আমার ফুলশয্যা

আমার ফুলশয্যা
ওর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো প্রায় সাত বছর আগে। আসলে দেখা হয়েছিলো বলতে আমি দেখেছিলাম, ও দেখেছিলো কিনা কে জানে। বিয়ের আগে বেশ কয়েকবার ওর সাথে আমার কথাও হয়েছে।আমি জানি, ভদ্রতার নিয়মেই আমার সাথে কথা বলতে হয়েছে মেয়েটির। ভদ্রতার নিয়ম বড়ই অনিচ্ছার নিয়ম।তবে আমার সাথে যতবার আলাপ হয়েছে নিজেকে যথেষ্ট শক্ত আর নিষ্প্রাণ করে রেখেছে মেয়েটা। “তোমাকে আমার মোটেই পছন্দ হয়নি” কথাটা বুঝিয়ে দেয়ার প্রানান্ত এক চেষ্টা। এর সাথে মনে মনে কত বিশেষণ যোগ করে কে জানে। আমার হাসি পায়। আমার বেসুরা গলায় বলতে ইচ্ছে করে, “আমি তোমারো সনে বেঁধেছি আমার এ প্রাণ”। আমি বলিনি। আমি অপেক্ষা করেছি এ মেয়েটার ভালোবাসার জন্য। একক ভালোবাসা বলে পৃথিবীতে কিছু নেই। ভালোবাসার জন্মই হয় দুজন মানুষের মাঝে ভাগ হবার জন্য।
ফুলের গন্ধ এত চমৎকার হতে পারে তা আমার জানা ছিলো না। অবশ্য থাকার কথাও না কারণ ফুল নিয়ে আমার জানাশোনা খুব কম।তবে আজ আমার ঘরময় ফুলের গন্ধ। সকাল বেলাই তুষার আমার বিয়ে উপলক্ষে ঘর সাজাতে সতেরো রকমের ফুল নিয়ে হাজির।ওর খুব শখ ছিলো আমার বাসর ঘরের ফুল দিয়ে সাজানোর কাজটা সে করবে। সত্যিই চমৎকার সাজিয়েছে।প্রাথমিক রংগুলোর কোনটাই বাদ পড়েছে বলে মনে হয়না। সত্যি হারামজাদাটা না থাকলে এ কাজটা আমার জন্য নেহায়েত সহজ হতো না। আমি অবাক হচ্ছি জেবীনকে দেখে। আজ ফুলের দিকে তার কোন আগ্রহ নেই এমনকি ওর প্রিয় অপরাজিতাতেও। না থাকাতে কোন দোষ নেই। মেয়েটা নিজেই ফুল হয়ে এসেছে আমার জীবনে। প্রচণ্ড যত্নে বেড়ে ওঠা কোন অর্কিডের মত মেয়েটা নিজের মত থাকবে। আমি শুধু ওর দায়িত্বের ভারটুকু নিতে পেরেই খুশি। মেয়েটা এখন অবাক বিস্ময়ে পুরো ঘর তাকিয়ে দেখছে। অবশ্য দেখারই কথা। ওকে চমকে দেবার জন্যই এ ঘরের পরতে পরতে আমি বিস্ময় গড়ে রেখেছি।
মেয়েটির আমাকে পছন্দ হয়নি। একেতো আমি সুদর্শন নই তার উপর ওর প্রত্যাশিত গুণাবলীর তেমন কোনটাই আমার নেই। আমি জানি সে ছবি আঁকতে পছন্দ করে, কবিতা পছন্দ করে,গান গাইতে পারে,গুছিয়ে কথা বলতে পারে। হয়তো তার চাওয়া, তার এই গুণ গুলোর সাথে আবলীলায় মিশে যাওয়া একটা পুরুষ তার জীবনের অংশীদার হবে।প্রত্যেক মেয়েই এমন সুদর্শন রাজকুমারের স্বপ্ন দেখে। এ চাওয়া দোষের না।কিন্তু এ গুণ গুলোর কোনটাই আমার তেমনভাবে নেই। কি জানি কতরাত মেয়েটা সৃষ্টিকর্তার সাথে এ নিয়ে অভিমান করে বসে আছে।
বিয়ের দুই সপ্তাহ আগের কথা। আমি ওর জন্য বিয়ের শাড়ি কিনতে গেলাম। আজকাল বিয়ের শাড়ি দুজন মিলেই পছন্দ করে। আমি গেলাম একা একা, কাউকে না জানিয়ে।
অনেক খুঁজে কিনলাম কালো রঙের একটা শাড়ি। পুরোটা কালো জমিন, তার মধ্যে লাল কাজ করা, লাল পাড়। জমিন জুড়ে কি সুন্দর সুন্দর লাল পাথর। বিদেশি কোন পাথর হবে নিশ্চয়ই।তবে বিয়ের শাড়ি কেউ কখনো কালো কিনেনা। বিয়ে হল আনন্দ, আনন্দের রং কালো হতে পারেনা। আমার পছন্দ দেখে ওর কষ্টের সীমা ছিলনা। একের পর এক অপছন্দের কাজ আমি করেই যাচ্ছি। তবে আমার এ কালো শাড়ীর পিছনে একটা গল্প ছিল। আমি যেদিন মেয়েটাকে প্রথম দেখি সেদিন তার পড়নে ছিলো কালো রঙের ড্রেস। কি যে সুন্দর লাগছিলো! যেন পৃথিবীর সব রূপ কৃষ্ণ গহ্বরের মত নিজের দিকে টেনে নিয়েছিল সেদিন। বিয়ের আগে আমাদের বাসা থেকে যখন ওকে দেখতে গেলো সেদিনো মেয়েটা কালো রঙের শাড়ি পরেছিলো। সেদিনো বরাবরের মত অসম্ভব ভালো লাগছিলো আমার। হঠাৎ করে সেদিন রাত তিনটার দিকে ওকে ফোন দিয়ে বসলাম।যথেষ্ট বিরক্তি নিয়ে ঘুম ঘুম কণ্ঠে ও বলে,
-এত রাতে? কি ব্যাপার?
-তোমাকে খুব সুন্দর লাগছিল আজ। অনেক সুন্দর।
-এটা বলার জন্যই কি ফোন দেয়া?
-হ্যাঁ। সুন্দরের কথা বলে দিতে হয়। আটকে রাখতে হয়না।
-তাই বলে রাত তিনটায়? এ সময়ে মানুষ মৃত্যু সংবাদ দিতে ফোন দেয়, সুন্দরের জন্য না তা কি আপনি জানেন?
এরপর আর কথা বলিনি। কিন্তু তারপরও মহাউৎসাহে আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ওর পছন্দ অনুযায়ী শাড়ি কেনা হয়েছে। ভালোবাসা জয় করার নেশা আনন্দের নেশা। আমি এ নেশা মেয়েটার মাঝেও ছড়িয়ে দিতে চাই। তারই খুব অল্প কিছু ভাগ আমি রেখেছি আমার বাসর ঘরটাতে।
এবার একটা ছোটখাটো বর্ণনা দেয়া যাক ঘরটার। আমার ঘরের সিলিঙের রং নীল। গাঢ় নীল না, সাগরের তীরে শুয়ে আকাশ দেখতে যেমন লাগে তেমন নীল। এ রঙটা মেয়েটার ঘরের সিলিঙের মত। দুই বছর আগে ওর ঘরে এ রং করা হয়েছিল। আমিও খোঁজ নিয়ে আমার ঘরের আকাশকে সেরকম করে নিলাম। অপরিচিত একটা মানুষের সাথে একই বিছানায় থেকে যখন দৃষ্টি উদাস করবে, মন খারাপে যখন বিষণ্ণ হবে তখন সিলিংটা দেখেই ভাববে এ তো আমারই ঘর, আমার নিজের আকাশ।
আমার ঘরের বাম দিকের দেয়ালটা জুড়ে ওর বেড়ে উঠার গল্প, ছোট থেকে বড় বেলায় আসার গল্প। ছোট বেলার ছবিটা জোগাড় করেছি আমার শ্বাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে। এ ছবি বড় যত্নে তিনি রেখে দিয়েছেন নিজের আলমারিতে। আমি আরেকটা কপি প্রিন্ট করে বাঁধাই করে নিয়েছি। দ্বিতীয় ছবিটা ওর কলেজ জীবনের। এ ছবিতে ওর বালিকাসুলভ আচরণ স্পষ্ট। ছবির উৎস ফেসবুক।
ফটো ক্রেডিট পাওয়া যায়নি। পেলে তাকে এই অসাধারণ মুহূর্তটি বন্দী করার জন্য একটা ধন্যবাদ অবশ্যই দিতাম।তৃতীয় ছবিটা গায়ে হলুদের। আমার শ্যালক এই কাজটি করেছে। হাতে মেহেদি দেয়া, গালে হলুদ, হাসি জুড়ে প্রাণের ছুটাছুটি। তার পরের ছবিটা আমাদের বিয়ের। কয়েক ঘণ্টা আগের তোলা। আমার ভাইকে দায়িত্ব দিয়েছি যে করেই হোক কাজটা করতে হবে। পাগলের ভাই পাগলই হবে। সে মহাউৎসাহে ছবি ফ্রেমিং করে টানিয়ে দিয়েছে। আমি নিশ্চিত এই পাগলামির মাশুল স্বরুপ আগামী মাসেই একটা নতুন ফোনের খরচ দিতে হচ্ছে আমাকে। তবু আমি খুশি। ছবিটা বন্ধনের সাক্ষী আমাদের। একদিন নিজের শাড়ীর আঁচলে ছবিটা মুছতে মুছতে মেয়েটা বলে উঠবে,”কতটা বছর হয়ে গেলো।” আর শেষ ছবিটা সাত বছর আগের তোলা সেই কালো রঙের ড্রেসে মায়াবতী বেশে, প্রথম তাকে যেদিন দেখেছিলাম সেদিনকার তোলা। রূপবতীদের রূপ সবার চোখে সবসময় ধরা পড়ে, কিন্তু মায়াবতীদের রূপ রূপবতীদের রূপের চেয়ে শত সহস্র গুণ স্নিগ্ধ। তারই এক বাস্তব বহিঃপ্রকাশ এই ছবিটা।
ঘরের ডানদিকের দেয়ালটা আরও ইন্টারেস্টিং। এ দেয়ালের বড় একটি অংশজুড়ে পর্দায় ঘেরা।সেখানে আমি অসংখ্যবার লিখেছি “আমি তোমাকে ভালোবাসি”। একাই লিখেছি। কোন এক সকাল থেকে দুজন মিলে প্রতিদিন একবার লিখব। এ ব্যাপারটা ওকে বলা হয়নি। যেদিন জিজ্ঞেস করবে সেদিন বলব। ও বিরক্ত ভাব মুখে ধরেই আনন্দের সাথে কাজটা করবে জানি। পাগলামিকে প্রশ্রয় দিতে হয়না। ব্যতিক্রম শুধু ভালোবাসার পাগলামি। এ পাগলামিকে প্রশ্রয় না দিয়ে উপায় থাকেনা।
ঘর ছাড়ার কাজ কঠিন কাজ। চাকরীর কারণেই সেবার যখন দেশের বাইরে যেতে হল আমি বুঝেছিলাম কতটা কষ্ট হয়েছিল, খারাপ লেগেছিল। যদিও তখন মনকে বুঝিয়েছিলাম যে এটা আমার প্রফেশন, সবার জন্য হলেও আমাকে যেতেই হবে। তাছাড়া মেয়েটা যেখানে আজীবনের জন্য নিজের ঘর ছেড়ে এসেছে। তার প্রতি অনেক দায়িত্ব, কর্তব্য আমার। তাকে নতুনভাবে গ্রহণ করে নিতে হবে এ আশ্রয়। আমি যথেষ্ট চেষ্টা করছি এ ঘরকে ওর আপন করে তুলতে। অপরিচিত হয়েও নিজেকে ওর কাছে বহুদিনের পরিচিত করে তুলতে। আমি পারব কিনা জানিনা। তবু চেষ্টা করব। আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম। মৃদু স্বরে বললাম, “তোমার আহত হবার কিছু নেই। এ তোমারই বাড়ি। বিশ্বাস করো, খুব সহজেই তুমি সবাইকে আপন ভাবতে শুরু করবে। এ বাড়ির সবাই তোমাকে অত্যন্ত পছন্দ করে।
মেয়েটি তার গাঢ় মেহেদি রাঙা হাতে আমার হাতটা ধরল। ঘরে প্রজ্জ্বলিত অনেকগুলি মোমের আলোয় মেয়েটির রূপকে কিভাবে প্রকাশ করতে হয় তা আমার মত সাধারণ ছাপোষা মানুষের জানা নেই। ওর গাঢ় কাজল দেয়া চোখ টলটল করছে। এতক্ষন চুপ করে থাকা মেয়েটি এই প্রথম সে আমার সাথে কথা বলল। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে প্রবল ভরসায় জিজ্ঞেস করল, “বাকিটা জীবন একই ভাবে আমায় ভালবাসবে তো ?” ওর এক ফোঁটা অশ্রুজল আমার হাতে পড়ল। আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে নির্ভরতার হাসি দিলাম। এই হাসির শব্দ নেই, তবে ভাষা আছে, অর্থ আছে। সে ভাষায় স্পষ্ট করে লিখা আছে, “ও মেয়ে, তোমার পাশে আমি সারাজীবন থাকতে বাধ্য, তোমার সাথে জন্মান্তরের বন্ধনে আমি বন্দী। সৃষ্টিকর্তার নামে যুগ যুগান্তর আগেই আমি সে শপথ করে রেখেছি।”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত