বিশ্বাস

বিশ্বাস
সেদিন যখন সে জানালো রাতে কথা বলবেনা কারণ তার শরীর খারাপ। আমিও ঠিক আছে বলে ম্যাসেঞ্জার থেকে চলে আসলাম।। আমার কাছে তার সুস্থতা আসল। সারারাত এপাশ ওপাশ করেছি। ঘুম আসেনি। টেনশানে ছিলাম। ও ঠিক আছে কি না। রাতে বেশি অসুস্থ হয়ে গেল না তো আবার বেশি। এইসব ভাবছিলাম। এপাশ ওপাশ করতে করতে চোখটা লেগে এসেছিল। ভীষণ ভয়ংকর এক স্বপ্ন দেখলাম। ঘুম ভেঙে যায়। পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ফোন হাতে নিয়ে দেখি রাত সাড়ে ৩টা। খুব বেশি ভয় পেয়েছিলান।। ওকে কল দিলাম। ওয়েটিং আসলো ওর নাম্বারটা। ওজানা আশংকায় বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মনে হলো ভুল শুনলাম। তাই আবার কল দিলাম। আবার ওয়েটিং আসলো। আমি নিজেকে নিজে চিমটি কাটলাম। নাহ আমি বাস্তবেই ছিলাম। সারা রাত আর ঘুমাতে পারিনি। সকালের দিকে একটু চোখটা লেগে এসেছিল। হঠাৎ কলে ঘুম ভেঙে যায়। আমি ঘুম জড়িত কন্ঠে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো,,
— বউ ঘুম ভেঙেছে? বউ শব্দটা শুননেই চোখ থেকে ঘুম চলে যায়। রাতের ঘটনা মনে পড়লেও প্রিয় মানুষের মুখে প্রিয় শব্দটা শুনে অভিমান চলে যায়। তবুও খানিকটা অভিমানের সুরে বললাম।,,
— বলেন আমার অভিমান বুঝতে পেরে বলল,,,
— রাগ কেন বউ? অভিমানের সুরে বললাম,,,
— গতরাতে ফোন ওয়েটিং এ ছিল কেন? সে এক গাল হেসে নিয়ে বলল,,,
— পাগলী রাগ হয়েছে বুঝি? আমার কাজিন তার প্রেমিকার সাথে কথা বলছিল।
— তোমার ফোন থেকে কেন?
— ওর ফোনে চার্জ ছিল না।
আমি একটা স্বস্তির হাসি দিলাম।। তৃপ্তিভরা ছিল সেই হাসিতে। মন মানছিল না। তবুও মনকে বুঝালাম,, “সে আমার। একানন্তই আমার। ও শুধু আমাকে ভালোবাসে।” কিছুক্ষণ পর সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল,,
— বউ শুনো
— বলো
— একটা গুড নিউজ আছে।
— কি?
— এবার শুধু আর মুখে বউ নয়। কাগজে কলমে আমার বউ হবে। এই পুরো পৃথিবীটা আর তার মানুষগুলো হবে রাজসাক্ষী।
ওওর কথা আমি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। খুশিতে কেঁদে দিলাম। বুঝতে পারলাম ও ওর পরিবারকে রাজি করিয়েছে। নিজের মনকে বললাম,,, ” দেখলি ও শুধু আমার। তুই খামোখা ভুল বুঝেছিস।” সেদিন কাজ আছে বলে ফোন রেখে দেয়। বলল অফিসে মিটিং আছে। সারাদিন আর ফোন দেয়নি। মন কেমন করছিল। আবার ভাবলাম হয়তো বিজি।
সেদিনই বিকেলে বের হলাম বাসা থেকে একটা বই কিনতে। রিক্সারর জন্য দাঁড়িয়েছি নিচে। হুট করে মনে হলো আমার সামনে দিয়ে রিক্সা করে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে গেল। ছেলেটা মেয়েটার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। কেন যেন মনে হলো ছেলেটা ইমন। হ্যাঁ আমার ইমন। কিন্তু ওর সাথে মেয়েটা কে? হুহু করে কেঁদে উঠল আমার মনটা। আমি ওকে কল দিলাম কোথায় জানতে। কল বেজেই যাচ্ছে। কেউ রিসিভ করছেনা। আমি আর সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে বাসায় গিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে দিলাম। কান্না অফ হচ্ছিল না। বালিশে মুখ গুঁজে রাখলাম। তারপর কান্না অফ হচ্ছিল না। ফ্যান ছেড়ে ফ্লোরে বসে পরলাম।। নাহ পারছি না। খুব কষ্ট হতে লাগলো. দম বন্ধ হওয়া কষ্ট। দৌড়ে ওয়াশরুমে গেলাম। জোরে পানির টেপ ছেড়ে দিলাম।
গোসলের ঝরণা ছেড়ে দিয়ে বসে পরলাম। চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। যেন বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। কেউ বুক থেকে কিছু ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। নিজের চুল গুলো টানছিলাম। কিছুটা শান্ত হয়ে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। বারেন্দায় দাঁড়িয়ে ভাবছি,, “এতোটা বিশ্বাস সে কি করে ভাঙতে পারলো? এত বছরের সম্পর্কের বন্ধন ছেড়ে চলে যাওয়া কি এতই সহজ? এত সহজে কি সে আমায় ভুলে যাবে? একটু একটু করে সাজানো সব স্বপ্ন সে কি সত্যি ভেঙে দিবে? ” একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বারেন্দা ছেড়ে রুমে আসলাম। দেখি অনেক গুলা কল। মোবাইল সাইলেন্ট মুডে থাকায় শুনিনি। ৩৮টা কল ৮টা ম্যাসেজ। সব ও দিয়েছে। আমি কল ব্যাক করতেই সাথে সাথে রিসিভ হলো। মনে হলো ফোন নিয়ে বসে ছিল। আমি হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে উত্তর এলো,,
— কি হলো এতক্ষণ কই ছিলা? জানো কত টেনশানে ছিলাম? ভয় পেয়েছিলাম। আমি খুব নরমাল ভাবে বললাম,,,
— আমি ঠিক আছি। তারপর ওপাশ থেকে সে বলল,,,
— জানো আজকে কত্ত বিজি ছিলাম। উফফফ কত কাজ। বিরক্ত লাগছিল। আমি চুপচাপ শুনে গেলাম। আজ আর কিছু বললাম না। মনে প্রাণে চাইলাম তার কথা গুলো বিশ্বাস করতে। বিধাতার কাছে চাইছিলাম যা দেখেছি তা মিথ্যে হয়ে যাক।
ওর ভালোবাসাময় কথা গুলা সব ভুলিয়ে দিলো আমায়। ও শুধু বকবক করছিল। এক পর্যায়ে বলে দিলাম যে আমি ওকে দেখেছি একটা মেয়ের সাথে। ও বলল,, “বিশ্বাস করো জান আমি অফিসে ছিলাম। তোমার ভালোবাসার কসম আমি কোন মেয়ের সাথে ঘুরাঘুরি করি নাই” আমি হুহু করে কেঁদে উঠলাম। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে আমাকে থামাতে। আমি কেঁদে যাচ্ছি। সে বারবার বুঝাচ্ছে সে আমাকে ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারেনা। আমি বিশ্বাস করলাম। কারণ আমি তো চাইছিলাম সব মিথ্যে হয়ে যাক। ওকে ছাড়া যে আমি বাঁচবো না। তারপর আমি খাইনি শুনে সে খুব রেগে গেল। আমাকে বাধ্য করলো খেতে। আমি বাধ্য প্রেমিকা হয়ে খেতে গেলাম। এরপর প্রায় ওর ফোন ওয়েটিং পেতাম। আর আমি কাঁদতাম। ও আমাকে এটা ওটা বলে সান্ত্বনা দিতো। ব্যস্ততার অযুহাতে দেখা করতো।
আমি বুঝতে পারলাম ও আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে কিন্তু বুঝতে দিচ্ছে না। আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারছিলাম না। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কষ্ট হচ্ছিল খুব। চিৎকার কাঁদতে ও পারছিনা। ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। বুকের ব্যথা ভীষণ রকম। ইচ্ছে হচ্ছে তাকে জড়ায়ে ধরে কাঁদি। সহ্য করতে না পেরে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম। হাটতে হাটতে একটা পার্কে গেলাম।। যেখানে হাজারো সময় কাটিয়েছি তার সাথে। প্রতিটা ধূলিকণায় আমাদের ভালোবাসার স্মৃতি রয়েছে। বাতাসে ছড়িয়ে আছে আমাদের সাজানো স্বপ্ন গুলো। দূর থেকে দেখলাম আমাদের সেই বেঞ্চিতে একজোড়া প্রেমিক প্রেমিকা বসে আছে। একটু সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। পা দুটো অবস হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভিতরের বাম পাশটায় ব্যথা অনুভব হচ্ছে। কেউ যেন আমার হৃদপিন্ডটা টেনে বের করে ফেলছে।
আমমি সেখানে আর অপেক্ষা না করে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম কেঁদে কেঁদে,, ” তুমি শুধু আমার। কেউ তোমাকে আমার কাছ থেকে নিতে পারবেনা। আমি তোমায় খুব ভালোবাসি। কেন এমন করছো? কেন এত কষ্ট দিচ্ছো? তোমাকে ছেড়ে থাকতে যে আমার খুব কষ্ট হয়” সে আমাকে হেচকা টান দিয়ে সরিয়ে দিয়ে একটা থাপ্পড় দিলো। আমি গালে হাত দিয়ে নির্বাক চোখে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে বলল,,, “কে আপনি? মেয়ে মানুষ হয়ে এত বেহায়া কি করে হলেন? অন্য একটা পুরুষকে এভাবে জড়িয়ে ধরলেন? লজ্জা শরম নেই নাকি?
আমি তার পা জড়ায়ে ধরে বললাম,, এভাবে বলো না মরে যাবো আমি। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। এত স্বপ্ন ভেঙে দিও না আমার। আমি কি নিয়ে বাঁচবো? কাকে নিয়ে থাকবো। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। নিশ্বাস নিতে পারছি না। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমার।” মেয়েটার হাত ধরে সে চলে গেলো আমাকে রেখে। আমি সেখানে মাটিতে বসে চিৎকার করে কাঁদছিলাম পাগলের মত। আর চারপাশের মানুষগুলো আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত