শূন্য কুটির

শূন্য কুটির
অনেকদিন পর নীলার হাতটা ধরে হাঁটছি। সেই পুরোনো অনুভূতি যেন নতুনভাবে অনুভব করছি। আমার শরীরের চামড়ায় মোটামুটি ভাঁজ পড়ে গেলেও নীলাকে সেই আগের মতো দেখাচ্ছে। যেন বিশ বছর বয়সী পরির মতো দেখতে কোনো মেয়ে। রাত ১টা, দুজনে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছি। এতো রাতে ও আমার সাথে আইসক্রিম খাবে বলে জেদ ধরেছে। আমারও এই মধ্য রাতে ওর হাত ধরে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে দারুণ লাগছে। কখনো কখনো সে বাচ্চা মেয়েদের মতো হাত ছেড়ে দৌড়ে কিছুদূর যাচ্ছে আবার অন্ধকারে ভয় পেয়ে এসে আমার হাতটা আঁকড়ে ধরছে। আমি জানি আমার হাতটা ওর জন্য কতটুকু বিশ্বস্ত। এই হাত ধরেই তো একদিন নিজের সবকিছু ছেড়ে আমার কাছে চলে এসেছিল। নীলা আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলে উঠলো,
–“আমাকে কি ঠিক আগের মতোই ভালোবাসো তুমি?”
–না। এর থেকেও কয়েক গুন বেশি ভালোবাসি তোমাকে।
–“তাহলে আমি এতোক্ষণ থেকে হাঁটছি আমার যে কষ্ট হচ্ছে সেটা কেন বুঝতে পারছো না? আমি আর হাঁটতে পারবো না।”
–জানি। দেখতেই তো পারছো বয়সের ভারে কতোটা নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। তা নাহলে কি তোমাকে হাঁটতে দিতাম? সেই আগের মতোই আইসক্রিমের দোকান পর্যন্ত তোমাকে সেভাবেই নিয়ে যেতাম।
–“আমি কিচ্ছু জানি না। আমি সেভাবেই তোমার কোলে চরে যেতে চাই।”
মেয়েটা বড্ড জেদি। যা বলেছে তা করতেই হবে। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যখন রাতে আইসক্রিম খাওয়ার জন্য বের হতাম, নীলা অর্ধেক পথ হেঁটে যেত আর অর্ধেকটা ওকে আমার দুই হাতের উপর তুলে নিয়ে যেতে হতো। ও দুই হাত দিয়ে আমার কাঁধে ধরে মিষ্টি চোখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। আমি তখন ওর এই মায়াবী চাহনির প্রেমে পড়তাম বার বার। ঠিক সেভাবেই ওকে তুলে নিলাম। না, আমার কোনো অসুবিধে হয়নি। এতটা হালকা লাগছে নীলাকে যেন বুঝাই যাচ্ছে না ওর কোনো ওজন আছে। সেই আগের মতো ও দুই হাত দিয়ে আমার কাঁধ আর গলায় জড়িয়ে ধরেছে। আমি ওকে নিয়ে ভালোভাবেই হাঁটতে পারছি। ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই আগের চাহনি আর এ চাহনির মধ্যে আমি অমিল খুঁজে পাই না। আমি ঠিক সেভাবেই পুরোটা পথ ওর চোখের চাহনির প্রেমে পড়তে পড়তে যাই। নীলা বললো,
–“আমি আজকে এত্তগুলা আইসক্রিম খাবো।”
–না, তুমি একটার বেশি খাবে না। তোমার ফ্যাট হয়ে যাবে তারপর আমি আর এভাবে তোমাকে নিয়ে হাঁটতে পারবো না।
–“মোটা হলে হবো। তোমাকে এভাবেই আমাকে নিয়ে হাঁটতে হবে।”
–আচ্ছা তুমি এমন কেন বলো তো! তুমি যা বলবে তা। আমার কোনো কথাই শুনবে না।
–“না না না, শুনবো না। শুনার জন্য তো তুমি আছো। আমার সব কথা শুনবে, যা বলবো তা করবে আর প্রতিদিন আমাকে নতুন করে ভালোবাসবে।”
–পাগলি!
–“হ্যাঁ পাগলি, আমি তোমার পাগলি। তুমি আমার পাগল।”
কেন যে ওকে এতোটা ভালোবাসতে ইচ্ছে করে জানি না। ওর প্রতিটা কথায় যেন আমি ফেঁসে যাই! ভালো না বেসে কোনো উপায় থাকে না। মনে পড়ে একদিন মজা করতে গিয়ে ওকে বলে ফেলেছিলাম, “ভালোবাসি না তোমাকে।” সেদিন ও অনেক বেশি কেঁদেছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেও ওকে বুঝাতে পারি নি যে আমি কথাটা মজা করে বলেছি। যখন ওর কান্না দেখে আমিও কাঁদতে শুরু করলাম তখন সে আমার চোখের জল মুছে দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ” আর কখনো কাঁদবে না। তোমার চোখের জল আমার সহ্য হয় না। তবে ভুল করেও যেন আর ঐ কথাটা না বলো। আমি সেটা শুনতে পারবো না, আমার কষ্ট হয় অনেক।” ওর চোখে আমার প্রতি যে ভালোবাসা দেখেছিলাম সেদিন তা হয়তো পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়জন দেখতে পারবে না। আইসক্রিম খেতে খেতে আবার দুজন বাসার পথে হাঁটছি। নীলা জিজ্ঞেস করলো,
–“আমাদের মেয়েটা কেমন আছে?”
–ভালো আছে। দেখতে অবিকল তোমার মতো হয়েছে।
–“অনেক বড় হয়ে গিয়েছে না?”
–হুম, বয়স ১৫ বছর হয়েছে।
–“ওর নাম কী?”
–তুমি যে নামটা ওর জন্য ঠিক করেছিলে, ‘তাছফি’।
–“মায়ের কথা কখনো জানতে চায়?”
–হুম। সেই ছোট থেকেই রোজ ওকে মায়ের গল্প শুনাতে হয়।
–“আমার মেয়েকে দেখে রাখবে। ওর যেন কোনো কষ্ট না হয়। যদি জানতে পারি কিছু উল্টোপাল্টা করেছো তাহলে তো চিনোই আমাকে!”
–নীলা, তুমি কী চলে যাচ্ছো?
–“হুম।”
–আরো কিছুটা সময় থাকা যায় না?
–“আমার কি ইচ্ছে করে না তোমার সাথে থাকতে? আমাদের ভাগ্যে নেই।”
–ভালোবাসি।
–“ভালোবাসি।”
–আমি বেশি ভালোবাসি।
–“না, আমি বেশি। আমি আমি আমি।”
নীলা আমার হাতটা ছেড়ে হাসতে হাসতে অন্ধকারের সাথে মিলিয়ে গেল। আমিও ওকে খোঁজার চেষ্টা করলাম না। জানি ওকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। বাসার পাশেই চলে এসেছি। বাসায় ঢোকার পর দেখতে পেলাম মেয়েটা জেগে আছে। ওর পাশে গিয়ে বসলাম।
–এখনো জেগে আছো?
–“বাবা বলেছিলে আজকে মায়ের গল্প বাকিটুকু বলবে।”
–ঘুমোবে না?
–“বলো না বাবা, পরে কী হয়েছিল বলো না।”
–আচ্ছা, গল্প কোথায় ছিল মনে করে দাও।
–“এই তো, আমার জন্মের আগেরদিনে।”
–হুম শুনো, যেদিন তোমার জন্ম হয় সেদিনই তোমার মা মারা যায়…
(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত