শৈশবের গল্প

শৈশবের গল্প
ছোটবেলায় আমার ধারণা ছিলো আমরা দুই বোন এক ভাই। কেউ জিজ্ঞেস করলে তাই বলতাম। আপু পাশে থাকলে ভুল শুধরে দিতো। আরে আমরা তো দুই বোন। আমি আমার পিঠাপিঠি খালাতো ভাই সহ বলতাম আর কী। ভাবতাম ওর কথা না বললে ও যদি কষ্ট পায়!! আমাদের বাসায় ল্যান্ডফোন ছিলো না। জরুরী প্রয়োজনে ফোন আসতো পাশের বাসায়। একদিন আম্মুর সাথে পাশের বাসায় গিয়েছি। সে বাসার আংকেল জিজ্ঞেস করলেন, কি নাম তোমার? বললাম। এরপর জিজ্ঞেস করলেন কোন স্কুলে পড়ো? -কেজিতে। কেজিতে? আচ্ছা কোন ক্লাসে পড়ো?
-প্রি ক্যাডেট ইন্সটিটিউট এ।
আংকেল নিশ্চয় বুদ্ধির বহর দেখে চমকৃত হয়েছিলেন। তখন দ্বীনের জ্ঞান ছিলো না। জন্মদিন পালনের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে জানতাম না। ছোট্ট ছিলাম তো। কেউ জন্মদিনের দাওয়াত দিলে কেক খাওয়া যাবে ভেবে অনেক খুশি লাগতো। তখন দাওয়াতে একটা প্লেটে কেক, চানাচুর, বিস্কুট, কলা খেতে দেওয়া হতো। আহ! কি যে স্ফূর্তি লাগতো। কেক খেয়ে আংগুল চেটে ক্রিম খেতে চাইতাম। বড় আপুর প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যেতো আমার এহেন কান্ডে। তিনিও কিন্তু তখন শিশু, কিন্তু টনটনে মান সম্মান বোধ বারাকাল্লাহু ফীক। বাসায় অভাব টের পাইনি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু এখনকার মধ্যবিত্ত পরিবারের বিলাসী জীবনের তুলনায় তখনকার জীবন এখন খুব সাদামাটা মনেহয়।
আমাদের বাসায় অনেক গেস্ট আসলে পাশের বাসার আন্টির প্লেট নিয়ে আসতাম আমরা। পেস্ট শেষ হয়ে গেলে টিউবটা মামনির হাতে দিতাম, মামনি কিভাবে যেন টিউবটা পেচিয়ে ঠিকই পেস্ট বের করে ফেলতো। ঈদ ছাড়া গর্জিয়াস নতুন জামা তেমন কেনা হতো না। এরপর কোন দাওয়াত বা বিয়ের অনুষ্ঠানে সেই ঈদের জামাই পরে যেতো সবাই। আর বড় মেয়েরা আর মহিলারা, একে অন্যের শাড়ি, ঘাগড়া, লেহেংগা ধার করে পরতো। এক রোজার ঈদে মামা ড্রেস উপহার দিয়েছিলেন। ভাবলাম আব্বুর দেওয়া জামাটা রোজার ঈদে পরি, আর মামারটা কুরবানিতে পরবো। খালামনি বারবার বলছিলো, এই ঈদেই মামারটা পরে ফেলো। পরেরটা পরে দেখা যাবে। আমি শুনিনি।
পরে খালামনি করলো কি, মামার দেওয়া ড্রেসটা বারান্দায় ঝুলিয়ে দিলো। হায় হায়। এ যে না পরেই জামাটা পুরানো হয়ে গেলো! কুরবানীর ঈদে কী ব্যবস্থা হবে তাহলে। সে কী দুশ্চিন্তা! সে কী টেনশন!! মুরগির মাংস কত্ত সুস্বাদু আর উপাদেয় খাবার, তা কি এখনকার বাচ্চারা জানে? এখন তো দুইদিন পর পর মাংস রান্না হয় অনেক বাসায়। অথচ আগে শুক্রবার, বা মেহমান আসলে যদি মুরগির মাংস রান্না হতো, কত্ত যে খুশি হতাম। ঈদের সময়েও মেনু ছিলো খুব সিম্পল। পোলাউ, মুরগির কোরমা আর গরুর ঝাল মাংস। কেউ সালামি দিলে লজ্জায় বলতাম, থাক থাক লাগবে না, লাগবে না। মনে মনে যে কত খুশি হতাম!! সবচে ভালো সালামি পাওয়া যেতো চাচ্চু আসলে। তাই ঈদের সকাল আরো ঝলমলে হয়ে যেতো চাচ্চু বেড়াতে আসলে।
এরপর সেই সালামি সাবধানে রাখতে আম্মুকে দিয়ে দিতাম। আর সেগুলোর কথা মনে থাকতো না। আসলে টাকা দিয়ে নিজে নিজে তো কিছু কেনা হতো না। তাই গুরুত্ব বুঝতাম না। ছোটবেলায় অপেক্ষায় থাকতাম কবে শীতকাল আসবে, সবার স্কুল ছুটি হবে আর বুবুবাড়ি যাবো। বুবুবাড়ি যাওয়ার এবং থাকার প্রতিটা মূহুর্ত আমার জন্য খুব অন্যরকম। বুবুবাড়িটা কোন স্থান না, আমার জন্য একটা অনুভূতির নাম। এখনো যখন শীত আসি আসি করে, বাতাসের শুষ্কতা বেড়ে যায়, মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের বসে যাওয়া গলার আযান শোনা যায়, আমার মনেহয়, আরে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। বুবুবাড়ি যাবো। যেয়ে দেখবো ভাইয়া, বুবু, মামা খালারা সবাই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা পৌছানো মাত্র হৈচৈ শুরু হবে। ভাইয়া দোলনা টানিয়ে রেখেছে, বুবু চালের গুড়ির পিঠা বানিয়েছে। পিকনিক হবে। গাছের ফাঁকে জোনাকির ঝাঁক, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, কচুগাছের পাতায় আতশবাজি ।
এইবার আর বুবুবাড়ি ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না। আব্বু আম্মুকে বলে দিবো আমাকে যেন এখানেই রেখে যায়।
আর যদি জোর করে ফিরে যেতে হয়ও, আমি বড় হলে এখানেই ফিরে আসবো। এখানেই থেকে যাবো। বড় হলে আমাকে কেউ এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবে না। আমি এখন অনেক বড়। বুবুবাড়িটাও আছে। কিন্তু সময়টা যে খুব পাল্টে গেছে। মানুষগুলোও যে কোথায় হারিয়ে গেলো এক এক করে। সবাইকে আমি জান্নাতে খুঁজে নেবো ইন শা আল্লাহ। জান্নাতের বিশাল পৃথিবীতে আমার একটা বুবুবাড়ি থাকবে। যেখানে রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নামা মাত্র মামা, খালারা হৈচৈকরে ছুটে আসবে। আমি সেই ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে হয়ে দু হাত দু পাশে ডানার মত করে ছুটে যাবো ওদের দিকে। এই তো, একটা সন্ধ্যা মাত্র। এরপরেই, ইন শা আল্লাহ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত