বিবাহ অভিযান

বিবাহ অভিযান
বিয়ের পাত্রী দেখতে এসে ৩৩০ ভোল্টের শক খেলাম।মেয়ের চেহারা সুরত ভালো।ভালো বংশও বটে।কিন্তু তার আচরণ একদমই শোভনীয় ছিলনা।সেই ২ বছর আগে মেয়েটির সাথে পাবলিক বাসে একটা কান্ড ঘটেছিল আমার!আমাকে দেখেই মেয়ে রাগে ফায়ার হয়ে বলতে শুরু করলো এই হারামজাদা সোফা থেকে উঠে এক্ষুণি বের হয়ে যাবি।ফুফুর হাতের বিস্কুটটা চায়ের কাপে পড়ে গিয়ে গলে গেল।ফুফা তো রীতিমত ঢেকুর তোলা শুরু করে দিয়েছে।পাত্রীর বাবা-মা হতবাক!এত সুন্দর ছেলেকে কিনা নিজের মেয়ে বলছে হারামজাদা!
তারপর মেয়ে আমার কলার ধরে সোফা থেকে দাঁড় করিয়ে দিল।কোন কিছু চিন্তা না করে ঠাটিয়ে ঐ মেয়ের গায়ে চড় লাগিয়ে ফুফা-ফুফুকে নিয়ে চলে আসলাম।গাড়িতে বসে মাথা হ্যাঙ হয়ে আছে।একটু আগে কি ঘটলো কিছুই বুঝলাম না।ফুফা-ফুফুও মনে হয় তব্দা লেগে আছে।একদম চুপ আমরা তিনজন।ঐ দিকে মেয়ের বাড়িতে কি কান্ড ঘটছে কে জানে!বাসায় এসে রাতের খাবার সেরে ফেললাম।মেয়েটির সাথে আগে আমার কি ঘটেছিল এসব কিছুই জিজ্ঞেস করলো না কেউ।খাওয়ার সময় ফুফা প্রচুর বকবক করে।ফুফু তার রান্নার প্রশংসা শুনতে চায়।আজকে তার কিছুই হলো না।বাড়ির কাজের লোক লালু কাকা এমন দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত নয়।
ফুফুর বিশ্বাস আমি অতীতে এমন কোন কাজ করিনি যাতে তাদের মাথা হেট হয়।নিজের ছেলের চেয়ে আমাকে ভরসা করে বেশি।রাশেদ ভাই নেশা-টেশা করে প্রায়ই জেল খাটতো।এক মাস আগে এক উকিলের মেয়েকে নিয়ে ভেগে গিয়ে সংসার পেতেছে।ফুফার কড়া নির্দেশ কেউ যেন ভাই-ভাবীর সাথে যোগাযোগ না করে।অথচ তিনিই লুকিয়ে লুকিয়ে গায়ে হাওয়া লাগানো ছেলেকে মাসে মাসে টাকা পাঠায়।ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার সময় ফুফু আমাকে এ বাড়িতে নিয়ে আসে।আমার বাবা এখন অন্যজনের সাথে সংসার করছে।মাঝে মাঝে বাবার দর্শন পেতে যাই।আমাকে দেখলেই সে কেন জানি কেঁদে উঠে।কিন্তু ফিরে আসতে বলেনা একবারও। আমি এমনেই খানিকটা ভীতু প্রকৃতির।রাগ আর উত্তেজনার বশে হাতে বোমা নিয়ে হাঁটতেও দ্বিধা থাকেনা।কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই ঘটনা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি।ঠিক যেমন এখন ভাবছি মেয়েটি নিশ্চয় গুন্ডা ভাড়া করে আমাকে মারতে আসবে।এমনই সময় দরজা থেকে খিলখিল হাসির শব্দ পেলাম।আরেহ নতিজা আপু!হাতে একটা পাঞ্জাবির প্যাকেট ক্রিম কালারের।কিরে সুশীল শুনলাম তুই নাকি বিয়ের আগে থেকেই বউ মেরে এসেছিস।আপুর এমন কথা শুনে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম।এই মেয়ে আমার বউ হওয়ার যোগ্যই না।পাঞ্জাবিটা দুলাভাই আমার জন্য পাঠিয়েছে।
আমার পাত্রী দেখার কাহিণী যখন আপু দুলাভাইকে শুনাচ্ছিলো তখন সে গ্যাসের ব্যাথায় কাতরাচ্ছিলো।ঘটনা শুনে দুলাভাই এমন হো হো করে হেসে উঠে তারপর থেকে নাকি দুলাভাই এর সব গ্যাস বেরিয়ে গেছে।আমার উপর সন্তুষ্ট হয়ে এই উপহার।কথাটা নতিজা আপু রসিকতা করে বললো যদিও।আমিও এই কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলাম। নতিজা আপু কাহিণী শুনতে এসেছে আমার কাছে।তবে আপুকে সব বলা যায়।ফুফাতো বোন হলেও আমার বন্ধুর মত।দুই বছর আগে মেয়েটির পেছনে বাসে দাঁড়িয়ে প্রথম চাকুরীতে যাচ্ছিলাম।হঠাৎ মেয়েটি চেঁচামেচি শুরু করে বাসটা মাথায় তুললো।কে নাকি তার পেছনে হাত দিয়েছে।
যেহেতু আমি ছিলাম তাই আমাকে সশব্দে পাবলিকের সামনে চড় কষিয়ে দিয়েছিল।আমি অপমানিত হওয়ার কথা না ভেবে গালে হাত দিয়ে এটা ভাবছিলাম যে,কেন মারলো!!!তারপর যা নয় তা বললো আমাকে।এসব জায়গায় ছেলেদের দোষ না হলেও ছেলেদের দোষী বানিয়ে দেয় পাবলিকরা হিরো সাজার জন্য।এক পকেটমার সবার সামনে থেকে আমার মানিব্যাগ কেড়ে নিয়ে বললো এটা হল তোর আপামণিকে বেজ্জতি করার শাস্তি।পাবলিকের দৃষ্টি ছিল আমাকে গিলে খাওয়ার মত।তারা ঐ পকেটমারটাকে কিছুই করলো না।আমাকে বাস থেকে নামিয়ে দিল। আমি নির্বিকার হয়ে হাঁটা দিলাম।পরিস্থিতি এমন ছিল আমি মেয়েটিকে কিছু বললেই গণধোলাই খেতাম। নতিজা আপু শুনে বললো তাহলে তো সিরিয়াস ভাবে ফেঁসেছিলি।কিন্তু মেয়েটা এতদিনে এটা মনে রেখে দিয়েছে?অবাক হয়োনা আপু তুমিও ঝগড়া হলে একটা কথা বহুদিন মনে রাখো।দুলাভাই তো এসব আমাকে মাঝে মাঝে বলে।
–বাদ দে তো বাদল আমার কথা।তুই মেয়েটার গালে আরেকটা চড় দিয়ে আসলে ভালো করতি।এমন মেয়েদের মুখে ঝাঁটা।
–আমি কিন্তু মনে মনে ভয় পেয়ে আছি আপু।ঐ মেয়ে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী না।
–আরে ধুর গাঁধা,ঐ মেয়ে কিছু করবে না দেখে নিস তুই।
এই দিকে মেয়ের বাবা বার বার আমাকে ফোন করছে।নিশ্চয় বড় ঝামেলা বাঁধিয়েছে মেয়েটি।আমাকে ওর বাবা সামনে পেলে কচুকাঁটা করবে এজন্য কল দিচ্ছে।আমি বার বার কেঁটে দিচ্ছি।পরেরদিন বাসায় ফুফু বাদে কেউ ছিলনা।দুই-চারজন লোক এসে আমাকে এক প্রকার উঠিয়ে নিয়ে গেল।ফুফু এদিকে সবাইকে ফোনে যোগাযোগ করে আমাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করতেছে।আমি বুঝতে পারলাম এটা ঐ মেয়েরই কান্ড।আমিও দেখতে চাই সে কতদূর যেতে পারে একটা চড়ের জন্য।
মেয়ের বাবা সোফায় বসে ছিল।আমাকে দেখতে পেয়ে হাত চেপে ধরে বলতে লাগলো, বাবা তুমি আমার মেয়েকে বিয়ে কর।তুমিই পার আমার মেয়েকে শাসন করে ঠিক করতে।বাবা হয়ে যেটা আমি পারিনি সেটা তুমি সেদিন করিয়ে দেখিয়েছো।মেয়েটা শাসনের অভাবে বদমেজাজী হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন।তোমার সাথে বিয়ে হলে ঠিক হয়ে যাবে।মেয়ে আমার তোমার হাতের চড় খেয়ে একদম শান্ত হয়ে গেছে।বাসায় কত যে শান্তি পাচ্ছি আমি আর ওর মা সেটা বলে বুঝাতে পারবো না।তোমাকে বিয়ে করতেই হবে বাবা। এসব শুনে আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে।কোন রকমে পালিয়ে চলে এলাম।
বৃষ্টির বাবা-মা ফুফা-ফুফুকে এই কয়দিনে পটিয়ে ফেলেছে।বৃষ্টি-বাদল নাকি মণিকাঞ্চন যোগ।ফুফু বলছিল সে নাকি বৃষ্টিকে প্রথম দেখেই চিনে ফেলেছে।একটু রাগী হলেও ওর নাকি মনটা ফেয়ার এন্ড লাভলী ক্রিমের মত নরম।আমার জন্য ঐ মেয়ে পারফেক্ট।যে আমার মত শান্ত প্রকৃতির লোককে ঝড়-ঝাপ্টা থেকে বাঁচাতে পারবে।আমার কি নিজেকে রক্ষা করার জন্য ঐ জাদরেল মেয়ের হেল্প লাগবে?লজিকহীন কথাবার্তা ফুফা-ফুফুর।অন্যদিকে বৃষ্টির বাবা-মা ভাবছে আমি মেয়েকে শাসন করে ঠিক করে দিতে পারবো।আমি আর বৃষ্টি দুইজন দুই মেরুতে কিন্তু পরিবারের বড়রা আমে-দুধে মিশ খাচ্ছে।যে করেই হোক বিবাহ অভিযান সফল করা লাগবেই।
বৃষ্টি আমাকে সারাদিন লোফার বলে গালাগালি করছে।এই মেয়ে নাকি বউ হবে!আমিও এমন জাদরেল মেয়ে চাইনা।না জাদরেল বেশি হয়ে গেল।বৃষ্টি আসলে ততটাও সেরকম না।মায়াবী চেহারার।হয়তো বৃষ্টিও ভাবা শুরু করেছে ছেলেটা ততটাও খারাপ না।সেদিন বাসে আমি ভুল করেছিলাম হয়তো।দুজন মিলে একসাথে বসে সব ক্লিয়ার করতে হবে।এদিকে বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছে।দুই পরিবার তোরজোর শুরু করেছে।অথচ আমরা কেউ অমত করছিনা।নাকি কোন এক অদ্ভুদ কারণে অমত করতে পারছি না!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত