ঈদ আনন্দ

ঈদ আনন্দ
রাতে ঘুমানোর আগে আব্বার পাশে শুয়ে আম্মা বললেন,’আপনার কাছে একটা আবদার আছে আমার এবার। রাখবেন আপনি?’ ঘর তখন অন্ধকার। সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আব্বা বললেন,’কী আবদার খুলে বলো।রাখার মতো হলে আবদার রাখবো।’ আম্মা তখন গলার স্বর আরো কিছুটা নামিয়ে এনে বললেন,’বলেন তো আমাদের বিয়ের ক’বছর হলো?’ আব্বা অদ্ভুত কন্ঠে বললেন,’ আট বছর।’
‘এই আট বছরে ষোলোটি ঈদ গেল যার কোনটিতেই আমি বাবার বাড়ি যেতে পারিনি।’ এই কথাটা বলতে গিয়ে আম্মার গলা ভিজে গেল খানিক। আমি জানি না তখন অন্ধকারে তার চোখের পাতাও ভিজে উঠেছিল কি না! আব্বা বললেন,’তো এখন কী চাও?এ বছরের ঈদটা বাবার বাড়িতে করবে?’ ‘আমার খুব ইচ্ছে করে বাবার বাড়িতে ঈদটা করতে। খুব খুব ইচ্ছে করে। কতদিন ঈদের সকালে আব্বার পা ছুঁয়ে সালাম করি না। আম্মার সাথে চুলোর পাশে বসে বসে রুটি সেঁকি না। ছোট ভাইটার কত আবদার।বুবু, একবার। শুধু একবার আমাদের সাথে ঈদটা কর। কিন্তু—‘ আম্মা কাঁদছেন। আব্বা তাকে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন,’ভোর হোক।দেখি কী হয়!’ আম্মা আব্বার কথায় প্রবল আশা নিয়ে রাতে ঘুমোতে গেলেন।
পরদিন দুপুর বেলা দাদু ডাকলেন আম্মাকে তার মাথায় বিলি কেটে দেওয়ার জন্য। আম্মা দাদুর মাথায় বিলি কাটছেন। এই সময় দাদু বললেন,’বউমা,আর মোটে তিনদিন আছে ঈদের। সময় খুব কম।কাজ কাম অনেক পরে আছে। কাল আসবো তোমার ছোট ননদ। এরপর দিন বড়জন। আমার ছোট বোনটাও এই বছর এইখানে ঈদ করবো।কাল পড়শু বোধহয় ছেলে মেয়ে নিয়ে সে চলে আসবো। অতগুলো মেহমান বাড়িতে আসবো। এই জন্য আগে ভাগেই সবকিছু গোছগাছ করতে হবে। আর শোন,কাজে শত কষ্ট হোক মেহমানদের সামনে কিন্তু মুখ কালো করা যাবে না। ক্লান্তির ভাব আনা যাবে না।তারা যেন তোমার কাজ কাম দেখে মনে মনে বলে,’আমাদের ভাবীর মতো ভাবী কিংবা আমার বোনের পুত্রবধূর মতো কাজের একটা বউ এই তামাম দুনিয়ায় আরেকটাও নাই।’
এই সময় শাশুড়ির কথাগুলো শুনে আচমকা আম্মার চোখ থেকে টপটপ করে ক’ ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো তার গালের উপর। কিন্তু তিনি এই জল তার শাশুড়িকে দেখতে দিলেন না।তার মন অত্যন্ত খারাপ হলো।প্রতিটা ঈদেই তিনি বুকভরা আশা নিয়ে থাকেন এবার মামাদের বাড়ি গিয়ে ঈদটা করবেন। কিন্তু ঈদের তিনদিন আগেই দাদু ঘোষণা করেন, আগামীকাল তোমার ননদেরা আসবে। সুতরাং ওদের সেবার জন্য তুমি প্রস্তুত হও। আম্মা মনে মনে বললেন,’ওদের বাবার বাড়ি আছে আমার বুঝি নাই!’ বিকেল বেলা দাদুর কাছে গিয়ে কাচুমাচু করে আব্বা বলেন,’আম্মা,আসমা তো বিয়ের পর থেকে এখানেই ঈদ করছে। এবারের ঈদটা না হয় ছেলেকে নিয়ে ওর বাবার বাড়িতেই করলো। আপনি যদি অনুমতি দেন তবেই সে যাবে।’ আব্বার কথা শুনে দাদু রাগে ফুসফুস করেন সাপের মতো।নাক কান্না কেঁদে বলেন,’বউয়ের প্রেমে মইজা গেছো মনসুর?মা বইনের চেয়ে বউয়ের দরদ বেশি!’
আব্বা খানিক সময় চুপ করে থাকেন। তারপর দাদুর সামনে থেকে আশাহত হয়ে উঠতে উঠতে বলেন,’মা বোনের দরদই তো বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু আপনি নিজেই তা অস্বীকার করেছেন।’ দাদু খ্যাক করে উঠে বলেন,’আমি কখন অস্বীকার করছি?’ আব্বা তখন মোলায়েম হেসে বলেন,’এই যে আসমাকে ঈদের সময়ও তার মার কাছে, বোনেদের কাছে যেতে দিচ্ছেন না।এটা কী অস্বীকার করা নয়?’ দাদু তখন চুপ হয়ে যান একেবারেই। নতুন কোন কথা হয়তোবা খুঁজে পান না বলেই। রাতে হঠাৎ করে দাদুর কাছে ছোট ফুপি ফোন করে কেঁদে ফেলেন।দাদু অবাক হয়ে বলেন,’কী হইছে মা,কী হইছে তোমার?’ ছোট ফুপি ভেজা গলায় বলেন,’আমাকে বাড়িতে আসতে দিবে না আমার শাশুড়ি।ননদেরা আসবে। বাসায় অনেক কাজ।’
মেয়ের কান্নায় মায়ের মন খারাপ হয়ে যায় খুব। তাছাড়া দাদুর কত আশা ছিল ফুপি আসবেন ঈদে। এই আশা ভঙ্গের কষ্টেরা তুলপাড় তুলে তার বুকে।দাদু বোধহয় তখন বুঝতে পারেন নিজের মেয়েটাকে ছাড়া একা ঈদ করতে কতটা কষ্ট হয়।তাই তিনি রাতেই আম্মার কাছে আসেন। এসে দেখেন আম্মা শুয়ে আছেন বালিশে মুখ চেপে। মিনমিন করে কাঁদছেন।দাদু তখন আলতো করে আম্মার পিঠ স্পর্শ করেন।আম্মা ঘাড় ঘুরিয়ে জলভরা চোখে দাদুর দিকে তাকাতেই দাদু আম্মার একটা হাত ধরে কাছে টেনে নেন। তারপর আম্মাকে বলেন,’তোমার জন্য একটা বিরাট সুখবর আছে বউমা।’
আম্মা কোনকিছু বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকেন। দাদু তখন নিজেই বলেন,’আগামীকাল তুমি তোমার ছেলেরে নিয়া বাপের বাড়িতে যাইবা। ওইখানে গিয়া বাপ মার সাথে ঈদ করবা।’ আম্মার বোধহয় কথাটা ভ্রম মনে হয়।তাই তিনি স্হির হয়ে বসে থাকেন। কিন্তু একটু পর যখন বুঝতে পারেন যে দাদু সত্যিই বলেছেন তখন তার গলা ভেঙ্গে কান্না আসে। তিনি শব্দ করে কেঁদে উঠেন।আর আমি তার কান্নামাখা দুটো চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবি,আহা! মেয়েরা কিংবা মায়েরা যে কেন এতো মায়াবতী হয়ে জন্ম নেয়?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত