বাবা

বাবা
যখন থেকে আমার বোঝার বয়স হয়েছে তখন থেকেই আমি আমার বাবাকে প্রচন্ড রকম ঘৃণা করে এসেছি। কিন্তু আজ যখন আমার বান্ধবীরা তাঁর বন্ধুদের দ্বারাই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তখন মনে হচ্ছে আমার বাবাই পৃৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। তাঁর মতো বাবা হয় না।
ফ্ল্যাশব্যাক, আমার যখন সাত বছর বয়স তখন থেকেই আমার বাবা আমাকে সবসময় তাঁর চোখে চোখে রাখতেন। কখনো আমাকে একা ছাড়তেন না। প্রথম প্রথম খুব ভালো লাগতো। বাবা নিজে স্কুলে নিয়ে যেতেন আবার তিনি নিজেই স্কুল থেকে নিয়ে আসতেন। কিন্তু আম্তে আস্তে বাবার এতো বেশি কেয়ারটা আমার কাছে বিরক্তিকর মনে হতে লাগলো। আমার ইচ্ছে ছিলো যৌথ স্কুলে পড়বো কিন্তু বাবা জোর করেই গার্লস স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আমার কোনো ছেলে বন্ধু ছিলো না। এটার জন্য দায়ী করতাম আমার বাবাকে। তিনি আমাকে ছেলে তো দূরে থাক ক্লাস টাইম বাদে কখনো কারো সাথে কথা বলতে দিতো না,ঘুরতে যেতে দিতো না। যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম তখন দেখতাম আমার বান্ধবীরা একা একায় অনেক জায়গায় ঘুরতে যেতো। কিন্তু আমার কখনো সেরকম সৌভাগ্য হয়নি। খুব বেশি জায়গায় ঘোরা হয়নি। তবে যেখানেই গিয়েছি আমার সাথে আমার বাবা আঠার মতো লেগে থাকতো।
মাঝে মাঝে নিজেকে খাঁচায় বন্দী পাখি মনে হতো। পাখিরা যেমন ডানা মেলে স্বাধীনভাবে নীল আকাশে উড়ে বেড়ায়। আমারও খুব ইচ্ছে করতো মুক্ত পাখির মতো, ঠিকানাবিহীন পাখির মতো দিক বেদিক হয়ে ঘুরে বেড়াই। কিন্তু আমার বাবার কারণে কখনো সেটা পারতাম না। আমি এসএসসি পাশ করার পর ভালো একটা কলেজে চান্স পাওয়ার কারণে ওখানেই ভর্তি হই। ছেলে মেয়েদের যৌথ কলেজ বিধায় বাবা প্রথমে খুব আপত্তি করেছিলেন। পরে কি মনে করে জানিনা আমাকে ওখানেই ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কলেজে উঠার পরেও বাবা আমার সাথে বাচ্চাদের মতো ব্যবহার করতেন। আগে যেমন আমাকে স্কুলে রেখে আসতেন আবার স্কুল ছুটি হলে নিয়ে আসতেন। ঠিক এখনও তেমন করেন। আমার বান্ধবীরা সবাই হাসাহাসি করতো এই বিষয়টা নিয়ে। আমি বাবাকে অনেক বুঝাতাম আমি এখন আর বাচ্চা নই। আমি একাই যাওয়া আসা করতে পারবো।
কিন্তু বাবার কথা ছিলো। তাঁর কোনো কাজ কাম নেই। চাকরি থেকেও অবসর নিয়েছেন। আর মেয়েদের জন্য নাকি বাবাদের সবসময় চিন্তা হয়। তাই তিনি আমার সাথেই থাকতেন সবসময়। আমি কখনো বান্ধবীদের সাথেও ঘুরতে যেতে পারতাম না। ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই বাবা আমার জন্য এসে বসে থাকতেন। আমি আমার আঠারো বছরের জীবনে কোনোদিন সন্ধ্যার পর বাহিরে বের হয়েছি কিনা আমার মনে নেই। আমার বান্ধবীদের অনেক ছেলে বন্ধু ছিলো। তারা তাদের সাথে ঘুরতে যেতো,রাতে ফুসকা খেতো। সিনেমা দেখতে যেতো। ক্লাস টাইম শেষে আমার সব বান্ধবীরা এনজয় করতো। আর আমি বাসায় চার দেয়ালের মাঝে বন্দী থাকতাম।
আমার সমবয়সী মেয়েরা দেখতাম কতো স্মার্ট। তারা শার্ট,প্যান্ট,গেঞ্জি পড়ে খোলা আকাশের নিচে ঘুরে বেড়াতো। কতো সুন্দর লাগতো তাদের। আমার হিংসা হতো তাদের দেখে। আমি যে সুন্দরী ছিলাম না তা কিন্তু না। আমিও অনেক সুন্দরী একটা মেয়ে। কিন্তু আমার পোশাক আশাক সব সেই প্রাচীন কালের। একারণেই হয়তো কোনো ছেলে আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইতো না। যদিও এটার জন্য আমার বাবাকেই আমি দায়ী করি। কারণ সেতো সবসময় আমার আশেপাশেই থাকে। আর কোনো ছেলে মনে হয়না কোনো বাবার সামনে তাঁর মেয়ের সাথে কথা বলতে চাইবে কিংবা কথা বলার সাহস পাবে।
দেখতে দেখতে আমি ভার্সিটিতে পা দিলাম। ভেবেছিলাম এখন হয়তো আমি নিজের ইচ্ছে মতো চলতে পারবো। জীবনে ফ্রিডম জিনিসটা কি বুঝতে পারবো। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। ভার্সিটি জীবনেও আমার ব্যক্তিগত জীবনে পরাধীন ছিলাম আমি। তারপরেও বান্ধবীদের সাথে মাঝে মাঝে একটু ঘুরতে যেতাম বাবার অগোচরে। একদিন আমার বান্ধবীরা ঠিক করলো তারা ঘুরতে যাবে। তবে সেটা ভার্সিটি থেকে নয়। আমাকে যখন আমার বান্ধবী বলল তারা দুজন আর তাদের পাঁচজন ছেলে বন্ধু আছে তারা সবাই মিলে ঘুরতে যাবে। তখন আমার কেনো জানি একটু ভয় কাজ করছিল। তাই আমি বান্ধবীকে জিগ্যেস করেছিলাম। আমরা তো তিনজন, যদিও আমি যেতে পারবো কিনা জানি না। আর পাঁচ জন ছেলের সাথে একান্তে ঘুরতে যাবে? যদি কোনো কিছু হয়?
– আরে দোস্ত এটা ২০২০ সাল। এটা নিয়ে কেউ চিন্তা করে? আর ওরা আমাদের খুব ভালো বন্ধু। তবে তুই গেলে ভালো মজা হবে। যেদিন ওরা ঘুরতে গিয়েছিল সেদিন ভার্সিটি বন্ধ ছিলো। তাই আমি তাদের সাথে যেতে পারিনি। হাজারবার রিকুয়েস্ট করার পরেও বাবা আমাকে ওইদিন ঘুরতে যেতে দেননি। বলেছিল ছেলেদের সাথে কিসের এতো ঘুরাঘুরি? ওইদিন বাবার সাথে রাগ করে কথা বলিনি। দুইদিন বাবার সাথে কোনো কথা বলিনি। দুইদিন পর হঠাৎ আমি আমার একটা বান্ধবীর ফোন পাই। হ্যালো
– সরি,আমি ওইদিন তোদের সাথে যেতে পারিনি। যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিলাম বাট পারিনি।
– না গিয়েই ভালোই করেছিস।
– কিভাবে ভালো করলাম? তোরা কতো মজা করলি আর আমি বাসায় বসে বন্দী দিন কাটালাম।
– ওরা পাঁচজন মিলে আমাদের দুজনের ওপর অনেক নির্যাতন করেছে। আমাদের কে ধর্ষণ করেছে। যাদের কে এতো বিশ্বাস করেছি তারাই আমাদের কতো বড় সর্বনাশ করলো।
– কি বলছিস?
– হ্যাঁ ঠিকই বলছি।
কিন্তু এই কথাগুলো কাউকে কোনোদিন জানাতে পারবো না,বিচার চাইতে পারবো না। কারণ আমরা নিজেরাই তো ওদের সাথে একান্তে ঘুরতে গিয়েছিলাম। ফোনটা রেখে দিয়ে ভাবছি। এই কথাটা হয়তো ওই পাঁচজন ছেলে,আমার বান্ধবীরা আর আমি বাদে কখনো কেউ জানতে পারবে না। জানতে পারবেনা দুইটা মেয়ে নিজেদের ইচ্ছাতেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আজ খুব করে বাবার কথা মনে পড়েছে। বাবার সাথে কথা বলি না দুইদিন হলো। খুব ইচ্ছে করছে বাবাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলতে, সরি বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিও। তুমিই পৃৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত