বয়স

বয়স
-মেয়ের বয়স তিরিশ হয়ে গেছে? এমা এখনো বিয়ে হলো না কেন? জামাই ঠিক আছে নাকি? ওমা তো সে কি করবে না বলেছে বিয়ে?
– না। তেমন কিছু না।
– তো কি? এই বয়সে তো আমার চার ছেলে মেয়েই হয়ে গিয়েছিলো।
আর আমার মেয়ে রিতু কে দেখ, ২৮ হলো সবে বড় ছেলে স্কুলে যায়। মেয়েকেও স্কুলে দিবে সামনে। কি যে করিস তোরা? নিশি টার এখনো বিয়েই হলো না। আজ আমার জেটুতো ভাইয়ের বিয়ে। বেশ সেজেগুজেই এসেছি আমি, বিয়ে বাড়িতে গেলাম এইসব কথা শোনা হয় নি, এমন খুব কম হয়েছে। অনুষ্টানের মাঝখান থেকে বেড়িয়ে এসেছি এমন ও হয়েছে অনেক। চাকরি করি, বেশ ভালো স্বভাব নিয়ে চলছি এখনো । মা বাবার আমাকে নিয়ে কোন মাথা ব্যাথ্যা নেই। মা বলে তোর জীবন, তোর যখন যা সিন্ধান্ত। অবশ্য এতেও মানুষের আপত্তি। সবাই আসলে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। যেন মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর বলে – আমার মেয়েটার জন্য একটা ভালো ছেলে খুজে দাও না। মা সেটা করে না। সেটাই হলো যত সমস্যা। এক সাথে বড় হওয়া কাজিন সবার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কারো একটা তো কারো দুটো বাচ্চা। মামা কাকারা বিয়ে করে ছোট ছোট বয়েসী মামী কাকী এনেছে। তারা হাসির ছলে বলে, কখন যে একটা বিয়ের দাওয়াত পাবো তোমাদেরদের বাড়ি থেকে? তোমার বিয়ে হতে হতে আমার মেয়ের না বিয়ে হয়ে যায়?
আমিও হেসে বলি, তাহলে তো ভালোই হবে। আপনার মেয়ের বিয়ের সময় একটা বোন অন্তত ইয়াং থাকবে৷ তাই না?
অনেকের আবার এইও ধরণা আমার কারণে ভাই বিয়ে করতে পারছে না। আমার ছোট বোনটার বিয়েও আটকে আছে আমার জন্য। কিন্তু এমন কিছুই নয় আসলে। আমার ছোট বোনটার এখনো ক্যারিয়ার শুর হলোই না। কেন যে এত মাথাব্যাথা ওদের? কি অদ্ভুত, মিলিয়ে নেয় তারা? আমাদের বাসায় কারোই আসলে এইসব নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। মাস দুয়েক হলো বাবা মারা গেলো। সবার কিন্তু বাবার অসময়ে চলে যাওয়াটা দুঃখের নয়, দুঃখ এই যে বাবা কোন মেয়ের বিয়ে দেখতে পারল না। নাতি দেখতে পারল না। আমি অবাক হয়ে চেয়ে ছিলাম এইসব কথা বলা মানুষ গুলো দিকে। এরা কি সত্যি এই সভ্য জগতের মানুষ? যুগ কি আদৌ সভ্য হয়েছে? এক সাথে পড়া বান্ধবী গুলোকে আর শিক্ষিত ভাবতে পারি না৷ তাদের এই এক কথা৷ তোর টা কবে খাচ্ছি? মা কে যখন এক দিদিমা এইসব কথা শুনাচ্ছিলো আমি গিয়ে হেসে হেসে বললাম
– তো দিদিমা এত তারতারি বিয়ে হলো আপনার, বাচ্চার মা হলেন, দিদিমাও হয়ে গেলেন। তো তারাতাড়ি স্বর্গবাসি হচ্ছেন না যে? দিদিমা মুখ ভেঙ্গছিয়ে চলে গেলো। মা আমার দিকে রেগে মেগে তাকিয়ে রইল। আমি মায়ের কাঁধে হাত রেখে বললাম,
-চুপ থাকো কেন?
বৌ এসেছে। সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত। সবাই যে যার মতো খুশি, ছবি উঠছে, হাসছে, শাড়ি গয়না দেখছে। কোথাও গেলে এইব্যাপার টা আমায় স্বস্তি দেয়। যখন দেখি আমাকে নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু আমার শান্তি কি কারো সহ্য হয়? কিছু কলিকের বউয়ের সাথে দেখা। সাথে পেয়ে গেলাম বেশ কিছু বান্ধবী। সবাইকে অবশ্য এখন আমার মামী কাকীদের দলেই ফেলা যায়। আড্ডার চলছে বেশ ধুমিয়ে। কার শাশুড়ী কেমন? কার জামাইর কার সাথে পরকিয়া চলছে? কার বাচ্চা খায় না? কত বার সুজি দেওয়া হয়? চারদিন পর নাকি ছয় দিন পর বাথরুম করে? এইসব। বাচ্চা পালা কত কষ্ট! সারা দিন রাত এক করে বাচ্চা পালতে গিয়ে নিজের শখ আল্লাদ বলতে কিছুই রইল না আর। শিমু বলে উঠল, আজ আসার সময় কোন রকমেই তো শাড়ি টা পড়ে এসেছি।। মুক্তা বাঁকা মুখে বলল,
-দেখ নিশি কত দিব্যি আছে। জামাই নেই সংসার নেই। বাচ্চার নিয়ে প্যারা নেই। এখনো কি যুবতী সেজে ঘুড়ে বেড়ায়। আমি চুপ করে আছি। ওরা ভাবছে এতে আমাকে আঘাত করতে পেরেছে। তাই কেউ কেউ সমবেদনার ছলে বলছে,
– বয়স বেশি হলে বুঝছিস বেবি হতে সমস্যা, আমার এক কাকীর তো দেড়িতে বিয়ে হওয়ায় আর বাচ্চাই হলো না৷
অন্যজন, আর এখনের ভালো ছেলে পাওয়াই দায়। ভালো সেলারী পাওয়া ছেলে গুলো তো আর্নাসের মেয়ে খুঁজে। তোর তো সে সব কবে শেষ। চাকরীও করছিস। ভগবানের নাম ধরে করে ফেল। এইবার আমি মুখ খুললাম,
-ভগবান মানিস তাহলে?
-হুম। ভগবানের ইচ্ছেই তো হয় সব।
-তাহলে ভগবানের উপর বিশ্বাস রাখতে পারিস না কেন? আমার বিয়েটা ওনার ইচ্ছেতেই হচ্ছে না ভেবে নেয় না। এত কষ্ট পাওয়ার কি আছে তোদের? নাকি আমি কেন হাসি মুখে ভালো আছি সেটা তোদের কষ্ট দিচ্ছে? আমার হাসিটা খুব জ্বলে তোদের, তাই না রে?
-মুক্তা তোর বিয়ে হলো কত বছর যেন?
-১০ বছর।
-হুম। দেখি বলতো এই দশ বছর সংসারে নিজের মতো করে উচ্ছ্বাস নিয়ে বেঁচে ছিলি কত দিন?
ঘুরতে কখন গিয়েছিস মনে আছে? সে বিয়ের পর নিয়ে গেলো বেড়াতে। তাও পুরো দিন রাত হোটেলে কাটিয়ে 3 দিনে ফিরে এলি, বছর না যেতে আবার গেলি সেরেলেক আর ডায়পার সামলাতে গিয়ে দেখায় হয়নি সমুদ্র তোর। আচ্ছা তোর জামাই কি জানে তোর সারা রাত জ্যোৎস্নায় সমুদ্র পাড়ে বসে রাত কাটানো শখ ছিলো? কিংবা কোন পাহারের গাছের ডালে দোলনা বেঁধে দোল খাওয়ার ইচ্ছে ছিলো। জানে? আমার হয়েছে সে সব ইচ্ছে পূরণ। সবুজের কোলে ঘুরেছি। সমুদ্রের বালিতে শামুক কুড়িয়েছি কত বার। সেসব বাদ দেয়, বল তো দশ বছরে তোর জীবনের সবচেয়ে মেমোরেবল দশ টা ঘটনা। পারবি না তো? শোন আমার আছে, প্রতি সপ্তাহে ১০ টা ঘটনা। যা আমার জীবনকে নিত্যনতুন করে তুলে। ১০ বছরে হাজার বার ঘুরতে যাওয়া। বিশ্বাস কর, আমি খুব ভালো ভাবেই, ভালো আছি রে।
– কি শাড়ি পড়েছিস? কাতান? দাম কত? ১৮০০০ টাকা? জানিস ১৮০০০ টাকা ইনকাম করতে কত কিছু করতে হয়? গায়ে শাড়ি নয় টাকা জড়িয়ে যে ভাব নিচ্ছিস আমার সামনে স্বামী দিয়েছে, কোন মূল্য আছে কি নিজের কাছে এর? আমার এই সেলোয়ারের দাম ৩০০০ টাকা। আমার কাছে এইটা অর্জন। জামা নয়। প্রাপ্তি কোনটা জানিস? মাকে ৮০০০ টাকায় জামদানী দিয়েছি। তুই পেরেছিস আন্টিকে ১০০০ টাকার শাড়ি দিতে নিজের টাকায়?
আমি আমার সব শখ আহ্লাদ সত্যিই মিটিয়ে নিচ্ছি। যাতে আমার মধ্যে কোন আফসোস না থাকে। বিয়ে সংসার বাচ্চা সামলাতে নিজেকে শেষ করে দিয়েছি এমন টাইপ। এতে কি হবে জানিস,তোদের মতো নিজের অপ্রাপ্তি গুলো সন্তানের গায়ে আর্দশ বলে চাপিয়ে দিবো না। আমি ছেড়ে দিবো তাদের নিজের মতো করে বাঁচতে। এই যে ভগবান আছে বলিস। তিনি চাইলে হবে সন্তান। না দিলে কাকে দোষ দিবো বল? তাছাড়া কত ছোট বয়সে বিয়ে হওয়া পর ও অনেক মেয়েদের তো বেবি হয় না। এতে কার দোষ বল। আমি বলছি না অন্যরা বিয়ে করবে না। করুক না। আমাকে থাকতে দেই না রে ঠিক আমার মতো। অনেক কিছু পাওয়ার আছে স্বামীর শাড়ি গয়না ছাড়াও। বিশ বছরে বিয়ে করে চল্লিস না পেরোতেই, মেয়ের বিয়ে দিয়ে মা মেয়ে দেখতে একই রকমের শরীর বানিয়ে পান চিবিয়ে চিবিয়ে শশুড় বাড়ির ঢালা খুলে বসা আমাকে দিয়ে জাস্ট হবে না রে।
চল্লিস না পেরোতেই ছেলের বৌ দের সাথে সংসার সংসার খেলে, নিজের অপ্রাপ্তি তাদের ইচ্ছের পথে দাঁড় করিয়ে সত্যিই আমি সার্থক মা হতে কখনো চাইবো না। কখনোই না। যার সাথে জীবন কাটাবো সে প্রতিদিনের কাজ সেরে পাশ ফিরে বালিশ জড়িয়ে ঘুমাবে। আমার মনের খোঁজ ও নেবে না। আমাকে সম্মান করবে না। আমার মূল্যায়ন করবে না।এমন জীবন সঙ্গি চাই না রে। এমন জীবন সঙ্গী পেয়ে তোরা কতটা ভালো আছিস বল তো আমাকে? নিয়েছে কোনদিন মনের খবর। দিয়েছে মূল্যায়ন? নাকি তুমি কি বুঝবে ওসবের এতেই থামিয়ে দিয়েছে?। আমাকে সম্মান করবে, বিয়ে করে অধিকার গত বউ নয়, সমান অংশীদারের মতো মূল্যায়ন করবে এমন কাউকে খুঁজে না পেলে থাকি না আরো দশ বছর অবিবাহিত। কি হবে তাতে?
জানিস দশ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। রাস্তা দিয়ে যখন হেটে যাই, তখন আমার চেয়ে মাথা উচু কত ছেলে মেয়ে সম্মানে মাথা ঝুকিয়ে নেয়। এইটা পাওয়া যে কত সম্মানের তা কি করে বুঝবি। এত কম বয়েসী স্কুলের সেরা শিক্ষিকা হওয়া আমার কাছে অর্জন। তোদের কাছে যেটা সংখ্যা, বিশ্বাস কর আমার কাছে ওটাই আমার অর্জন। বিশ্বাস কর আমি সত্যিই ভালো থাকার মতোই ভালো আছি। কোন আক্ষেপ নেই আমার। তোরাও প্লিজ বিশ্বাস করে নেয় না, আমি বেশ ভালোই আছি। আমার হাসিটা আমার ভাল থাকার স্বাধীনতা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত