বিয়ে

বিয়ে
আসিফ আমার ইয়ার মেট । অসম্ভব চঞ্চল একটা ছেলে। সবাই বলে চঞ্চল ছেলেদের মন ভালো হয়। আমার ও তাই ধারনা ছিল । তাই তো ওর দুষ্টামি দেখে মুগ্ধ হতাম । কিন্তু বুঝতে দিতাম না কখনো। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সে পড়ি। রোকেয়া হলে থাকি। একদিন পহেলা বৈশাখে হঠাৎ করেই আমার একটা call আসলো। আমি হবাক হয়েছিলাম । কারন ঢাকা শহরে আমার আত্মীয় স্বজন কেউ ছিল না ।
আমি পাড়া গাঁয়ের মেয়ে । বাবার কিছু জমি জমা আছে । তাই দিয়ে কোন রকমে আমাদের সংসার চলে। আমার পড়ার খরচ আমার চাচা দিতেন। আমাদের কোন আত্মীয় স্বজন কোনদিন ঢাকা চোখে ও দেখিনি। তাই call পেয়ে ভীষণ অবাক হয়েছিলাম । গেটের কাছে এসে খুঁজছিলাম কে আমাকে call দিল। হঠাৎ করে দেখি , আসিফ হাসতে হাসতে আমার কাছে আসলো । বললো, নীরা আমিই তোমাকে call দিয়েছিলাম । আমি তো অবাক! আসিফ আমাকে কেন call দিবে ? বললাম, আমাকে ?! কেন?! আসিফ বললো, এটা বলার জন্যই তো এসেছি। চলো , টি এস সি তে যেয়ে বসি। আমি পাড়াগাঁয়ের মেয়ে । কোন ছেলের সাথে একসাথে গল্প করার মত সাহস তখনো অর্জন করিনি । বললাম , না, তুমি এখানেই বলো। কিন্তু মনে মনে খুব চাইছিলাম, ও জোর করুক ।
তাই করলো। বললো , নীরা, আমি বাঘ , ভাল্লুক নই। তুমি আমার উপর নির্ভর করতে পারো। অবশেষে বললাম , আচ্ছা চলো। আসিফ বললো, উহু , এভাবে নয় । তোমার লাল জামাটা পরে এসো। আর সামান্য একটু সাঁজবে। আমি আবার রুমে ফিরে গেলাম। আমি সাঁজগোজ কখনো করি না । তাই সাঁজগোজের কোন জিনিস আমার ছিল না । লাল জামাটা পরে, আমার বান্ধবী এবং রুমমেট নীতুর কাছ থেকে সাজগোজের জিনিস নিয়ে সাঁজছি আর অবাক হয়ে ভাবছি, আসিফ কখন খেয়াল করলো যে , আমার লাল রঙের একটা জামা আছে ?! আমি ভালো সাঁজতে পারি না । আর তাছাড়া আমার তখন খুব palpitation হচ্ছে, আর হাত পা ও একটু একটু কাঁপছে। আমার অবস্থা দেখে নীতুই আমাকে সাঁজিয়ে দিল। সাঁজগোজের পর নিজেকে নিজেই চিনতে পারছিলাম না ।
কারন এই প্রথম আমি এমন সেজেছি। আমার চেয়ে নীতুকেই বেশি উৎফুল্ল লাগছিল । কারন আমার মত মেয়ের জীবনেও এমন দিন আসবে, সেও চিন্তা করেনি। নীচে যখন আসলাম , তখন আমার গা হাত পা কাঁপছে । ব্যাপারটা তেমন কিছুই নয়। আমার যে কোন ইয়ার মেট আমাকে call দিতেই পারে । কিন্তু আসিফ আমার পছন্দের একটা ছেলে। আর তাছাড়া আমাকে যখন বললো , লাল জামাটা পরে এসো, তখন ওর চোখে কি যেন ছিল । যা একটা মেয়েই বুঝতে পারে। আমরা হাটতে হাটতে টি এস সির দিকে গেলাম । আমরা অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি । কেউ কোন কথা বলছি না। একসময় আসিফ নীরবতা ভাঙলো । বললো, নীরা আমি ও যে কোনদিন কোন মেয়ে কে এভাবে প্রপোজাল দিবো , চিন্তা ই করিনি । কিন্তু তোমাকে যত দেখেছি, ততই মুগ্ধ হয়েছি । আমি মাটির দিকে তাকিয়ে আছি আর ওরনার একপ্রান্ত চিবুচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সুখ আজ আমার দ্বারে এসেছে !
আসিফের সাথে আমার এফেয়ারটা হয়ে গেল । বন্ধু বান্ধবী অনেকেই খুব খুশি হলো। কেউ কেউ বিদ্রুপ করতে ও ছাড়লো না । অনেকেই বললো , বানরের গলায় মুক্তার মালা। আমি খুব দুঃখ পেতাম। কারন আমি জানি, আমার চেহারা খারাপ নয় । এবং আমি খুব মেধাবী । শুধু আমি বড়লোক ফ্যামিলির মেয়ে নই। সেই তুলনায় আসিফ বিশাল ধনী পরিবারের ছেলে । আমার বাবা মা, ভাই বোন গ্রামে থাকে । তারা আধুনিক নয়। সেই তুলনায় আসিফের পরিবারের সবাই যেন দামি ব্রান্ডের প্রোডাক্ট ।
কিন্তু আমার মনে হয় , আমি যে কোন পরিবেশে বেশ ভালোভাবেই adjust করতে পারবো। তাই মন খারাপ করতাম। আসিফ ই আমার মন ভালো করতো। বলতো , বাদ দাওতো। নিন্দুকেরা সব সময়ই উল্টা পাল্টা বলবেই। বরং আমার সৌভাগ্য যে, তোমার মত মেয়ে পেয়েছি। আসিফের সাথে আমার সম্পর্ক তিন বছরের । আসিফ আমাকে খুব ভালো বোঝে। আমার পছন্দ অপছন্দ, ভালো লাগা না লাগা, মনে হয় আমার থেকে ওই ভালো জানে। আমার সব সময়ই মনে হয়, পৃথিবীতে আমার জন্যই আসিফের জন্ম হয়েছে । নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়।
আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো। এর ভীতরেই বাসার থেকে খবর আসলো , আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলেটা একটা এম পি ও ভুক্ত কলেজের অংকের টিচার । কোচিং করিয়ে ভালোই ইনকাম পাতি করে।দেখতে ভালো । ভালো ফ্যামিলি । আমার চাচার পরিচিত । তারা নাকি ডিপার্টমেন্টে এসে আমাকে দেখেও গেছে। তাদের মেয়ে খুব পছন্দ । আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো । আমি আসিফ কে আমার সমস্যার কথা বললাম। আসিফ কিছুই বললো না । অবাক হয়ে দেখলাম, আসিফ পরের দুইদিন ক্যাম্পাসেই আসলো না ! দুইদিন পরে যখন ক্যাম্পাসে আসলো , তখন আসিফের মুখের দিকে তাকানো যায় না । বললো , নীরা, আমাকে মাফ করে দাও । আমি এই দুইদিন বহুত চেষ্টা করলাম, বাসার সবাইকে বোঝাতে। কিন্তু কেউ রাজি হয় না । বলে , তোমার বাড়ি গ্রামে। বিয়ে তো খালি দুইটা ছেলে মেয়ের ভিতরেই হয় না, দুইটা পরিবারের ভিতরে হয়। আমার মা বলেছে, তোমার ফ্যামিলির সাথে কখনোই আমাদের adjust হবে না ।
আমার পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে গেল। আসিফের মার ছবি আমি দেখেছি । উনার অনেক গল্প শুনেছি । সেই কবে থেকেই মনে মনে আমি উনাকে মা বলি। সেই মা এটা বলতে পারেন, আমি চিন্তা ই করিনি । আমি কাঁদতে কাঁদতে আসিফ কে বললাম , কিন্তু, তুমি তো জেনেশুনেই আমার সাথে সম্পর্ক করেছো। এই চিন্তাটা তিন বছর আগে করতে পারো নি ? আসিফ ভালো মানুষের মত বললো, আমার তো কোন আপত্তি নেই । কিন্তু আমার কোন চাকরি বাকরি নেই। আমার পরিবার তোমার মত দশজন কে পালতে পারে । কিন্তু আমার তো তোমাকে পালার মত সামর্থ্য নেই । তোমাকে এখন বিয়ে করলে তোমার সাথে সাথে আমার খাওয়া ও বন্ধ হয়ে যাবে । আমি বললাম, আমি কি তাহলে অপেক্ষা করবো? আসিফ নির্লিপ্তভাবে বললো, এটা তোমার ব্যাপার । আমি বুঝে গেলাম আসিফের মনোভাব । সে এখন আমার সাথে আর সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছে না । অবাক হয়ে আসিফের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম । এই মানুষটাকে ঘৃনা করতে ও ঘৃণা হচ্ছিল ।
ক্যাম্পাসে নিন্দুকেরা আবার সোচ্চার হলো। Sympathy দেখানোর নাম করে আমাকে বলতে লাগলো, আমরা আগেই জানতাম, এটা হবে। দুই রকম দুইটা family, কখনো adjust হয় নাকি ? আমরা জানতাম, আসিফ time pass করছে। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, মানুষ এত নিষ্ঠুর কেমনে হয় ? আমার এখন আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না । মাঝে মাঝেই মনে হয় , আমি একটা চলন্ত লাশ। আসিফ আর একদিন ও ক্যাম্পাসে আসলো না । আসিফের সাথে আবার যোগাযোগ করতে আমার আত্মসম্মানে বাঁধলো। মনে হয় , লাশদের ও আত্মসম্মান বোধ আছে ।বাসার থেকে খবর পাঠালো , কালই রওনা দাও , সকালের ট্রেনে। দুপুরের ভীতর পৌঁছে গেলে , কাল দুপুরেই তোমার বিয়ে। ট্রেন লেট থাকলে বিয়ে হবে রাতে।
ট্রেন স্টেশনে যখন পৌঁছালাম , তখন একবার মনে হলো, ট্রেন আসলে ট্রেনের নিচে ঝাপিয়ে পড়বো। কিন্তু আমি অত সাহসী ছিলাম না । তাই শেষ পর্যন্ত সুইসাইড করার চিন্তাটা মাথার থেকে বাদ দিলাম । তাছাড়া, বাবা মার চেহারাটাও মনের ভিতর ভাসছিল । কত আশা করে আমাকে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়তে পাঠিয়েছিল। আর চাচা ? তার কাছে ও তো ঋণী কম নই। সে যদি পড়ালেখার খরচ না দিত , তাহলে তো আমি এত বড় জায়গায় পড়তে পারতাম না । তাই সাত পাঁচ ভেবে, ট্রেনে চেপে বসলাম । দুপুরের ভীতর পৌঁছে গেলাম গ্রামে । ইউনিয়ন এর চেয়ারম্যান চাচার সাথে দেখা হলো রাস্তায়। বললেন, যাও মা , বর যাত্রী পৌঁছে গেছে । দশটা গাড়ি সাজায় আনছে। এত বড় ফ্যামিলিতে তোমার বিয়ে হচ্ছে , এটা আমাদের গ্রামের জন্য বিশাল সম্মানের। আমি মুখ নীচু করে তার সামনে থেকে চলে আসলাম । কি দরকার মানুষের কাছে নিজের মনের কথা প্রকাশ করে ? শুনলাম পিছন থেকে তিনি কুদ্দুস চাচাকে বললেন, মেয়ে লজ্জা পাইছে !
বাড়ির সামনেই চাচার সাথে দেখা হয়ে গেল। চাচা মহা খুশি । বললো , যা মা, তাড়াতাড়ি অন্দর মহলে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে গুছিয়ে নে। বাড়িটা বিয়ে বাড়ির মত করেই সুন্দর করে সাজিয়েছে । কিন্তু কোন কিছুই আমার মনের উপর কোন প্রভাব ফেললো না। মনে মনে আমার মৃত্যু হয়েছে । মৃত মানুষের মতই বাসায় ঢুকলাম। আমাকে নিয়ে সবার হৈচৈ পড়ে গেল । আমার ছোট বোন খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললো, আপু , দুলাভাই যে সুন্দর! একদম রাজপুত্রের মত। ডাইনে তাকায় দেখো। আমার ইচ্ছা করলো না, তাকিয়ে দেখি । আমার কপালে যা আছে তাই হবে। রাজপুত্র না হয়ে মামদো ভূত হলে ও সমস্যা নেই ।
ঘরে ঢোকার পরে এক অপরিচিত মহিলা সামনে আসলেন। চেহারায় তার আভিজাত্যের ছাপ । ব্যবহারটা এত সুন্দর! বললেন , ইস রোদের ভিতরে Journey করে মেয়েটা আমার ঘেমে নেয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলাম, আমাদের সাথেই গাড়িতে করে আনবো। কিন্তু গ্রামের লোকজন আবার কি বলে , এই ভয়ে আনলাম না । মহিলার ব্যবহারে কেমন একটা আপন আপন ভাব ছিল । যা মনকে ছুঁয়ে যায়। আমার মনে হচ্ছে মহিলাটাকে আমি কোথায় যেন দেখেছি ।
আসিফের সাথে break up হওয়ার পরে মাথাটা ভালো কাজ করে না । আসিফের কথা মাথায় আসতেই বিদ্যুত খেলে গেল মাথায় – এটা আসিফের মা ! এই মহিলা এখানে কি করছে ?!!! এতক্ষণ একবার ও বর কে দেখতে ইচ্ছা করেনি। এখন হঠাৎ করেই দেখতে ইচ্ছা করলো। দৌড়ে চলে গেলাম জানালার কাছে । উঁকি মেরে দেখি – শেরওয়ানী পরে বরের সাঁজে আসিফ !!!!! আমাকে দেখেই দুষ্টামি একটা হাসি দিল । আমার গা হাত পা কাঁপছে । আমার হৃদপিন্ড এমন লাফাচ্ছে যে , মনে হচ্ছে খাঁচা ছাড়া হয়ে যাবে ! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো ?!! পৃথিবীটা এত সুন্দর কেন ?!!!!
গল্পের বিষয়:
গল্প
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত