শুকনো পাতা

শুকনো পাতা
রাতের খাবার শেষে পাতিলে অল্প কিছু ভাত থাকতো। প্রতিদিন-ই দেখতাম মা সেই ভাতে পানি দিয়ে রাখতো। সকাল হতেই মা সেই পান্তা ভাত খেতে দিত বাবাকে। বাবা সেই পান্তা ভাত হাসি মুখে খেত। ঘরের পিছনে ছোট দু’টো মরিচ গাছ ছিল৷ বাবা প্রায়-ই আমায় ডাক দিয়ে বলতো…
-রুবেল বাবা, যাওতো একটা কাঁচা মরিচ নিয়া আহো।
-পারুমনা মা’রে কও৷
-গাছ থেকে নিয়ে আহো যাও।
আমি এক দৌঁড়ে গাছ থেকে কাঁচা মরিচ নিয়ে আসতাম। সেই কাঁচা মরিচ বাবা না ধুয়েই ভাতের সাথে খেত। খাওয়া শেষে কাজে যেত। আহা কি তৃপ্তি সহকারেইনা খেত। মাকে দেখতাম এক ঈদে নতুন কাপর নিলে আরেক ঈদে নিতনা। একবার মা’কে বাবা বলল….
-কুরবানির ঈদে এইবার তোমারে আরেকটা শাড়ি কিন্না দিমুনে।
-কেন? কে কইছে আমার শাড়ি লাগব? লাগবনা কিছুই। এত শাড়ি দিয়া আমি কি করুম?
-তোমারতো শাড়িই নাই।
-ও শাড়িতে আমার কাজ নেই। আর আমার কি শাড়ির পরার মতন সময় আছে?
-তুমি এহনো কিন্তু সুন্দরী, তয় মুখে খালি একটু স্পট।
-ইসসস, যানতো! লাগবনা কিছুই আমার৷ পোলাডারে পারলে একটা সাইকেল কিন্না দিয়েন।
অভাব অনটনের সংসারে ভালোবাসার কমতি ছিলনা। মাঝেমাঝে মা রাত হলেই উঠোনে মাদুর পেতে বসে থাকত৷ বাবা অনেক রাতে বাড়ি ফিরলে মাদূরে বসে দুজন গল্প করতো। কখনো আমি জেগে গেলে আমায় মা মাদুরে শুয়ে কোলের উপর মাথা রেখে শুয়ে দিত। আহা! কি সেই অনুভূতি কি সেই শান্তি। তখন মনে হয় ভালোবাসা, সুখ, শান্তি জিনিসগুলো টাকা দিয়ে কেনা যায়না। সত্যিই তাই! একদিন মা’কে দেখলাম রান্না করছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। আমার কিশোর মনে আবদার জাগলো আমি গান শুনব। আম্মা মুচকি হেসে বলল….
-ধুর পাগল, আমি গান পারিনা।
-না আমি গান শুনুম।
-আমি পারিনাতো।
-একটু আগেইতো কইলা? মা অস্বীকার করতো৷ আমাদের মা ছেলের তর্ক লাগতো৷ বাবা এসে বলত….
-হয়েছে কি? আমি গাল ফুলিয়ে বলতাম….
-মা গান কয়না।
-আচ্ছা আসো, আমি শুনাই।
আমি বাবার কাছে যেতাম বাবা গান জুড়ে দিত। ভাটিয়ালি গান শুনলে প্রাণটাই জুড়িয়ে যেত। মা’কেও দেখতাম আগ্রহ সহকারে সেই গান শুনছে৷ কেবল অভাবের মাঝে দুঃখ কষ্ট থাকেনা। কিছুটা সুখও থাকে। সুখ জিনিসটা আপেক্ষিক। সহজে ধরা দেয়না। মাঝেমধ্যে ধরে নিতে হয়। মানিয়ে নেওয়ার নাম যেমন জীবন, তেমনি মানিয়ে নেওয়ার নাম-ই সুখ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত