ভাগ্য বিড়াম্ভনা

ভাগ্য বিড়াম্ভনা
রাতে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিলাম আর তখনই আমার মোবাইল টা বেজে উঠলো। রাত তখন প্রায় ১১টা বাজে। এতো রাতে আবার আমার মত আজাইরা মানুষকে কে মনে করলো? মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখি নিলয় ফোন দিছে। ও আমার খুব ভাল বন্ধু নয় তবে খুব খারাপ বন্ধুও না। আমি ফোনটা রিসিভ করতেই বললাম…
— হ্যালো নিলয় বল।
— আরে রাজ কোথায় তুই?
— এতো কম রাতে তো আর চুরি করার সময় নয় তাই রুমেই শুয়ে আছি।
— ফাজলামী করছিস।
— নয়ত তোর কি মনে হচ্ছে? এটা কি কোথাও যাওয়ার সময় নাকি?
— আচ্ছা যাই হোক, রাজ আমার তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
— ওরে বাব্বা এত্তো বড় কবে হইলি?
— আবার মজা শুরু করলি।
— আচ্ছা আর করবো না। এবার বল মেয়ে কবে দেখতে গেলি আর কবেই বা বিয়ে ঠিক হয়েছে?
— দোস্ত আমি এখনো মেয়ে দেখে নি। আসলে তোরা তো জানিস আমার ইচ্ছে বাসার মানুষের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করবো। আর আজ মা বলল ওরা নাকি মেয়ে পছন্দ করে রেখেছে। কাল মেয়ের সাথে দেখা করতে যেতাম।
— বাহ্ বাবা মায়ের বাধ্য ছেলে। তোর মত প্রানীই তো এখন বিলুপ্ত প্রায়। দোস্ত আর কয়টা দিন অপেক্ষা করে দেখ তোকে জাদুঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোক আসবে।
— আবার শুরু করলি।
— আরে সত্যি বলছি। আজকাল বাবা মায়ের পছন্দের বিয়ে করা ছেলে মেয়ে তো দেখাই যায় না। তাই বলতেছি। তা মেয়ের নাম কি আর বাড়ি কোথায়?
— মেয়ের নামটা কালকে বলবে, যখন আমি মেয়ের সাথে দেখা করতে যাবো। আর মেয়ের বাসা নাকি আমাদের জেলায়ই।আর কালই মেয়ের নাম্বার দিবে।
— বাহ্ তুই সত্যি আলাদা জগতের প্রানী। বিয়ে ঠিক হইছে লাফাইতেছোস কিন্তু মেয়ের নামই জানস না।
— মা বলেছে এখন মেয়ের নাম জানলে পরে আবার নাম্বার চাইবো। আর তখন মেয়ের সাথে ঘন ঘন কথা বলে টাকা নষ্ট করবো।
— ওরে আমার মায়ের বাধ্য ছেলে রে। এখন বল আমায় কেন ফোন দিলি?
— আসলে কাল আমার সাথে তুই একটু যাইবি।
— সারা শহরে এই কাজের জন্য আর কাউকে পাইলি না। শেষ পর্যন্ত আমি।
— দোস্ত ভার্সিটিতে যখন পড়তাম তখন তো তুই মেয়েদের সাথে কথা বেশি বলতি একসাথে ঘুরতি আরো কত কি? তাই ভাবলাম তোকেই নিয়ে যাই। কারন আমি তো মেয়েদের সাথে ঠিক মত কথা বলতেই পারি না।
— ওরে আমার নাড়ু, তুই এটা আমার সুনাম করলি নাকি দুর্নাম।
— পরেইটাই।
— মানে?
— না মানে দোস্ত চল না।
— নারে কাল তো আমার একটা চাকরীর জন্য ইন্টারভিউ দিতে যাবো। আর কোম্পানিটা বেশি দূরেও না। যদি ইন্টারভিউ তারাতারি হয়ে যায় তাহলে দেখা করতে পারি।
— আচ্ছা তাহলে তুই ইন্টারভিউ থেকে বের হয়েই আমায় ফোন দিস। মেয়েটা নাকি ১টা বাজে দেখা করবে। একবারে তোকে নিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিবো।
— আচ্ছা বায়।
ফোনটা রেখে দিয়ে ভাবতে লাগলাম একে একে সবার বিয়ের দাওয়াতই পেয়ে যাচ্ছি কিন্তু নিজের বিয়ের দাওয়াতই পাচ্ছি না। না মানে ভার্সিটিতে জীবনে বলতাম আমি সবার আগে বিয়ে করবো কিন্তু ভার্সিটি শেষ করে ৩ বছর হয়ে গেল কিন্তু বাসা থেকে একবার বলল না বিয়ের কথা। বাসা থেকে বলবেই বা কেন? আমি তো কোন চাকরী করি না। তবে আপাতত কিছু প্রেসারে আমাকেও চাকরী পাওয়ার জন্য উঠে পরে লাগতে হয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি শরীরটা হালকা গরম লাগছে। হয়ত জ্বর জ্বর লাগছে। তবু শরীরের তোয়াক্কা না করে ফ্রেশ হতে লাগলাম।
বাসায় সকালের খাবার খেয়ে চাকরীর ইন্টারভিউর উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম। চাকরীর ইন্টার ভিউয়ের জন্য তো অনেক মানুষই এসেছে তবে আমার পরীক্ষাটা প্রথম শিফটে হয়ে গেল। আসলে আমার সিরিয়ালই আগে ছিল। তবে যে আমার পরীক্ষা নিয়েছে এখানের একটা লোক প্রচুর প্রশ্ন করে। আমি মনে মনে ওনাকে অভিশাপ দিয়েছি “ওনার যদি মেয়ে থাকে তাহলে সেই মেয়ে কারো না কারো সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে। ” কোম্পানির ভিতর থেকে এসেই নিলয়কে একটা ফোন দিলাম। নিলয় বলল, অনন্যা রেস্টুরেন্টে আসতাম। মেয়ে নাকি অনেক আগেই চলে এসেছে। আমি আর কিছু না বলে হেটেঁই রওনা দিলাম।আসলে আমার পকেট তো এখন ফাকাঁ আর বাসা থেকে দেয় না কোন টাকা। তাই সব কিছু মনে হয় সাকালাকা। প্রায় ২০ মিনিট পর রেস্টুরেন্টের কাছে এসে নিলয়কে ফোন দিলাম।
— হ্যালো নিলয় কই তুই?
— দোস্ত আমি তো রেস্টুরেন্টের ভিতরে আর তুই কোথায়?
— আমি তো রেস্টুরেন্টের বাইরে দাড়িয়ে আছি।
— তাহলে ভিতরে চলে আয়।
— না দোস্ত তুই একটু বাইরে আয়। আমার আসতে একটু নার্ভাস লাগছে।
— আচ্ছা আমি আসছি।
আমি বাইরে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতেছি। একটু পরেই আসলো নিলয়। বাহ্ নিলয়কে তো বেশ লাগছে।তারপর নিলয়ের সাথে কথা বলতে বলতে রেস্টুরেন্টের ভিতরে গেলাম। নিলয়ের দিকে কথা বলে হাটঁতে হাটঁতে একটা টেবিলের সামনে এসে থামলাম। আর নিলয় বলল, ” দোস্ত ওনার সাথেই দেখা করতে এসেছি “।আমি মেয়ের দিকে তাকিয়ে তো একদম শক। আর মেয়েটাও আমার দিকে তাকিয়ে অবাক। আর আমার মুখ দিয়ে আচমকা বেরিয়ে আসলো ” শামা তুমি! “। কিছুক্ষণের জন্য যেন আমার সব কিছুই থেমে গিয়েছে। তখন নিলয় আমাকে বলল…
— রাজ তুই ওনাকে চিনস নাকি?
— না চিনি না তবে বেশ ভাল করে চিনি।
— ও তাহলে তো আর কি পরিচয় করিয়ে দিবো? তখন শামা বলে উঠলো…
— না আমি তো ওনাকে চিনিই না। (আমাকে উদ্দেশ্য করে নিলয়কে বলল) তখন আমি বললাম..
— ওই মিথ্য বলছো কেন?গত তিন বছর আমার সাথে রিলেশন করে এখন বলো চিনো না।
— এ্যা আসছে নিয়ে রিলেশনশিপ। বুঝো নি রিলেশনশিপ কী? নিজে প্রেম করো আর আমার বাসায় বিয়ের কথা পাঠাতে পারো না।
— কিভাবে পাঠাবো হে? তোমার বাপ তো একটা হিটলাম। আমার সাথে তো দেখা করতেই চায় না।
— ঠিক করে। বাবা তো আমায় বলছিল তোমাকে বলতাম “তুমি যদি চাকরী পাও তাহলে বাবার সাথে দেখা করতে”।
— চাকরী পাওয়া যেমন মুখের কথা।
— এই কথাটা আমাকে প্রপোজ করার আগে ভাবতে পারো নি।
— আরে নতুন নতুন প্রেমে এমন একটু আধটু হয় আর কি? মিথ্যা বলতেই হয় নয়ত মেয়ে পটে না।
— তুমি না একটা ইয়ে…
— ইয়েটা আবার কিয়ে?
— ধ্যাত তোমার সাথে কথা বলাটাই ঝামেলা।
চেয়ার থেকে উঠে আমার দিকে রাগ দেখিয়ে চলে গেল। নিলয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি নিলয় নির্বাক চলচিত্র হয়ে গেছে। আমি টেবিল থেকে এক গ্লাস জল খেয়ে বললাম ” এখানে নয় বাইরে চল তোকে সব বুঝাচ্ছি “। নিলয় ওদের সব বিল মিটিয়ে আমার সাথে বাইরে আসলো। আর আমার দিকে সেই কখন থেকেই হা করে তাকিয়ে রয়েছে।
— কিরে রাজ বলবি কি হয়েছে?
— ওই যে সামনে নাচের স্কুলটা দেখছিস।
— হুমম।
— এখানে শামা নৃত্য শিখায়। আর অনেক সুন্দর রবীন্দ্র সংগীত গাইতে পারে।
— তুই এইসব কেমন করে জানিস?
— আরে এতো কথা বলিস কেন? বলবো তো।
–হুমম। একটু হেটেঁ সামনে আসার পর পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে আসলাম।
— নিলয় এই লাইব্রেরীতে কখনো গিয়েছিস?
— না তো। দরকারি বই পড়েই তো শেষ করতে পারি না আর এখানে অযথা বই পড়তে আসবো কেন?
— তাও ঠিক।কিন্তু শামা এখানে প্রতি সোমবার সকাল ১০টায় বই পড়তে আসে।
— তোকে কে বলল?
— আচ্ছা নিলয় কখনো পুকুর পাড়ে বসে মাছ রাঙা পাখি দেখার চেষ্টা করেছিস?
— না।
— কিন্তু এটা শামার বেশ পছন্দের।
— ওই চুপ কর তো। এই মেয়ে তোর হয় কি?
— আরে গাধা এতক্ষণেও বুঝলি না আমার কি হয়?
— না।
— তুই আসলেই বিলুপ্ত প্রানী। তারাতারি বাসায় গিয়ে লুকিয়ে পর নয়ত জাদুঘর থেকে নিয়ে যাবে। যদি কোন জন্তু জানোয়ার হইতি তাহলে হয়ত চিড়িয়াখানা থেকেই লোক আসতো।
— রাজ তুই বলবি?
— শামা আমার গার্লফ্রেন্ড হয়। গত তিন বছর ধরে প্রেম করছি আর আপাতত গত এক সপ্তাহ ধরে আমাদের ব্রেকআপ চলছে।
— তাহলে আগে আমায় বলিস নি কেন?
— আমি কি জানতাম? আমার গার্লফ্রেন্ডকে বউ বানানোর চেষ্টা তোদের বাসার লোক করবে।
— রাজ একটা কথা বলবো?
— হুমম বল।
— দোস্ত তোর সাথে তো শামার ব্রেকআপ হয়ে গেছে। এখন তাহলে ও তো সিঙ্গেল আছে। আমি বিয়েটা করেই নেই।
— আরে এতক্ষণ আমি কি তুর্কি ভাষায় তোর সাথে বকবক করলাম?
— মানে?
— মানে আমার মাথা। গার্লফ্রেন্ড আমার জানার পর তুই বিয়ে করতি চাইলি এটা তো লজ্জা।
— আমার বিয়ে যার সাথে ঠিক হয়েছে এটা তোর গার্লফ্রেন্ড হয় এটা বলাও তো লজ্জা। কত নাটক দেখেছি নিজের গার্লফ্রেন্ডের হাত বন্ধুর হাতে তোলে দেয়।
— ওই বেটা হ্যারপিক আমাকে কি নাটকের নায়ক লাগে? যা এখন বাসায় গিয়ে বল” তুই বিয়ে করবি না আর মেয়ে তোর পছন্দ হয় নি “।
— আগেই তো বলেছি মায়ের পছন্দে বিয়ে করবে।
— তোরে অযথা বুঝিয়ে লাভ নাই। তুই এখন বাসায় যা আর আমিও বাসায় যাই। হাটঁতে হাটঁতে তো আমার বাড়ি চলে এসেছে।
— তার মানে এতো খানি রাস্তা হাটিঁয়ে আনলি তোর বাসা এই দিকে বলে।
— বাহ্ নিলয় আমার সাথে এইটুকু সময় কাটিয়েই তো তোর বুদ্ধি খুলেছে। যা এবার বাসায় যা।
— হুম।
নিলয় রিকশা নিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলো আর আমি আমার বাড়ির দিকে। আজ কার মুখ দেখেই যে ঘুম থেকে উঠেছি। একটার চেয়ে একটা সমস্যা কাধেঁ এসে পরছে। আরে ঘুম থেকে উঠে তো আমি আমার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আর আমার মোবাইলেরর ওয়াল পেপার তো আমার নিজের ছবি। থাক এইসব জোরে বলতে নেই। পাবলিক শুনলে হা হা রিয়েক্ট দিবো। এভাবে কয়টা দিন ভালই কাটলো। অবশ্য এখন মনে হচ্ছে নিলয়ের বিয়েটা মনে হয় বাদ হয়ে গেছে। নয়ত খবর পেতাম। একদিন বিকালে ছাদে বসে বসে মুড়ি খাচ্ছিলাম তখন আমার মোবাইলটা বেজেঁ উঠলো আর তাকিয়ে দেখি শামা ফোন দিছে ।
— হ্যালো বাবু বলো।
— তোমার বাবু আমার পাশে দাড়িয়ে আছে। আমি শামার বাবা বলছি। কথাটা শুনে মুখ থেকে সব মুড়ি পড়ে গেল আর আমি কাঁশতে লাগলাম।
— আরে শশুড় মশাই আপনে। আরে না আঙ্কেল বলেন?
— শামা খুব জোর করতেছে তোমার সাথে দেখা করতে। তুমি নাকি বেশ ভাল ছেলে।
— জ্বি আমি খুব ভাল।
— তোমাকে নিজের ঢোল নিজেকে পিটাতে বলি নি।
— মাঝে মাঝে নিজের ঢোল নিজেকেই পিটাতে হয় যদি নিজের ঢোল পিটাতে অন্য কাউকে বলি আর ও যদি ঢোল ছিড়েই ফেলে।
— চুপ করো বেয়াদপ।
— একদম।
— কাল সকাল ১০ টায় আমার বাসায় তোমার সকালের নাস্তা করার নিমন্ত্রণ রইলো।
— জ্বী আসবো।
আমার কথা শুনতে পারছে কি না জানি না তবে ফোন কেটেঁ দিছে? আচ্ছা কাল আমাকে খাওয়ার জন্য ডাকলো নাকি বাশঁ দেওয়ার জন্য ডাকলো। যাই হোক শত হলেও হবু শশুড় বলে বলে কথা। না হয় দুই চারটা কথা বলতেই পারে। এতে রাগ করার কি হয়েছে? সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই দেখি ৯টার উপর বাজে। আমি কোন রকমে তারাতারি রেডি হয়ে শামার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। চাকরী পাই নি বলে বাসার মানুষের সাথে আমার তেমন একটা কথা হয় না। বাবা আমার উপর অনেক রাগ করে আছে। বেশি হলে ১ বছর কাউকে বসিয়ে খাওয়ানো সম্ভব কিন্তু আমি তো সেই ৩ বছর যাবত বসে বসে খাচ্ছি। শামার বাসায় এসে কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে দিলো। আমার দিকে শামা কেমন ভাবে যেন তাকালো। মনে হলো রাতে অনেক কেঁদেছে। আসলে যদি কোন মেয়ে চোখে কাজল দেয় আর কান্না করে তাহলে বুঝা যায় স্বাভাবিক।
— কি হলো শামা তোমার মন খারাপ কেন?
— কিছু না তুমি বসো। আমি বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।
— হুমম।
শামা আমাকে বসতে বলে চলে গেল। আমি বসে বসে খেলার পত্রিকাটা দেখতে ছিলাম। তখনই শামার বাবা এসে দাড়ালো। আমি তখন ২৩১ বোল্ডের শক খেলাম। আসলেই এই লোকটা শামার বাবা। তার মানে কিছু দিন আগে যে আমি একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরীর ইন্টারভিউ দিলাম ওনিই বেশি প্রশ্ন করে ছিলেন। ওনাকে হয়ত পরীক্ষক হিসেবে আনা হয়েছিল। আমি ওনাকে দেখে দাড়ালাম আর সালাম দিলান। আমায় দেখে কেমন ভাবে যেন তাকালো কিন্তু আমি মাথা নিচু করে রাখছি। আমায় বসতে বলল আর ওনি বলল…
— তুমিই তাহলে রাজ।
— হুমম।
— তোমায় কি আমি আগে কোথাও দেখেছি? যাক হয়ত চিন্তে পারতেছে না, এখনই কথাটা আমি ঘুরিয়ে দেই।
— মনে হয় বৈশাখি মেলায় দেখে ছিলেন। ওই যে ধাক্কা ধাক্কির সময়। আপনি পড়ে যাচ্ছিলেন আর আমি ধরে ফেললাম।
— আমি গত ১০ বছর ধরে কোন মেলায় যাই না।
— ও তাহলে হয়ত কোন রাস্তায় দেখেছেন।
— না তাও না।
— তাহলে হয়ত কোন তর্কে বা বিতর্কে আমি আপনের সাথে জরিয়ে ছিলাম।
— এই তো মনে পরছে তোমার সাথে ইন্টারভিউ রুমে আমার দেখা হয়েছে।
–( ইশশ কি মাথা রে)
— কিছু বললে।
— না।
— আচ্ছা যাই হোক এবার আসল প্রসঙ্গে আসি।
–হুমম বলেন।
— চলো খেতে খেতে বলি।
— আপনার ইচ্ছা।
শামা আমাকে আর ওনাকে খেতে দিলেন। তারপর শামার বাবা শামাকে রুমে যেতে বললেন। শামা আমার দিকে করুন মুখ করে চলে গেল। তখন শামার বাবা বলল…
— নাও খাওয়া শুরু করো।
— হুমম।
–আচ্ছা তুমি কি চাকরী পেয়েছো নাকি এখনো ঘুরতেছো?
— এখনো পাই নি। (খাবারটা এখনো মুখে দেই নি)
— বাহ্ ভাল। তা তুমি কিসের যোগ্যতায় শামাকে বিয়ে করতে চাও?
–( আমি চুপ)
— তোমরা দুইজন দুইজনকে ভালবাসো তা মেনে নিলাম। কিন্তু তোমাদের ভবিষ্যৎ কি হবে?জানো তো অভাব যখন দরজা দিয়ে আসে তখন ভালবাসা জানালা দিয়ে পালায়।
— হয়ত এমন সময় আসবে না।
— কিসের গ্যারান্টি আছে তোমার?না আছে ভাল চাকারী আর না ভাল যোগ্যতা। এটা কোন সিনেমা বা গল্প নয় যে ৫ মিনিটে বড় লোক হয়ে গেলে। এটা বাস্তবতা আর এখানে চলতে গেলে হাজারও কষ্ট আছে।
— ( সত্যি ওনার কথার কোন উত্তর ছিল না)
— এখন তো চুপ করে আছো। অনেক বড়ই তো হলে এবং তোমার বুঝার ক্ষমতাটাও আছে। তাই বলছি আপাতত এইসব বিয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে একটা চাকরী খুঁজো।
— হুম
— একটা কাজ করো তুমি শামা আর নিলয়কে বিয়ে করতে রাজি করাও আর আমি তোমার চাকরীর জন্য চেষ্টা করবো।
— এটা কি কন্ট্রাক্ট করতেছেন?
— আরে না তবে শুধু বললাম।এইসব বিষয় নিয়ে কন্টাক্ট করাটা বোকামি।
— হুমম
— তো কি চিন্তা করলে?
— আপনার প্রতিটা কথাই ঠিক কিন্তু একটা কথা জানেন কি? আপনি কারো প্রিয় বাবা হওয়ার যোগ্য নন। আমার বাবা তো গত এক বছর ধরে আমার সাথে কথা বলে না কিন্তু আপনি তো আপনার মেয়ের জীবন নষ্ট করছেন?
— আমি কি করছি না করছি সেটা তোমার না ভাবলেও চলবে? আপাতত বলো তোমার মত কি?
— আমি নিলয় আর শামার সাথে কথা বলবো। আর হ্যাঁ এর কারনে আমার কোন চাকরী চাই না।
— বাহ্ বেশ ধারনা তো।
— আমার ধারনা সব সময়ই সলিড,শুধু কিছু মানুষ বুঝে না।আচ্ছা তাহলে আমি উঠছি?
— আরে কিছুই তো খেলে না।
— অনেক তো খেলাম। আপাতত পেটে জায়গা নেই।
— আচ্ছা আবার এসো।
আমি চলে আসলাম। ওনার কথা গুলো শুনতে আমার কষ্ট হয়েছে তবে বেশি কষ্ট হয়েছে যখন বললাম নিলয় আর শামার সাথে আমি কথা বলবো। ঠিক ৩ দিন কারো সাথে কোন যোগাযোগ আমি রাখি নি। আজ ৩দিন পর ফোনটা চালু করে শামাকে ফোন দিলাম।
— হুমম রাজ।
— শামা আজ বিকালে একটু ফ্রী থাকবে? একটু দেখা করবে আমার সাথে।
— হুমম।
— তাহলে বিকেলে পুকুর পাড়ে চলে এসো। এক সাথে শেষ বারের মত মাছরাঙা পাখি দেখবো নে।
— হুমম
ওর কন্ঠ শুনেই বুঝতে পেরেছি ও কান্না করছে তবুও আমি ওর কান্না না থামিয়ে ফোনটা রেখে দিলাম। ফোনটা কেটেঁ দিয়ে নিলয়কে ফোন দিয়ে এটাই বললাম। আসলে শামার বাবার প্রতি কথাই ঠিক। আমি কোন যোগ্যতায় আজ ওদের বাসায় গিয়ে ছিলাম। যদি আমার একটু লজ্জা থাকতো তাহলে হয়ত যেতাম না। আমার চোখ গুলো বেইমান হয়ে গেছে। এখন আগাম বার্তা না দিয়েই গাল ভিজিয়ে দেয়। বিকালে অনেকটা আগেই পুকুর পাড়ে চলে আসলাম।আসলে আমি তো ফ্রী মানুষ আর ওদের মত এতো ব্যস্তও না তাই তারাতারি চলে আসলাম। প্রায় ৩০ মিনিট পর আমার পাশে এসে শামা বসলো।
— জানো শামা ৩০ মিনিট ধরে বসে আছি কিন্তু একটাও মাছা রাঙা পাখির দেখা পাই নি। মানুষের সাথে সাথে ওরাও এখন আমার থেকে দূরে চলে গেছে।
— তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না রাজ।
— বাদ দাও। শামা তুমি হয়ত জানো আমি তোমায় এখানে কেন ডেকেছি?
— হুমম।
— আমি জানতাম তুমি ওই দিন আড়াল থেকে সব শুনেছো।
–( ও চুপ) ঠিক একটু পরেই নিলয় চলে আসলো। নিলয় এসে আমার ডান পাশে বসলো আর শামা আমার বাম বসে আছে। তখন আমি দুইজনের উদ্দেশ্যে বলল…
— নিলয় একটা কথা কি জানিস? ভালবাসা হয়ত খুব সহজে হয়ে যায় কিন্তু দুই মন এক হতে দুইটা পরিবারের সম্মতি লাগে। হয়ত আমি ভালবাসতে পারলেও সম্মতি পাবো না কিন্তু তুই এখন সম্মতি পেলে একটা সময় ভালবাসতেও পারবি। আজ হয়ত তোদের দুইজনের মাঝে বাধাঁ আমি হয়ে আছি কিন্তু সেটা আর থাকবো না। তাছাড়া শামা খুবই ভাল। খুব ভাল কাটুক আগামী দিন গুলো। আমি চলে যাই আর তোরা তোদের জীবন সাজিয়ে নে। আমি আর এখানে কোন কথা না বলে ওদের মাঝখান থেকে উঠে আসলাম। জানি শামা আমার দিকে না তাকিয়েই কান্না করছে আর নিলয় অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
ওদের থেকে বিদায় নিয়ে যখন বাসায় যাওয়ার জন্য সি এন জি তে উঠলাম। ঠিক একটু পরেই দুর্ঘটনা ঘটলো। সি এন জি টা একটা ট্রাকের সাথে এক্সিডেন্ট করলো।আমি সাইডে বসার কারনে ছিটকে পরে যাই। এরপর আমার আর কিছুই মনে নেই। যখন আমার জ্ঞান ফিরল তখন আমি নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করলাম। আমার চারপাশে কাউকে খুজঁতে লাগলাম কিন্তু কেউ নেই। এটা ভেবেই আমার চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা জল পরলো। ঠিক একটু পর একজন নার্স আসলো। দেখলাম নার্স আমার জ্ঞান ফিরেছে দেখে দৌড়ে বাইরে গেল। কিছুক্ষণের মাঝে রুমটা লোকে ভরে গেল। আমার মা আমার হাতটা ধরে কান্না করছে আর শামার বাবার চোখটাও ভেজাঁ লাগছে। মনে হয় আমার জন্য ওনার একটু মায়া হয়েছে। আর শামাও ওর বাবার পাশে দাড়িয়ে কান্না করছে। তখন বাবা আমায় বলল…
— কিরে এতো বড় হয়েছিস আর দেখে পথ চলতে পারিস না? ( যে বাবা গত এক বছর আমার সাথে কথা বলে নি তিনিও কান্না করছে)
— বাবা আমার কোন ভুল ছিল না। (হালকা হালকা কন্ঠে বললাম) তখন নিলয় বলতে লাগল…
— বাহ্ দোস্ত এই তুই আমায় বন্ধু ভাবিস। তোর জন্য তো সব করতে পারি? তুই গত ২ দিন যাবত এই অবস্থায় রয়েছিস। তুই তো আমাকে আর শামাকে বুঝিয়ে দিয়ে নিজে চলে গেলি। একটা বার আমার কথা জানতে চাস নি। আমি তো তোকে বলতে এসেছি আমি মাকে বলে দিয়েছি আমি শামাকে বিয়ে করবো না। দোস্ত তুই ভাল হয়ে যা। তোর বিয়েতে কিন্তু আমি খুব মজা করবো।(নিলয় কান্না করতে করতে বলল)
— দূরে যা বিলুপ্ত প্রানী। ( মুচকি হাসলাম)
— রাজ বাবা আমি দুঃখিত আর তুমি সুস্থ হয়ে যাও। তুমি যেদিন চাকরী পাবে সেই দিনই শামার সাথে তোমার বিয়ে দিবো।( শামার বাবা বলল)
— আচ্ছা আঙ্কেল আমার যদি ২ দিন পর জ্ঞান ফিরে তাহলে এখন আপনেরা এখানে কেন? মানে বুঝলেন কি করে যে এখন আমার জ্ঞান ফিরবে?
— তুমি বড্ড প্রশ্ন করো। এটা তো ডাক্তারই বলেছে তাই দুপুর থেকে তোমার জ্ঞান ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছি। আর প্রশ্ন না করে তারাতারি ফিট হয়ে উঠো তো। আমার চারপাশের অপ্রিয় মানুষদের মুখে প্রিয় বাক্য শুনতেও যেন বেশ লাগলো। একটু সুস্থ হয়ে নেই তখন সবাইকে বুঝাবো আমি কি কষ্ট পাইছি?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত