চিরকুমার

চিরকুমার
সাকিব সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ সে আত্মহত্যা করবে‌। এই জীবন আর রাখবে না। তার জীবনে শুধু কষ্ট। কেউ তার দুঃখ বুঝে না। সবাই আত্মহত্যা করে দুঃখে, ডিপ্রেশনে, প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে, অভাবে, অপমানে। কিন্তু সাকিবের আত্মহত্যা করতে চাওয়ার কারণ হচ্ছে বিয়ে না করতে পারা। অদ্ভুত হলেও সত্যি। সাকিবের বয়স ঊনচল্লিশ ছুঁই ছুঁই। তবুও আশ্চর্য কারণে সাকিবের বিয়ে হচ্ছে না। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো তার বাবা। তার বাবা একজন আর্মি রিটার্ড অফিসার। ভীষণ বদমেজাজি। সব সময় নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। আর সাকিব ছোটবেলা থেকেই তার বাবাকে যমের মতো ভয় পায়। বড়বেলাও তাই।
বাবার সামনে দাঁড়ালে হাঁটু কাপে। আর যার কারণে সাকিব বলতেও পারে না তার বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। মা’কে বলেও কোনো লাভ নেই। মা সারাদিন টিভির সিরিয়ালের বউ নিয়ে ব্যস্ত। আর এদিকে নিজের ছেলের বিয়ে করানো উচিত এটা তারা ভাবেই না। সাকিব মা’কে বিয়ের ব্যাপারে বললে মা বলে, “এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করে তুই নিশ্চয়ই আমার সংসারে আগুন লাগাতে চাচ্ছিস?” সাকিব বুঝতে পারলো না বিয়ে করার সাথে সংসারে আগুন লাগে কীভাবে। সাকিব বলে, “কি বলছো মা? বিয়ে করলে সংসারে আগুন লাগে কীভাবে?”
“কি বলছি মানে? আমি নাটকে দেখেছি, ছেলেকে মা সুন্দর একটা মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়। বিয়ের কিছুদিন পরে ঐ সুন্দরী বউ শ্বাশুড়িকে দেখতে পারে না। কথায় কথায় শ্বাশুড়িকে অপমান করে।”
“হোয়াট! কীসের সাথে কীসের সম্পর্ক? তার মানে তোমরা আমাকে বিয়ে দিবে না?”
“এত অধৈর্য্য হচ্ছিস কেন? বিয়ে তো আমরা তোকে নিশ্চয়ই দিব। কিন্তু তার জন্য তো একটা সুন্দর মেয়ে দরকার। দেখিস তোকে মোহরের মতো একটা মেয়ের সাথে বিয়ে দিব। সময় হোক।”
“মোহরটা আবার কে?”
“ও মা! তুই জানিস না। যে নাটক দেখার জন্য আমি সারাদিন অপেক্ষা করি। অবশ্য জানবি কী করে তুই তো আর এসব ভালো জিনিস দেখিস না?”
সাকিব বুঝতে পারলো তার বাবা-মা তার বিয়ে সম্পর্কে একদম সিরিয়াস না। একমাত্র সন্তান সে। তবুও বাবা-মা বুঝার চেষ্টা করছে না। আত্নীয় স্বজনরা সব দূরে থাকে। কেউ সরাসরি বলে কেউ অন্যভাবে বলে। পাড়াপড়শিরাও পর্যন্ত বলে। কিন্তু তবুও সাকিবের বাবা-মার এক কথা, “দিব, ভালো পাত্রী পাই। অবশ্যই দিব। সময় হোক।” কিন্তু এই সময় হোক করতে করতে প্রায় বিয়ে করার সময় চলে গেল তবুও সাকিবের বিয়ে হলো না। কারণ সাকিবের বাবা-মার কাছে সাকিব এখনো ক্লাস ওয়ানের বাচ্চা। সন্তানরা নাকি বাবা-মার কাছে কখনো বড় হয় না। এর দৃষ্টান্ত উদাহরণ সাকিবের বাবা-মা। অথচ সাকিবের বয়স বেড়ে চুল পেকে যাচ্ছে। চুলও পড়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন পর টাকলা হতে সময় লাগবে না। ভুঁড়িও বেড়ে স্বাস্থ্য বেশ উন্নত হয়েছে। মোটা যাকে বলে। কিন্তু তবুও সে বিয়ের জন্য উপযুক্ত নয়। মাঝে মাঝে সাকিবের মামলা দিতে ইচ্ছে করে তার বাবা-মার নামে। বিয়ে না দেওয়ার মামলা। কিন্তু আফসোস এমন কোনো মামলা আমাদের দেশে নেই।
বাস্তব জীবনে সাকিব খুব সহজ সরল। সবার সাথে মিলেমিশে চলে। অফিসে বিভিন্ন চাকরিজীবী তার সাথে মজা করে। তার থেকেও ভয়ঙ্কর হলো অফিসের কমবয়সী সুন্দরী কলিগরা। সাকিবকে আঙ্কেল বলে ডাকে। সাকিব এই লজ্জায় কোনো মেয়ের সাথে কথা বলতে পারে না। তবুও মাঝে মাঝে শিলা মেয়েটাকে তার ভালো লাগে। কী সুন্দর করে মেয়েটা সেজে আসে। সাকিবের ইচ্ছে করে টুপ করে গলায় বিয়ের মালা পড়িয়ে দিতে। একদিন শিলা নীল রঙের শাড়ি আর ম্যাচিং ব্লাউজের সাথে কালো টিপ মাথায় দিয়ে একদম পরীর মতো সেজে অফিসে আসে। সাকিবের মনে ‘ও মেয়ে কাছে আসো না’ গানটা বাজতে থাকে। সাকিব লাঞ্চ টাইমে শিলাকে বলে, “আমি পরী দেখেনি কিন্তু তোমাকে দেখেছি। নীল শাড়িতে কী সুন্দর লাগছে তোমায়। আচ্ছা তুমি এত সুন্দর কেন?” শিলা মুচকি হেসে বলে, “কি যে বলেন না সাকিব আঙ্কেল, ধন্যবাদ।” শিলার কাছ থেকে আঙ্কেল শুনে সাকিবের মন ভেঙে যায়। সাকিব রেগে গিয়ে শিলাকে বলে, “দূর একটু মজা করলাম। আসলে তুমি দেখতে একদম চাকমাদের মতো। ঐ যে চিকা আছে না? তার আকৃতি তোমার মধ্যে বিদ্যমান।” শিলা রেগে গিয়ে সাকিবের কানের নিচে বাজিয়ে চলে গেল। সাকিব বুঝতে পারলো না বয়সের দিক থেকে যদি আঙ্কেল মনে হয় তবে চড় মারার সময় এরা বন্ধু ভাবে কীভাবে।
সাকিব সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিলিং ফ্যানে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করবে। আত্মহত্যার অনেক উপায় থাকলেও তার কাছে এটা বেটার মনে হলো। কারণ সে সাঁতার জানে না তাই নদীর জলে ঝাঁপ দিতে ভয় পায়। বিষ বা ক্যামিকেল খেয়ে আত্মহত্যা করতে বেশ সময় লাগে। এত সময় নিয়ে যন্ত্রণা ভোগ সে করতে পারবে না। ঘুমের ঔষধ খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সাকিবের মনে করে এই পদ্ধতি মেয়েদের মতো দুর্বল ছেলেদের জন্য। উঁচু থেকে লাফ দেওয়া যাবে না কারণ সে উঁচুতে ভয় পায়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মরা যায়, কিন্তু এখানে বেঁচে গিয়ে পঙ্গু হবার আশঙ্কা আছে। কিন্তু সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে মরায় সে কোনো খারাপ দিক খুঁজে পেল না। বরং ঝুলে গেলেই খেলা খতম। এটা বর্তমানে বহুল প্রচলিত ট্রেন্ড। অনেক সেলিব্রিটি মানুষরাও এভাবে ফ্যানের সাথে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাই সে এটাকে এক শিল্প মনে করলো। ইতিহাসে সেই মনে হয় প্রথম ব্যক্তি যে বিয়ে না করতে পারার শোকে আত্মহত্যা করবে। হয়তো আত্মহত্যার ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে। জাতি তাকে চিনবে। সাকিবের জন্য তার মতো বিয়ে না করা অসহায় ব্যাচেলর ছেলেদের বাবা-মা যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দিবে। জাতির কাছে একজন আইকন হিসেবে সে থাকবে। ভাবতেই সাকিবের বুকটা ফুলে উঠছে।
ফ্যানের সাথে ঝুলার জন্য তার প্রয়োজন একটা শক্ত মোটা দড়ি। কিন্তু ঘরে কোথাও দড়ি খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ তার স্পষ্ট মনে আছে কিছুদিন আগেও তার ঘরে ছিল। দড়ির জন্য বাবা-মাকে কিছু বলা যাবে না। তাই সে নিজে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে দড়ি পেল রান্নাঘরে। কিন্তু দড়ি দেখে ছেঁড়া। বেশ ভালো করে ছেঁড়া। সাকিব বুঝতে পারলো ইঁদুরের কাজ এটা। এই দড়ি দিয়ে ফাঁস ঝুলানো সম্ভব নয়। তাই সে বাইরে গিয়ে দোকান থেকে মোটা দড়ি কিনে নিয়ে এলো। এরপর প্রয়োজন একটা টুল বা চেয়ার। সাকিবের স্বাস্থ্য মোটামুটি অনেক। প্লাস্টিকের চেয়ার দিয়ে হবে না। যদি ভেঙে বা পড়ে গিয়ে ব্যাথা পায়। না! সে মরার সময় কোনো রিক্স নিতে পারবে না। তাই সে ঠিক করলো কাঠের চেয়ার লাগবে। এখন ঘরের একমাত্র কাঠের চেয়ার হলো বাবার রুমে। বাবা দরজা বন্ধ করে ঘুমাচ্ছে। প্রতিদিন বাবা দুপুরের দিকে ঘুমায়। আজ দেরি করে ঘুমিয়েছে। হয়তো একটু আগে। দু ঘন্টা পর ঘুম ভাঙবে । তাই সাকিব এতক্ষণ অপেক্ষা করতে লাগলো।
যতো যাইহোক আর সে কাঠের চেয়ার ছাড়া ফ্যানের সাথে ঝুলবে না। এমনিতেই জীবনটা তার বেদনা। আর বেদনায় জর্জরিত হতে চায়না। এজন্যই সাকিব টানা আড়াই ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করতে লাগলো কখন তার বাবার ঘুম ভাঙে। এদিকে দুপুর পেরিয়ে বিকেল শেষ হয়ে গেল তবুও সাকিবের বাবার ঘুম ভাঙলো না। ঘুম ভাঙলো আরো প্রায় এক ঘন্টা পর। মাগরিবের আজান দেওয়ার আধা ঘন্টা আগে। কিন্তু ঘর থেকে বাবা বের হলেন মাগরিবের নামাজের সময়। এদিকে সাকিবের শরীর রাগে জ্বলে যাচ্ছে। সাকিব এরপর ধীরে ধীরে কাঠের চেয়ারটা নিয়ে আসলো। না আর দেরি করা যাবে না। সময় অনেক হয়েছে। বাবা আসার আগেই ঝুলে পড়তে হবে। মা সিরিয়াল দেখায় ব্যস্ত। দুনিয়া কিয়ামত হয়ে গেলেও এখন তিনি ঘরের খবর রাখবে না। তাই এটাই মোক্ষম সুযোগ। তাই এখন সব রেডি। দড়ি গলায় দিয়ে চেয়ারে দাঁড়িয়ে সে প্রস্তুত।
একটু পর ঝুঁলে যাবে। শেষে একবার বাবা-মার কথা মনে পড়লো। তারা কি কষ্ট পাবে? কিন্তু পরক্ষণেই দুনিয়ায় নিজের নাম পরিচিত করতে হবে বলে সে খুশি হয়ে গেল। চেয়ার ছেড়ে দিল। কিন্তু সিলিং ফ্যান ভেঙে সাকিব ডিগবাজি খেয়ে পড়লো মেঝেতে। কোমরে পেল ব্যাথা। মোটা হলে যা হয় আর কি। পুরাতন ফ্যান । হয়তো ঝং ধরেছে। তাই ভেঙে পড়ছে। সাকিবের শরীর রাগে জ্বলছিল। মরার জন্য এতো সমস্যা হবে সে ভাবতে পারেনি। মেঝেতে পড়ে সাকিবের কোমর ভেঙে গেছে। নড়তে পারছে না। এদিকে ঘরের কেউ খোঁজ রাখছে না সাকিব কী করছে। এসব ভেবে সাকিবের মাথা রাগে ভনভন করছে। দুনিয়ার বুকে আগুন জ্বালিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠলো। দেখে বন্ধু ইমনেরর ফোন। ফোন ধরার সাথে সাথে ইমন ওপাশ থেকে বললো,
“বন্ধু তুই কই?” সাকিবের মন দিয়ে একটা কুরুচিকর কথা বের হলেও দমন করে উত্তর দিল,
“বাসায়, কেন?”
“তোকে একটা কথা বলার ছিল?”
“মেয়েদের মতো ঢং না করে বল কী বলবি?”
“মারিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক সবাই মেনে নিয়েছে। আগামী শুক্রবারে বিয়ে।”
সাকিব আর কিছু বললো না। কাঁটা গায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছে। রাগে ফোনটা আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেললো। শুধু ফোন না মন চাচ্ছে ঘরে যা আছে সব ভেঙে ফেলতে। আর সহ্য করা যাচ্ছে না। বন্ধুমহলে ইমন আর সেই ছিল অবিবাহিত। তাই সাকিবের দুঃখ বুঝার জন্য সে ছিল একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু এখন সেও নেই। দুনিয়াকে বড্ড স্বার্থপর মনে হচ্ছে। রাগে গরমে শরীর ভিজে যাচ্ছে‌। কিন্তু ফ্যান আকাশে না ঝুলে পড়ে আছে মাটিতে। নিজের প্রতি রাগ যেন বেড়েই চলেছে। তার দ্বারা আত্মহত্যা পর্যন্ত হচ্ছে না। নিজেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে গর্দভ মনে হচ্ছে। আর সব ক্ষোভ জমা হচ্ছে তার বাবার প্রতি। সাকিবের এখন তার এক্স সাদিয়ার কথা মনে পড়ছে। সাদিয়ার বিয়ে হয়েছে আরো পনেরো বছর আগে। সাদিয়া বিয়ের আগে সাকিবকে পালিয়ে গাছ তলায় সংসার পাতার কথা বলেছিল। কিন্তু সাকিব তার বাবার ভয়ে তা করতে পারেনি। বিদায় কালে সাদিয়া বলেছিল, “দেখিস এই জন্মে তোর বিয়ে হবে না। আমাকে ধোঁকা দেওয়ার শাস্তি তুই পাবি।” এখন সাকিব বেশ বুঝতে পারছে সাদিয়ার অভিশাপ কতোটা জোড়ালো ভেবে লেগেছে।
রাতে সাকিবের বাবা আসার সাথে সাথে সাকিব তার বাবার কাছে গেল। তার বাবা কাগজ নিয়ে কী জানি হিসেবে নিকেশ করছে। সাকিবের আর সহ্য হচ্ছে না। আজ সে বলবে। আর নয়। লড়াই করার সময় এসেছে। সাকিব তার বাবার সামনে গিয়ে সিংহের মতো বেশ চিৎকার করে বললো,”চৌধুরী সাহেব?” সাকিবের বাবা চশমার আড়ালে সাকিবের দিকে তাকালেন। সাকিব মনে ভয় এসে গেল এ কি করলো? বাবার নাম ধরে ডাকা উচিত হয়নি। কিন্তু পরক্ষণেই সাকিব মনকে বুঝালো ভয়কে জয় করতে হবে। তাই আবার বললো কিন্তু বিড়ালের মতো মিনমিন করে,
“বাবা,একটা কথা বলতে চাই আপনাকে?”
“হু,বল?”
সাকিবের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মনে ভয় হচ্ছে। কিন্তু আজ সে বলবে। চোখকান বন্ধ করে বেশ জোড়ে বললো,
“বাবা আমি বিয়ে করতে চাই?”
‘কী, আবার বল?’
“বাবা আপনার ছেলের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু আপনারা দেখছেন না। আমি কি আপনার মতো বাবা ডাক শুনবো না?”
“কী! এত বড় সাহস তোর? বাপকে বিয়ের কথা বলিস?”
“আপনিই তো বললেন আবার বলতে। তাই বললাম। আমি আর মুখ বন্ধ করে থাকবো না। বিয়ে না দিলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।”
“তো বসে আছিস কেন? চলে যা। বেয়াদব কোথাকার।”
“বাবা আপনি এই কথা বলতে পারলেন? আমার কী কোনো মূল্য নেই আপনার কাছে? নাকি আমাকে দত্তক নিয়েছেন?”
“দত্তক নিলেও তোকে কখনো নিতাম না। গর্দভ একটা। বাবার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় জানিস না?”
“বাবা একটা বিয়ে দিলে কী হয়? আপনার দাদু ডাক শুনতে ইচ্ছে করে না?”
“চুপ করবি নাকি লাঠি বের করবো। এখনো দুধের দাঁত পড়েনি সে চাইছে বিয়ে করতে।”
সাকিবের এই কথা সহ্য হলো না। দুবার করে দাঁত পড়ে যাচ্ছে এখনো বলে দুধের দাঁত পড়েনি। এমনিতেই মাথা গরম আবার এইসব আজগুবি কথা। সাকিব নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে বাবার ঘাড়ে কামড় দিয়ে বললো, “এই লোন? দেখেন দুধের দাঁত?” সাকিবের বাবা আমেনা নাম ধরে দিল এক চিৎকার। চিৎকার শুনে দৌড়ে আসলো সাকিবের মা। সাকিবের মা’কে দেখে সাকিবের মনে হলো আজ বুঝি রক্ষা নাই। বাবা লাঠি নিয়ে আসার আগেই মা’র সামনে দিয়ে সাকিব ছুটলো। কিন্তু যাবার আগে দেখে টিভি চালু করা। সাকিব রিমোট দিয়ে টিভি অফ করে রিমোটটা নিয়ে ছুটলো বাড়ির বাইরে। পিছনে বাবা লাঠি নিয়ে আসছে। যেভাবেই হোক আজ পালাতে হবে।
সাকিব ট্রেনে করে পালিয়ে যাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে জানে না। কিন্তু সে হারাচ্ছে। এখানের কাউকে ভালো লাগে না। তাই সে পাড়ি জমাচ্ছে অজানায়। যেখানে কেউ তার জীবন নিয়ে সমালোচনা করবে না। ফোনটা আগেই ভেঙে ফেলেছে। তাই সে নিশ্চিত কেউ তার খবর পাবে না। সাকিব নিজেকে মহাপুরুষ ভাবছে। কারণ অনেক মহাপুরুষরা বিয়ে না করে আজ তারা বিখ্যাত। সাকিবেরও এখন তেমন ইচ্ছে। সে এখন মহাপুরুষ হতে চায়। কিন্তু সবকিছু ঠিক ছিল হঠাৎ করে এক দম্পতি সাকিবের সামনের সিটে বসলো। দম্পতিদের আবার এক ছোট্ট ছেলে। স্ত্রী দেখতে বেশ সুন্দর। না চাইলেও চোখ চলে যায় সাকিবের। সাকিব দেখলো ট্রেন ছাড়ার সাথে সাথে দম্পতির মাঝে রোমান্টিকতা ছুঁয়ে যাচ্ছে। সামনে যে একজন বসে আছে তা তারা খেয়ালই করছে না। কম বয়সী হয়তো এরা। তাই লাজলজ্জা কম। একটু পর লোকটি স্ত্রীকে বলছে,
“তোমার কি অসুবিধা হচ্ছে?”
“না।”
“কেন? কিছু খাবে?”
“আমার কিছু চাইনা। তুমি আছো পাশে আর কী বলো লাগে?”
এই বলে মেয়েটা লোকটার হাত আঁকড়ে ধরলো। লোকটির কোলে তাদের সন্তান। আহ্ কী সুন্দর দৃশ্য! কিন্তু সাকিবের বুকে আগুন জ্বলছে। এত ভালোবাসা দেখে তার আর কিছু করার না থাকলেও দেবদাস হতে সে বোতলের ছিপি খুললো। বোতলে বিয়ার পানীয় থাকলেও বোতলটি বিয়ারের নয়। বাজার থেকে কিনে আনা পানি খাওয়া প্লাস্টিকের বোতল। সাকিবের বন্ধু সাব্বির তাকে দিয়েছে। সাব্বিরের আবার এসবে ব্যবসা আছে। দুঃখ ভুলতে সাব্বিরের কাছে গেলে সাব্বির সাকিবকে বলে, “তোকে বলেছিলাম যেদিন তুমি বুকের হাহাকারে পুড়িবে, সেদিন তা নিভাতে আমার কাছেই আসিবে।
সাকিবের অন্য সময় সাব্বিরকে অসহ্য লাগতো। তার এই ব্যবসা সাকিব সহ্য করতে পারতো না। আর তাই আজ সুযোগ বুঝে সাব্বির টিটকারি মারছে। সব দুঃখ বুঝতে পেরে সাব্বির সাকিবকে বিয়ারের পানীয় প্লাস্টিকের বোতলে ভরে দিল। যেন কেউ সন্দেহ না করতে পারে। আর তাই সাকিব এখন বোতলের মুখ খুলে এক চুমুক দিল। ইয়াক! কী বিশ্রী? প্রথম প্রথম খেলে যা হয়। সাকিব চোখ বুঝে পিনিক অনুভব করতে লাগলো। আহ্ শান্তি। একটু পর সামনে দম্পতির বাচ্চাটা ‘পানি খামু’ বলে কেঁদে উঠলো। দুর্ভাগ্য তাদের কাছে পানির বোতল ছিল না। সাকিবের কাছে পানির বোতল দেখে সাকিবকে লোকটা বললো, “ভাই একটু পানি দিবেন? বাচ্চাটা খাবে।” ও শিট! লোকটার কথায় সাকিব চমকে উঠলো। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এটা যে অ্যালকোহল তা বলা অসম্ভব। পরে ট্রেনে মার খেতে হবে। যদিও রাতে তেমন লোকজন নেই। তবুও একটা মাসুম বাচ্চাকে এসব দেওয়া অন্যায়। সাকিব বললো,
“না। দিতে পারবো না।”
“আশ্চর্য! একটা বাচ্চা পানি খেতে চাইছে আপনি দিবেন না কেন? আপনার মনে কি মায়া দয়া নাই। বাচ্চাটা পানি পিপাসায় ছটফট করছে।” “আমি এক কথায় বলি আমি পারবো না। সরি। আপনার বাচ্চা মরলে আমার কি?”
সাকিব পরে বুঝতে পারলো লোকটার সন্তানকে নিয়ে এভাবে মরার মতো অলক্ষুনে কথা শোনানো একদম উচিত হয়নি। লোকটা রেগে গিয়ে সাকিবের সাথে পানির বোতল নিয়ে টানাটানি শুরু করলেন। যেভাবেই হোক তার পানির বোতল চায়। অবশেষে পানির বোতল নিয়ে বাচ্চাকে খাওয়ানোর সাথে সাথে বাচ্চা বমি করে দিল। লোকটা বোতল থেকে বিশ্রী গন্ধ পেয়ে বুঝতে পারলো এটা মাদকদ্রব্য জাতীয় কিছু। তিনি জোর গলায় চেঁচাতে লাগলেন। ট্রেনের সব যাত্রীরা তা দেখার জন্য এলো। আর সাথে সাকিবের গালে কিছু উপহার দিয়ে গেল। একটু পর স্টেশন মাস্টার আসলো। সাকিবকে পরের‌ স্টেশনে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দিল। এদিকে অর্ধেক বিয়ার খাওয়া সাকিবের ততক্ষণে নেশা হয়ে গেছে। দুনিয়া সব সবকিছু উল্টাপাল্টা লাগছে। সাকিব একটা বেঞ্চে বসলো। পাশে একজন ভদ্রলোক চাদর গায়ে বসে আছেন। সাকিব বুঝতে পারছে না এই গরমে চাদর গায়ে দেওয়া কোন ধরণের ভদ্রতা। সাকিব লোকটাকে বললো,”আজ খুব গরম তাই না?” লোকটা বললো,
“না।”
“ওহ, আপনার শরীরের তাহলে জ্বর?”
“না।”
“দেখেন দুনিয়ায় সবকিছু ঠিক নাই। মানুষ বড্ড খারাপ হয়ে গেছে। অন্যের দুঃখ বুঝে না। কিন্তু আমি আপনার দুঃখ বুঝতে পারছি আপনার মনে অনেক দুঃখ তাই না?”
“না।”
সাকিব বুঝতে পারলো লোকটার প্রতিটি উত্তর ঐ-না এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সাকিবের মনে জিদ চেপে গেল। তাই সে আবার বললো,
“বলেন তো বিয়ে করা কি পুণ্যের কাজ?”
“হ!”
এইবার উত্তরে পজিটিভ কথা শুনে সাকিবের মাথা খারাপ হয়ে গেল। সাকিব ভেবেছিল সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় বিয়ে করা। কিন্তু এই লোকটির কথায় সাকিব নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারলো না। সামনে একটা গাছের ডাল পেয়ে লোকটাকে মারতে শুরু করলো। লোকটা কয়েকটা মার খেয়ে বুঝতে পারলো এই নিশ্চয়ই কোনো পাগলের পাল্লায় পড়েছে। লোকটা উঠে দিল দূর। সাকিবও পেছনে দৌড়ে গিয়ে লোকটাকে গালমন্দ করতে করতে ধরলো। লোকটার পিঠে এক রামকিল দিয়ে লোকটার পেটে বসে সাকিব বললো,
“বল বিয়ে করা পুণ্যের কাজ নয়,বল হারামজাদা?” লোকটা তুতলাতে তুতলাতে বললো,
“হ,বিয়ে করা হারাম। বিয়ে করা হারাম।”
“ঐ ব্যাটা এক কথা তুই দুইবার বলোস কেন?”
এই বলে সাকিব আমার মারতে শুরু করলো। লোকটা গগন ভেদ করে চিৎকার করে বললো, “বাঁচাও, হেল্প! হেল্প!” সাকিব বসে আছে এক অন্ধকার ঘরে। সামনে একটা টেবিল। আর দুই পাশে দুটি চেয়ার। মাথার উপরে একটা বৈদ্যুতিক বাল্ব মৃদু আলোয় জ্বলছে। টেবিলের ওপাশে বসে আছে ওসি কুদ্দুস আলী। সাকিব কেন এখানে এলো তা বুঝতে পারছে না। ওসি কুদ্দুস আলী বললো, “আগে বল তুই আমাদের ইনফর্মার কে কেন মারলি?” সাকিব এতক্ষণ পর বুঝতে পারলো যাকে মেরেছে সে একজন পুলিশের ইনফর্মার। সাকিব চুপ করে রইলো। ওসি কুদ্দুস আলী আবার বললো, “আর তোর কাছে এটা কীসের রিমোট? কোথায় হামলা করার প্লান?” সাকিব ডোগ
গিললো। কী বলবে বুঝতে পারছে না। সাকিব বললো,
“আমি কিছু জানি না।”
“তাই না। সবকিছু খুলে বল? তোর এসবের পিছনে কে দায়ী?”
“আমার বাবা।”
“ও তার মানে তুই আর তোর বাবা জঙ্গিবাদে যুক্ত?”
“হোয়াট! তিনি একজন আর্মি রিটার্ড অফিসার।”
“তাই কী? আজ দেশরক্ষকরাও দেশখাদক। এসব বলে লাভ নেই। বল তুই কোনগ্রুপে সাথে যুক্ত?”
“জী, ব্যাচালর অবিবাহিত গ্রুপ।”
“মজা নিচ্ছিস আমাদের সাথে? মজা তোর পেছন দিয়ে বের করছি? হাবিলদার একে ডিম থেরাপি দেওয়া শুরু করো?” সাকিব অনেক বুঝালো রিমোটটা টিভির। কিন্তু কিছুতেই তারা মানলো না। সাকিবের মতো একটা মোটা গোরু পেয়ে হাবিলদার শুধু মেরেই গেল। সকালে সাকিবের বাবাকে সাকিবের ব্যাপারে ফোন দেওয়া হলে সাকিবের বাবা বলে,”ও আমার সন্তান নয়?” “হোয়াট! তাহলে আমরা কার ছেলেকে ধরলাম।”
“আমি জানি না।” “আপনি জানেন না মানে? সে বলছে আপনি তার বাবা।” এদিকে সাকিবের মা সাকিবের বাবার কানের কাছে এসে বলছে, “ওগো, সাকিবের কাছ থেকে একটু জেনে বলো না, রিমোটটা কোথায়?” সাকিবের বাবা বেশ জোরে ফোন কানে নিয়েই বললেন, “চুপ কর। একদম কানের গোড়ায় দেব?” ওসি কুদ্দুস আলী ধমক খেয়ে কিছুটা ভয় পেয়ে ফোনটা কেটে দিলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন সাকিব নিশ্চয়ই কোনো জঙ্গি দলের সাথে যুক্ত। হাতে প্রমোশনের সুযোগ থাকতে পারে। তাহলেই তিনি বিয়েটাও করতে পারবে। এমনিতেই তাঁর বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। এবার সুযোগ এসেছেন। ওসি কুদ্দুস আলী চিৎকার করে বললেন, “হারামজাদাটা কি এখনো কিছু বলেনি? দাঁড়াও আমি আসছি।”
পরিশিষ্টঃ সাকিবের বয়স এখন পঞ্চান্ন। সে আর এই জীবনে বিয়ে করেনি। সে এখন নিজেকে আরণ্যক বসুর ‘মনে থাকবে’ কবিতার সারমর্ম অনুসারে প্রায় বলে, ‘পরের জন্মে বয়স যখন ষোলো সঠিক, তখন আমরা বিয়ে করবো মনে থাকবে!’ বর্তমানে সে একটা সংঘের সাথে যুক্ত। সভাপতি পদে কাজ করে। সংঘের নাম ‘চিরকুমার সংঘ!’

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত