নতুন মা

নতুন মা
চল্লিশ বছর বয়সী একজন বিপত্নীক পুরুষ, যার দুটো বাচ্চা আছে, তার দ্বিতীয়া স্ত্রী হিসেবে বাইশ বছর বয়সী আমি বাসর ঘরে বসে আছি। জীবনটা সত্যিই অদ্ভুত। কি ভেবেছিলাম আর কি হলো!
সৎ মায়ের শত অযত্ন অবহেলার পরও বাবার আদর নিয়ে পড়ে ছিলাম ও বাড়িতে। সৎ বোনদের দেখাশোনা থেকে শুরু করে বাড়ির সব কাজ করার পরও নিজের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ এতটুকু কম ছিলো না আমার। তবে ছাত্রী হিসেবে খুব কাঁচা ছিলাম কি না! দুইবার এসএসসি আর একবার এইচএসসি ফেল করার পর সৎ মা আমাকে পড়িয়ে টাকা নষ্ট করার ঘোর বিরোধিতা করতেন।
কিন্তু বাবা আমাকে বুঝতেন। ছাত্রী খারাপ হওয়ার পরও লেখাপড়ার প্রতি আমার আগ্রহ দেখে বাবা আমাকে কখনও পড়তে মানা করেন নি। অবশ্য আমি ছাত্রী খারাপ ছিলাম, না কি পড়ার সুযোগের অভাবে ফেল করতাম, এ প্রশ্নের উত্তর আজও আমার অজানা। না তো স্কুলে ঠিকমত যেতাম, না কোনো কোচিং এ যেতাম বা প্রাইভেট পড়তাম, না বাসায় পড়ার সুযোগ পেতাম। এইচএসসি পাশ করে সবে মাত্র ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি এরই মধ্যে বাবার হার্ট এ্যাটাকে ওপারের ডাক চলে এলো। আমাকে নিয়ে বাবার শেষ ইচ্ছা ছিলো আমাকে যেন কোনো ভালো পাত্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভালো পাত্রের হাতে তুলে দিতেন কি না জানি না, তবে বাবা মারা যাওয়ার পর সৎ মা যে আমাকে যেকোন পাত্রের হাতে তুলে দিতেন সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তবে কি না স্বামীর শেষ ইচ্ছা বলে কথা, অনেক খুঁজে মা আমার জন্য ভালো পাত্র আনলেন। পড়াশোনার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও মা সে কথায় কর্ণপাত করলেন না।
বিয়ে না করার জন্য মায়ের পায়ে পর্যন্ত পড়েছি। কিন্তু কাজ হয় নি। কেনই বা হবে? বাবা গত হয়েছেন। এখন আমার পড়ালেখার খরচ কে চালাবে? আর পড়ালেখা না করলে ঘরে বসিয়ে কেই বা আমাকে খাওয়াবে? কেন খাওয়াবে? সংসারের কোন কাজে আসি আমি? সব ভেবে আমাকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাত্র খুব ভালো। ভালো চাকরি করে, পয়সাওয়ালা, দেখতেও বেশ, বাবা-মা বেঁচে নেই। শুধুমাত্র বয়সটা যা একটু বেশি, আর দুটো বাচ্চা আছে। এ আর এমন কি? সতীনের সংসার তো আর করতে হচ্ছে না। তিনিও গত হয়েছেন। তাই তো ভদ্রলোক আবার বিয়ে করতে চান। এমন সোনার ছেলে আমার সৎ মা হাত ছাড়া করলেন না। আমাকে ঝুলিয়ে দিলেন তার গলায়। এসব ভাবতে ভাবতে আমার স্বামী রায়হান সাহেব রুমে ঢুকলেন। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম।
– তোমার সাথে বিয়ের আগে কথা হয় নি। আমার সম্পর্কে কতটা জেনেছো জানি না, তবে বাকিটা জেনে যাবে আস্তে আস্তে। এখন কি তোমার কিছু জানার আছে? যা জানতে চাও বলো। তোমার নিজের সম্পর্কেও আমাকে বলো।
– আমার কিছু জানার নেই, কিছু বলারও নেই
– আসলে হুট করে বিয়ে হওয়াতে তোমার সাথে বিয়ের আগে কথা হয় নি। তাছাড়া তোমার মা মানে আমার শ্বাশুড়ি বললেন বিয়েতে তোমার সম্পূর্ণ মত আছে। তাই ভাবলাম কথা না বললেও চলবে। আচ্ছা, তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হলে কেন?
– সবই কপাল!
– মানে?
– ভাগ্যে থাকলে ঠেকায় কে?
– তা অবশ্য ঠিক বলেছো। তুমি মনে হয় জানো আমার দুই সন্তান আছে?
– জি শুনেছি।
– তাহলে হয়তো এটাও বুঝতে পেরেছো যে তাদের দেখাশোনার জন্য তোমাকে বিয়ে করা। তার মানে এটা নয় যে তোমাকে আমি কাজের মেয়ে বা বাচ্চাদের কেয়ারটেকার হিসেবে এনেছি। তোমাকে আমি ওদের মা হিসেবেই এনেছি। তুমি আমার স্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি ওদের মা হয়েও থাকবে।
– জি আচ্ছা।
রুমের ভেতর দুটি ফুটফুটে মেয়ে দৌড়ে প্রবেশ করলো। একজনের বয়স সাত-আট বছর হবে। আরেকজনের আনুমানিক তিন বছর হবে। বড় মেয়েটা অনেক জল্পনাকল্পনা নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে। আর ছোটো মেয়েটা দৌড়ে এসে আমার কোলে বসলো। তাকে আগেই বলা হয়েছে যে আজ তার মা আসবে। তাই মায়ের সাথে ঘুমোনোর লোভে আমার কোলে এসে বসেছে।
বাইশ বছর বয়সী একটা মেয়ে যদি মুহুর্তেই সাত-আট বছরের মেয়ের মা হয়ে যায়, তাও আবার নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে, তার পক্ষে এটা মেনে নেওয়া সত্যিই অসম্ভব হয়। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। মেনে নিতে পারছি না আমি বাচ্চা দুটোকে, তাদের বাবাকে, এ সংসারকে, এ বিয়েকে, কিছুতেই মানতে পারছি না। তবে এখন আমার মানা না মানাতে কিছুই আসবে যাবে না। যা হবার তা তো হয়েছেই। আমাকে যে মানতেই হবে। জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বাচ্চাটিকে আদর করছি। রায়হান সাহেব হয়তো আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছেন। তিনি বাচ্চাদের অন্য রুমে রেখে আসতে চাইলেন। কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা। মাকে ছাড়া ঘুমোবে না। অনেক বোঝানোর পরেও যখন ওরা রাজি হলো না বাধ্য হয়ে আমার কাছে রাখতে হলো।
বিবাহিত জীবনের প্রথম রাত, বাসর রাত, রেডিমেড দুটো বাচ্চা নিয়ে ঘুমাতে হচ্ছে, আমার দুইপাশে দুই বাচ্চা, ওপাশে আমার স্বামী ঘুমোচ্ছেন। বাচ্চা দুটো দুপাশ থেকে আমাকে জড়িয়ে আছে। খুব অস্বস্তি হচ্ছে। রাগে, দুঃখে, কষ্টে, যন্ত্রনায় ঘুম আসছে না। তবে বাসর রাতে স্বামীর ভালোবাসা পাই নি এ নিয়ে মোটেও কষ্ট হচ্ছে না। যেখানে বিয়েটাই মন থেকে মানতে পারি নি সেখানে স্বামীর ভালোবাসা আশা করার প্রশ্নই আসে না। সকালে উনি ভোরে ঘুম থেকে উঠলেন। আমাকে নামাজের জন্য ডেকে দিলেন। আমি খুব একটা নামাজ পড়ি না। হুট করে উনি নামাজ পড়তে বলায় না বলতে পারছি না। বাধ্য হয়ে নামাজ পড়লাম। তারপর উনি আমাকে কিচেনে নিয়ে গেলেন।
– তোমার ঘর তুমি বুঝে নাও। এখনই তোমাকে কিছু করতে হবে না। আমি নাস্তা বানাচ্ছি তুমি পাশে থাকো। চা খাবে?
– আপনি সরে যান আমি নাস্তা বানাচ্ছি।
– সে কি? নতুন বউ এখনই কাজ করবে কেন? এসব করার অভ্যাস আমার আছে। কিছুক্ষণ পর বুয়া খালা আসবে।
বাসার সব কাজ উনি করে দিয়ে যাবেন। আমি অফিসে থাকবো। তুমি শুধু দুপুরে রান্না করিও আর আমার রিনি-মিনির খেয়াল রাখিও। বুড়োর ঢং দেখে বাঁচি না। এমনভাবে কথা বলছে যেন আমার কত বছরের চেনা। বিয়ের রাতেই দুই বাচ্চার মা বানিয়ে দিলো। এখন আদিখ্যেতা করা হচ্ছে। ইচ্ছা না থাকা সত্বেও উনি আর বাচ্চাদের সাথে বসে নাস্তা করতে হলো। বড়ো মেয়ে রিনিকে উনি তৈরি করে স্কুলে নিয়ে গেলেন। ওখান থেকে অফিসে যাবেন। ছোটো মেয়ে মিনি আমার সাথে বাসায় আছে। বুয়া খালা এসে বাসার বেশিরভাগ কাজ করে দিলেন। আমি রান্না করলাম আর ওনাকে টুকটাক সাহায্য করলাম। এর মধ্যে মিনি এসে অনেকবার “মা, মা” বলে ওড়না টানলো। তাতে আমার বিশেষ কিছু আসলো গেলো না। আমি বাচ্চা দুটোকে আমার সন্তান হিসেবে মানতেই পারছি না। বুয়া খালা বড্ড বেশি বকবক করে। সেই তখন থেকে শুরু করেছে থামছেই না,
– আপনি আইছেন অহন আমার একটু কাম কমবো। মিনি আফা এত দুষ্টামি করে পাগল কইরা দেয়। অহন আপনেরে জালাইবো। আমারে ছুটি দিবো এবার। দেখছেন নি কি চান্দের লাহান ফুটফুইট্টা মাইয়া। এই মাইয়ারে থুইয়া মা ডা মইরা গেলো। আহারে কপাল। অহন আমনে আইছেন। আমনেই ওর মা।
– আপনি একটু চুপ করবেন? কাজের চেয়ে কথা বেশি বলছেন। চুপচাপ কাজ করুন
– আইচ্ছা আম্মা রাগ কইরেন না।
দুপুরবেলা রিনির স্কুলের গাড়ি ওকে নামিয়ে দিয়ে গেলো। বাসায় এসেই “নতুন মা” বলে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। অস্বস্তি হচ্ছে খুব। তবুও কিছু বললাম না। কিই বা বলবো? আমাকে তো ওদের দেখাশোনা করার জন্যই আনা হয়েছে। ভালো না লাগলেও সহ্য করতে হবে। মিনিকে গোসল করাতে নিয়ে গেলাম। তখন রিনিও জেদ ধরে বসলো।
– নতুন মা, নতুন মা, আমাকেও গোসল করিয়ে দাও না!
– এতদিন কে করিয়ে দিতো?
– পারুর মা বুবু(বুয়া) করিয়ে দিতো। মাঝে মাঝে আমি একাও করতাম
– তাহলে আজও একা করো! অমনি রিনি আমার গলা জড়িয়ে ধরলো।
– এখন তো তুমি এসেছো। তুমিই করিয়ে দাও না নতুন মা।
– আমি না আসলে তো একাই গোসল করতে তাই না? আর আমি যদি কখনও না থাকি তখনও তো একাই করতে হবে।
– কেন নতুন মা? তুমিও কি মায়ের মত আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?
বলেই রিনির চোখ ভিজে গেলো। কিন্তু ওর ভেজা চোখ দেখে আমার মন গললো না। এক প্রকার বাধ্য হয়েই দু-বোনকে গোসল করিয়ে খাইয়ে ঘুম পাড়ালাম। যেহেতু বাবার বাড়িতেও সৎ বোনদের দেখাশোনা আমিই করতাম, তাই রিনি-মিনিকে সামলাতে বেগ পেতে হলো না। যদিও মিনি একটু দুষ্টুমি করে। কিন্তু ছোটো একটা ধমক দিলেই চুপসে যায়। ওদের চোখে আমি আমার জন্য ভালোবাসার চেয়ে বেশি ভয় দেখতে পাই। সারাদিন যখন ওরা আমার সাথে থাকে কেমন চুপসে থাকে। রাতে ওদের বাবা আসলে প্রাণভরে দুষ্টুমি করে। তখন মনে হয় জীবন্ত দুটো পুতুল হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। সত্যিই মেয়েদুটো একদম ফুটফুটে। কেন যেন আমি ওদের আমার মেয়ে হিসেবে মানতে পারছি না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত