাম,
–কাব্য(আমার ৮মাস বয়সী ছেলে) ঠিক আছে তো? শ্রাবণী হেসে বললো,
– হুম ঠিক আছে। কিন্তু তুমি তাড়াতাড়ি আসো অফিস থেকে বের হয়ে রিকশায় উঠলাম। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম রিকশাওয়ালা ছেলেটা যুবক বয়সী। আর নরমালি আমরা যে ভাষায় কথা বলি ছেলেটা সে ভাষায় কথা বলে। রিকশাওয়ালা ছেলেটাকে বললাম একটু তাড়াতাড়ি যেতে। একটা রেস্টুরেন্টের সামনে ছেলেটা রিকশা থামিয়ে আমায় বললো,
~স্যার, একটা কথা বললে কিছু মনে করবেন? আমি বললাম,
— কি কথা? রিকশাওয়ালা ছেলেটা অসহায়ের মতো আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
~ এইসব হোটেলে তো আপনি খাওয়া দাওয়া করেন আপনি নিশ্চয়ই জানেন কোন খাবারটা ভালো হবে। এই হোটেল থেকে সবচেয়ে দামী খাবারটা আমাকে একটু এনে দিতে পারবেন? আমি টাকা দিচ্ছি আসলে আমি গরীব মানুষ এই হোটেলের দারোয়ান আমাকে এই ময়লা শরীরে ঢুকতে দিবে না আমি অবাক হয়ে বললাম,
— তুমি যেহেতু গরীব মানুষ তাহলে এত দামী খাবার খাওয়ার কি দরকার? ছেলেটা মুচকি হেসে বললো,
~ স্যার আমি না আমার মা খাবে রেস্টুরেন্টে থেকে একটা পিৎজা কিনে এনে রিকশায় বসলাম। রিকশাওয়ালা ছেলেটা রিকশা চালাচ্ছে আর আমি তখন অন্য কিছু ভাবছি। হঠাৎ রিকশাওয়ালা ছেলেটা বললো,
~স্যার, আপনিও আপনার মাকে অনেক দামী দামী খাবার কিনে খাওয়ান তাই না? আমার ক্ষমতা নাই মাকে এত দামী খাবার খাওয়ানোর। তবুও চেষ্টা করি কিনে খাওয়াবার। ৯দিন ধরে দুপুরের খাবার না খেয়ে টাকা জমিয়ে আজকে এই খাবারটা কিনতে পেরেছি আমি অস্পষ্ট গলায় বললাম,
— খুব ভালোবাসো মাকে? রিকশাওয়ালা ছেলেটা হাসতে হাসতে বললো,
~আমরা সন্তানরা মাকে যতটা ভালোবাসি মা’রা তারচেয়ে হাজারগুণ বেশি আমাদের ভালোবাসেন। আমি যে খাবারটা মার জন্য নিয়ে যাচ্ছি মা কিন্তু সেটা কখনোই একা খাবে না। আগে মা আমাকে খাওয়াবে তারপর পরিবারেন অন্যদের খাওয়ানো পর অল্প একটু মুখে দিবে। তারপরও মা একটু খেয়েছেন এটাই সন্তানের তৃপ্তি। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন আপনি হাজার কষ্ট দিলেও মা সেটা হাসিমুখে মেনে নেয়। সন্তানের কোন কথাতে মা সহজে চোখ থেকে জল বের করে না। কারণ মায়ের চোখের থেকে একফোঁটা জল বের হলে আল্লাহ আরশ কেঁপে উঠে বাসায় এসে কলিংবেল বাজাতেই শ্রাবণী দরজা খুললো। আমাকে দেখে শ্রাবণী জড়িয়ে ধরে বললো,
– পিয়াস কাব্য আজ প্রথম আমাকে মা বলে ডেকেছে। আমার এত্ত ভালো লেগছে তোমায় বলে বুঝাতে পারবো না
আমি শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম শ্রাবণী কাঁদছে কিন্তু ওর চোখে মুখে এক পৃথিবী সমান আনন্দ সেদিন খেয়াল করলাম শ্রাবণী ওর বান্ধবীর বিয়েতে যাবে বলে তৈরি হয়ে যখনি কাব্যকে কোলে নিলো ঠিক তখনি কাব্য শ্রাবণীর কোলে প্রস্রাব করে দিলো। আমি যখন বললাম,
— এই কাব্যকে নামাও কোল থেকে। ও তো তোমার শাড়ি নষ্ট করে দিচ্ছে শ্রাবণী রাগী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো চুপ থাকার জন্য। তারপর একটু পর বললো,
– হুট করে এইভাবে চিৎকার করলে কেন? তোমার চিৎকার শুনে তো আমার ছেলের ভয়ে প্রস্রাব আটকে যেতো। আমার ছেলে প্রস্রাব করে আমার পুরো শরীর নষ্ট করে দিলেও আমার কোন সমস্যা নেই শ্রাবণীর কথা শুনে আমি কিছু না বলে চুপচাপ অন্য কিছু ভাবতে লাগলাম রাত ৩টার সময় ঘুম ভেঙে গেলে খেয়াল করে দেখি পাশে শ্রাবণী আর আমার ছেলে নেই। তড়িঘড়ি করে ড্রয়িং রুমে এসে দেখি শ্রাবণী আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে ড্রয়িং রুম জুড়ে হাটাহাটি করছে। আমাকে দেখে শ্রাবণী অস্থির হয়ে বললো,
– ছুঁয়ে দেখো কাব্যের শরীরটা গরম। মনে হয় জ্বর এসেছে। কালকেই ওকে আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো
শ্রাবণীর শাড়ির অর্ধেকটা অংশ ভিজা থাকতো আমার ছেলের প্রস্রাবে। মাঝেমধ্যে দেখা যেতো আমার ছেলে পায়াখানা করে সারাশরীর নষ্ট করে দিয়েছে। শ্রাবণী বিন্দু পরিমাণ ঘৃণা না করে দুইহাতে সেগুলো পরিষ্কার করতো। রাতের পর রাত ছেলেকে কোলে নিয়ে হাটাহাটি করতো আমার পাশে বসে আমার ছেলে কাব্য চিৎকার করে কান্না করছে। কিন্তু আমি ওকে কোলে নিয়ে শান্ত করছি না। শ্রাবণী রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে কাব্যকে কোলে নিয়ে আমায় বললো,
– তুমি এমন কেন? ছেলেটা কখন থেকে কান্না করছে তুমি একবারও কোলে নিলে না। আমি মুচকি হেসে শ্রাবণীকে বললাম,
— ছেলেকে এতটা ভালোবেসো না, পরে ছেলের অবহেলা সহ্য করতে পারবে না। শেষ বয়সে অসুস্থ হয়ে বিছানায় প্রস্রাব করে দিলে ছেলে তোমাকে বকাঝকা করবে। নতুন জাজিমের নষ্ট যেন না হয় সেজন্য তোমার স্থান হবে স্টোর রুমে। শেষ বয়সে ছেলেকে আদর করে কিছু রান্না করে খাওয়াতেও পারবে না। একসাথে বসে ছেলের সাথে খেতেও পারবে না। এমনকি আমার যদি আরেকটা সন্তান হয় তোমাকে নিয়ে ভাগাভাগিও হতে পারে। বছরে ৬ মাস একছেলের অবহেলায় বেঁচে থাকবে আর ৬ মাস অন্যছেলের অবহেলায় বেঁচে থাকবে শ্রাবণী আমার কথাগুলো বুঝতে পেরেছিলো তাই ছেলের দিকে তাকিয়ে নিরবে অনবরত চোখের জল ফেলছিলো। আমি বাসা থেকে বের হয়ে মায়ের কবরের পাশে বসে মাকে বললাম,
— মা তুমি আমাকে ক্ষমা করো না। আমি আজ থেকে শুধু বেঁচে থাকবো তোমাকে দেওয়া কষ্ট গুলো নিজে ভোগ করার জন্য

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত