হৈমন্তী অতঃপর অপু

হৈমন্তী অতঃপর অপু
বিবাহ করিবার মনোবৃত্তি আমার ছিলো না। মায়ের পিড়াপিড়িতে আবার বিবাহের পিঁড়িতে বসিতে হইলো। বাবা মায়ের বাধ্য সন্তান বলিয়াই তাহাদের মনে দুঃখ দিতে পারছিলাম না। বিবাহ সম্পর্কে বাবা একটি কথাও বলিলেন না। কেমন যেন নিশ্চুপ হইয়া রহিলেন। আকাশের দেবতারা মুখ তুলিয়া তাকাইয়া ছিলেন বলিয়াই কপাল জুড়িয়া বিবাহের ফুল ফুটিল।
মা কন্যা দেখিতে ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন, আমি একটি বার শুধু বলিয়া ছিলাম, বিবাহ করিতে আমার মতি নাই।কিন্তু মা নাছোড়বান্দা, আমার কথায় কর্ণপাত করিলেন না কুম্ভকর্ণেয় ন্যায় তাহার কথায় স্থির পড়িয়া রহিলেন। অনেক দেখিয়া শুনিয়া পাত্রী ঠিক করিলেন। পাত্রী আনিয়া দিলেন মায়ের দূরসম্পর্কের মাসতুতো ভাই। কোন কন্যার পিতাই চাহেন না তাহার কন্যাকে দ্বোজবরের সহিত বিবাহ দেন। তবুও প্রজাপতির দুপক্ষের সম্মতিতে কন্যা জুটিলো।
কন্যার বাবার তাড়া এবার একটু বেশিই মনে হইলো, তাহার কারণ বুঝিলাম মেয়ের বয়স ইতোমধ্যে ভদ্র অভদ্র সকল সমাজ ছাড়াইয়া গিয়াছে। কন্যার পিতার সম্মন্ধে জনশ্রুতিতে অনেক কথায় শোনা গিয়েছিল। তাহার বিষয় সম্পত্তির বিস্তর হিসাব করিয়াই বিবাহে অগ্রসর হইয়াছিল। এবার আর ঠকিতে রাজি নয়।তাহার বিষয় আশায় অনুমান করিয়া মনে হইলো তাঁহার তুলনায় আমরা নিত্যন্তই শিশু।
যথা সময়ে বিবাহ হইয়া গেল। বাবা খুশি হইয়াছিল কি না বলিতে পারিব না, মা অত্যন্ত আনন্দিত হইয়াছিলেন বুঝিতে পারিলাম। বিবাহের পূর্বে মেয়ের একখানা ফটো পাঠাইয়াছিল। দেখিবার প্রয়োজন বোধ করিনাই বলিয়া দেখা হয় নাই। হৃদয়ের তাম্রশাসনে যাহাকে স্থান দিয়াছি। সমস্ত হৃদয় জুড়িয়া যে জড়াইয়া রহিয়াছে, তাহাকে কেমন করিয়া ভুলিয়া যাইব। সে আমার সমস্ত অন্তর জুড়িয়া আসন পাতিয়া বসিয়া আছে, তাহাকে আসন থেকে নামানোর কোন অধিকার আমার নাই। তাহাকে অন্তর দিয়াই ভালোবাসিয়াছি। একদা সংকল্প করিয়াছিলাম বি.এ পাশ করিব এবং তা ভালো ভাবেই পাশ করিব। হৈমন্তীর বিয়োগ যাতনায় পাশ করিবার আর আগ্রহ থাকিলো না। মার্টিনোর বই তেমনি পড়িয়া রহিয়াছে। হৈমন্তীকে আনিয়া দেওয়া বইগুলোর উপর ধূলার আস্তরণ জমিয়া উঠিয়াছে।
একদিন প্রাত আহ্নিক সারিয়া আসিয়া দেখিলাম নিরূপা বইগুলির ধূলার আস্তরণ ঝাড়িয়া মুছিয়া সাফ করিতেছে। বিবাহের পর নিরূপার সহিত দু একটি কথা বলিয়াছি মাত্র। সে বুঝিতে পারিয়াছিল বটে আমার হৃদয় হৈমন্তীর বেদনায় বিভোর হইয়া রহিয়াছে, তবুও সে মন খারাপ করিয়া রহে নাই। স্বাভাবিক ভাবেই মানিয়া লইয়াছে।
নিরূপা মোটেও রূপহীনা ছিলো না। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের কন্যা যদি দেখিয়া থাকেন তবেই তাঁহার রূপ অনুধাবন করিতে পারিবেন। তাহার উপরে উন্নত নাসিকা আর গভীর কৃষ্ণকায় ভ্রুদ্বয় তাহাকে রূপবতী করিয়া তুলিয়াছে।
হঠাৎ একদিন নীরুর বাবা আসিয়া হাজির হইলো। দু হাড়ি মিষ্টান্নের সহিত একজন হিন্দুস্তানি চাকর লইয়া। বাবা ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, আরে বিয়াই সাহেব যে, সবদিক ভালোতো?
নীরুর বাবা সত্যভূষণ রায় হাসিয়া জবাব দিলেন, হে, চলছে একরকম, ভগবানের আশির্বাদে।শ্বশুর মশাই ধর্মকর্ম মানিয়া চলিতেন। দেবতার প্রতি তাঁহার ভক্তি বিশ্বাস অটুট। ধ্রুব তারার মতই স্থির অবিচল। সরকারের বড় বড় দপ্তরে কাজ করেন, ইহা দেখিয়াই বাবা বোধ হয় তাঁহার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছিলেন।শ্বশুর দিলখোলা মানুষ। সবসময় ঠোঁটের কোণায় হাসি লাগিয়াই থাকিত। অল্প সময়ে গল্পের আসর জামাইয়া ফেলিতে পারিত। বাবার সহিত আসর জমাইয়া লইলেন। কবে কোথায় কী আশ্চর্য জিনিস দেখিয়া ছিলেন। কোথায় চাকরি করিবার যাইয়া কী কাণ্ডটা করিয়াছিলেন, তা বলিয়া চলিলেন। বাবাও তাহা ধৈর্য সহকারে শুনিয়া গেলেন। নীরু আসিয়া নতমুখে পশ্চাতে দাঁড়াইয়া রহিলো। তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম কিছু বলিবে না কী? সে ঈষৎ মাথা ঝাকাইয়া বলিল, একবার বাড়ি যাইতে মন টানিতেছে।হৃদয়ের কোথায় যেন মোচড় দিয়া উঠিল, এমনি করিয়া হয়তো হৈমন্তী বলিতে পারিত কিন্তু সে বলিতে পারেনাই। তাঁহার মনও বোধ হয় এমন করিয়া টানিয়াছিল।
সেবার নীরুর যাওয়া হইলো না। শ্বশুর মশায় ফিরিয়া গেলেন। যাওয়ার পূর্বে বলিয়া গেলেন, পরেরবার আসিয়া তাহাকে লইয়া যাইবেন। বাবা রাজি হইয়াছিলে, মা নীরুকে ছাড়িতে চাহিলেন না। দেখিলাম নীরুরও যাইবার মন নাই। তাহার মনকে সে ফিরাইয়া লইয়াছে। একদিন পড়ন্ত বিকেল বেলায় নীরু জানালার ধারে দাঁড়াইয়া আছে। মুখমণ্ডল সোনালী রৌদ্দুরে উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। স্বর্ণের প্রতিমার মতইই উজ্জ্বলতা ঠিকরাইয়া পড়িতেছিল। নিরূপার দিকে তাকাইয়া চক্ষুদ্বয় ফিরাইয়া নিতে পারিলাম না। তাঁহার চোখ দেখিয়া মনে হইলো, ভাবনার জগতে সে হারাইয়া গিয়াছে। দৃষ্টিহীন চোখে সে তাকাইয়া রহিয়াছে। কিছুকাল আগে দূর্গাপূজো চলিয়া গিয়াছে। পূজো উপলক্ষে প্রতিবারের ন্যায় এবারও আত্মীয়স্বজনে বাড়ি ভরিয়া উঠিয়াছিল। হাসি ঠাট্টায় বাড়ি পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। নীরু ধনী পরিবারে মানুষ হইয়াছে, ঠাট্টার সহিত তাঁহার পরিচয় ঘটে নাই। এমন করিয়াও তাঁহাকে কেহ বলে নাই।
নিরূপাকে ঐ দিন অমন করিয়া দেখিয়া মনের গহিন কোণে ব্যথার সঞ্চরণ ঘটিয়াছিল। কেবলই মনে হইতে লাগিল, আমি কী তাহাকে ভালোবাসিতা পারি না? না হয় তাহাকে হৈমন্তী বলিয়া ভালোবাসিলাম। আমার কাছে সে না হয় হৈমন্তী হইয়াই থাকিল? আমি আর চিন্তা করিতে পারিলাম না। মনের ভেতর একটা কথা ঘুরিয়া ফিরিয়া বাজিতে লাগিল, তুমি তাহাকে ভালোবাসিয়া ফেলিয়াছো। তোমার হাতে আরেকটি সীতা বিসর্জনের কাহিনী লেখা হইবে।
পত্র -পত্রিকায় লেখা লেখি আমার চিরকালের অভ্যাস। সাম্প্রতিক বিধবা বিবাহের উপর একখানা লেখা ছাপা হইয়াছে। কিছু গোঁড়াপন্থি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে কটুক্তি করিয়া লেখাটা ছাপাইয়াছে। আমি বরাবরই বিধবা বিবাহের পক্ষ লইয়াছিলাম। বিদ্যাসাগর মহাশয় গত হইয়াছে কিছুকাল আগেই।
তিনি বাঁচিয়া থাকিলে হয়তো ইহার প্রতিবাদ করিতেন। তিনি বাঁচিয়া নাই ইটার জন্যেই আমি একটা প্রতিবাদ লিপি ছাপাইবার মনস্থির করিলাম। বহু বই ঘাটিয়া বিধবা বিবাহের উপকার লইয়া লেখাটা সম্পন্ন করিতেছিলাম।এমন সময়ে বাবা পশ্চিমের লাল মেঘের ন্যায় রাগে মুখ লাল করিয়া প্রবেশ করিলেন। আর কাহাকে যেন গালি দিতেছেন। জোচ্চোর! শয়তান! পশ্চিমাদের দালাল! আমার সাথে জোচ্চুরি? আমি তোকে পুলিশে দেব, প্রতারণার দায়ে জেলের অন্ন খাওয়াইয়া ছাড়িব ইত্যাদি ইত্যাদি।আমি শংকিত হইয়া পড়িলাম। বাবার এমন মুখ আরও একবার দেখিয়াছিলাম।প্রথমে বুঝিতে না পারিলেও পরে বুঝিতে পারিলাম আমার শ্বশুর সত্যভূষণ রায়ের উপরই বাবা রাগ ঝাড়িতেছেন। আমি চিন্তিত হইয়া পড়িলাম। শ্বশুর মহাশয় এবার বাবার সাথে কী প্রতারণা করিলেন? শ্বশুরের অর্থসম্পদের কমতি নাই। প্রতাপ প্রতিপত্তি কোন অংশে খাটো নয়। তাহা হইলে কেমন করিয়া বাবার সহিত প্রতারণা করিলেন।
ঘটনাটি এমন হইয়াছিল নীরুর ইতোপূর্বে আর একবার বিবাহ হইয়াছিল। নীরু যখন ছোট, পুতুল খেলার বয়স। পুতুলের সহিত পুতুলের বিবাহ যেমন হয়, নীরুর সহিত তাঁর দূরসম্পর্কের মাসতুতো ভাইয়ের তেমনি বিবাহ হইয়াছিল। বিবাহ ছিল পুতুলের খেলাঘরের মতই। নীরুকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিলে সে কিছু বলিতে পারিল না। তাহার বোধগম্য হয় নাই তখন এটা কী ছিল, পুতুল খেলা? না কী বিবাহ? বাবা কিছুতেই মানিয়া লইতে পারিলেন না। বিয়াই তাহাকে ঠকাইয়াছেন, তাহার জাত মারিলেন। নীরুর বোঝার বয়স হওয়ার আগেই তাঁহার মাসতুতো ভাই গত হইয়াছিলেন। বাবা বাড়ি মাথায় তুলিয়া লইলেন। মা নিশ্চুপ হইয়া রহিলেন। চারিদিকে ছি! ছি! রব পড়িয়া গেল। সকলে বলাবলি করিতে লাগিলেন, অপু একটা বিধবাকে ঘরে তুলিয়া আনিয়াছে। জাত বুঝি এবার থাকিলো না।
মনের কোণে নীরুর ভালোবাসা অল্প অল্প করিয়া বাসা বাঁধিয়া উঠিয়াছিল। আজ প্রথমত বুঝিলাম, নীরুকে ভালোবাসিয়া ফেলিয়াছি। মায়ের নিরবতা, বাবার আচরণ, আমার মৌনতা নীরুর অল্প দিনেই অসহ্য হইয়া উঠিল। পশ্চিমের জানালা ধরিয়া মল্লিক বাড়ির শুন্য বাগিচার দিকে নীরব হইয়া তাকাইয়া থাকে। কিছুদিন তাহার শরীরটা দেখিতেছি খারাপ যাইতেছে। মাঝে মধ্যেই মুর্ছিত হইয়া পড়ে। বমনের বেগ বাড়িয়া যায়। বাবা কিছুতেই নীরুকে এ বাড়িতে এক দণ্ড রাখিয়া দিতে চাহিতেছেন না। আমার কপাল জুড়িয়া যে ফুল ফুটিয়াছিল তাহা একে একে ছিঁড়িয়া ফেলিয়া দিতে চাহিলেন।
বাবার সম্মুখে আমি ভেজা বেড়ালটি হইয়া পড়িলাম। আমার আজীবনের সংস্কার কাঁচের টুকরার মতইই ভাঙ্গিয়া পড়িয়া গেল। আমার আদর্শ, আমার ঔদ্ধত্য আলপিনের আগায় ছিদ্র হওয়া বেলুনের মতই চুপসিয়া গেল। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রতি আমার শ্রোদ্ধা মাটির সহিত মিশিয়া গেল। নীরুকে বাধ্য হইয়া একেবারে বাবার বাড়ি পাঠাইয়া দেওয়া হইলো। নিরূপা যাইবার সময় শেষ বারের মত আমার মুখের দিকে তাকাইয়া আশ্রয় খুঁজিয়াছিল। আমি একটা বিধবাকে আশ্রয় দিতে পারিলাম কই? যাইবার আগে দুদণ্ড অশ্রু বিসর্জন দিয়া বলিয়া গেলো, তোমার স্মৃতি বহন করিয়া চলিলাম। আমার যতই কষ্ট হউক না কেন তাহাকে আঁকড়াইয়া পড়িয়া থাকিব। তাহাকে বড় করিয়া তুলিব।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত