ফিরে আসো

ফিরে আসো
মাত্রই আমার স্ত্রীকে জমের মতো পিটিয়ে মকবুলের দোকানে বসে চা খাচ্ছি। আমার হাতে যদিও ব্যথা অনুভব করছি তাও এটা নিত্যদিনের ব্যথা বলে তেমন পাত্তা দিচ্ছি না। নিত্যদিনের বলতে, এরকম প্রায়ই আমার স্ত্রীকে একটু আধটু না পেটালে, শরীরের রাগ মনে হয় যেন কমে উঠে না।
ওহ বলে নেই, আমার স্ত্রী ফাল্গুনী। দেখতে শুনতে পরী না হলেও মোটামুটি চলে আর কি। কলেজ লাইফে খুব পছন্দ করতাম কিন্তু কেন যেন এখন ফাল্গুনীর তেমন কিছুই নজড়ে পড়ে না। ইচ্ছে না করলেও হাত উঠে যায় তার উপর। বাহিরের অন্য মানুষের সব রাগ আমি তার উপর ঝাড়ি। আর যদি ফাল্গুনী নিজে কিছু ভুল করে তাহলে তো কথাই নাই। মকবুলের দোকান এবং আমার বাসা পাশাপাশি থাকায়, দোকানে বসেই ফাল্গুনীর কান্নার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। সে আওয়াজে হয়তো কোনো জমে থাকা অভিযোগ, অল্প পরিমাণ রাগ, আমাকে জীবনসঙ্গী করার খুব বেশি আফসোস আর একটু ব্যথার অনুভূতি ভেসে আসছিলো। যা আমার কানে মোটেই না পৌঁছালেও মকবুলের কানে পৌঁছে গেছিলো অনেক আগেই। প্রতিদিনের মতো আজও মকবুল লেকচার দিলো –
~ ভাবীকে এভাবে যে পেটাস! তুই কি মানুষ নাকি অমানুষ। মেয়েটার সিজার হয়েছে এক মাস হলো। একটু মায়াও কি নাই তোর? কীভাবে কান্না করছে শুনেই মায়া লাগছে। আর তুই কিনা এখানে বসে দিব্বি চা খেয়ে যাচ্ছিস। আগে তো এমন ছিলি না তুই! কি হয়েছে তোর বল আমায়!
~ খুব বেশি দরদ লাগলে যা গিয়ে মলম লাগিয়ে দে। আর এতো লেকচার দিবি না। স্ত্রী আমার আমি যা খুশি করবো। তোর দোকানের চা খাচ্ছি এটা ভাগ্য তোর। যদি তোর সমস্যা হয় এই দোকানে আর আসবোই না। মকবুলের দোকান থেকে বাসায় এসে দেখি ফাল্গুনীর খুব কষ্ট হচ্ছে তাও বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে কান্না থামাচ্ছে। আমাকে দেখে সে অন্যরুমে চলে গেলো। বাচ্চা কান্না করছে শুনে মাথায় রক্ত উঠে গেল। আবার কতোক্ষণ চিল্লাতে থাকলাম। কেন একটা বাচ্চা সামলাতে পারে না। বাসায় তো আর কেউ নেই, একটা বাচ্চাকে সামলানো এ আর এমন কি! তিনদিন হয়ে গেল ফাল্গুনী প্রয়োজন ছাড়া কথা বেশি বলে না। আমিও তাকে বেশি একটা পাত্তা দিচ্ছিলাম না। হুট করেই ফাল্গুনী আমার কাছে এসে কান্না করতে করতে বলছে-
~ হিয়ার খুব ঠান্ডা লেগেছিল, আজকে একদম শ্বাস নিতে পারছে না, আপনি একটু তাড়াতাড়ি আমার প্রাণ টাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
বাচ্চার ঠান্ডা লেগেছে অথচ আমাকে কেন বলে নি সেটার জন্য একদফা পিটিয়ে, হিয়াকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। আমার কলিজা আমার মেয়ে তার কিছু হলে ফাল্গুনীকে শেষ করে দিবো মনে মনে এগুলাই ভাবছিলাম। কিন্তু তিন ঘন্টা পর ডাক্তার বললো বাচ্চা সুস্থ আছে এখন আর ভয়ের কিছু নেই। হিয়াকে নিয়ে বাসায় আসলাম। ফাল্গুনীকে খুব জোরে জোরে কাঁদতে দেখেও একটাবারের জন্য সান্ত্বনা দিতে ইচ্ছে হয় নি। বরং উল্টা আরও রাগ ঝেড়ে বাহিরে চলে গেলাম। এভাবে প্রায়ই ফাল্গুনীর উপর হাত তুলতে তুলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এটাকে আমি তেমন কিছুই মনে করছি না। আমার মাথায় একদমই ছিল না, ফাল্গুনীর সিজার হয়েছে মাত্র এক মাস গেল। যদি থাকতো তাহলে হয়তো আজকে আবার জঘন্যভাবে পেটাতাম না। খুব পেটানোর পরে চা খেতে হয় আমার কেন যেন এটা আমি না করলে শরীরের রাগ শেষ হয় না। চা খেতে আজকে মকবুলের দোকানে না গিয়ে অন্য দোকানে গেলাম। হঠাৎ করেই এক চাচা আমাকে দেখে বলতেছে-
~ রিদু তোমার বউ তো মরার পথে, তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় যাও।
কেন যেন কথাটা তেমন গুরুত্ব দেই নি। চা খেতেই আছি। এর ঠিক আধ ঘন্টা পর আমার পাশের বাসার এক চাচি এসে আমাকে বললো ফাল্গুনীর অবস্থা খুব খারাপ এখনি হাসপাতালে না নিলে মারা যাবে। আমি তাও তেমন গুরুত্ব না দিলেও ঠিকই বাসায় যাচ্ছি। বাসায় এসে ফাল্গুনীকে দেখে আমি চমকে গেলাম। ফাল্গুনীর পেটের সেলাই টা থেকে রক্ত গড়গড় করে বের হচ্ছে, আর ফাল্গুনী সেটা আটকানোর জন্য একটা বালিশ দিয়ে পেটে চাপা দিয়ে রেখেছে। আমি তাড়াতাড়ি ওকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিলাম, আর মকবুল কে বলে গেলাম আমার হিয়াকে যেন দেখে রাখে। রাস্তায় ফাল্গুনীর এই অবস্থা দেখে আমারই পরিচিত মানুষজন বলাবলি করছে-
~ কীভাবে যে ফাল্গুনী এই ছেলের ঘর করে আল্লাহ জানে। মেয়েটাকে মেরেই ফেলেছে মনে হয় একদম। মনে হয় না আর বাঁচবে। সিজারের পরপর এভাবে মারলে তো মেয়েটার মরার ই কথা!
আমার শরীরে শক্তি ছিল না একদম তাও অনেক কষ্টে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে সবাই জিজ্ঞাসা করছিলো কীভাবে এমন হয়েছে। আমি কি উত্তর দিবো ভেবেই পাচ্ছিলাম না। এতো বেশি গিল্টি ফিল হচ্ছিলো বলার বাহিরে। দেখলাম ফাল্গুনী নিজেই বলছে সে বাথরুমে পড়ে গেছিলো তাই এমন হয়েছে। কিন্তু কেউই তার কথায় বিশ্বাস করছিলো না। ফাল্গুনীকে যখন ভিতরে নিয়ে গেল আমি তার চোখের দিকে তাকাতেই পারছিলাম না।
সন্ধ্যায় ফাল্গুনীর মুখ একবার দেখতে দিয়েছিলো তাও তার সারা শরীর সাদা কাপড়ে ঢাকা ছিলো। রক্ত ছাড়া মুখ টার দিকে তাকাতেই বুকের ভিতর ধক করে উঠলো। কলেজ লাইফের হাসিমাখা চাহনির সেই ফাল্গুনী আজ নেই। আমার সামনেই চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে এবং এটার জন্য আমি নিজে দায়ী।
এতটুকুই মনে আছে, এরপর তেমন কিছুই মনে নেই। এখন কারাগারে বসে বসে প্রায়ই কান্না করি। আমার হিয়ামণি কে এক নজড় দেখার জন্য প্রাণ টা শুকিয়ে থাকে। কিন্তু কেউ একটা বারের জন্যও আমার হিয়াকে নিয়ে আসে না। কেনোই বা নিয়ে আসবে কারাগারে। নিষ্পাপ এই বাচ্চাটা কেন দুই মাস বয়সেই কারাগারের মুখ দেখতে আসবে।
আহা ফাল্গুনী! ফিরে আসবে না কি তুমি! আমার ভুলের মাফ আমি কার কাছে চাবো? এক টা সেকেন্ড এর জন্য আসো না ফিরে। শুধু একটা বার তোমাকে বলতে চাই, মাফ করে দিবা তো? তোমার হিয়া কে ও দেখে রাখতে পারছি না। আর যাই করো তোমার হিয়ার জন্য হলেও ফিরে আসবে কি ফাল্গুনী? তোমার চোখ গুলা আরেকটা বার খোলা দেখতে খুব মন চায় প্রিয়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত