সেন্স অব টিউমার

সেন্স অব টিউমার
আবীর প্রেগ্নেন্ট। এ ব্যাপারে এখন আর আবীরের কোন সন্দেহ নেই। মিনিট বিশেক আগেও সন্দেহ ছিল। বমি হয়েছিল বার দুয়েক সাথে মাথা ঘুরানি। কি জানি মাথায় আসছে ডিস্পেন্সারিতে গিয়ে প্রেগ্নেন্সি চেকার নিয়ে গোপনে চেক করে দেখল রেজাল্ট পজিটিভ।
ডিস্পেন্সারিতে গিয়ে যদিও জিনিসটা কিনতে তার যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। দোকানদারকে বলল ” ভাই প্রেগ্নেন্সি টেস্ট করে যে ঐ মেশিন টা দেন”। দোকানে ভীড় থাকায় দোকানদার তাকে পাত্তা দিল না। দু তিন মিনিট পর আবার বলল ” ভাই মেশিনটা দেন না জলদি।” দোকানদার রেগে ঝাড়ি মেরে বলল – ভাই এত অস্থির হচ্ছেন কেন? এমন ভাব করতেসেন যেন আপনি ই প্রেগ্নেন্ট হইসেন। এখনি টেস্ট না করাইলে দুনিয়াদারী অশান্তি লাগছে আবীরের। মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সেটাও পারবেনা। তার পেটে বড় হচ্ছে এখন অন্য আরেকজন। এটা কি হয়ে গেল তার জীবনে হুট করে। কি পাপ সে করেছিল যে এমনটা হতে হবে। এই অবস্থা নিয়ে সে কিভাবে দাঁড়াবে তার বউ এর সামনে। কিছুতেই কিছু ভেবে না পেতে পেতে একসময় আবীর মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেল।
জ্ঞান যখন ফিরল তখন আবীর এর মাথার কাছে তার একমাত্র বউ আয়েশা বসে আছে। আবীরের দিকে আয়েশার কড়া নজর। এমনিতে বেচারা আবীর তার বউকে জমের মত ভয় পায়। তার উপর এই অনাকাংখিত ঘটনা। সে মনে মনে দোয়াকালাম পড়ে দোয়া করছে যেন আয়েশা এ খবরটা গুণাক্ষরেও টের না পায়। দোয়াকালাম শেষ হবার আগেই আয়েশা হুংকার ছেড়ে বলল ” ছি আবীর, ছি। তোর মত একটা গের সাথে আমি এতগুলা দিন এক ছাদের নিচে থেকেছি এইটা ভাবতেও এখন ঘেন্না হচ্ছে। আয়েশার কথাটা বুঝে উঠার আগেই আবীর আরেকবার ফিচিত করে বমি করে দিল। তেঁতুলের আচার খাওয়ার পর বমি থামল। বমি থামতেই আয়েশা আবার আবীর কে প্রশ্ন ছুড়ে দিল “তা কদিন ধরে সম্পর্কটা চলছে”। আবীর অসহায় জবাব দিল ” কি বলছ এসব? কিসের কদিন?
– ন্যাকামো না করে যা জিজ্ঞাসা করছি তার ঠিকঠাক জবাব দাও। যার বাঁচ্চা পেটে নিয়ে ঘুরছ, তার সাথে সম্পর্ক কতদিনের”
-তোমাকে ছাড়া কোনদিন কোন মেয়ের সাথে কখনো ঘুরতে দেখেছ তুমি আমাকে, আয়েশা? “
– মেয়ের সাথে তো ঘুরোনি তুমি।
– তাহলে?”
– কোন ছেলের সাথে তোমার গে-বৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তা না হলে তোমার পেটে বাচ্চা এল কি করে।
– তুমি কি করে জানলে যে আমার পেটে…
– বারেহ! সাধুবাবা। একটু আগেই তো ঘোরের মধ্যেই সত্যটা নিজেই বলে দিলে। ছি শেষমেশ কিনা একটা গে…….ইস। বলতেও ঘেন্না হচ্ছে আমার।
আজব কি বলছে এসব আয়েশা। আবীরের চরিত্র তো কখনোই এত নোংরা ছিল না। তার পেটে সন্তান কিভাবে এসেছে সে এটা নিজেই জানেনা, তার উপর আয়েশা এমন নোংরা সন্দেহ করছে। তার আরেকবার মরে যেতে ইচ্ছে করল। কিন্তু সেটা এখন সম্ভব না৷ কারণ তার পেটে বেড়ে উঠছে আরেকজন। সারা সন্ধ্যা বসে বসে আবীর গুগলে তন্ন তন্ন করে ” পুরুষ মানুষ কিভাবে প্রেগ্নেন্ট হয়” লিখে সার্চ করল। কোন লিংকেই কোন জবাব পেল না৷ যে ব্রাউজার থেকেই সার্চ দেয় সেখানেই রিপ্লায় আসে “নায়িকা জয়া প্রেগ্নেন্ট( দেখুন ভিডিওসহ)।” পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙতেই আয়েশা হাজির। ওর হাতে গ্লাস। গ্লাসের ভেতর কি এটা বোঝার জন্যে আবীর জিজ্ঞাসা করল ” এইটা কী? ” ” এইটা হরলিক্স” আয়েশা জবাব দিল।
– মানে কী?
– আরে বাবা এইটা মাদার হরলিক্স না, ফাদার হরলিক্স।
– কিন্তু কার জন্যে?
– কার জন্য মানে? তোমার জন্যে! তুমি বাবা হতে চলেছ। তোমার গর্ভে নতুন কেউ বেড়ে উঠছে৷ এখন থেকে তোমার সব হেলদি খাবার খেতে হবে।
– তা বুঝলাম। কিন্তু ফাদার হরলিক্স কিভাবে পেলে? কোথায় পেলে? কোন দোকানে পেলে?
– আরে পাইনি৷ ফাদার হরলিক্স কি বের হয়েছে নাকি?
– তাহলে?
– আমি বুদ্ধি করে একটা মাদার হরলিক্স কিনে মাদারের জায়গায় ফাদার বসিয়ে নিয়েছি কলম দিয়ে। ব্যাস!
– এএএএএএ! বিস্ময়ে আবীরের চোখ দুইটা এই যেন ফুড়ুত করে বের হয়ে আসল। আয়েশা আবার বলে উঠল-
– জানো আমি গতরাতে অনেক ভেবেছি।
– কী ভেবেছ?
– যা হয়েছে ভালই হয়েছে, তুমি বাবা হচ্ছ।
এমনিতেই তো এই কাজটা আমার ই ছিল। আমাদের ঘরের প্রায় সব কাজ ই তুমি করে দাও। সন্তান আনার কাজটাও তোমার দ্বারা হয়ে গেল। কি দারুণ। আমি অযথায় মিছেমিছি তোমাকে নিয়ে গতরাতে কি বাজে সন্দেহ করেছিলাম। আই এম স্যরি। এখন থেকে তোমার যাবতীয় সেবা যত্ন সব আমার দায়িত্ব সোনা। যতই হোক তোমার পেটে বেড়ে উঠছে আমাদের সন্তান। কথাটা শোনার পর আবীরের মনে কিছুটাও হলে স্বস্তি ফিরে এল। যাক অন্তত আয়েশা এইটাতো মেনে নিয়েছে যে কোন ছেলের সাথে তার কোন গা-বৈধ সম্পর্ক হয়নি ছি ছি এইটা ভাবতেও তো কেমন লাগে। ইছ। সে ভাবল যাই হবে হোক। জীবনে এই প্রথম সে তার বৌর সেবা শুশ্রুষা তো পাবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি অস্কারজয়ে বোধয় ক্যাপ্রিও পায়নি। সে আবেগাপ্লুত হয়ে আয়েশাকে বলল
– দাও হরলিক্স টা দাও। খেয়ে নিই।
আয়েশা আহ্লাদ করে বলল- এই একদম বিছানা ছেড়ে উঠবেনা। শুয়ে থাকো। লক্ষী বাবাদের মতন। আমি ই তোমাকে খাইয়ে দিচ্ছি৷ আবিরের কাছে সব স্বপ্ন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আয়েশা তার সাথে দুষ্টুমি করছে। আহ্লাদ করে হরলিক্সটা খাচ্ছে আবীর। আর আয়েশা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আহ এমন সুখ পেলে আবীর বছরের সবসময় ই প্রেগ্নেন্ট থাকতে চায়। আহ্লাদে আহ্লাদে কাটল গোটা দিন। কিন্তু বিকেল নাগাদ আবীরের বেডরুমটা হস্পিটালের মতন অবস্থা। শয়ে শয়ে মানুষ তাকে দেখতে আসছে।
এস্থেটিক ফটো মিডিয়া থেকে শুরু করে লোকাল মিমট্রল এজেন্সি, টিকটক ক্লাব, পাব্জি ক্লাব, এক্স-সিওসি কম্যুনিটি, ফেসবুক ছাত্রলীগ, বিলুপ্ত ছাত্রদল, ফেমিনিজম গ্রুপ, ইস্যু এনাইলাইজার কেউ বাদ নেই। কেউ না। সবাই এক এক করে এসে আবীর কে দেখে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরণের কথোপকপথন চলছে। কর্মকান্ড হচ্ছে। ছবি তুলছে। এস্থেটিক ফটো মিডিয়ার লোকজন বিভিন্ন এংগেলে আবীরকে বসিয়ে ছবি তুলছে। কখনো কানে কাঠাগোলাপ গুজে দিচ্ছে। হাতে অপরাজিতা ফুলের চা ধরিয়ে দিচ্ছে। দুই হাতে দুইটা প্যাম্পার্স ধরিয়ে দিচ্ছে। ফুলা পেটের ছবি তুলছে।
মিমট্রল এজেন্সির লোকজন বিভিন্ন ভাবে প্রশ্নে প্রশ্নে বিদ্ধ করে দিচ্ছে আবীরকে। তাদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে তরজতাজা মিম বানিয়ে ফেলছে। পেট মোটা লোকদের নিয়ে আবীরের সাথে রিলেভেন্ট মিম বানানোর প্রসেসিং চলছে। সে এক তুমুল এলাহী কান্ড।
ইস্যু এনালাইজার এর কেউ কেউ পুরা ঘটনাটা আবীরের মুখে একবার শুনছে। শুনতে শুনতে সাংকেতিক ভাষায় নোটপ্যাডে টুকে নিচ্ছে। কেউ কেউ লাইভে যাচ্ছে। পুরা বিষয়টার সবিশদ বর্ণনা করছে। ফেমিনিস্ট আপুরা এসেই আবীর কে প্রায় জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কান্না করে দেবে অবস্থা। এই দেখে আবীর হতবাক। স্কিভলেস ব্লাউজ পরা এক সিটি ফেমিনিস্ট কাঁদো কাঁদো গলায় বলল – উফ! আবীর ইউ হ্যাভ ডান এন এক্সট্রা অর্ডিনারি ট্যাস্ক। এখন আমরা বলতে পারব নারী পুরুষ সমান। আরেকজন বলছে ” প্লিজ আবীর একবার বলুন, আপনি কিভাবে এই দারুণ কাজটি করে ফেললেন। কিভাবে প্রেগ্নেন্ট হলেন। কিভানে কন্সিভ করলেন? এই একই পদ্ধতি আমি আমার হাজব্যান্ডের উপর এপ্লায় করে দেখিয়ে দিতে চাই দেশকে। নারী পুরুষ সমান। ” আরেক ফেমিনিস্ট ভাষণের গলায় বলে বসল ” আপনাকে সম্মাননা দেয়া হবে আবীর সাহেব। আপনি অসাধ্য সাধন করেছেন। “
এভাবে রাতারাতি আবীর সেলেব্রিটি বনে গেল। আবেগী মেয়েরা তাকে ভালোবাসতে শুরু করে দিল। ভার্সিটির মেয়েরা একলাইনের কবিতা লিখতে লাগল লাগল ” প্রেমিক হলে আবীরের মত হও, জামাই হলে আবীরের মত হও। “
স্কুল কলেজের মেয়েরা ডিপিতে আবীরের পেট ফুলা ছবি দিয়ে ক্যাপশন দিল ” উফফ, ক্রাশ।” ফেসবুকে তাকে নিয়ে দিনরাত আলোচনা সমালোচনার ঝড়। এদিকে তার আস্তে আস্তে বেড়ে উঠতে লাগল গর্ভের উচ্চতা। দিন যতই যেতে লাগল আবীরের মনে একটাই প্রশ্ন কেবল দানা বাঁধতে লাগল ” সন্তানটা বের হবে কোনখান দিয়ে”। রাত দিন এই এক চিন্তায় তার নাওয়া খাওয়া ঘুম প্রায় হারাম হয়ে যেতে লাগল। তার বউ আয়েশা এতটাই অমায়িক মহিলা যে সে ই একমাত্র আবীরকে এই বলে আশ্বস্ত করল বারবার ” সন্তান যিনি দিয়েছেন, তিনি নিশ্চয় সামনে পেছনে একটা পথ বের করে দিবেন। চিন্তা কোরোনা। “
কথাটা শুনেই আবীর একবার জোরে ঢোক গিলে। সামনে তো কোন পথ নেই। তার মানে কি পেছনে অমনি আয়েশা বানিয়ে রাখা ফাদার্স হরলিক্স বাড়িয়ে দেয়। আবীর খায়। ঘুম যায়। এভাবেই দিন গড়ায়৷ এভাবে চলে যায় অনেকদিন। ব্যাথা উঠে। বমি হয়। তারপর একরাতে আবীরের তুমুল যন্ত্রণা উঠে। ইমার্জেন্সী নিয়ে যাওয়া হয় হস্পিটালে। ডাক্তার জানায় এক্ষুণি আবীরের অপারেশন করাতে হবে৷ অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয় আবীরকে। দীর্ঘ চার ঘন্টা ধরে অপারেশন চলতে থাকে। একসময় অপারেশনের লাইট নিভে যায়৷ ডাক্তার বের হয়ে আসে। আয়েশা দৌড়ে ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার হাসিমুখে জানায়
– অপারেশন সাক্সেসফুল। আয়েশা আনন্দে লাফিয়ে উঠে। অবশেষে সে কোন পরিশ্রম ছাড়াই মা হয়ে উঠল। উফ কি দারুণ। ফেসবুকে গার্লস গ্রুপে তক্ষুণি একটা পোস্ট করে দেয় আয়েশা। যেহেতু সে নিজেই সে গ্রুপের এডমিন, তাই কোন এপ্রুভাল ছাড়ায় পোস্ট টা দ্রুত পৌছে যায় সব্বার কাছে। পোস্ট টা আপডেট করেই ডাক্তার কে জিজ্ঞাসা করে
– আচ্ছা ডাক্তার সাহেব একটা প্রশ্ন করতাম যদি মনে কিছু না করেন।
– জ্বি করুন।
– আসলে আপনারা সন্তানটা বের করলেন কোন পথে?
– মানে?
– না মানে? পায়ু পথে নাকি সিজার
– আশ্চর্য পায়ু পথে কেন হবে৷
– তাহলে কি সিজারে
– হ্যা সিজারে আই মিন পেট কেটে।
– তা ডাক্তার, আমাদের বেবিটা এখন কেমন আছে? ওর বাবা কেমন আছে?
– কার বেবি?
– কার বেবি মানে?
– আমিওতো জিজ্ঞাসা করছি কার বেবি?
– কেন আমাদের বেবি।
– কি বলছেন এসব আবোল- তাবোল আপনি। মাথা ঠিক আছে আপনার?
ডাক্তারের মুখে কথাটা শেষ হতে না হতেই আয়েশা দৌড় দিল ওটি রুমে। আবীর সটান হহে শুয়ে আছে বিছানায়। আশে পাশে কোন বেবি নেই। একজন নার্সের হাতে একটা বালতি। বালতিতে চোখ পড়তেই আয়েশা দেখতে পেল বিশাল একটা মাংসপিন্ড। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নার্সটা বলে উঠল ” এত্ত বড় টিউমার আমি আমার বাপের জন্মেও দেখিনায়। ভাগ্যিস লোকটার পেট লম্বা ছিল। না হলে এত্ত বড় টিউমার কোন পথে বের করত কে জানে!” পেছন থেকে আবীর বিড়বিড় করে বলে উঠল ” ওগো আয়েশা, আমাদের ছেলে হয়েছে নাকি মেয়ে? তাকে একটু আমার কোলে দাও

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত