পরিচয়

পরিচয়
-জানিস? তিন বছরে আমরা একবার নতুন জামা পাই, গত বছর একটা জামা পেয়েছিলাম। তা রোজি দিদিকে দিয়ে আমি এইখানের ঠিকানা বের করেছি, যেখান থেকে আমাকে কোন এক ভোর বেলায় পলিথিনে মুড়ানো আবস্তায় পেয়েছিল। আমি প্রায় আসি এইখানে। কেউ কি খুঁজতে আসে আমাকে? খুঁজে দেখি কারো মুখ মিলে কিনা আমার সাথে। কারো চোখের মতো কি আমার চোখ? চুল কি তার মতো যার পেটে ছিলাম? তার কি আরো বাচ্চা আছে? তাকে কি কেউ মা ডাকে? তাহলে আমার দোষ কোথায় ছিলো? এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলতে লাগল তিন্নি। ওর কথা গুলো শুনে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এখন নিঃশ্বাস বের হয়ে যাবে মনে হচ্ছে৷ এক শহরের এক কলেজে এক ক্লাসে পড়া আমরা, আমাদের ভাগ্য কত আলাদা? কত আলাদা চিন্তাভাবনা?
আমি মিথি, মা বাবার সব থেকে ছোট মেয়ে বলে বেশি শাসনের৷ তিন বড় ভাই, তাদের শাসন তো সে আরেক জ্বালা।
তাদের আমার সব কিছুতেই প্যারা। বন্ধু থাকা, ঘুরতে যাওয়া, বয়ফ্রেন্ড নিয়েও তাদের পেইন৷ নিজেরা কিন্তু ঠিকিই নিজের পছন্দের মেয়ে বিয়ে করেছে দুই ভাই। কিছুদিন হলো কলেজে তিন্নির সাথে পরিচয় হয়েছে। মেয়েটা পড়ালেখায় ভালো। ক্লাসে প্রায় তাকে বকা শুনতে হয় বই না আনার জন্য। ও নিচু হয়ে শুধু শুনে, মাঝেমধ্যে আমাদের নোট করে দেয়, যাতে ও একটু বইটা একদিনের জন্য নিতে পারে। তো ওকে আমি তিন দিনের জন্য বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম। সে কি লজ্জা ওর। কথায় কথায় কান্না করে। আমার অনেক ফ্রেন্ড বাসায় যায়। ওকে মা বাবার বেশ ভালো লেগেছে কারণ ও খুব লক্ষীমন্ত। সকাল বেলা মা যখন ডাকছিলো, সে ধরপরিয়ে উঠে বলে,
-তোর মা ডাকছে, উঠ।
-চাপ নিস না, নাস্তা খাওয়ার জন্য ডাকছে, ঘুমা আরো। পরে উঠব।
-পরে নাস্তা পাবি?
– আরে মাথা খাবি না প্লিজ। পাবো না কেন? যা তোর ইচ্ছে হলে খেয়ে নেয়।
-তোকে তোর মা রোজ ডাকে?
-আর বলিস না, এই এক প্যারা।
আমার ড্রেস পড়তে দিয়েছিলাম সে কি লজ্জা ওর। এক সাথে খেতে বসলাম, ও না খেয়ে সবার দিকে তাকিয়ে আছে।
যে যা বলছে সে অবাক হয়ে শুনছে। আমার এত খেয়াল ছিলো না। বাবা আমাকে সবসময় মা ডেকে কথা বলে আমার বান্ধবীদের ও তাই। তিন্নিকে বলল-
– মা তুমি কি খাবে? এইটা জিজ্ঞেস করায় সে কি কান্না। পরে বাবা আবার হাত বুলায় শান্ত করেছিল। তাই বাবা ওর জন্য কি বিচ্ছিরি সবুজ কালারের একটা জামা এনেছিলো আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম। ছুড়ে ফেলেছিলাম সে ড্রেস,
-কে বলেছে তোমাকে আমার ফ্রেন্ড এর জন্য এমন ড্রেস আনতে?
-সুন্দর তো,
-বাবা তুমি সুন্দর চিনো?
কিন্তু তিন্নি সে ড্রেস কেমন বুকে চেপে ধরেছিল। বাসায় বৌদিদের সাথে মায়ের প্রায় এইটা ওটা নিয়ে ঝগড়া লাগে। আমি অবশ্য এইসবে নেই কারণ ওরা আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু পরশু রিহান আমাকে বাসায় নামিয়ে দিলে বৌদি মাকে বলে দেয়। আমি নাকি যার তার সাথে মিশি। কেন ওদের এত টেনশন কেন? আমার লাইফ, আমার ফ্রেন্ড আমি বুঝে নিবো। কি সেকেলে মা বাবা মতো বকা ঝকা মোবাইল নিয়ে ফেলা৷ তাই তাদের শাস্তি দিতে অন্য কোথায় না গিয়ে তিন্নির হোস্টেলে উঠেছি। তিন্নি বেশ বিপাকে পরে, আমি ওকে বলেছি,
-তুই আমাদের বাসায় ছিলি, আমি তোর এইখানে থাকব৷ তুই ম্যানেজ কর।
তিন্নি আমাকে সিট দিয়ে নিজে ফ্লোরে শুয়েছিল। সকাল হতে হতে বুঝেছি এইটা হোস্টেল নয়, অনাথ আশ্রম। ছোট থেকে বড় সব বয়েসী অনেক ছেলে মেয়ে। সব দিকে নোংরা, বড় হল রুম। ফ্যান গুলো অনেক উপরে। বাতাস ও লাগে না। তিন্নির রুমে আরো পাঁচ জন আছে। সবাই বড় তাই কিছুটা পরিস্কার। এক পাশে পড়ার টেবিল। তার পাশে কিছু টুকটাক সাজার জিনিস। তিন চারটা জামা। সকালের দিকে একবার বেল বাজে তখন সবাই হুরমুড়িয়ে উঠে নাস্তা খেতে যায়, চা পাউরুটি কলা, আমি উঠি না। তিন্নি আমাকে ডাকে না। কারণ আমি এইসব খাবো না। তিন্নি আমার জন্য এক পিস পুডিং নিয়ে আসে। আমাকে দিয়ে ও স্নান করতে যায়। আমি যখন খাচ্ছিলাম তখন একটা বাচ্চা মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে আমি ওর দিকে ইশারা করতেই ও খেতে আসে। দুই চামচ দেওয়ার পর আরেক বার দিচ্ছিলাম। তখন তিন্নি এসে ধমক দেয়,
– এই টুনি তুই এখানে কি করিস, যা ভাগ। আমি বিরক্ত হলাম। এত ছোট বাচ্চা ওকে খেতে দিলো না। তিন্নিকে কেমন যেন লাগতে শুরু করল। বাচ্চাটা মুখ ভেঙচি দিয়ে চলে গেল।
-আরে থাক না, বাচ্চা তো!
– আরে বাচ্চা না এক একটা শয়তানের বাপ।
তুই পুরো হাড়ি দিয়ে পেট ভরাতে পারবি না এদের। আর তুই কি খাবি? এখন আর কিছু পাবো না রে। এইখানে ছোট বড় দেখলে পারবি না। আগে নিজের পেট। আমার খারাপ লাগে, বড় দাদার মেয়েটা ও এত বড় আর কি। বৌদি কি অবস্তা করে খাওয়ানোর জন্য। সবার আদরের মণি তাই বেশি দুষ্ট। সবাই একটু একটু খাওয়াতে চাই কিন্তু খায় না। দুপুর বেলা ভাত, আর রাতের আট টায় ভাত। প্রথম দিন আমি গেলাম না , তিন্নি বাইরে থেকে খাবার আনল আমার জন্য।আমি কোন টাকা পয়সা নিয়ে আসি নি। আসলে আগে তো রাগ করলে মামার বাড়ি উঠতাম, বুঝি নি আগে। পরের দিন তিন্নি আর আনতে পারে না। আমি বললাম,
– চল যাই, তোদের হল রুমে। অনেক বড় হল রুম। স্যাতস্যতে মেঝে। যে যার থাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লাইন ধরে নিয়ে কেউ কেউ গোল করে বসছে। আমার প্রথমে বেশ মজা লাগল। আমাকে দেখে যে মেয়ে টা খাবার দিচ্ছিলো সে ভ্রু কুচকে বলল-
– এই মাদারী টা আবার কে রে? আমার মাথা গরম হয়ে গেলো। আমি সরে যেতে তিন্নি নরম গলায় বলল-
-রোজি দি এইভাবে বলো না, ভদ্র ঘরের মেয়ে ও, আমার বান্ধবী, দুই দিন থাকবে। তখন মহিলা আরো জোরে হুংকার দিলো,
– ভদ্র মেয়ে? এই আকাশ-নীড়ে কি করতে এসেছে? এইখানে কি মা* কম পড়েছে যে আরো এনে তুলেছিস?
আরো অনেক কথা বলতে লাগল, যা শুনলে আমি জীবনে ওই মহিলার মুখ দেখতাম না। খাওয়া তো দূরের কথা।
তিন্নিকে বললাম- এই জল্লাদ মহিলাটাকে রাখছিস কেন এইখানে? তিন্নি হাসে,
– উনি জল্লাদ না, আমাদের ভগবান বলতে পারিস। এইসব আমরা ছোট থেকে শুনে এসেছি। আমরা রাখব কেন উনাকে? উনি রেখেছে আমাদের। দেবী আমাদের। ডাল, দুই টুকরো আলু আর কিসের যেন বিস্বাদ ভর্তা। সবাই চেটেপুটে খাচ্ছে। এক বাচ্চা মেয়ে আবার খাবার চাইতে গেলে ওকে লম্বা চামচ টা দিয়ে সজোরে বারি দেয়, কিন্তু সে কোন কান্না করে না, কিছুক্ষন পর আবার সে মহিলা কিছু খাবার দেওয়ায় সে হেসে চলে আসে। এইসব দেখে কারো কিছু যায় আসে না এইখানে। আমার বুকে থম ধরে গেছে। মা আমাকে সকালে নাস্তা আর ভাত খাওয়ানোর জন্য এখনো বকাঝকা করে। খেতে না চাইলে নিজের হাতে এখনো খাওয়ায়, আর বলে,
-খাবি না, খাবি না বলছিল। এখন কার পেটে গেলো? আমার কেমন যেন লাগছে। তিন্নি বলল-
-আংকেল আন্টিকে বলেছিস এইখানে আছিস।
– না, করুক চিন্তা। তারপর বুঝবে মজা। তিন্নি হাসে, বলে,
-আচ্ছা ছেলেটা কি তোর খরচ চালায় নাকি? মানে খাওয়া -পড়া।
– পাগল নাকি? আমি ওর কাছে থেকে রির্চাজ ও কখনো নিই নি। ব্রেকাপের পর খোটা দেওয়া জন্য?
– মানে ওকে বিয়ে করবি না?
-শিওর না।
-তবে এমন কারো জন্য নিজের মা বাবাকে কষ্ট দিয়ে মজা দেখাচ্ছিস, যারা ছোট বেলা থেকে তোর সব টা পূরণ করেছে। তিন্নি ওর হাত দেখিয়ে বলে,
-এই দেখ, এইগুলো যে কালো কালো দাগ, এইসব কোন বয়ফ্রেন্ডের জন্য না, কিংবা বড় বড় কারণে অভিমানে কাটা দাগ না। খুব সামান্য কারণে, এখানে আর একটু খাবার চাওয়াই পাওয়া হাজারো ছ্যাকা এইসব। চল তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাই! তিন্নি একটা পার্কে নিয়ে আসে। এক জয়গায় বসি আমরা তখন তিন্নি বলে,
-জানিস? তিন বছরে আমরা একবার নতুন জামা পাই, গত বছর একটা জামা পেয়েছিলাম। তা রোজি দিদিকে দিয়ে আমি এইখানে ঠিকানা বের করেছি, যেখান থেকে আমাকে কোন এক ভোর বেলায় পলিথিনে মুড়ানো আবস্তায় পেয়েছিল। আমি প্রায় আসি এইখানে। কেউ কি খুঁজতে আসে আমাকে? খুঁজে দেখি কারো মুখ মিলে কিনা আমার সাথে। কারো চোখের মতো কি আমার চোখ? চুল কি তার মতো যার পেটে ছিলাম? তার কি আরো বাচ্চা আছে? তাকে কি কেউ মা ডাকে? তাহলে আমার দোষ কোথায় ছিলো? আমি চুপ থাকি, এইসব আমার চিন্তা ভাবনার বাইরে, যখন থেকে চোখ খুলেছি আশেপাশে মা বাবা দেখে বড় হওয়া আমার কাছে এইসব চিন্তা শক্তির বাইরে। তিন্নি আবার বলতে শুরু করল,
-জানিস আমি যখন তোদের বাসায় ছিলাম তিন দিন, তোর কাছে ওটা কিছুই না। আমার কাছে যেন স্বর্গ। মা -বাবা, ভাই, বোন কি নেই তোর। আর আমরা সারাদিন রাত কান্না করেও খুঁজে পাই না কে মা? কে বাবা? ভাই বোন তো দূরের কথা। সবাই কত আদর করে তোকে। খাওয়ানোর জন্য কি অবস্তা তোর মা ডাকতে ডাকতে হয়রান। আমি কত বেলা বিছানায় পড়ে ছিলাম জানিস? কেউ তো একবার শুধু একবার ডেকে বলবে,উঠ খেতে আয়।কেউ কোন দিন ডাকে নি জানিস। কারো সাথে রাগ অভিমান করে না খেয়ে শুয়ে থাকব। এইসব আমাদের কাছে স্বপ্ন। কখনো ফিল করি নি এইসব। তোর বাবা যখন মা ডেকেছিলো, আমি কান্না করে দিয়েছিলাম। জীবনে বোধহয় ওটাই প্রথম কেউ মা ডেকেছে। আমাদের কি ডাকে সকালে তো শুনেছিস। খাবার টেবিলে সবাই এক সাথে বসে কি সুন্দর খেতে বসিস সবাই। তোর দাদা তোকে মাছে মাথাটা তুলে দেয়, বৌদি শিমের বিচি গুলো তোর পাতে দেয়, তুই তোর বাবার প্লেট থেকে মাছের পেটি ছিড়ে নিস। এইসব তোর কাছে নিত্য ব্যাপার যা আলাদা করে কখনো ভাবিস নি, কিন্তু আমাদের কাছে সারাজীবন বুকের মাঝে লালান পালন করতে থাকা এক স্বপ্ন। যা কখনো পূরণ হয় না।
তোর বাবা আদর করে কিছু আনলে তুই কি ভয়াবহ রেগে যাস পছন্দ না হলে, কিন্তু কখনো ভেবেছিস কি আদর আর ভালোবাসা থাকে সেখানে? আমি তো চিন্তা করি ইস যদি একবার কাউকে মা বাবা ডাকতে পারার অধিকার পাই সারাজীবন তাদের বুকে জড়িয়ে রাখব। আর তোরা সে অধিকার জম্ম থেকে নিয়ে আসিস। আমরা তার জন্য প্রর্থনায় জল ফেলি। জানিও তো না কার কাছে চাইবো মা- বাবা। আল্লাহ নাকি ভগবান? কাকে ডাকব? তোর বাবার দেওয়া সে জামা টা আমি খুব যত্ন করে রেখেছি, মাঝেমধ্যে খুলে বুকে জড়িয়ে নিই কেউ মা ডেকে এইটা দিয়েছে। তোকে আমি আমার সারাজীবনের জমানো টাকা দিয়ে হলেও আমার কাছে রাখতাম ৷ তুই তিন দিনে আমাকে পরিবারের ভালোবাসা দিয়েছিস৷ বাকী জীবন এই দিয়েই কেটে যাবে। রোজি দিদিরা এখনো আমাদের যে নীড়ে রেখেছে তাই ওরা আমাদের দেবী। যতই খারাপ ব্যবহার থাক না কেন রাস্তায় তো থাকতে হচ্ছে না। ছাদ তো আছে। যেমন হোক খাবার তো পাচ্ছি। কত ভাগ্যবান মনে হয় নিজেকে, জানিস?
আর তোরা। যে একদিন ও তোর দায়িত্ব না নেওয়া কারো জন্য মা বাবা কে কষ্ট দিচ্ছিস, যারা তোকে কখনো বুঝতেই দেয় নি দুনিয়া কত খারাপ। এত কিছু থাকার পর ও তোদের কত অভিযোগ, মা বাবার সাথে মতের অমিল, ডিপ্রেশন, সারাজীবন তিল তিল করে কত আদর যত্ন, টাকা পায়সা খরচ করে ভালো ভালো কলেজ ভার্সিটিতে পড়ায়। তাদের সবটা দিয়ে তোদের ছোট ছোট ইচ্ছে পূরণ করে। তাদের ছেড়ে অন্য কেউ ভালোবেসে ছেড়ে গেলো, যে তোর মর্মেই বুঝল না তার জন্য জীবন শেষ করে দিস। আর আমাদের প্রতিদিন বেঁচে থাকার এই লড়াই। আমাদের হয় না এইসব ডিপ্রেশন। সত্যি। আমি আর পাচ্ছিলাম না। তিন্নিকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলাম। দুনিয়াটা যেন পালটে গেলো আমার কাছে। কেউ যেন আয়না ধরল চোখের সামনে।
সত্যিই তো মা -বাবার মর্ম আমরা কয়জন বুঝি? মা – বাবা মারা গেলে আমরা কি কান্না করি তারা নেই, কিন্তু মা বাবা তো ডাকতে পারি, বলতে পারি আমি আমার বাবার মেয়ে। কখনো কি চিন্তা করেছি আমার এই আমি হওয়াতে আমার তো কোন হাত নেই। সবটা তো মা বাবার। তেমন তিন্নির অনাথ হওয়াতে তিন্নির তো কোন দোষ নেই।
আমি তিন্নির মোবাইল থেকে বাবাকে ফোন দিলাম। এইখানের ঠিকানা দিলাম। ছোট দা এসে নিয়ে গেলো। ছোট দা বার বার তিন্নিকে ধন্যবাদ দিচ্ছিল। তিন্নির চোখে মুখে কি লজ্জা। আমি বাসায় এসে মায়ের বুকে যে কতক্ষন শুয়ে ছিলাম জানি না। বাবার কাছে গেলাম। নিজেকে কি ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। সবাইকে তিন্নির কথা গুলো বললাম। বাবা-মায়ের চোখ ভিজে গেলো। সবাই চুপ হয়ে ছিলাম তখন ছোট দা বলল-
– তোকে যখন ও পরিবার চেনাল, তুই তাহলে ওকে পরিবার দেয়। সবাই ছোট দার দিকে ফিরে চাইলাম। আমার বুঝতে টাইম লাগল ও কি বলতে চেয়েছে। মা উঠে দাঁড়িয়ে গেলো, এতক্ষন কান্না ভেজা চোখ কঠিন হলো,
-না, না, এইসব মেয়েকে মায়া করা যায়, দয়া করা যায়, বউ না।
-কেন মা? ভালো পরিবার থেকে বউ এনেও কি সবাই ভালো থাকে? সে তোমাদের মর্ম বুঝবে। ছোট দার এই কথায় বৌদিরা ফেঁপে উঠল।
-আমি তোমাদের কিছু বলি নি। আমি কথার কথা বললাম।
সবাই চুপ হয়ে গেলো বাবার এক কথায়। বাবা রাজি। আমি বাবাকে জোরে ঝাপটে ধরি। ১০ বছর পর, এখন তিন্নি আমাদের বাড়ির গিন্নি, আমি লন্ডনে থাকি, বড় দা ও এইখানে। মেঝ দাদারা ওখানে থাকে তবে আলাদা। মা প্যারালাইজড আজ চার বছর। সব তিন্নি করে। সে কি খুশি থাকতো তিন্নি। বাবা মা কে সারাদিন ডাকতো আর হাসতো আবার কান্নাও করতো। বাবা কি লাগবে? মা কি রাধব? বাবা চা দিবো? মা বকা দিলে হাসতো। খুব জোরে হাসতো। ওর পাগলামী দেখে আমরা সবাই হাসতাম। কি যত্ন করে আগলে রেখেছে মা বাবাকে ও। ঠিক যেমনটা ও বলতো। আমাকেও ছোট দি ডাকা শুরু করেছিলো।সে কি খুশি ওর। ছোট আর তিন্নির একটা মেয়ে মোহনা। তিন্নির কাছে যেন ও এক খেলার পুতুল। ও যখন বলে আমার মায়ের নাম তিন্নি রায়, তিন্নি হাসে। নিজের পরিচয়ে হাসে, কারো কাছে ওর নাম তার পরিচয় এই ভেবে হাসে। হাসতে হাসতে আবার কাঁদে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত