তিন কন্যা

তিন কন্যা
-বড় বউ, ও বড় বউ কই গেলি ? বছর বছর শুধু মাইয়া জন্ম দেছ। অহন শরিফুল্লার চায়ের দোকানের সামনে যাইয়া দেখ, তোর সোয়ামি আরেকখান বিয়া কইরা তোর সতিন নিয়া আইছে । তরকারির পাতিলটা চুলা থেকে নামাচ্ছিলাম। এই সময় রাবি পাগলীর কথা শুনে আমার হাত থেকে পাতিলটা পড়ে যাচ্ছিল। মেঝ জাল চুমকি দৌড়ে এসে পাতিলটা ধরে ফেলেই রাবিকে উদ্দেশ্য করে বকতে লাগলো।
-এই পাগলী , তোর আর কাম নাই, বেহুদা কথা কইয়া ঝামেলা করস ক্যা ? যা ভাগ, আমগো বাড়িততুন। বড় ভাই কোন দিনই ভাবিরে থুইয়া আরেকখান বিয়া করবো না ।
-হ, আমিতো পাগলই । বেবাকে আমারে পাগল কয় । তয় আইজকা কইলাম আমি মিছা কথা কইতাছিনা । ঐ শরিফুল্লার চায়ের দোকানের সাম্নেই তোর ভাসুরে বউ লইয়া রিক্সাতুন নামছে। আরেকটু বাদেই বাড়িত আইলে দেখবি । চুমকি আমার দিকে তাকিয়ে বলল – ও ভাবি তুমি এর কথা বিশ্বাস কইরো না তো । আমার শরীরের ভিতরে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। রাবি বিনা কারনে এইরকম একটা কথা বলবে না। বছরের দুই এক মাস ওর মাথা খারাপ থাকলেও , অন্য সময়গুলো ও ভালোই থাকে। মানুসের বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে বেড়ায়। আমার বুকের ভিতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো। গত এক –দেড় বছর থেকেই আমার শাশুড়ি আমার স্বামীকে আরেকটা বিয়ের জন্য বলছিলেন। আমার বিয়ে হয়েছে সাত বছর। এই সাত বছরে আমি তিনটা মেয়ে জন্ম দিয়েছি। এইটাই আমার অপরাধ। ছেলের জন্য আমার মেঝ দেবর কে বিয়ে করিয়েছেন আম্মা । আমার মেঝ জালের তিন মাস আগে একটি ফুটফুটে ছেলে হয়েছে।
সেই ছেলেকে আম্মা আমার স্বামী মাসুদের কোলে দেয়ার সময় বলেছেন – এই দেখ মাসুদ, আমাগো বংশের বাতি । তোরে তো আমি বুঝাইতে পারিনা। তোর এই বউয়ের পেটে পোলা হইবোনা। তুই আরেকখান বিয়া কর । তাইলে তোর ঘরেও এমন চাঁদের লাহান পোলা হইব। মাসুদ বরাবরের মতোই চুপ করে হাসি মুখে ভাতিজাকে কোলে নিয়ে আদর করেছে। আমার নিজের কাছেও খোকাকে খুব আদর লাগে। মেঝ কে আমি কিছু করতে দেইনা। খোকার সব কাজ আমি নিজেই করি। মাসুদকে আমি নিজেও অনেক বার বলেছি। আম্মা মনে হয় ঠিক কথাই কয়। আমার পেটে তোমার পোলা হইব না। এই কথা বললেই মাসুদ রাগ করে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে- আম্মার না হয় বয়স হইছে তাই উল্টা – পাল্টা কথা কয়। তুমি এমন কথা কও ক্যান ? আমার পোলা লাগবোনা। আমার মাইয়াগোরে নিয়াই আমি খুশী। বলেই মেয়েদের আদর করতে থাকে । সেই মানুষ এমন একটা কাজ কিভাবে করলো ??
চুমকি কে কিছু বলতে না দিয়ে আমি রান্নাঘর থেকে বাহির হয়ে উঠান পার হয়ে বাড়ির সামনে যাব তখনই দেখি, মাসুদ মাথায় ঘোমটা দেয়া লাল শাড়ি পরা একটা মেয়েকে নিয়ে বাড়ির দিকে হেঁটে আসছে। আমি আর দাঁড়াতে পারলাম না। ধপাস করে মাটিতে বসে পড়লাম। মেঝ দৌড়ে এসেই আমাকে ধরে ফেলল । সামনের দিকে তাকিয়ে একই দৃশ্য দেখে ও ফিসফিস করে বলল – ও, ভাবি আমিতো মনে করছি রাবি কি না কি কয় । কিন্তু বড় ভাইতো দেখি হাছাই বউ লইয়া আসতাছে। হায়, হায় তোমার কি হইব? মাইয়া তিনটার কথা একবারও ভাবলোনা বড় ভাইয়ে ? বলেই ও আমাকে ধরে উঠিয়ে ঘরের দাওয়ায় নিয়ে বসাল। তারপরেই উঠানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে লাগলো।
-আম্মা ও আম্মা, ও ছোড ভাই বাহির হও দেইখা যাও বড় ভাই আরেকহান বিয়া কইরা বউ নিয়া আসছে গো । মেঝর চিৎকারে ঘরের ভিতর থেকে আমার ছোট দেবর আর শাশুড়ি বের হয়ে আসলো। বাজারে আমাদের একটা চালের আড়ত আছে । আমার স্বামী আর মেঝ দেবর সেটার তদারকি করে। আর ছোট দেবর পড়ালেখা শেষ করে দুই বছর থেকে চাকরি খুজতেছে। ওর কাছে দোকানে বসতে নাকি ভাললাগে না। তাই ও চাকরি করবে। আজকে সকালেও আমার মেঝ দেবর আর মাসুদ একসাথে দোকানে গেছে। কিন্তু বিকালের দিকেই এই ঘটনা। আমি বুঝতে পারলাম না মাসুদ হটাৎ করে এমন একটা কাজ কেন করলো ? মাসুদ বউ নিয়ে উঠান পার করে ঘরের সামনে আসতেই আমার শাশুড়ি ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে বলল – ও বাজান তুমি আম্মারে না জানাইয়া বিয়া কইরা আনলা ক্যান ? আম্মারে আগে কইলেইতো আম্মা ধুমধাম কইরা তোমারে বিয়া করাইয়া আনতাম।
– আম্মা আমিতো ওরে বিয়া করি নাই। শুন কি হইছে । সকালে আমি আর মামুন দোকানে যাইয়া বসার পরে আমার বন্ধু রুবেল আইয়া কইলো , পাশের গ্রামে ওর দূর সম্পর্কের এক মামাতো বইনের বিয়া। ওর একলা যাইতে মন চায়না আমি যেন ওর লগে যাই। আমি মামুনরে আড়তে বসাইয়া গেলাম বিয়া খাইতে। গিয়া দেখি কি সুন্দর এই অল্প বয়সি মাইয়ারে এক বুইড়ার লগে ওর চাচারা বিয়া দিতাছে । এই মাইয়ার বাপ নাই। নিজেদের বোঝা কমানোর লাইগা চাচারা এই কাম করতাছে। দেইখা মেজাজ গেছে খারাপ হইয়া। ভাবলাম এই মাইয়ারে আমাগো বাড়ির বউ করলে খুব মানাইবো । তাই কলির চাচা আর ঐ বুইড়া বেডার লগে সারাদিন বইরা ঝামেলা কইরা ওরে নিয়া আসছি । এহন যদি তোমার পছন্দ অয় তা হইলে মাগরিবের পরে বড় মসজিদের হুজুর আইনা বিয়ার কাম সাইরা ফালামু । বলেই মাসুদ আমার দিকে তাকিয়ে বলল – কি হইল পারুল ? তুমি এমন মরা মাইনসের লাহান আমার দিকে চাইয়া রইছ ক্যান ? উড আমারে ভাত দেও । বহুত ক্ষিদা লাগছে। বলেই ও ভিতরের দিকে চলে গেল । কথাগুলো মাসুদ এমনভাবে বলল যেন ঘরে বউ রাইখা আরেক বিয়ে করা খুবি সাধারন একটা ঘটনা ।
আমি টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ালাম। আম্মা খুশিতে গদ্গদ হয়ে সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির মাথার কাপড় সরিয়ে বললেন- মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ কি সন্দর চাঁদের লাহান মুখ। আমার পোলার পছন্দ আছে। ও বাজান মাইয়া আমার পছন্দ হইছে। তুমি বাজান খাইয়া উঠাই হুজুর নিয়া আইসো । বলেই আম্মা মেয়েটিকে নিয়ে ঘরের দিকে উঠতে যাবে, এই সময় আমার ছোট দেবর চিৎকার করে বলল- আম্মা আপনি পাগল হইছেন ? বড় ভাইরে এতদিন ভুল্ভাল বুঝাইয়া আপনি ভাবির জন্য সতিন ঘরে আনাইছেন । আমি কিন্তু কইয়া দিলাম বড় ভাই যদি এই ছেমরিরে বিয়া করে তাহইলে আমি বাড়িততুনে বাহির হইয়া যামু । আমার শাশুড়ি ছেলের কথায় খেখিয়ে উঠে বললেন – যা বাহির হইয়া যা। ফাজিল পোলা । ভাবির লাইগা মা ভাইর বিরুদ্ধে কথা কস । তারপরেই মেয়েটাকে নিয়ে ঘরের ভিতরে চলে গেলেন। ছোট দেবর আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল- তুমি এমন ম্যাদা মাইরা রইছ ক্যান ভাবী ? তুমি কিছু কইবা না বড় ভাইরে ?
-আমি কি কমু মিলন ? তোমার ভাইরে তো আমি পোলা দিতে পারি নাই। তাই তোমার ভাইয়ে এই কাম করছে । আমি আমার মাইয়াগোরে লইয়া আমার বাপের বাড়িত চইলা যামু । আমার কথা শুনেই মেঝ ঝাঁজের সঙ্গে বলল- ক্যান , ক্যান তুমি মাইয়াগোরে লইয়া বাপের বাড়িত যাইবা হ্যাঁ ? মাইয়াগো এই বাড়িত হক আছে না? তোমার হক আছে না ? নিজের অধিকার থুইয়া যাইবা ক্যান ? তুমি খাড়াও । ও ছোড ভাই তুমি বাজারে গিয়া তোমার মাইজ্যা ভাইরে লইয়া আহো। এই মাইয়ারে কিছুতেই বড় ভাইর লগে বিয়া হইতে দিমুনা । মুইড়া পিছা দিয়া পিডাইয়া ঐ বুইড়া কাছে পাঠাইয়া দিমু । পোলা হয় নাই দেইখ্যা এমন অন্যায় কাম করবো ? আহারে কি সুন্দর ফুলের লাহান তিনডা মাইয়া তোমাগো ।
মিলন দ্রুত পায়ে হেঁটে বাড়ি থেকে বাহির হয়ে বাজারের দিকে গেলো । আমি ধীর পায়ে হেঁটে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলাম। আমার মেয়েগুলো পাশের বাড়িতে গেছে খেলতে। ওরা আসলেই ওদের কে নিয়ে আমি বাহির হয়ে যাব । যে মানুষ আমার কথা ভাবলোনা , নিজের মেয়েদের কথা ভাবলোনা অল্প বয়সি মেয়ের রুপে পাগল হয়ে সেই মেয়েকে বিয়ের আসর থেকে নিয়ে আসছে নিজের বউ করার জন্য। সেই মানুষের প্রতি কিসের আমার অধিকার ? আমার কোন হক লাগবেনা । মনের মিল না থাকলে জোর করে কি আর সংসার হয় । আমি সেই বিকাল থেকেই রান্নাঘরে বসে থাকলাম। মিলন মামুন ভাইরে নিয়ে মাগরিবের একটু আগেই বাড়িতে আসলো । আসার পর থেকেই আম্মার সাথে দুই ভাইয়ে তুমুল ঝগড়া করছে । তাদের সাথে চুমকিও আম্মাকে নানা ভাবে বুঝাতে চাইছে । কিন্তু আম্মা অনড় ।
উনি মাসুদকে আবার বিয়ে করাবেন । তানা হলে মাসুদ নির্বংশ থাকবে। এইটা উনি কিছুতেই মানতে পারবেন না। চুমকি উনাকে বুঝাতে চাইলো এই মেয়ের ঘরে ছেলে হবে এটার কি গ্যারান্টি ? উনার এক কথা এই মেয়ের ঘরেই নাকি ছেলে হবে। মেয়েগুলো বাড়িতে এত চিল্লাচিল্লিতে ভয় পেয়ে আমাকে ঘিরে বসে আছে। আমি নিজেকে সামলানোর আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছি । কিন্তু মেয়েদের মুখের দিকে তাকালেই আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। কিছুতেই চোখের পানি আমি ধরে রাখতে পারছি না । সেই যে মাসুদ ঘরে ঢুকল তারপরে আম্মা নিজেই ওর জন্য ভাত বেড়ে নিয়ে গিয়েছেন রুমে। তারপর থেকে ও রুমেই আছে। এতক্ষনে একটিবারও ও আমার অথবা মেয়েদের খোঁজ করলনা। একটু আগে রুম থেকে বের হয়ে ভাইদের কে বলল – এত চিল্লাচিল্লি করছ ক্যান তোরা আম্মার লগে ? কি হইছে? আম্মা যখন কইছে কলি রে আম্মার পছন্দ হইছে তাহইলে কলি আমাগো বাড়ির বউ হইব। তোরা এমন চিল্লাইয়া কোন কাম হইবনা। যা রে মামুন বড় মসজিদের হুজুররে ডাইকা লইয়া আয় ।
-আমি পারুম না বড় ভাই। আপনি কইলাম আম্মার কথা ধইরা খুব বড় ভুল করতাছেন । ভাবির লাহান মানুষ দেইখ্যা এহনো চুপ কইরা রইছে । অন্য বেডি হইলে এতক্ষনে পুলিশ লইয়া বাড়িত আইত । এই সাত বছরে ভাবী আম্মা অথবা আপনার বিরুদ্ধে কোন কথা কয় নাই। আপনারা যেমনে কইছেন হেমনে চলছে। আমাগরে নিজের ভাইয়ের লাহান আদর করছে। এরুম মাডির মানুষের লগে আপনি এমন অন্যায় করতাছেন ক্যান বড় ভাই ? পোলা না হইলে কি হয় ? বলেই মামুন হু হু করে কেঁদে উঠল । মামুনের কান্না শুনে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না । মেয়েদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরে আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম । আমার কান্না দেখে আমার মেয়েরাও কাঁদতে লাগলো । উঠান থেকে মাসুদ গলা উঁচু করে আমার নাম ধরে ডাকতে লাগলো । আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে উঠানে নেমে আসলাম।
– এই যে পারুল আসো । আম্মা আপনেও আসেন । এই যে এই চেয়ারে বসেন। এই মামুন কাদ্দন থামা । বলেই মাসুদ আমার শাশুড়ির সামনে একটা পিঁড়ি টেনে বসে বলল – আম্মা দেখছেন পারুলরে শুধু আমি না । এই বাড়ির সকলেই ভালবাসে। মামুন ঠিক কথাই কইছে, পারুলের লাহান বউ আমি পাইছি এইটা আমার ভাগ্য। আর আপনি যে শুধু কোন পোলা হইতে হইব । পোলা লাগবো ক্যান ? আমারে আল্লাহ যে তিনখান জান্নাত দিছে এইটাইতো আমার ভাগ্য। সবাইর তো জান্নাত পাওনের কপাল হয় না। আমার মাইয়ারাই আমার বংশ রক্ষা করবো। আপনি ও তো মাইয়া । আপনি যখন পোলা হয়না দেইখ্যা পারুল রে কথা শুনান আমার খুব খারাপ লাগে। আমি ভাবছি আপনি নিজেই একদিন সব বুঝবেন। কিন্তু দিন্ দিন দেখি আপনি ঝামেলা করতাছেন বেশি । আমি ভাবলাম দেখি আমার বাড়ির হগলেই কি আপনার লাহান চায়নি যে আমি আরেকখান বিয়া করি । সেই জন্য কলিরে নিয়া আসার পর থেক্যাই আমি চুপ রইছি । আমি আসলে কলিরে নিয়া আসছি আমাগো মিলনের লগে বিয়া দেওনের লাইগা। সেইজন্যই আপ্নারে কইছি আপনার পছন্দ হইলে কলি আমাগো বাড়ির বউ হইব। একবার ও তো কই নাই আমার বউ হইব । এইকথা বলেই মাসুদ মিলনের দিকে তাকিয়ে বলল – কি রে মিলন করবিনা কলি রে বিয়া ?
-হু, করুম একশবার করুম। না করলে যদি আপনি কইরা ফালান । আমার হেই ডর আছে না । মিলনের কথায় সকলে হা হা করে হাসতে লাগলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত