অনুতপ্ত

অনুতপ্ত
বিয়ের ৭ বছর খুব ভালো ভাবেই কেটে গেলো। স্বামী কামাল এত কেয়ারিং ছিল যে,স্ত্রী রাবেয়া সবসময় ভাবতো দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সেই সুখী। ৮ বছরের মাথায় কামাল তার এক চাচাতো বোনের মেয়ে শাহানাকে সাজিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসলো। সর্ম্পকে ছিল মামা-ভাগ্নি কিন্তু আজকে স্বামী-স্ত্রী । তা দেখে প্রথম স্ত্রী রাবেয়া খুব শকড হয়েছিল যা আমরা ফিলও করতে পারবো না।
রাবেয়ার বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থা খুব ভালো ছিল তারা রাবেয়াকে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বলেছিলো কিন্তু ওনি যায় নি। রাবেয়ার ছেলেমেয়ে ছিল ৫ জন, ৩ জন মেয়ে ২ জন ছেলে। মেয়েরা বড় ছিল আর ছেলেরা ছোট। ২য় বিয়ের পর কামাল আর রাবেয়ার কাছে যায় নি এমনকি একসাথে বসে কোনদিন কথাঅ বলে নি। আর শাহানাও কোনদিন কামালকে রাবেয়ার কাছে যাওয়ার সুযোগ দেয় নি। শাহানা ছিল কামাল থেকে প্রায় ২০ বছরের ছোট আর দেখতেও অনেক সুন্দরী। শাহানা কামালকে খুব ভালোবাসতো আর সাথে অনেক সেবা। রাবেয়ার সংসারের কোন খরচ বা বাচ্চাদের জন্যও কোন খরচ তিনি দেন নি। রাবেয়া এতোটাই কষ্ট পেয়েছিলেন যে, তিনি কামালের বাড়িতে থেকেঅ তার সাথে ঝগড়া করা বা সংসারের খরচ চাওয়া কোনটাই তিনি করেন নি আর শাহানার সাথেও কোন দিন কথা বলে নি। বাবার বাড়ির সাহায্যে আর নিজে খুব কষ্ট করেই রাবেয়া তার সংসার চালাতো।
অনেক বছর কেটে গেল, রাবেয়া তার মেয়েদের যেভাবেই হোক বিয়ে দিলেন কিন্তু কামালের কাছে কোনরকম সাহায্য নেয় নি আর কামালও তাদের কোন কিছুতে এক টাকা দেয়া তো দূরের কথা চেয়েও দেখে নি। শাহানার ঘরের ছেলেমেয়েরাই যেন তার আপন সন্তান ছিল আর রাবেয়ার সন্তানেরা কেউ না। স্বামী স্ত্রী হয়ে এক বাড়িতে থেকেও তারা ছিল একদমই অচেনা মানুষ। রাবেয়ার মুখের হাসির সাথে সাথে কথা বলাও যেন কমে যাচ্ছে দিনে দিনে। রাবেয়া মেয়েদের বিয়ে দিয়ে যেভাবেই হোক বাবার বাড়ির সাহায্যে ছেলেদেরকেও বাহিরে পাঠিয়ে দিল। ছেলেরা খুব ভালো একটা পজিশনে নিজেদের দাড় করালো।ছেলেরা বিয়ে করলো আর রাবেয়া তার বুকে বয়ে বেড়ানো কষ্টের চাপে আস্তে আস্তে করে পুরোই পাগল হয়ে গিয়েছে ততদিনে।
কামাল আর শাহানার ছেলেমেয়েদেরও বিয়ে হলো। বয়স বাড়লো আর কামাল খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো ধরা পড়লো ক্যান্সার। ডাক্তার জানালো ট্রিটমেন্ট করতে ৩ লাখ টাকা লাগবে। কামালের ২য় ঘরের ছেলেরা বললো, বয়স হইছে কয়েক দিন পরে এমনিতেই তো মারা যাবে শুধু শুধু এতগুলো টাকা নষ্ট করে কি লাভ। তখন গ্রামের মানুষ মিলে কামালের বড় স্ত্রীর ছেলেদেরকে বললো তারা যেন সাহায্য করে। আর সাথে শাহানাও রাবেয়ার ছেলেদের হাতে পায়ে ধরলো টাকার জন্য।
রাবেয়ার ছেলেরা কামালের চিকিৎসার জন্য ১ লাখ টাকা দিল। ট্রিটমেন্ট করানোর জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে কিন্তু এর আগেই কামালের অবস্থা খুব খারাপ। দম যায় যায় অবস্থা, সবাই খুব কান্নাকাটি করছে। কামাল দুইদিন ধরে এক ফুঁটা পানিও খায় নি আর কোন কথাও বলে নি। শুধু চোখ দিয়ে তকিয়ে ছিল আর হাপাচ্ছিল। অবস্থার খারাপ বুঝে সবাই তার কাছে মাফ চেয়ে নিল আর মাফ দিচ্ছে। তখনি কেউ রাবেয়ার কথা মনে করলো, বললো তার কাছে অ তো দাবি ছুটাতে হবে! হাজার হোক সে ই তো বড় বউ।
লোকজন গিয়ে রাবেয়াকে নিয়ে আসলো কামালের কাছে। সে কিন্তু এখন পুরো পাগল, দুনিয়ার এইসব কিছু থেকে একদমই দূরে। লোকজন রাবেয়াকে এনে কামালের মাথার কাছে বসালো। তা দেখে শাহানা রেগে আসলো রাবেয়ার কাছে, সবাই বুঝালো শাহানাকে সে যেন রাবেয়াকে একটু বসার সুযোগ দেয়। রাবেয়া কামালের কাছে এসে দুই হাত দিয়ে তার মুখে ধরে হাত বুলাতে লাগলো।
৪০ বছর পর সে কামালকে ছুয়েছে। অসুস্থ কামাল রাবেয়ার হাতের ছোয়া পেয়ে হাউমাউ করে কাদঁতে লাগলো। আর তার দুচোখ ভেয়ে ঝরঝড়িয়ে পানি বালিশে পড়তে লাগলো। কামালের নিজ হাত দিয়ে চোখ মুছার ক্ষমতাটুকুও আজকে নাই। এই দৃশ্য দেখে ঘরের সবাই খুব কাঁদলো এমনকি শাহানাও। কিন্তু রাবেয়ার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি ঝরলো না।
সবার কথায় রাবেয়া কামাল এর মুখে ২ চামচ পানি দিল, যেই কামাল দুই দিন ধরে কোন পানি মুখে নিচ্ছে না আজ সে রাবেয়ার দেয়া পানি খেল। রাবেয়া রাত ১১ টায় পানি খাইয়ে তার ঘরে চলে গেল, এর পর আর কামাল কোন কিছুই মুখে নেয় নি। রাত ৩ টায় কামাল তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো।
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত