অতৃপ্ত চাওয়া

অতৃপ্ত চাওয়া
নীলার বয়স যখন সবে পাঁচ তখন তার বাবা ইহলোক ত্যাগ করে।স্বপ্নের মত সাজানো গুছানো সংসারটা যেন মুহুর্তেই লন্ডভন্ড হয়ে যায়।অভাবের সংসারে দুবেলা ভাতের নেশায় বাড়ি বাড়ি কাজ করত নীলার মা সুমিত্রা।বহু কষ্টে বড় করে একমাত্র মেয়ে নীলাকে।
এসএসসি পাশ করে কলেজের হাজিরা খাতায় নাম তুলেছে নীলা।যৌবনের ফুল ফুটেছে সবে।এরমধ্যেই পাড়ার কাকিমারা উঠে পরে লেগেছে তার বিয়ে নিয়ে।উজ্জ্বল ফরসা অার ছিমছাম গড়নের হওয়ার যে কারো চোখে পরে নীলা।রোজ একটা-দুইটা পাত্রের খোঁজ নিয়ে সুমিত্রার কাছে অাবদার জুড়ে পাড়ার কাকিমারা। নীলার সেজমাসী অাবার বিরাট বড়লোক। নীলার বিয়ে নিয়ে তাদের অাগাম চিন্তাভাবনা।পাত্র ঠিক করে রেখেছে।নীলার পছন্দ হলেই কথাবার্তা অাগাবে।বিয়ের যাবতীয় সব খরচের দায়ভার নিবে তারা।এমনকি বিয়েটাও তাদের বাড়ি থেকেই হবে। তারপর একদিন সেজমাসির বাড়িতে বেড়াতে গেল নীলারা।দুপুরে মাছ- মাংস দিয়ে খাওয়া দাওয়া করল।নীলা তখনো জানেনা কি ঘটতে চলেছে।খানিকক্ষণ পর কোথায় থেকে একটা মেয়ে এসে তাকে সাজিয়ে চলে গেল।ছেলেপক্ষের লোকজন এসে নীলাকে দেখল।পছন্দও হল তাদের।যাওয়ার সময় তার হাতে কিছু টাকা গুজে দিল।নীলার মতামত খুব একটা প্রাধান্য পেলনা।
সবাই চলে যাওয়ার পর নীলা তার মাকে বলে- মা কি হচ্ছে এসব? অামি এখন বিয়ে করতে পারবনা।সুমিত্রা মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে- দেখ, অামি ছেলের বাবা-মা’র সাথে কথা বলেছি খুব ভালো পরিবার।ছেলেও যথেষ্ট ভদ্র।তুই সুখে থাকবি দেখে নিস।এমন সুযোগ বারবার অাসবেনা মা। নীলা চুপ করে থাকে।ঘড়ির কাঁটা উল্টো গণা শুরু করেছে নীলা।মাত্র ১৪ দিন পরে তার বিয়ে।এর মধ্যে সে একবার বাড়িতে গিয়ে যাবতীয় কাপড়-চোপড় সব নিয়ে এসেছে।সে জানতে পেরেছে বিয়েটা এখান থেকেই হবে।এখানে কোনকিছুরই অভাব হচ্ছেনা নীলার।মুখ ফুটে কিছু চাইতেই নিয়ে হাজির করছে সেজমাসি।টাকা থাকলে বোধয় সবকিছুই সম্ভব।
এতকিছুর পরেও নীলার মনখারাপী কাটেনা।বিষন্নতার দুষ্ট চাদর তাকে মুড়ে রাখে সবসময়।যার সাথে সারাজীবন কাটাতে হবে সেই অপরিচিত লোকটা নীলার নাম্বারে ফোন দেয় মাঝেমধ্যে।ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হয় তাদের।কোন ভালো লাগার অনুভূতি জন্মায় না নীলার মনে।।মন ভালো করতে জানেনা লোকটা।নীলা ভাবে, লোকটা তার উপযুক্ত না লোকটার বদ স্বভাব অাছে কতগুলো।বাইরে থেকে নম্র ভদ্র দেখালেও ভেতরটা ময়লায় পরিপূর্ণ।কথাবার্তায় শালীনতা নেই তেমন।বিয়ে পরবর্তী কি হবে সেটা নিয়ে নোংরা নোংরা ইঙ্গিত করে।নীলার একদম শুনতে ইচ্ছে করেনা সেসব কথা।সে কিছুটা হলেও অান্দাজ করতে পারছে লোকটার ব্যাপারে।লোকটা নীলার মনের মত নাহ…..
কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে নীলার ঘোর কাটে।সেজমাসি নীলার একদম গাঁ ঘেষে দাঁড়াল।
– সেজমাসি অাপনি? ( নীলা অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল)
– হ্যাঁ। কি এত ভাবছিস বলতো…
– তেমন কিছুনা সেজমাসি।
– তুই না বললেও অামি ঠিক বুঝতে পেরেছি।বিয়ের অাগে সব মেয়েরই ওরকম একটু অাধটু মন খারাপ হয়।
অামারও হয়েছিল।তবে তোর মত নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে ভাবতে বসিনি। সেজমাসি ঠিকই ধরেছে।নীলা অাসলেই ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু বেশিই ভাবছে। ইদানিং রাতে ঘুমাতে পারছেনা নীলা।অজানা এক কষ্টে তার চোখদুটো ভারি করে তুলে।নীলা চেয়ার থেকে উঠে বসে।ব্যালকনিতে চেয়ার এনে বসাটা নীলার অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে।দিনের বেশিরভাগ সময় সে এখানটাই কাটায়।সেজমাসি খাবার টেবিল থেকে “নীলা, নীলা” বলে ডাকছে।নীলা খেতে যাচ্ছে তবে সে খাবার নীলার গলা দিয়ে নামবেনা।
নীলার পড়াশোনা এখন বন্ধপ্রায়।বইপত্র সব পড়ে অাছে নিজ বাড়িতে।কদিন অাগেও নীলা ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল নিয়ে বেশ মন দিয়ে পড়ছিল।এখন সেই চিন্তাটা অার মাথায় নেই।বাইরে বের হতে পারেনা নীলা, অাগের মত বেখেয়ালি চলতে পারেনা।নীলা ভাবে, বিয়ের অাগেই অনেক স্বাধীনতা হারিয়েছে সে না জানি বিয়ের পরে অারো কতকিছু হারাবে। ভাবনার একপর্যায়ে নীলার চোখ গেল মেইন গেইটের দিকে।একটা ছেলে বড় বড় দুইটা বালতি দুহাতে চেপে ধরে রিক্সার সিটে বসে অাছে।গেইট পেরিয়ে বাড়ির ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল রিক্সা।ছেলেটা রিক্সা থেকে একলাফে নিচে নামল।তারপর দুজনে দুইটা বালতি রিক্সা থেকে নামিয়ে রাখল।ভাড়া মিটিয়ে দিলে রিক্সায়ালা সুরসুর করে বেড়িয়ে গেল।
নীলা দেখেই বুঝতে পেরেছে এগুলো রঙের বালতি।ছেলেটা হঠাৎ উপরের দিকে তাকাতেই নীলার চোখে চোখ পড়ল।নীলা তখনো চোখ সরায়নি ছেলেটার দিক থেকে।কি অদ্ভুৎ চাহনি।অজানা এক শিহরণ বয়ে গেল নীলার সমস্হ শিরা বরাবর।অচিরেই হাসি ফুটল নীলার ঠোঁটে।নীলা ব্যলকনি ছেড়ে পালাল।ছেলেটা এখনো সেই ব্যালকনির দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে অাছে।নীলা অাড়াঅাড়ি হয়ে শুয়েছে বিছানার উপর। নীলা ছেলেটাকে অাগে কোথাও দেখেছে বলে মনে করতে পারছেনা।তবুও প্রথম দেখাতেই নীলার মনে হচ্ছে ছেলেটা কতদিনের চেনাজানা।যেন বহুদিন ধরে তাদের পরিচয়।ছেলেটার চোখে অাকাশ দেখতে পেয়েছে নীলা।ওই অাকাশে মুক্ত পাখি হয়ে বিচরণের স্বাদ জেগেছে নীলার মনে।নীলার মনখারাপী দূর হল নিমিষেই।নীলা ভাবে, ছেলেটারও কি তার মত অবস্হা হয়েছে..?
পরদিন থেকেই রঙ করার কাজ শুরু।ছেলেটা অারো দুইটা উঠতি বয়সের ছেলেকে সাথে নিয়ে এসেছে।তারা বাউন্ডারির দেয়াল পাথর দিয়ে ঘষছে।তাদের কাজ শিখিয়ে দিচ্ছে কালকের সেই ছেলেটা।নীলা ব্যালকনি থেকে সবকিছু নজর দিচ্ছে।ছেলেটা কাজের ফাঁকে ফাঁকে ব্যালকনির দিকে অাড়চোখে তাকাচ্ছে।যে চাহনিতে কোন নোংরামো নেই, নেই কোন বাজে ইঙ্গিত।অথচ নীলা এমন কাউকেই চেয়েছিল তার জীবনে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত