কেক

কেক
পুরান ঢাকায় জন্ম আমার। আমার ছোট্ট ভাই সাজু আমার থেকে চৌদ্দ বছরের ছোট। এতো বছরের ছোটো আমার ভাই তাই বন্ধু বান্ধব হাসি তামাশা করত। গায়ে লাগত না কখনো। খুশিই হতাম আমি কিছুটা। তখন বাবা-মা একটু লজ্জা পেতো। ওকে যখন অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে আনে আমি আর আব্বা খুশিতে লাফিয়ে উঠেছিলাম। এতো সুন্দর সাদা বল আমার ভাই। মায়ের গায়ের রং সুন্দর। ভাইটা আরো ফুটফুটে।
কিছুদিনের মধ্যে সে বেশ গোলগাল হয়ে গেল। আরো সুন্দর লাগত দেখে। ও হবার পর মা খুব অসুস্থ হয়ে যায়। ওকে দেখে রাখার দায়িত্ব পড়ে আমার উপর। ওকে পরিষ্কার করা, সময় মত খাইয়ে দেয়া, ঘুমিয়ে থাকলে পাশে বসে থাকা ইত্যাদি। নিজের ভাইয়ের উপর মায়া ব্যাপারটা ছাড়াও তাকে দেখে সবাই আদর করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। ভাইটা আমার গোলাপি তুলতুলে গালওয়ালা। মাথায় কোঁকড়ানো চুল, গোল গোল চোখ, একদম একটা পুতুলের মতো। কথা বলতে শিখার পর অনেকদিন পর্যন্ত” র ” কে “ল ” বলত। বাকি সব স্পষ্ট। আমার মা সাজু হবার পর কোরান পড়তেন মাগরিবের নামাজের পর। সূরা আর রহমান এর যখন “ফাবি আয়ী আলা ই রাব্বী কুমা তুকাজজীবান” আসতো আমার ছোট ভাই টা আম্মার সাথে বলে উঠত “লাব্বী কুমা তুকাজজীবান”। প্রতিবার সে মা বলার আগেই বলে উঠত। হাঁটা শুরু করল যখন থেকে ওর পছন্দের জামা ছিল পাঞ্জাবী।
ওইটুক মোটুসোটু ছেলে সাদা পাঞ্জাবী পায়জামা পরে থাকবে। যেকোনো গম্ভীর মানুষ তাকে দেখে হেসে দিবে না এমন কখনো হয় নি। রাতে মাঝেমধ্যে বুকে উঠে শুয়ে পড়তো কোনোভাবে নামানো যেতো না। অনেক আদরের ও আমার। কোনো কারণে আমাকে মা বকলে সাজু মাকে চিৎকার করে বলতে থাকতো” চুপ কলো চুপ কলো” ওকে কেউ কিছু যখন দিত, বলত “আমাল এটা?” “ভাইয়াল টা কই?” আমার জামা কাপড় এর মত জামা কাপড় তার পড়তে হবে না হলে কান্নাকাটি শুরু করতো। বাবা বেশ পয়সার মালিক ছিলেন। অনেক অকারণ বিলাসিতা ছিল পরিবারে। যেমন প্রতি সপ্তাহে বড় কোনো রেস্টুরেন্টে যাওয়া, অকারণ অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, প্রতি বছরে নতুন মডেলের গাড়ি, অনেক টাকা টিফিন বাবদ আমাকে দেয়া, একসময় পুরো পরিবার এসব বিলাসিতার উপর নির্ভরশীল হয়ে গেলাম।
বাবা খুব শক্ত মানুষ ছিলেন…আমিও তাই। স্কুলের স্যারের মার, কেউ অকারণ অন্যায় ভাবে দোষ দিলে চুপ করে থাকা। অনেক দুঃখ পেলেও কাউকে বুঝতে না দেয়াটা সম্ভবত রক্তে ছিল। একবার ক্রিকেট বল লেগে হাতের দুই আঙুল ভেঙে গেলো চোখ দিয়ে পানি পড়লো না। খুব বেশি হলে উফ মা গো” পর্যন্ত। পরিবারের সবাই আমাকে রোবট ডাকতো। কষ্ট পেয়ে কান্না করাটা এমন না যে ইচ্ছা করে আটকে রাখতাম। পারতাম না অনেক চেষ্টা করেও। সাজু যখন প্রথম স্কুলে যায় আমাকে বলেছিল তার ক্লাস রুমের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভাই আমার একটু পরপর আমার দিকে তাকিয়ে দেখছিল। হঠাৎ কি কারণে যেন একটু দূরে গেলাম দেখি ক্লাস থেকে জোরে চিৎকার করছে “ভাইয়া-ভাইয়া” বলে। বেশ কিছু দিন সময়ে লেগেছিল ওকে বোঝাতে। “ভাইয়া, এইখানে থাকলে কি হয়?” এরকম কিছু আদর মাখা প্রশ্ন করতো তাকে বোঝানোর সময়।
আমার বেড়ে উঠার সময়টা ক্রিকেট নির্ভর ছিল। আমার বয়সে কেউ ক্রিকেট খেলবে না এটা অসম্ভব। আমিও খেলতাম তবে গলির মুখে না। প্রফেশনাল ক্রিকেট খেলতাম। ফাস্ট বোলার হতে চাইতাম। আমার উচ্চতা ৫ ফিট ৯ ইন্চি। বংশের কারণে সাধারণ মানুষদের থেকে আমাদের গায়ে জোর বেশি। স্কুলে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যের ছেলেটা কে কাঁধে নিয়ে দৌড়াতে পারতাম। সোয়েব আকতার নইলে ব্রেট লি হতে হবে এটাই জানতাম। কোচ অনেকবার গতি কমিয়ে টেকনিক এ মনোযোগী হতে বলত। আমি ভাবতাম স্ট্যাম্প ভেঙে ফেলার কথা। পকেট ভর্তি টাকা। গায়ের জোর আর অনেক বন্ধু-বান্ধবের কারণে আমি বেশ রাগী ছিলাম টিনএজ বয়সে। অনেকবারই ব্যাটসম্যানকে অকারণে ইনজুর করেছি।আফসোসতো দূরে থাক কখনো মন খারাপও হতো না। অনূর্ধ্ব-১৬ খেলব দেশের হয়ে স্বপ্ন ছিল। অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে আসতে পেরেছিলাম। পরে সিলেক্ট হতে পারিনি।পারিনি কারণ পায়ের বৃদ্ধা আঙুল ভেঙে যায়। দৌড়াতে খুব কষ্ট হত আর গতিও কমে যায়। পরের দিকে মন চাইতো না খেলতে। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি প্রেমটা এখনও রয়ে গিয়েছে।
বয়স যখন আঠারো তখন প্রেম টাইপ কিছু একটা হলো অল্প কয়দিনের জন্য। তারপর খুব স্বাভাবিক টাইপ ব্রেক আপ। তেমন কষ্ট পাইনি আর হয়ত কষ্ট পেলেও অনুভব করিনি। এই বয়সে সবাই নাকি প্রেম করে। তাই রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। তার উপর আমার কোন রাগ নেই কিন্তু আমার উপর রেগে থাকার কথা। সত্যি বলতে আমি দুঃখিত না। তখন সম্পর্কে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সম্পর্কের প্রথম দিকে আমার সব কিছুই তার ভালো লাগতো আর পরে আমার কিছুই ভালো না…এটা কি ধরনের ভালবাসা, এসব বোঝার ক্ষমতা ওই বয়সে ছিল না এখনো নাই। বেশিরভাগ সময়েই ঝগড়া লেগে থাকত। তখন নিজের স্বাধীনতাটাই সবচেয়ে প্রিয় ছিল। সাজুটা বাসায় ঢুকলে অদ্ভূত প্রশ্ন করত। যেমন “ভাইয়া, কেউ যদি তোমাকে বলে তুমি কি খেতে ভালোবাসো, তুমি কি বলবা?” আমি বললাম, “বিরিয়ানি…”
“কিন্তু কেক তো বেশি মজা…”
“হ্যাঁ, কিন্তু আমি বিরিয়ানি বেশি পছন্দ করি।”
“না…কেক পছন্দ করলে কি হয়?”
আমি চুপ করে থাকতাম। তারপরে কেক নিয়ে আসতাম। ওকে কোলে বসিয়ে খাইয়ে দিতাম। ওর কেক খাবার সময়ে চোখ বন্ধ হয়ে যেতো। অসাধারন একটা দৃশ্য। যদি বলতাম,”আমাকে একটু দিবে?” তাড়াতাড়ি খেয়ে বলত, “শেষ, নাই তো আর আবার মাঝেমধ্যে এসে বলতো,”ভাইয়া, তোমার যদি অনেক মায়া লাগে তাহলে কি আমাকে কেক এনে দিবা?” আমি উত্তর দিতাম, “না।” জানতাম এখন ও এমন একটা চেহারা বানাবে যার জন্য পৃথিবীর সব কিছু করা যায়। কেক না এনে বসে থাকবে এই সাধ্য হয়তো কোনো মানুষের নেই। একদিন সকালে বলে, “ভাইয়া, পৃথিবী ঘুরছে জানো?”
“হ্যাঁ, জানি।”
“মাথা ঘুরায় না?”
“না তো।”
“মাথা ঘুরালে কি তুমি ভয় পাবা?”
“না।”
“ভয় পেলে আমাকে বলবা কিন্তু।”
“অকে বলব।”
এই ধরণের আজব সুন্দর কথা বলতো। মায়া তে মন ভরে যেতো। বয়স তখন কুড়ি হবে। বুঝলাম বাবার ব্যবসা খারাপ। বাবা কিছু বলতোনা কিন্তু অনেক কিছু পরিবর্তন হতে লাগলো। ইউনিভার্সিটিতে খরচের টাকা কম দিতে চাইতো। মেজাজ খারাপ হতো।
কারণ, অভ্যাস হয়ে গেছে অনেক খরচের। ফাস্টফুডে বন্ধুদেরকে নিয়ে যাব না ডেইলি এটা ভাবতেই পারতাম না। কোন বন্ধুর বার্থডে পার্টিতে বড় অংকের টাকা খরচ করব না এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হতো। বন্ধু কমে যেতে শুরু করলো। খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ তেমন খোঁজ নিত না। সব বদলে যেতে শুরু করলো। সাজুর বয়স ৬/৭ হবে তখন। মাত্রই সে রাগ করে না খেয়ে থাকা শুরু করেছে। তাকে সব কিছু সবার আগে দিতে হবে। সবচেয়ে সুন্দর সাইকেল ওর থাকবে। বিভিন্ন গেমস, বড় টিভি ওর জন্য, এসি রুমে ও বড় হবে, ওর কথামতো সব হতে হবে এটা শুধু ওর না আমার পুরো পরিবার এর অভ্যাস ছিল। সবাই কেমন যেন মনেমনে চাইতাম যে ও কিছু একটা আব্দার করুক। কে কার আগে ওই আব্দার পূরণ করবে এ নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হতো। তবে এটাও ঠিক কেক ছাড়া তেমন কিছু সে চাইতো না। ওকে সবকিছু চাওয়ার আগে আমরা নিজে থেকেই দিতাম।
আমি যখন থার্ড সেমিস্টারে পড়ি বাবা আমাদের ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেলেন কিছু না বলে। ব্যবসা খারাপ হবার কারণে তিনি বেশ কিছু টাকা ধার নেন। সেটা ফেরত দিতেই টাকা সব শেষ হয়ে যায়। ব্যবসার চাপ বাড়তে থাকে যা একসময় তার সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়। খুবই চুপচাপ মানুষ ছিলেন বাবা। আমাদের কাউকেই তার সমস্যার কথা বুঝতে দেন নি। টাকা যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য এটা বুঝতে দেরি হয়নি আর। কেন চলে গেলেন কোথায় গেলেন আসবেন কবে একদম কিছুই বলে যাননি। একদিন রাতে আর ফেরত আসলেন না। অনেক খোঁজাখুঁজি করলাম। সব হাসপাতাল ও আত্মীয়দের বাসায় খোঁজাখুঁজি করলাম কোথাও নেই। সারারাত আমি গাড়ি নিয়ে সব সম্ভাব্য জায়গায় গেলাম কোথাও খোঁজ পেলাম না। আমাদের খারাপ সময় শুরু হল। সেদিন মা অনেক কাঁদলো। মন খুব খারাপ হল দেখে। কাঁদতে চাইলাম আমিও। পারলাম না কিছুতেই…মাথা নিচু করে রুমে ঢুকে সাজুকে দেখলাম কি যেন লিখছে। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “রাত এ খেয়েছ ঠিক মতো?”
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেই জিজ্ঞেস করলো, “আব্বু কি বিদেশে গেছে?” বললাম, “হ্যাঁ।” কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেলো বুঝে গেলাম, আব্বা আর নেই। আমাদের বাসায় কোন টাকা রেখে যাননি তিনি। আম্মা কখনো কোনো টাকা জমাতেন না। প্রয়োজন হয়নি। বাসার গাড়িগুলো আব্বা আগেই বিক্রি করে গিয়েছিল। এরমধ্যে গাড়ির মালিকরা এসে গাড়ি নিয়ে গেলো। আমাদের আর কিছুই ছিল না। আম্মার কাছে টাকা যা ছিল প্রায় সব শেষ হয়ে যায় একসময়। গয়না বিক্রি শুরু হয়। কিছু টাকা দিয়ে তিনি ড্রেস বিক্রি ব্যবসা শুরু করেন। খুব অল্প টাকা দিয়ে আমার পরিবার চলত। আমি বাসার বড় ছেলে। আমি আর আম্মা আমরা দুইজন একটু কম খেতাম যেমন ভাত ডাল আর অন্য তরকারি। কিন্তু সাজু কে কিচ্ছু বুঝতে দেইনি।
ওর জন্য আলাদা রান্না হতো। আর বাকি সব ঠিক আগের মতই থাকলো। মাকে খুব করে অনুরোধ করেছিলাম যেন এইভাবে থাকে সবকিছু। আমাদেরকে যেকোন উপায় সাজুকে সব সুখ-সাচ্ছন্দ্য দিতে হবে। যেহেতু ক্রিকেট খেলতাম, পড়াশুনাতে মনোযোগ কম ছিল কিন্তু খারাপ কখনোই ছিলাম না। চাকরি বা অন্যকিছু করার কথা ভাবার সময় পাইনি এর আগে। যার পকেটভর্তি টাকা থাকে, তার হয়তো খুব তাড়াতাড়ি কিছু একটা করতে হবে এমন মানসিক পূর্ণতা দেরিতে আসে। সেমিস্টারের টাকা দিতে না পারায় আমাকে বের করে দিলো ইউনিভার্সিটি থেকে। অপমানে খুব কষ্ট পেলাম। সবার সামনে এই অপমানটা সহ্য কিভাবে করেছিলাম এখনও তা জানিনা। সত্যি সেদিন ভেবেছিলাম কাঁদতে পারলে ভালো হতো। পারি নি। খুব হিংসা হতো মায়ের উপর। কষ্ট পেলেই কেমন কেঁদে হালকা হয়ে যায়। সেদিন বাসায় এসে রুমে ঢুকতেই সাজু জিজ্ঞেস করলো,
“ভাইয়া, আব্বু কি মারা গেসে?”
“জানিনা।”
“মারা গেলে কি কবর দিতে হয় না?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে মনে হয় বেঁচে আসে।”
“জানিনা।”
“জানো, আমাকে স্কুলে মিস জিজ্ঞেস করসে আব্বু কি করে?”
“তুমি কি বলেছ?”
“বলেছি আব্বু চলে গেসে।”
সাজুর এই সাধারণ উত্তরটা আমার কাছে অনেক বড় কিছু। আমার সব কষ্ট হাসি মুখে নিতে শিখে গেছি ততদিনে।
লাইট অফ করে শুয়ে পড়লাম। রাতেই ভাবলাম আমার কিছু একটা করতে হবে।যেভাবেই হোক। সকালে উঠেই কাজ খুঁজতে বের হবো ভেবে রেখেছিলাম। কেউ দিবে না চাকরি জানতাম কিন্তু আমি জানি কাজ আমার লাগবেই। সব জায়গায় যেয়ে খুব অনুরোধ করলাম কাজের জন্য। একদম প্লিজ আমাকে একটা চান্স দেন ধরণের অনুরোধ করলাম। এক সপ্তাহের মধ্যেই কাজ পেলাম। বেতন ৩,০০০ টাকা। দয়া করে দিলো চাকরিটা। বেতন খুব কম কিন্তু একটা শুরুতো হল তাই খুশি হয়েই কাজ শুরু করলাম। আসার সময় ভাইয়ের জন্য কমদামি চকোলেট আনতাম দেখে বলতো, “এহ্, এটা আমি খাই না পরে আবার নিয়ে খেয়ে ফেলতো। চকোলেট খাওয়ার সময়ে জিজ্ঞেস করতাম, “তুমি নাকি খাবে না?”
হিহি করে হাসি দিয়ে বলতো আমি তো দুষ্টামি করেছি। ওর ইংলিশ স্কুলের খরচের টাকা আমি আর মা মিলে খুব কষ্ট করে জোগাড় করতাম। দামি ইংলিশ স্কুলে পড়ে ও। আর ও এখানেই পড়বে এটা একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম আমি। জেদের বশে নেয়া সিদ্ধান্ত। চাকরি বদলে ৫,০০০ টাকা পাই ৬ মাস এর মধ্যে। ভাইয়ের স্কুল খরচ আর টিফিন সব আগের মত হতে হবে। গাড়িতে নিতে পারবো না তাই সিএনজিতে নিব। আর ফেরার পথে হেঁটে চলে আসবো এভাবে আমার জীবন। ওকে স্কুলে নামাতে যাবার সময় দৌড়ের জুতা পরে যেতাম। ধানমন্ডি থেকে পুরান ঢাকা দৌড়ে চলে আসতাম। মা নাস্তা দিতো খেয়ে কাজ এ যেতাম। মা আবার ওকে নিয়ে আসত। এরমধ্যেই সাজুর জ্বর হল। ভাই আমার পোলাও খেতে চায় জ্বর হলে। পুরান ঢাকাইয়া রক্ত ওর মাঝে আছে। মাকে রান্না করতে বললাম। আম্মা মুখ কালো করে বললো এতো কিছুতো নাই। তখন বসের কাছে ফোন করে কিছু টাকা নিয়ে পোলাওয়ের ব্যবস্থা করলাম।
টাকার কষ্টে মন খারাপ হতো। খুব একা লাগত। কাউকে কিছু বলতে পারতাম না। আর বলে কি লাভ। কেউ বুঝবে না এটা। আমার বয়সী সবাই তখন এত কঠিন বাস্তব বুঝে উঠতে পারবে তা ভাবলে বোকামি মনে হতো। মাসের শেষে টাকা শেষ হয়ে গেলে কষ্ট বেড়ে যেতো। মা বুঝতে দিত না টাকার দরকার। কখনো কাঁদি নি। কাঁদতে পারি নি। কিছু অনুভূতি হয়তো সবার ভাগ্যে হয় না। আর ততদিনে আমি আরো শক্ত হয়ে গেলাম। আমার পৃথিবীটা শুধু টাকা, মা আর ভাই এতটুকু জানতাম। বছর পার হবে প্রায়। যুদ্ধ চলছে জীবনে। কাজ করছি পাগলের মত টাকার জন্য। আর ছোট ভাইটার জন্য। একদিন ভাইটা এসে বললো, “ভাইয়া, স্কুলে যাব না তিনদিন।”
“কেনো?”
“এমনিই।”
“ওমা, তোমার তো সব ঠিক। কেনো যাবা না?”
“না।”
“আমার ভালো লাগছে না। তিনদিন পর যাব।”
“কেন?”
“প্লিজ, তিনদিন পরে আমি সব সময় যাব। কোনদিন না করব না।”
“আমি কিছু বুঝলাম না।”
“তোমাকে স্কুলে কিছু বলেছে?”
“না।”
“সাজু মিথ্যা বলতে পারে না। কিছু হলে বলতো।”
মা কে জিজ্ঞেস করলাম যে ও কেনো স্কুলে যাবে না। মাও বললো যে সাজু মা কেও একই কথা বলেছে। একটু আজব লাগলো কিন্তু ওকে না করব এটা সম্ভব না। রাজি হয়ে গেলাম। পরদিন বাসায় এসে মনে পড়লো আগামীকালতো ১৮ই অক্টোবর। সাজুর জন্মদিন। এবার ৭ হবে ওর। ভাইটা কেক খুব পছন্দ করে। কিছুদিন আগে ছিনতাই হবার কারণে পকেটে খুব কম টাকা আমার। তবে, অল্প কিছু জমানো আছে। ওর জন্য বড় কেক কিনব এটা ভেবেই টাকা জমিয়ে রেখেছিলাম।
এটিএম মেশিনে ৪,০০০ টাকা ব্যালান্স দেখে আমি অনেক খুশি। কিভাবে ৪,০০০ টাকা জমে গিয়েছে টের পাইনি। বড় সাইজের কেক কিনব। আমি, মা আর ভাই একসাথে খাবো। ছোট করে কিছুটা কেটে সাজুর স্কুলে পাঠাবো। সব প্ল্যান মাথায় চলে আসলো। বাসায় যাবার পথে পোলাও চাল আর মুরগি কিনব যদি টাকা বেঁচে যায়। খুব সম্ভবত কিছু টাকা থাকবে কেক কিনার পর। কতদিন সাজুকে কেক খেতে দেখি না। টাকা না বাঁচলেও কোন অসুবিধা নেই। এই পুরো টাকাটাতো সাজুর কেকের জন্যই জমানো। এটা দিয়ে কেক কিনলে কোনো দুঃখ নাই। টাকা তুলে বাসায় ফিরলাম। সাজুকে বললাম, “ভাইয়া, চলো তো ঘুরে আসি।” সাজু বললো, যাবে না। আমি ওকে খুব আদর করে বললাম, “চলো না ভাইয়া, এই বেইলি রোডে যাব আর আসবো..”
“কেন?”
“এমনিই।”
“না যাব না।”
“চলো প্লিজ…আমি তোমাকে কত আদর করি না?”
“কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বললো,”চলো।”
ওকে নিয়ে চলে গেলাম একটা ভালো বেকারিতে। দোকানে ঢোকার আগে বললো,”কই যাও?”
আমি বললাম, “কেক কিনব। আমার সাজু ভাইয়াটার জন্মদিন না?”
দেখি হাত শক্ত করে আমাকে পিছনে টানতে শুরু করেছে। আমার রাগ হল একটু। নিজেকে সামলে বললাম,
“এগুলো কি? আসো এখানে।”
ও ভয় পেয়ে ঢুকলো দোকানে। বললাম, “যাও, তোমার যেই কেকটা পছন্দ ওইটা কিনো।” যেয়ে প্রথমে একটা পেস্ট্রিকেক দেখালো। বললাম,”বড় কেক নাও। ছোটো কেক কিনব না আজকে। মাকে আর আমাকে দিবে না তুমি?” রাগ হবার কারণে আমার কন্ঠ ভারী হয়ে যায়। যদিও তখন রাগ আর নেই কিন্তু স্বাভাবিক কন্ঠে ফিরে যেতে সময় লাগে। সাজু আমার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল আমি কি রেগে আছি নাকি।বুঝে উঠতে পারেনি। কারণ, ও কোন কথা বলছিল না। দেখলাম দোকানের পুরোটা ঘুরে দেখতে লাগলো। আমার থেকে একটু দূরে যেয়ে সেলসম্যানকে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা কি?”
“মুজ কেক।”
“কত দাম?”
“১,২০০ টাকা।”
“আপনাদের কি অনেক দাম?”
“না তো।”
“আপনাদের সবচেয়ে কমদাম কোনটা?”
এইটুকু বাচ্চার মুখে এই প্রশ্ন শুনে সেলসম্যান খুব অবাক হয়ে সাজুর দিকে তাকিয়ে থাকল।
“বলেন না….কোনটা কম দাম?”
“এই যে এইটা।”
“কত দাম?”
“৭০০ টাকা।”
“আরো কম নাই?”
“না, এটা সবচেয়ে কম।”
খুব সম্ভবত কয়েক মিনিটের জন্য আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়। ও কমদামি কেক কেন খুঁজছে? আমরা তো ওকে কিছু বুঝতে দেইনি। সেইদিন আমি সেখানে দাঁড়িয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। অনেক চেষ্টা করেও আটকাতে পারছিলাম না। অনেক কষ্টে চোখের পানি দ্রুত মুছে ফেলতে লাগলাম যেনো সাজু না দেখে ফেলে। টিস্যু পেপার দিয়ে একটু পরপর মুখ মুছতে লাগলাম। ভাই আমার স্কুলে যাবেনা কারণ স্কুলে সবাই কেক খেতে চাইবে। আমার কিনে দিতে কষ্ট হবে তাই দোকানের সবচেয়ে কমদামি কেক সে নিবে। এইটুক ছেলে এত কিছু বুঝে।
আমরা তো কখনো ওর সামনে কিছু বলিনি। যতোটুক পেরেছিলাম ওকে বুঝতে দেই নি। আমরা ব্যর্থ। টাকা দেয়ার সময় সাজু বললো, “ভাইয়া, কেক ভালো লাগে না।”
আরো কাঁদতে লাগলাম। রিকশায় ফেরত আসার সময় অন্যদিকে মুখ ফিরিয়েছিলাম। ছোট্ট ভাইটা যেন আমাকে কাঁদতে দেখে না ফেলে। ভাই আমার বড় চাকরি করে এখন। দামি একটা ফোন কিনে দিয়েছে আমাকে। প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, “কেক খাব নাকি?” আমার অনেক কান্না পায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত