উপহার

উপহার
ডাইনিং স্পেসে দাঁড়িয়ে পর্দাটা একটু সরিয়ে তিয়ানার কেক কাঁটার দৃশ্য দেখে চোখের পানি আটকাতে পারলো না ফরিদা। তার মেয়ে ফুলিরও আজ জন্মদিন। সকালে কাজে আসার সময় কতো করে মেয়েটা বললো,
—- আজ একটু আগে আইসো গো মা। আমার জন্য কিন্তু একটা কেক আনতে হইবো! আর একটুখানি পোলাউ রাইন্দো গো মা। ফরিদা ঠিক করেছিলো আজ এই বাসার আপাকে বলে একটু আগে ভাগে বাসায় যাবে। কেক কিনতে না পারলেও অন্তত একটু পোলাওয়ের চাল কিনে অল্প করে পোলাও রান্না করবে। কিন্তু ফরিদা কাজে এসে দেখলো এখানে আজ রান্নাবান্নার বিশাল আয়োজন চলছে। বাসায় সবসময়ের জন্য রেশমা নামের যে গৃহকর্মী মেয়েটি থাকে, ওকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো- আজ এই বাসার আপার মেয়ে তিয়ানার জন্মদিন। রেশমা মেয়েটি আরো বলল,
— আফায় তো তিয়ানা মামণির জন্মদিন এইভাবে অনুষ্ঠান কইরা পালন করতে চায় নাই। আমাদের ধর্মেও নাকি হেইডা নিষেধ। কিন্তু তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব হেইডা মানতে চায় না। তারা সবাই এই দিনডা মনে রাইখা বিভিন্নরকম উপহার নিয়া হাজির হইতো। তারা বলতো, “এই দিনটাতে আমরা সবাই একত্র হয়ে একটু আনন্দ করবো, সেটা থেকে আমাদের বঞ্চিত করবে?” এরপরেও কী আপায় তাগোরে আসতে মানা করতে পারে, কও?
এখানে প্রায় দুই মাস হলো কাজ করছে ফরিদা। এই আপার মেজাজ মর্জি কেমন, সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি সে। তাই আজ আগে ভাগে বাসায় যাওয়ার ব্যাপারটা ভয়ে আর বলতে পারল না ফরিদা। মেয়ের জন্মদিনে ফরিদা নিজের মেয়ের কাছে থাকতে পারেনি বলে এতোক্ষণ তার খুব কষ্ট লাগছিল। সেই কষ্ট এখন যেন হাজার গুন বেড়ে গেল, যখন দেখল তার মেয়ের বয়সী এই তিয়ানা মেয়েটির জন্মদিন কতো ঘটা করে পালন করা হচ্ছে। ধনী-গরীবের এই ব্যবধান সে মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারল না।
পর্দার আড়াল থেকে সে দেখতে পেল, রাজকন্যার মতো সাজে তিয়ানা, তার মা কে কেক খাইয়ে দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কেন আজ এই তিয়ানা মেয়েটার জায়গায় তার মেয়ে নেই? কেন তিয়ানার মায়ের জায়গায় আজ সে নেই? কেন কেউ কেউ এরকম রাজপ্রাসাদে রানীর মতো জীবন ধারন করবে? কেন সে নিজে ঘুঁটেকুড়ুনি হয়ে সেই রাজপ্রাসাদে কাজ করে যাবে? একটুখানি ভালো থাকার জন্য কেনো তাকে এতো সংগ্রাম করতে হবে?—- এই এত্তোগুলো ‘কেন’ এর জবাব খুঁজতে গিয়ে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল সে। হঠাৎ কাঁধে কারো কোমল হাতের স্পর্শে চমকে উঠে তাকালো সে। দেখল এই বাসার আপা উদ্বিগ্ন চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। এবার তিনি খুব অস্থির হয়ে বললেন,
—- তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে ফরিদা?
—- জ্বি না আফা, আমি ঠিক আছি। কোনো কাজ করতে হইবো? তাইলে বলেন আফা ফরিদা চোখের পানি লুকিয়ে তড়িঘড়ি করে উত্তর দেয়।
—- না, না… এখন আর কিছু করতে হবে না তোমাকে। তুমি এখন তোমার বাসায় চলে যাও। আজ তো একটু দেরী হয়ে গেল। সন্ধ্যা বেলায় একা একা যাওয়াটা ঠিক হবে না। আমাদের ড্রাইভার আলম তোমাকে গাড়িতে করে তোমার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসবে। তুমি এখনি যাও…
—- গাড়ি লাগবে না আফা। আমার বাসা তো কাছেই। আমি হাঁইটাই যাইতে পারবো। ফরিদা লজ্জা পেয়ে বলল।
—- আমি যেটা বলছি সেটা করো। এক্ষুণি গিয়ে গাড়িতে ওঠো কড়া গলায় নির্দেশ দিয়েই আপা ড্রইংরুমে গেস্টদের কাছে চলে গেলেন। ফরিদা দোতলা থেকে নিচে নামতেই ড্রাইভার আলম তার কাছে এসে বলল,
—- আসো বইন, আপায় তোমারে তোমার বাসায় পৌঁছায় দিতে বলছে।
বলে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়াল আলম। ফরিদা সঙ্কোচের সাথে ভেতরে ঢুকতেই আবার দরজা আটকে দিল আলম।
ভেতরে ঢুকে বসতেই ফরিদা দেখল গাড়ির ভেতরে আগে থেকেই অনেকগুলো ব্যাগ রাখা। ফরিদাকে ওর বাসায় নামিয়ে দিয়ে হয়তো আপার কোনো আত্মীয়ের বাসায় এগুলো নিয়ে যাবে আলম– ভাবল ফরিদা। গাড়িতে বসে ফরিদা শুধু ধনী-গরীবের ব্যবধান নিয়েই ভাবতে লাগল আর নীরবে চোখের পানি মুছতে লাগল। আপার বাসায় কাজ শুরু করার আগে একদিন তিনি গাড়িতে করে ফরিদার বাসায় এসে ওর খোঁজ নিয়ে গেছেন। তাই আলম ফরিদার বাসা চিনত। বাসার সামনে এসে গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে বিনয়ের সাথে ফরিদাকে নামতে বলল আলম।
—- ধন্যবাদ ভাই বলে গাড়ি থেকে নেমে এল ফরিদা। এর মধ্যেই ফরিদার মেয়ে ফুলি আর মেয়ের বাবা বাইরে এসে দাঁড়াল। ফুলি দৌঁড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলল,
—- আইজ আমার জন্মদিন, সেইডা তুমি ভুইলা গেলা মা! তুমি খুব পঁচা। যাও, তোমার লগে আর কোনোদিন কথাই কমু না মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ফরিদাও জোরে কেঁদে উঠে বলল,
—- গরীব হয়ে জন্মানোর যে কী জ্বালা সেটা বড় হইলে বুঝবি গো মা নিজের চোখ মুছতে মুছতে ফুলির বাবা মকবুল এবার মা-মেয়ে দু’জনকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—- তোমরা কী বাইরেই থাকবা, নাকি ভেতরে আসবা? বলে দরজার দিকে এগুতেই পেছন থেকে আলমের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো তারা—
—– একটু দাঁড়াও বইন।
আলম যে গাড়ি নিয়ে এখনো যায়নি, এতোক্ষণে খেয়াল করল তারা। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল আলম হাসি মুখে বড় বড় বেশ কয়েকটি ব্যাগ নিয়ে তাদের দিকেই আসছে। মকবুলের হাতে ব্যাগগুলো ধরিয়ে দিয়ে আলম বলল, আজ তাইলে আসি। মকবুল আর ফরিদা অবাক হয়ে বলল,
—– এগুলান কী?
—– ভেতরে যাইয়া খুইলা দেখো।
আপায় তোমাগো লাইগা উপহার পাঠাইছে। মকবুল হাসি মুখে আলমকে বলল, ভেতরে আসো ভাই। আইজ না, অন্য একদিন আসব। আইজ আসি। সবগুলো ব্যাগ খাটের উপরে রেখে ফরিদা, মকবুল আর ফুলি ব্যাগগুলোকে ঘিরে বসল। প্রথম ব্যাগটা খুলে দেখল একটা কাগজের বক্স। সেটা খুলতেই আনন্দে চিৎকার করে উঠল ফুলি.. ও আল্লাহ্‌ গো কত্তো সুন্দর একটা কেক! দেখো মা, দেখো এবার দ্বিতীয় ব্যাগটা নিয়ে তার ভেতরে যে প্যাকেটটি ছিল, সেটা খুলল মকবুল। চুমকি আর ছোট ছোট পাথর বসানো গোলাপি রঙের সুন্দর ঝকমকে একটি জামা বের হয়ে এলো।
—- এইটা আমার জন্য? অবিশ্বাসের সুরে জানতে চাইল ফুলি। আমাদের ঘরে তুই ছাড়া কি আর কোনো রাজকইন্যা আছে যে সে পরবো? হাসি মুখে বলল ফরিদা।
এবার তৃতীয় ব্যাগটা খুলে সেটার ভিতর থেকে দুইটা প্যাকেট বের করল ফরিদা। প্যাকেট দু’টো খুলে দেখল একটার ভিতরে একটা শার্ট আর অন্যটার ভেতরে একটা শাড়ি। শাড়িটা খুলে দেখতে গিয়ে ফরিদার চোখ দু’টো ছলছল করে উঠল। নীল রঙের ভেতরে কী সুন্দর ছোট ছোট সাদা ফুলের জমিন… পাশের বাসার টিভিতে সেদিন ঠিক এরকম একটি শাড়ি পরে নায়িকা শাবনুরকে নাচতে দেখে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ফরিদা যখন নিজের জন্য ঠিক সেরকম একটি শাড়ি উপহার পেল, তখন আনন্দে তার চোখে পানি চলে এলো। মকবুলের দিকে তাকিয়ে দেখল, মকবুলও নতুন শার্টটা দুই হাতে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ঝাপসা চোখে হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এই তো সেদিন ঠিক এরকম একটা শার্ট পরে রাজপুত্রের মতো দেখতে একটা ছেলে মকবুলের রিকশায় উঠেছিল। তখন তার মনে হয়েছিল ঠিক এরকম একটি শার্ট পরলে হয়তো তাকেও ঠিক এরকম রাজপুত্রের মতোই দেখাতো… ঠিক এমন সময় দেখল তাদের চোখের সামনে ফুটফুটে একটি ফুলপরী দাঁড়িয়ে আছে! ফুলপরীটি যখন তাদের দু’জনকে জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বলল,
—– মা, বাবা, দেখো তো আমারে কেমন লাগতাছে? তখন তারা ভালো করে তাকিয়ে দেখলো এটা তো তাদের ফুলি! সবসময় জীর্ণ পোশাকে থাকা তাদের ফুলি আজ এত্তো সুন্দর একটি পোশাক পরাতে তাকে ঠিক যেন একটা পরীর মতো লাগছিল। মকবুল আর ফরিদা দু’জনেই একসাথে ফুলিকে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়ানো কন্ঠে বলে উঠলো,
—- তোমারে ঠিক একটা পরীর মতো লাগতাছে গো মা। ফুলি খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠলো। খাটের উপরে থাকা আরেকটি ব্যাগ তখনো খোলা হয়নি। সেই ব্যাগটি দেখিয়ে ফুলি বলল,
—– বাবা দেখো, আরেকটা ব্যাগ খোলা বাকি আছে! আরেকটা ব্যাগ!
মকবুল ব্যাগটির ভেতর থেকে কাগজের বক্সটি বের করে খুলতেই বিরিয়ানির সুগন্ধে ভরে গেল তাদের ঘরটি… ফরিদা, মকবুল এবং ফুলি– তাদের তিনজনের কাছেই মনে হলো– তারা নিশ্চয় কোনো স্বপ্নরাজ্যে চলে এসেছে। আর স্বপ্নরাজ্যটি যিনি তৈরি করেছেন, তারা তিনজনেই মনে মনে তার জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করল। ঠিক সেই সময় তিয়ানাদের বাসায় তিয়ানার আম্মু নিজের হাতে তিয়ানাকে বিরিয়ানি খাওয়াতে খাওয়াতে গল্প শোনাচ্ছিলেন….
—- জানিস, আজ একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। তোর ফরিদা আন্টির বাসায় যেতে দেরী দেখে তার হাসবেন্ড এসেছিল। সে আমাদের ড্রাইভার আলমের কাছে বলেছিল, তার মেয়ে ফুলিরও আজ বার্থডে। আলম যখন উপরে এসে আমাকে এই কথা বললো, আমি তখন ওদের সবার জন্য সারপ্রাইজ গিফট পাঠিয়ে দিয়েছি।
—- কী মজা! ওরা নিশ্চয়ই এতোক্ষণে সেই সারপ্রাইজ গিফট দেখে ফেলেছে আর খুব খুশি হয়েছে! তিয়ানা হাততালি দিয়ে বলল। তিয়ানার মুখে বিরিয়ানির একটা লোকমা তুলে দিতে দিতে তিয়ানার আম্মু বললেন,
—– হ্যা, মা। আর জানো, ওদের সেই খুশিটুকুই কিন্তু মহান আল্লাহ্‌’র দরবারে পৌঁছায় আর আমাদের জন্য অন্য কোনো উপহার হয়ে সেটা ফিরে আসে!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত