ডিসেম্বরের বৃষ্টি

ডিসেম্বরের বৃষ্টি
২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আমাকে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে দশ দিনের জন্য ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়েছিল ময়নাতদন্ত(Autopsy) দেখার জন্য। ওই সময়ে প্রতিদিন চোখের সামনে পাঁচ ছয়টা করে পোস্টমর্টেম হতে দেখেছি। কেউ গুলিবিদ্ধ,কারো গলায় ফাঁস,কেউ ট্রেনে কাটা, কেউবা আবার বিষের তেজে নীলবর্ণধারী। অল্পদিনে লাশকাটা ঘরের সাথে ভালোই সখ্যতা গড়ে উঠেছিলো আমার। রোজ রুটিন করে আসা যাওয়া। মাঝে মধ্যে লাশের পরিবারের লোকজনের সাথে সামান্য আগ্রহ নিয়ে কথা বলা,এগুলো করেই সময় কাটতো। বৃহস্পতিবার দিন সকাল এগারোটার দিকে আমি মর্গের ওখানটায় আসি; আমি একা নই আমার সাথে আরও অনেক মেডিকেলের ছাত্র সেখানে রয়েছে। প্রথম যে পোস্টমর্টেমটা হলো সে এক বাচ্চা ছেলের লাশ,পানিতে ডুবে মরা। এরপরের কেসটা বিষ খাওয়া(death due to poisoning). একটা মেয়ে,বয়স বড়জোড় ১৯ কি ২০ এমন হবে। হাত-পা’য়ের ফর্সা রংটা গাঢ় নীলাভ হয়ে গেছে। গত রাতে মারা গেছে। এই পোস্টমর্টেমটা শেষ করেই আমি বাইরে চলে আসি।
সামনে গুটিকয়েক লোক দাঁড়ানো,এরা লাশেরই স্বজন;আর একটু দূরে দুজন পুলিশ। এদের থেকে আলাদা হয়ে বা দিকটায় গাছের গোড়ায় একজন আধবুড়ো লোক মাথানিচু করে বসে আছেন। আর একটু পর পর কাঁধে রাখা গামছা দিয়ে চোখ মুছছেন। আমি ওনার কাছে যেতেই চোখ তুলে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলাম আপনার কোনো স্বজন কি মর্গে আছেন। চোখে জল নিয়ে উত্তর দিলেন “আমার মেয়ে” তার বাকি বর্ণনায় বুঝে গিয়েছিল এই শেষ পোস্টমর্টেম টা তাহলে ওনার মেয়েরই হয়েছিল। একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছিল আপনার মেয়ের;কেনো বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলো ? এরপর ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন, আমার মনি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে, ওকে স্কুলে পাঠিয়ে আমি আর ওর মা গেছিলাম সদর হাসপাতালে,ডাক্তার দেখাতে। আমাদের আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায়, হাসপাতালে ভীর ছিলো খুব। আসলে বুঝিনি যে,এতো সময় লাগবে আমাদের। ও স্কুল থেকে ২ টার সময়ই ফেরে। আমরা যখন বাড়িতে আসি তখন দেখি, আমার মনি ঘরের মধ্যে বসে কাঁদতেছে।
তখনই কেমন জানি আমার কলিজাটা কেঁপে উঠে। এরপর ওর মাকে বলে,মা উত্তর পাড়ার গিয়াস আসছিলো ঘন্টা দুই আগে। আব্বাকে খোঁজ করছে বলছি ঘরে নাই। এরপর পানি খাওয়ার কথা বলে বারান্দায় বসলো। অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে যায় না। একটু পর হঠাৎ করেই ও ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে আর আমাকে…..() ভদ্রলোক তখন বেশ জোরেই কান্না করছিলেন আর বলছিলেন,কুত্তার বাচ্চা গিয়াস আমার মাকে..!! ওর উপর গজব পড়ুক। গিয়াস ওইদিন রাতেই ঢাকা পালিয়ে আসে। ওর নামে মামলা করা হয়। এর কিছুদিন পর ধরাও পড়ে, বেশ কয়েক বছর জেল হয়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার ছ’মাসেই ও বিয়ে করে নেয়। আর অন্যদিকে ওই সময়ে এ ঘটনাটা বেশ জানাজানি হয়ে যায়। পুরো গ্রাম ওদেরকে আড়চোখে দেখা শুরু করে।
সম্মান বাঁচতে আর মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মনি’র মা বাবা ওকে ওর খালার বাসায় রেখে আসে। ওর বাকি পড়াশোনাটা সেখানেই হয়। এসএসসি পাশের পরই মনি’র বাবা মা ওকে বিয়ে দেয়ার জন্য বেশ তোড়জোড় শুরু করে। তাদের চিন্তা বিয়েটাও খালার বাসায় বসেই হোক। নিজ এলাকায় আসলে যদি কেউ পুরানো কথা তোলে,তাহলে হয়তো বিয়েটাও ভেঙে যেতে পারে। মূলত এই ভয়েই মনি’র বাবা মা ওর খালার বাসাতেই বিয়ের সমস্ত বন্দোবস্ত করে। ছেলে মাছের ব্যবসা করে,দেখতে শুনতেও ভালো। ব্যাস,এটাই যথেষ্ট। ওর বাবা মায়ের কথা হলো,বিয়েটা হয়ে গেলেই বাঁচা যাবে। খালার বাসায়ও বা আর কতোকাল থাকবে। ভালোয় ভালোয় মনির বিয়েটাও হয়ে যায়। সবকিছুই একদম ঠিকঠাক ছিলো। পুরানো ক্ষতকে চাপা দিয়ে ততদিনে ওদের পরিবারটা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।
মনির বাবা মা জামাইকে একটু বেশিই আদর যত্ন করতো,যা যা চাইতো কোনো কিছুতেই তাদের দ্বিমত ছিলোনা।
বিয়ের ন’মাস পরে ওর স্বামী নাসির একদিন শ্বশুরবাড়ির এলাকার বাজারে যায় মাছ কিনতে, সেখানেরই এক মাছ বিক্রেতা পরিচয় জানতে চাইলে নাসির নিজের পরিচয় দেয়। পাশের অন্য একজন কথার সাথে সুর মিলিয়ে বলে “ও সেই মেয়েটা,যাক আল্লাহ তাইলে একটা ভালো জামাই ই জুটিয়ে দিছে” নাসির কথাগুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলো। তখন থেকেই ওর মনে একটা সন্দেহের সৃষ্টি হয়। যদিও ও কাউকেই কিছু জিজ্ঞেস করেননি। এর ঠিক চার মাস পর একদিন নাসির তার নিজের মাছের আরৎ এ বসে আছে। বিকেলের দিকে এক লোক আসেন মাছের অর্ডার দিতে। কথায় কথায় নাসির জানতে পারলো ওই লোকের বাড়িও ওর শ্বশুরের এলাকাতেই। তাকে চা বিস্কিটও খাওয়ালো। অল্পসময়েই বেশ সুসম্পর্ক হয়ে যায় তার সাথে।
তবে উনি যাওয়ার আগে নাসিরের বাবার কাছে বলতে লাগলেন, ছেলেকে যে বিয়ে দিয়েছেন কিছু কি জেনেশুনে বিয়ে দিয়েছেন না একদমই চোখ বুজে। ওর বাবা প্রথমে ওই লোকের কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারেননি। তারপর জানতে চাইলে ওই লোক বলেন, ওই মেয়ে তো ভালো না,আগে এমন একটা ঘটনা ঘটাইছিলো। নাসিরের বাবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। এরপর তার থেকে প্রথমে নাসিরের মা এবং পরে নাসিরের কানেও পৌঁছায় খবরটা। মনি তখন তিন মাসের গর্ভবতী। এরপর থেকেই শুরু হয় শ্বশুর,শ্বাশুড়ি আর স্বামীর অনাদর,অবহেলা আর কথায় কথায় মার। শ্বশুরবাড়ির সবাই মানিকে খুব তাচ্ছিল্যের চোখে দেখতে লাগলো। তারপর থেকে নাসির আর রাত হলে ঘরেও ফেরে না।শ্বশুরবাড়ির সাথেও সবরকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে ৩ মাস ২১ দিনের মাথায় মনির গর্ভপাত হয়ে যায়। এরপর কিছুদিন ও বাবার বাড়িতেই ছিলো।
ভাবছিলো নাসির এসে ওকে নিয়ে যাবে কিন্তু সে দু মাসেও আর আসেনি। শেষমেশ মনির বাবা মা ই ওকে আবার শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এবার আসার পরপরই নাসিরের মুখে দ্বিতীয় বিয়ের কথা শুনে মনি ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। ওর মনোবাসনা হলো,মারুক কাটুক এ বাড়িতেই থাকবে তাও যেন নাসির এই কাজটা না করে। রাতের অর্ধেকটা সময় মনি’র কাঁদতে কাঁদতেই চলে যায়। নাসিরের জন্য অপেক্ষা করে,রাত বাড়ে কিন্তু নাসির ঘরে ফেরে না। শুধুমাত্র দুপুরবেলা এসে ঘন্টাখানেক থেকে আবারও চলে যায় দোকানে। মনির সাথে একটা কথাও বলে না।  এমনই একদিন দুপুরবেলা নাসির বাড়ি ফিরলে মনি ওকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে। নাসির ওর হাত ছাড়িয়ে ধাক্কা দিয়ে ওকে দূরে সরিয়ে দেয়।
এরপর কতক্ষণ জঘন্য ভাষায় গালাগাল দিয়ে না খেয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। এর ঠিক ১৩ দিন পর ডিসেম্বরের ১১ তারিখ নাসির দ্বিতীয় বিয়ে করে। মনি খবরটা পায় একদিন পর। মানে ১২ তারিখ সকালবেলা। এরপরের অংশটুকু মনির জীবনের শেষমুহুর্তের গল্প। ওর শ্বশুর দু প্যাকেট কীটনাশক কিনে রাখছিলেন ওনার শীতকালীন সবজি ক্ষেতে দেয়ার জন্য। মনি কীটনাশকের অবস্থান ভালো করেই জানতো। ওইদিন সকাল আটটার দিকে ঘুমানোর কথা বলে রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর পুরো দু প্যাকেটই খেয়ে নেয়। কয়েক ঘন্টা পর ওর রুমে ঢুকতে হয় দরজা ভেঙে। এরপর প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে আনতে আনতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মনি ইহলোক ত্যাগ করে। আমি ওইদিন আর মর্গেই ঢুকিনি। হোস্টেলে এসে শুয়ে পড়ি। মাথায় তখন শুধু ওই একটা গল্পই বারবার চলছিলো।
একটু পর টিনের চালায় ঝরঝর শব্দের উপস্থিতি টের পাই।সেই সাথে উত্তরীয় হিমেল হাওয়া। জানালা খুলে বাইরে
তাকাতেই অবিরাম বৃষ্টির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা আমায় শরীর স্পর্শ করে যায়। ডিসেম্বরের এ অকস্মাৎ বৃষ্টিতেই ঘুমিয়ে যাবে একটা মেয়ে,মাটির অনেকটা নিচে। যার অনেক স্বপ্ন ছিল।অনেক ইচ্ছে ছিলো। যে মেয়েটা প্রথম জীবনে দূর্ঘটনার শিকার হয়েও বেঁচে ছিলো অনেকগুলো বছর। যার জীবনীশক্তি ছিলো প্রবল। কিন্তু এ সমাজটা তার জীবনীশক্তি কেড়ে নিলো, বাধ্য করলো অকাল প্রয়ানে। ডিসেম্বরের বৃষ্টির মতোই খুব অল্পসময় নিয়ে ও এসেছিলো এ পৃথিবীতে। আবার চলেও গেলো। মাঝখানে সাক্ষাৎ পেল একজন নিঃস্বার্থ মানুষ বাবা,স্নেহমহী মা,নরপিশাচ গিয়াস, শ্বশুরবাড়ির কিছু হীনমন্য প্রাণী আর একটা বিষাক্ত সমাজের।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত