সময় অসময়ের টাকা

সময় অসময়ের টাকা
পারুল আমার দিকে বালিশ ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “খবরদার, তুমি আমার কাছে শুইতে আসবা না।” আমি কিছুই বুঝিনি এমন ভান ধরে জানতে চাইলাম, কী হইছে পারু? পারুল শোয়া থেকে উঠে বসল। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। কুপির আলোয় তার চোখের ছলছল পানি চিকচিক করছে। গভীরভাবে তাকালে পারুলের দুই চোখের ভিতর কুপির আগুন দেখা যায়। আশেপাশে শুকনো কাঠ, খড়, লতাপাতা পেলে জ্বালিয়ে দেবে সবকিছু। এখন শুধু আলো দিচ্ছে। আমি আবার জানতে চাইলাম, “পারু আমার। কী হয়েছে বলো সোনা।”
“খবরদার আমারে পারু কইবা না, ভাত কাপড় না দিতে পারলে বিয়া করলা ক্যান? বাচ্চা ফুটাইলা ক্যান?”
এবারের কথায় চুপসে গেলাম আমি। পারুল কখনো একবেলা উপোস দিয়েছে বা আমাদের ছয় বছরের ছেলেটা কখনো না খেয়ে ছিল, এমনটা মনে পড়ে না। হয়তো প্রতিদিন ভালো তরকারী আনতে পারি না। তবে আমি চাউল এক কেজি দেড় কেজি করে কখনো কিনে আনিনি। ত্রিশ কেজি করে আনি। অথচ পারু আমাকে আজ এই কথা বলল? আমি এগিয়ে গেলাম বিছানায়। পারুল মুখ ঘুরিয়ে আছে। আমি বাম হাতে কুপি ধরেছি তার মুখের সামনে। ডান হাত দিয়ে তার অবাধ্য চুল কানের কাছে গুঁজে দিতে দিতে বললাম, পারু কী হইছে তোমার? পারুলের চোখ থেকে টপ করে গড়িয়ে পড়ল পানি। সে বলল, “টাকার লাইগা নাকি আইজ একজন তোমার শার্টের কলারে ধরছে। হাওলাত কইরা আমাদের ক্যান খাওয়াও? কামাই করতে না পারলে না খামু।”
কুপিটা পাশে রেখে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। উঠানের একপাশে গাছের গুঁড়ি রাখা। সেখানে বসে বিকেলের কথা ভাবছি। আমাদের আকিবের বয়স ছয় বছর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে, আমি কাজে বের হবো। আকিব চৌকি থেকে আমার গলা জড়িয়ে ধরেছে। বলল, আব্বা আমি বিস্কুট খামু, আইনা দেও। আমি পকেটে হাত দিতে গিয়েও দেইনি। গতরাতের কথা মনে হতেই মুখটা রক্তশূণ্য হয়ে গেল। পারুল তখন রান্না করছে। তাকে ডেকে বললাম, “পারু পাঁচটা টাকা দেও। আমি আইসা দিয়া দিমুনে।” পারুল ঘরে এসে আঁচলের গিঁট খুলে পাঁচ টাকা দিয়ে বলল, যদি বিড়ি খাও তাইলে কইলাম খবর আছে।
-আরে বিড়ি খাইতাম না, তোমার পোলায় বিস্কুট খাইতে চাইছে। আমি আকিবকে নিয়ে দোকানে গেলাম বিস্কুল কিনে দেয়ার জন্য। সেখানে বসা ছিল গফুর মোল্লা। আমাকে দেখামাত্র এসে শার্টের কলারে ধরলো। বলল, সারাদিন কই ছিলা চান্দু? আমার টাকা কই? আমি আস্তে করে বললাম, গফুর ভাই পোলাডা লগে। এহন কিছু কইয়েন না, আমি কালই টাকা দিয়া দিমু।
-মনে থাহে যেন।
আকিবকে বিস্কুট কিনে দিয়ে একটু এগিয়ে দিলাম। তারপর ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। যা ভয় পেয়েছিলাম তাই হয়েছে। আকিব বাড়ি এসে সব বলে দিয়েছে। পারু বেড়ার দরজা ফাঁক করে বেরিয়ে এলো। আম গাছটার ফাঁক ফোকড় দিয়ে চাঁদের আলো এসেছে উঠানে। ফর্সা পারুলকে তবুও কেমন ফ্যাকাশে লাগছে। বিয়ের আগে কত সুন্দর ছিল। আমার সংসারে এসে তার চেহারা আর চেহারা নেই। তবুও মুখ ফোটে কোনোদিন অভিযোগ করেনি।
পারুল আমার পাশে এসে গাছের গুঁড়িতে বসল। আমার পিঠে হাত দিয়ে বলল, ঘরে যাও। দুই চারদিন কাম কইরা মাইনষের টাকা দিয়া দিও। আমি আর কোনো কথা না বলে ঘরে গেলাম। আকিব চৌকির একপাশে ঘুমাচ্ছে। মাঝখানে পারুল আর তার পাশে আমি শুয়ে আছি। মনে মনে ভাবছি, গতরাতে জুয়া না খেললে ভালো হতো। গত দুই বছর ধরে পারুলকে একটা কাপড় কিনে দিতে পারিনি। পরনের দুইটা কাপড়ই কয়েক জায়গায় ছেঁড়া। সুঁই সুতো দিয়ে পারুল প্রায়ই কাপড় দুটো সেলাই করে পরে। তবুও একবার বলে না, আমারে একটা কাপড় কিনে দেও। গতরাতে একশো দশ টাকা ছিল পকেটে। রহিম আমাকে বলল, বড় খেলা হচ্ছে মিয়া। দশ মিনিট যদি খেলতে পারো, ভাগ্য ঘুরবার পারে।
আমি বললাম, না রে। আমি এসব খেলা বিয়ার আগেই ছাইড়া দিছি। রহিম আমারে হাত ধরে টেনে বলল, “তোমার খেলা লাগব না। আমার সাথে বইসা খেলা দেইখো।” ঘর ভর্তি মানুষ। সবাই বসে জুয়া খেলছে। শুধু গফুর মোল্লা চেয়ারে বসে আছে। কেউ হেরে গেলে গফুর মোল্লা টাকা ধার দেয়। কিন্তু পরিশোধ করতে হবে সুদসহ। পাঁচশত টাকা দিবে, ফেরত দিতে হবে সাতশো। সাত আটজন গোল হয়ে পাটি বিছিয়ে খেলছে। সবার সামনেই টাকা। দশ টাকা, বিশ টাকা থেকে শুরু করে পাঁচশো টাকার নোটসহ। এই সবগুলো টাকা আমার হলে কোনো অভাবই থাকত না আমার। একটা ভ্যানগাড়ি কিনে ফেলতাম। তাহলে প্রতিদিন ঘাম জড়ানো টাকা থেকে ভ্যানগাড়ির মালিককে জমা দিতে হতো না।
পাঁচশো টাকার নিচে খেলায় বসা যায় না। শয়তানের ধোকায় আমার খুব ইচ্ছে করছিল খেলতে। কিন্তু পকেটে টাকা নেই। রহিম আমাকে চোখে ইশারা করে গফুর মোল্লাকে দেখিয়ে দিলো। চেয়ারে বসে পান চিবোচ্ছে। আমি গিয়ে টাকা চাইলাম। গফুর মোল্লা বলল, “সারাদিন ভ্যান চালাইয়া পাঁচশো কামাইতে পারোস তো? আমারে কিন্তু কালই টাকা ফেরত দিবি।” আমি পাঁচশো নিয়ে খেলায় বসে পড়লাম। কাইট খেলা। খেলতে খেলতে কখন সময় গড়াচ্ছে মনে নেই। কখনো সাত আটশো টাকা আসে, কখনো যেতে যেতে দুইশোতে চলে আসে। একটা হাজার টাকা হলেই খেলা ছেড়ে উঠে যেতাম। কিন্তু রাত দুইটা তিনটার দিকে হারতে হারতে সব টাকাই হেরে গেলাম। শূণ্য হাতে বাড়ি ফিরে বেড়ার দরজা ফাঁক করে কোনোরকমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। দুপুর অবধি ঘুমিয়ে বিকালে আকিবকে নিয়ে দোকানে যাওয়ার পরই গফুর মোল্লা শার্টের কলারে ধরেছিল।
সকালে ভ্যান নিয়ে বের হয়েছি। ফিরলাম সেই রাতে। গফুর মোল্লার সাথে আজও দেখা করিনি। দুইশত চল্লিশ টাকা পকেটে। সারাদিন খ্যাপ তেমন পাইনি। পাবো পাবো আশা নিয়েই বসেছিলাম। বাড়িতে এসে দেখি ঘরে এখনো কুপি জ্বলে। তারমানে পারুল এখনো ঘুমায়নি। আরেকটু এগিয়ে বেড়ার দরজা ফাঁক করতে গিয়ে দেখি পারুল কান্না করছে। আর আকিবের মাথায় পানি ঢালে। আমাকে দেখে বসা থেকে উঠে এসে বলল, “আকিবের বাপ ভ্যান কই তোমার? পোলাডা জ্বরে মরতাছে। আমার পোলারে হাসপাতাল লইয়া যাও। দাঁতে দাঁতে খিল লেগে গেছে আকিবের বাপ।”
আমি আর এক মূহূর্ত দেরি না করে ভ্যান নিয়ে এলাম। মেহগণি গাছের সাথে তালা মেরে রেখেছিলাম। আকিবকে ভ্যানে শুয়াইছি। পারুল ভ্যানে বসা। তার কোলে আকিবের মাথা। আমি তাড়াতাড়ি করে হাসপাতালে ছুটলাম। জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ভ্যান রেখে আকিবকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে ঢুকলাম। সদর হাসপাতালে গেলে ঠিকঠাক ঔষধ পাওয়া যায় না। ডাক্তাররা সদর হাসপাতাল রেখে প্রাইভেট ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারে রোগী দেখতে চলে যায়। তাই জেলা হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।
একটা কাগজ ধরিয়ে দিলো ডাক্তার আমার হাতে। বলল, তাড়াতাড়ি এই ইনজেকশন আর ঔষধ নিয়ে আসেন ফার্মেসী থেকে। আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলাম কাগজ নিয়ে। হাসপাতালের একটু সামনে, জেলখানার মোড়ে অনেক ফার্মেসী। কাগজ দিয়ে ফার্মেসীতে ঔষধ দিতে বললাম। টাকমাথা লোকটি ঔষধ প্যাক করার আগেই বলল, ছয়শত নব্বই টাকা দেন। আমার মাথায় হাত। ঔষধের দাম এতো কেন? আমাদের গরীবদের জন্য ডাক্তাররা আলাদা করে ঔষধ বানাতে পারে না? গরীবদের জন্য কমদামী ঔষধ।
আমি পকেটের দুইশত চল্লিশ টাকা দিয়ে বললাম, ভাই এইটা রাখেন। বাকিটা আমি রাত পোহালেই দিয়া দিমু।
টাক মাথা লোকটা ঔষধ নিচে রেখে দিয়ে বললেন, “ভাই আমি এখানকার কর্মচারী। টাকা ছাড়া ঔষধ দেয়া যাবে না।”
আমি তখন কী করব আমার মাথায় কাজ করছে না। ভ্যান নিয়ে ছুটে চললাম বাড়ির দিকে। সেই ঘরে গিয়ে উপস্থিত, যেখানে জুয়ার আসর জমে। গফুর মোল্লা পানের সাথে একটা সিগারেটও ধরিয়েছে। আমাকে দেখামাত্র বলে উঠল, “শালারপুত, কালকে কালার ধরছিলাম। তবুওতো আজ সারাদিন দেখা নাই। টাকা বাইর কর।” আমি গফুর মোল্লার কাছে হাঁটু গেঁড়ে বসে বললাম, “গফুর ভাই আমি আপনার সব টাকা দিয়া দিমু। আপনে আমারে আর পাঁচশো টাকা দেন। পোলাডা হাসপাতালে।”
-শালারপুত। তোর লাইগা টাকার গাছ লাগাইছি আমি? আগের টাকা বাইর কর, নয়তো ছ্যাচমু এহন তোরে।”
-ভাই আমারে যা খুশি করেন। কিন্তু টাকা দেন। আমার পোলাডা মইরা যাইবো। কখনো কখনো খারাপ মানুষের মনেও দয়া মায়ার উদয় হয়। পাষাণের বুক ফেটেও কান্নার আওয়াজ বের হয়। তেমনি গফুর মোল্লার মনেও মায়ার সৃষ্টি হয়েছে। সে এখন আমার ভ্যানে বসা। আমি জেলা হাসপাতালে যাচ্ছি। গফুর মোল্লা আমাকে কোনো টাকা দেয়নি। বলল, “চল।
দেখি তোর পুতের কয় টাকার ঔষধ লাগে। সব আমি দিমু।” রাত দশ এগারোটার বেশি হবে না। তবুও হালকা শীতের রাত দেখেই সবাই কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে মনে হয়। রাস্তাঘাট কেমন ফাঁকা। আমি পেছন ফিরে বললাম, গফুর ভাই আমি আপনার সব টাকা কাম কইরা দিয়া দিমু। অবাক হয়ে দেখলাম, গফুর মোল্লা চাদরে চোখের পানি মুছে। আমি জানতে চাওয়ার আগে গফুর মোল্লা নিজেই বলল, “শাহীন তোর মনে আছে? এমনি এক রাইতে তুই আমারে লইয়া হাসপাতাল গেছিলি। আমার কোলে আমার পোলাডা আছিলো। যাওয়ার সময় বাইচ্যা থাকলেও পোলাডারে টাকার অভাবে বাঁচাইতে পারি নাই। দুই বছর পর এহন আমার কত টাকা, কিন্তু পোলাডা আর নাই। তোর পোলা টাকার লাইগা মরব, তা হইতে পারে না। সেই রাইতে কোনো ভ্যান পাই নাই। তোরে আমি ঘুম থাইকা তুলে আনছিলাম।”
দুই বছর আগে গফুর মোল্লার ছেলেটা মারা গিয়েছিল। পেটের মধ্যে ব্যথা, বুকের মধ্যে ব্যথা, এমন বলতো। একদিন এমন ব্যথা উঠেছে যে দুই তিন বাড়ির মানুষ সজাগ হয়েছিল ছেলেটার চিৎকারে। আমাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল গফুর মোল্লা। হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর ডাক্তার বলল, কিসের অপারেশন যেন করতে হবে। গফুর মোল্লা সেই রাতে আমার ভ্যানে চড়ে কত মানুষের বাড়ি গিয়ে টাকা ধার চেয়েছে। কেউ টাকা দেয়নি। আমাকে নিয়ে যখন আবার হাসপাতালে গেল তখন তার ছেলেটা মারা গিয়েছিল। আজ গফুর মোল্লার ছেলের কথা হয়তো মনে পড়েছে।
দু’দিন পর গফুর মোল্লার সাথে দেখা। আকিব বাড়িতেই আছে। গতকাল বাড়ি নিয়ে এসেছি। সুস্থ হয়ে গেছে আকিব। পারুল জিজ্ঞেস করেছিল, “টাকা কই পাইছো?” আমি বলেছি গফুর মোল্লার কাছ থেকে ধার নিয়েছি। পারুল এই কথা শুনে ভয় পেল। সে জানে দু’দিন আগেও টাকার জন্য গফুর মোল্লা ছেলের সামনে আমার শার্টের কলার ধরেছিল। তাই সে কানের দুল খুলে দিয়ে বলল, “কিচ্ছু জিগাইবা না আমারে। পরে বানাইয়া দিও। আগে গফুর মোল্লার টাকা দেও বেইচ্যা।” গফুর মোল্লা আমাকে দেখে শালারপুত বলে গালি দেয়নি। জিজ্ঞেস করলো, কই যাস?
আমি পকেট থেকে কানের দুটো বের করে বললাম, জিনিস বেচতে যাই। আইজকাই আপনার টাকা দিয়া দিমু।
গফুর মোল্লা কাছে এসে আবারো আমার শার্টের কলারে ধরলো। কলার ধরে বলল, “বউয়ের নাক কান খালি রাখতে হয় না। আমার এহন অনেক টাকা। প্রতিদিনই টাকা আসে। তোর ঐ টাকা দিতে হইবো না। যদিও দেস, তোর যহন মন চায় দেইস। তোর পোলাডা যে ভালা আছে আমি তাতেই খুশি। টাকার জন্য যেন কারো পোলা না মরে।”
আমি কানের দুল নিয়ে বাড়ি ফিরছি। মনে মনে ভাবলাম, “সত্যিই গরীবদের জন্য কমদামী ঔষধ খুব দরকার ছিল। বড় বড় পরীক্ষা আর দামী দামী ঔষধ গরীবদের জন্য নয়।”
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত