স্বার্থপরতা ও বাজির গল্প

স্বার্থপরতা ও বাজির গল্প
ছাদের গাছ গুলোতে পানি দিচ্ছিলাম। তখন খেয়াল করলাম ছাদে হয়ত কোনো লোক উঠেছে। তবে দেখার কোন শখ নাই। তাই আমি আপন মনে পানি দিচ্ছি। কেউ পিছন থেকে বলে উঠলো….
— গাছে পানি দিচ্ছো বুঝি।
পানি দেওয়া থামিয়ে দিয়ে পিছনে তাকালাম। তাকিয়ে দেখি দিপ্তি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ও ২ তলায় থাকে আর আমরা ৩ তলায়। তবে দুইজনেই সরকারি কলেজে পরি আর এবার এইচ.এস.সি পরীক্ষা দিবো। ওর সাথে কথা কম বললেও মুখ চিনায় পরিচিত বলা যেতে পারে। তাই আমিও উত্তর দিলাম।
— হুমম দেখতেই তো পারছো।
— হুমম রাজ আমি না একটা জিনিস ভাবছি?
— বলে ফেলো?
— আসলে আমরা তো অনেক আগে থেকে একজন আরেক জনকে চিনি। তাও আবার একি কলেজে পরি কিন্তু আমরা কখনো দরকার ছাড়া কথা বলি না কেন?
— কথা বলার দরকারটা কী?
— ও মা দরকার নেই বুঝি। দেখো আমরা যদি ভাল বন্ধু হই তাহলে তো এক সাথে মিলে পড়তে পারি আর একজন অন্যজনকে সাহায্যও করতে পারি।
— সেটা তো এমনিই করা সম্ভব।
— ও বুঝেছি, রাজ হয়ত তুমি আমায় ইগনোর করতে চাইছো।
— আসলে তা নয় তবে সামনে যে টেস্ট পরীক্ষা সেটা নিয়ে চিন্তায় আছি।
— ও তাহলে চলো এক সাথে বসে পরি।
— আমি একা ছাড়া পড়তে পারি না।
— ওকে তাহলে আর কি?
— আচ্ছা দিপ্তি আমি যাই বায়।
— আরে রাজ শুনো তো।
— হুমম বলো।
— কাল আমায় তোমার সাথে কলেজে নিয়ে যেও তো। অবশ্য তোমার মত ব্রিলিয়েন্ট ছাত্রের আশেপাশে থাকলেও যদি কিছু শিখতে পারি।
— তোমার যা ইচ্ছা তাহলে সকাল ৯টা বাজে রেডি হয়ে থেকো। আমি একদম সময় মেনে চলি।
— ওকে
আর ছাদে না দাঁড়িয়ে চলে আসলাম। দিপ্তিকে আমার সুবিধার মেয়ে মনে হয় না। আমি যখন কলেজের জন্য বাসা থেকে বেড়িয়ে যাই তখন নাকি ও ঘুম থেকে উঠে। আর আমার যখন ক্লাস শেষ হয়ে যায় আর বাসায় আসবো বলে পা বাড়াই তখন দেখি ও বাজে ছেলে মেয়েদের সাথে মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে । তাই আমি সব সময় এড়িয়ে চলি। ও আমাকে নিয়ে অনেক মজা করেছে আর আমার চশমা নিয়েও অনেক কথা বলে। তবে বাসায় ও সব সময় ওর পরিবারের কাছে বকা শুনে আমার জন্য। আমি তো রাতে পড়ি আর ও রাতে মোবাইল নিয়ে কাটিয়ে দেয়।
সকালে ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসলাম। কখন যে ৮টা বেজে গেল খেয়ালই ছিল না। তারপর তারাতারি গোসল করতে চলে গেলাম। গোসল শেষ করে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিলাম। তারপর আবার পরতে লাগলাম। একদিকে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি। আমি ঠিক ৯টা বাজে বেড়িয়ে দিপ্তিদের রুমের সামনে এসে কলিং বেল চাপ দিলাম। বাব্বা দিপ্তিও দেখি আজ রেডি হয়ে আছে। এই প্রথম ওরে এতো সকালে দেখলাম। যাক তাহলে বলা যায় মেয়েটার সুবুদ্ধি হয়েছে। তাছাড়া আজ দিপ্তিকে মেকআপ ছাড়া দেখছি তো তাই অনেক কিউটও লাগছে। দিপ্তি আর আমি পাশাপাশি হাটতে লাগলাম। আমাদের বাসা থেকে কলেজ পায়ে হেটে১০ মিনিটের জায়গা। তাই আমি রিকশা বা অটো নেই নি। তবে দিপ্তির হাটার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এই মেয়ে মনে হয় হাটতেও পারে না। কলেজের সামনে এসে দিপ্তি আমায় বলে….
— বাব্বা রাজ তুমি প্রতি দিন কি এভাবেই হেটে আসো?
— হুমম কেন??
— না আসলে আমি প্রথম আজ হেটে কলেজে আসলাম।
— ও তবে আমার সাথে আসলে হেটেই আসতে হবে।
— সমস্যা নেই অভ্যাস হয়ে যাবে।
আমি আর কিছু বললাম না। আমি আর দিপ্তি ক্লাসের দিকে যাচ্ছি তখন দিপ্তির ফ্রেন্ড গুলো সামনে আসলো কিন্তু দিপ্তি সরাসরি বলে দিলো ও এখন থেকে পড়ার দিকে মনোযোগ দিবে। এটা শুনে ওর ফ্রেন্ডদের মন খারাপ লাগলেও আমার বড্ড ভাল লেগেছে। হয়ত দিপ্তি বুঝতে পারছে যে একটা ভাল রেজাল্ট না করতে পারলে ভাল একটা ভাল ভার্সিটিতে চান্স পাবে না।
এভাবে দিন গুলো ভালই চলছিল। এখন দিপ্তিও বাসায় মন দিয়ে পড়ে কিন্তু দিপ্তির প্রতি আমার কেমন যেন একটা ভালা লাগা তৈরি হচ্ছে বুঝতে পারছি না। আগে মনে হতো আমি একা একা পরলেই হয়ত ভাল লাগবে কিন্তু এখন যেন মনে একটা টান তৈরি হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি দিপ্তির রুমে গিয়ে পড়ি নয়ত দিপ্তিকে আসতে বলি। এই সকলের মধ্যে দিয়ে আমাদের টেস্ট পরীক্ষা চলে গেল। পরীক্ষার রেজাল্টের দিন দেখলাম আমার রেজাল্ট ভাল হলেও দিপ্তির রেজাল্ট আগের থেকে উন্নতি হয়েছে। তবে আমার থেকে ওর রেজাল্ট জানার প্রতি আমার মাঝে একটা আকর্ষণ তৈরি হয়। একদিন আমি লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিলাম তখন দিপ্তি এসে আমার পাশে বসলো। যেহেতু লাইব্রেরীতে নিয়ম হলো কথা বলা নিষেদ তাই দিপ্তি একটা কাগজে লেখলো “ওই একটু বাইরে চলো, দরকার আছে। ” প্রথমে যেতে মন না চাইলেও পরে আসলাম বাইরে। তারপর ও বলল…
— ওই এত্তো পড়াশুনা করলে হয়ত ভাল রেজাল্ট করবে তবে কখলো কলেজ লাইফের মজাই বুঝবে না।
— ঠিক বুঝলাম না।
— চলো আজ সারাদিন আমি আর তুমি মিলে ঘুরবো।
— কিন্তু সামনে তো ফাইনাল পরীক্ষা।
— দেখে রাজ একদিনের ঘুরার কারনে পড়ার কোন ক্ষতি হবে না। প্লিজ চলো না।
— আচ্ছা চলো।
যেতে মন না চাইলেও ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আর না বলতে পারলাম না।
প্রথমে দিপ্তি আমার হাত ধরে আমায় টেনে ফুসকার দোকানে নিয়ে গেল আর তিন প্লেট ফুসকার অর্ডার দিলো।
— ওই আমরা তো মাত্র দুই জন কিন্তু তিন প্লেট কেন?
— কেন? তোমার এক প্লেটের হাফ আর আড়াই প্লেট আমার।
— তুমি একা এত্তো গুলো ফুসকা খাবে।
— হুমম মেয়েরা ফুসকা একটু বেশিই খায়, তুমি জানো।
— হুমম অনেক কিছুই জানি না।
— হয়ত বা
তারপর আমি আর দিপ্তি মিলে ফুসকা খেতে লাগলাম কিন্তু যখন ও আমার দিকে একটা ফুসকা বাড়িয়ে দিলো তখন আমি যেন ওর দিকে নয় বরং ওর চোখের মাঝেই হারিয়ে গিয়ে ছিলাম। ওর ডাকেই বাস্তবে ফিরলাম।
— ওই কি হলো খাও?
— হুমম।
— রাজ জানো তোমার কারনেই আমি টেস্টে পাশ করেছি নয়ত ঠিকই ফেল করতাম।
— আমার জন্য নয় বরং তুমি কষ্ট করে লেখা পড়া করছো তাই পাশ করছো।
— ধ্যাত তোমার সাথে মিশার পর থেকে পড়াশুনায় মনোযোগ দিয়েছি।
— জানি না।
— তোমার না জানলেও চলবে। আমার জানলেই হবে বুঝলে।
তারপর দিপ্তিকে সাথে নিয়ে সারাটা শহর ঘুরে ঘুরে দেখলাম। আমি গত ১২ বছরের মাঝে সারাদিন বাইরে কারো সাথে কাটিয়েছি কিনা মনে পরছে না আর কোন মেয়ের সাথে তো নয়ই। তবে এই মেয়ে নিজে বদলে আমাকেও বদলে দিয়েছে। নিত্তিয়া তার কাজিনের বিয়েতে এসেছে। যদিও ও একটু কালো তবে মনটা বেশ ভাল। তবে আজও একটা রিলেশনে জড়ায় নি। আর এবার ওরও সামনে এইচ.এস.সি পরীক্ষা। যদিও ওর সামনে টেস্ট পরীক্ষা তবুও বাধ্য হয়ে বিয়েতে আসতে হলো। নিত্তিয়া একটু দুষ্টু তবে লেখাপড়ায় অনেক এগিয়ে। ও খুব মজা করে বিয়েতে হৈ চৈ করছে।
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে সে বাসায় চলে আসলো। তারপর কয়েকটা দিন কেটে গেল। ও পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে একটু ফেসবুকও চালায় তবে অনেক কম। বলতে গেলে নেটে সে তেমন একটা আসে না। সবাই বলে ফেসবুক নাকি একটা নেশা তবে নিত্তিয়াকে সেই নেশার কোনটাই ছুতে পারে নি। একদিন রাতে শুয়ে শুয়ে তার এক বোনের সাথে ফেসবুকে কথা বলছিল। তখনই একটা ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসে। প্রথমে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট টা ভাল করে চেক করে। অ্যাবাউটে দেখে ওদের জেলাতেই থাকে তবে ও চিনে না তাই ভাবলো কিছুদিন ঝুলিয়ে ডিলেট করে দিবে কারন বেশির ভাগ মেয়েরা এটাই করে। নিত্তিয়াও এর বিপরীত নয়। সেও আইডিটা ঝুলিয়ে রাখলো।
২ দিন পর একটা ম্যাসেঞ্জারে একটা ম্যাসেজ আসলো” নিত্তিয়া তুমি হয়ত আমায় চিনো না তবে আমি তোমাকে চিনি তাই যদি আমার রিকুয়েস্ট টা কনফার্ম করে নিতে তাহলে খুশি হতাম।” ম্যাসেজটা পরার পর ভাবলো হয়ত ছেলে শুধু এড হয়ে থাকতে চায় তাই সেও কনফার্ম করে নিলো। তারপর নিত্তিয়া নেট থেকে চলে আসলো। আবার দুইদিন নেটে যায় নি। এরপর যখন নেটে গেল তখন ভুলেই গিয়ে ছিল সেই ছেলেটার কথা। ছেলেটার নাম ছিল “অভ্র”। কিছুক্ষণ পরেই একটা ম্যাসেজ আসলো…..
— ধন্যবাদ রিকুয়েস্ট কনফার্ম করার জন্য।
— হুম। নিত্তিয়া প্রথমে কথা বলতে না চাইলেও কথা না বলে থাকতে পারলো না।
— নিত্তিয়া তোমার নাকটা টা খুব কিউট।
— মানে?
— মানে তোমার কাজিনের বিয়েতে তোমাকে দেখলাম তো তাই আর তোমার নাকটা খুব ভাল লাগছে।
— আপনি তো আজব পাবলিক। আমাকে ঠিক মত চিনেন না আর আমায় তুমি করে বলছেন। আর আমাকে দেখেছেন তো এটা নিয়ে কথা বলার কি আছে?
— আরে এতো রেগে যাচ্ছো কেন?
— এটাই তো স্বাভাবিক ।
— দেখে নিত্তিয়া তুমি আমার বয়সে ছোট হবে তাই তুমি করে বলছি আর বন্ধু ভেবে তোমার নাক নিয়ে কথা বললাম।
— আমি কখনো বলছি যে আপনি আমার বন্ধু।
— তা নয় তবে আস্তে আস্তে হয়ে যাবো নে।
— দেখেন আরেকটা এক্সট্রা কথা বললে ব্লক খাবেন বললাম।
— ওরে বাব্বা কত্তো রাগ, ওকে বায়।
নিত্তিয়া আর কোন উত্তর দিলো না। কারন নিত্তিয়া খুব সহজে কোন ছেলের সাথে মিশতে পারে না। এদিকে নিত্তিয়ার টেস্ট পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। কিন্তু অভ্র প্রতিদিন নিত্তিয়ার পরীক্ষার আগে ম্যাসেজ দেয় ” অল দি বেস্ট “। কিন্তু নিত্তিয়া নেটে আসে না আর ম্যাসেজও চেক করা হয় না। এদিকে অভ্র প্রতিদিন নিত্তিয়ার খুঁজ নিতে ব্যস্ত। পরীক্ষার ব্যস্ততা কাটিয়ে একদিন রাতে নিত্তিয়া নেটে আসলো আর এত্তোগুলো ম্যাসেজ দেখে চমকেই গেল। তবে নিত্তিয়া শুধু ধন্যবাদ দিয়ে বেড়িয়ে যাবে তখনই আরেকটা ম্যাসেজ আসলো….
— ওই মেয়ে কেমন আছো?
— ভাল.. আপনি কেমন আছেন?(নিত্তিয়া অভ্রের ব্যাপারে একটু পজেটিভ হলো)
— ভাল। আচ্ছা নিত্তিয়া তোমার কি রং পছন্দ বলো তো?
— জল রং। কেন বলেন তো?
— না এমনি তবে আমার পছন্দের সাথে তো মিলে গেল।
— ওই চাপা মারবেন না।
— সত্যিটাকে চাপা মারা ভাববে না।
— হুহহ।
এভাবেই দুইজনের মাঝে কথা বলা দিন দিন বাড়তে লাগলো। একটা সময় তো নিত্তিয়া অনেক দিন পর পর অন লাইনে আসতো কিন্তু এখন যেন তার আসতেই হবে। এমনি কথার মায়া জ্বালে নিত্তিয়াও আটকা পরতে লাগলো। তার যে সামনে পরীক্ষা চলে এসেছে তার খেয়ালই ছিল না। দিপ্তির সাথে সময় কাটাতে আমার বরাবরের মত ভালই লাগে তাই সব সময় চাইতাম আমি দিপ্তির সাথে সময় কাটাই কিন্তু এখন তো ওরই সময় হয় না। একদিন রাতে রুমে বসে পড়ছিলাম তখনই দিপ্তি আসলো।
— ওই কি করছো?
— পড়ছিলাম।
— এটা তো আমিও দেখতে পারছি তবে শুনলাম কোচিং থেকে নাকি পরীক্ষার জন্য ফাইনাল সাজেশন দিছে।
— কেন তুমি পাও নি?
— তুমি থাকতে আমি পাবো না এটা কি হয়?
— মানে?
— আসলে আমি তো কোচিংয়ে চাই নি তাই তোমার কাছ থেকে সাজেশন নিতে আসছি।
— এই নাও ( ওর দিকে সাজেশনটা বাড়িয়ে দিলাম)
— ওকে
দিপ্তি যাওয়ার সময় আমার মাথায় হাত ভুলিয়ে গেল। আমার সবটা এলোমেলো করে দিয়ে গেল। আগে ওর থেকে দূরে থাকতাম কিন্তু এখন এটা সম্ভবই হয় না। তবে ইদানিং ও আমার সাথে কথা কম বলে তবে মাঝে মাঝে আসে আর আমায় এলোমেলো করে দেয়। যেমন চাতক পাখি বৃষ্টির আশায় থাকে আর বৃষ্টি এসে পাখিকে ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায়। দিন গুলো দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছিল আর সাথে সাথে আমার মনে দিপ্তির জন্যও ভালবাসা জন্মে ছিল। তাই ভাবলাম সামনেই কলেজের বিদায় অনুষ্ঠানে ওকে আমার মনের কথা গুলো বলে দিবো। কিন্তু ভয় হয় যদি আমায় না মেনে নেয় তবে ওর ব্যবহার দেখে তো আমার মনে হয় ও আমায় ভালবাসে।
এভাবেই বিদায় অনুষ্ঠানের দিন চলে আসলো আর সামনেই আমাদের পরীক্ষাও। কলেজে সব ছেলেরা আজ পাঞ্জাবী পড়েছি। তবে আজ যখন দিপ্তিকে নিয়ে আসবো বলে ওর রুমের কাছে গেছিলাম তখন দিপ্তির মা বলে ও নাকি চলে আসছে।তাই আমি কলেজে এসে ওর অপেক্ষায় রইলাম। প্রায় ৩০ মিনিট পর দিপ্তিকে আসতে দেখতে পারছি আর আজ ও শাড়ী পরেছে। ওরে যেন অসম্ভব সুন্দর লাগছে। যা বলে প্রকাশ করা সম্ভব না। দিপ্তি আমার সামনে দিয়ে হেটে চলে গেল কিন্তু আমার দিকে ফিরেও তাকালো না । আমার খুব রাগ হচ্ছে কিন্তু আমার তো রাগ হওয়াটা উচিত নয়। তবে কি আমি ওরে ভালবেসে ফেলেছি যার কারনে রাগ নয় বরং অভিমান হচ্ছে ওর উপর। আমার চোখ গুলো ছলছল করছে। আমি আর থাকতে না পরে বিদায় উৎসবে না থেকে চলেই আসলাম। বিকালে ছাদে বসে আছি। সব কিছু বিরক্ত লাগছে। আসলে আমার হয়েছে কি? ও আমার সাথে কথা বলে নি। এই কারনে আমার খারাপ লাগবে কেন? ভালবাসাটা কী? যতসব প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করছিলাম তখন আমার কাঁধে কারো হাত অনুভব করলাম। পাশ ফিরে দেখার দরকার হলো না কারন এটা দিপ্তির হাত…
— কি হলো? এখানে বসে আছো কেন?
— এমনি।
— সত্যি তো।
— ও আচ্ছা, আমি তোমায় বিদায় অনুষ্ঠানে কত খুঁজলাম কিন্তু তুমি কোথায় ছিলে?
— তুমি আমায় খুঁজে ছিলে নাকি দেখেও না দেখার মত ছিলে।
— না সত্যি খুঁজেছি।
— যদি তাই হতো তাহলে আমায় ফোন দিতে।
— ঠিক বলছো তবে আমার ফোনে চার্জ ছিল না।
— হুমম তাই তো মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছিলে।
— ওরে বাব্বা রাজ তো হেব্বি রেগেছে।আচ্ছা তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল?
— কি কথা?
— আসলে আমার মনে তোমাকে নিয়ে কিছু ভাবনার জাগরণ হয়েছে।
— কী ভাবনা?
— এখন বলবো না কারন তোমার পরীক্ষার রেজাল্ট তাহলে খারাপ হতে পারে তাই পরীক্ষার পরেই বলবো।
— মানে?
ও আমার কোন কথার উত্তর না দিয়ে চলে যেতে লাগলো আর আমার মনে আরেকটা বার কৌতুহল দিয়ে গেল। ও আমায় কি বলতে চায়? ও কি আমায় ভালবাসে নাকি অন্য কিছু। হয়ত ভালবাসেই হবে নয়ত বলল কেন পরে বলবে?এখন বলবে না কারন এতে আমার পরীক্ষা খারাপ হতে পারে। আমাদের পড়া শুরু হয়ে গেল। দুইজনেই মন দিয়ে পড়াশুনায় ব্যস্ত হয়ে পরলাম তবে আমার বার বার দিপ্তিকে ভালবাসার কথাটা বলতে ইচ্ছা করছে। প্রতিটা পরীক্ষা শেষে ওরে মনের কথা বলবো বলবো করেও বলা হয় না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম পরীক্ষার শেষ দিনই ওকে মনের সব কথা বলে দিবো। কপালে যা আছে তাই হবে। আজ পরীক্ষার শেষ দিনে আমি দিপ্তির জন্য কলেজ মাঠে অপেক্ষা করতে লাগলাম। মুখে হাসি নিয়ে ও আমার সামনে আসলো।
— দিপ্তি তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল?
— হুমম বলো।
— আসলে আমি তোমাকে…
— ভালবাসি তাই তো।
— হুমম।
— কি রাজ তুমিও না? কয়টা দিন হেসে হেসে কথা বললাম আর তুমি আমায় ভালবেসে বসলে।
— তুমিও তো আমায় ভালবাসো।
— আচ্ছা তোমার আছে টা কি যে তোমায় ভালবাসবো।হ্যা একটা সময় অনেক ব্রিলিয়েন্ট ছিল তবে তোমার রেজাল্ট তো মনে হয় আমার থেকেও খারাপ হবে।
— কিন্তু তুমি আমায় কি বলতে চেয়ে ছিলে?
— তোমায় বলতে চেয়ে ছিলাম যে রাজ তুমি আমায় ভালবেসে ফেলো না, এতে তোমার ক্ষতি হবে। আসলে আমার লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছিল বলে তোমার সাহায্য নিয়েছি। তাই বলে যে বোকার মত তোমায় ভালবেসে ফেলবো এর তো কোন মানে নেই।
— তার মানে তুমি শুধু আমায় ব্যবহার করে গেছো।
— দুনিয়াতে সবাই স্বার্থের পিছনে ঘুরে। আমিই বা এর বিপরীত হতে যাবো কেন?
ওর কথায় আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয় নি বরং আমার হাতটা চলেছিল। সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল কিন্তু আমি আর কারো দিকে না তাকিয়ে পিছনের ফিরে হাঁটা শুরু করলাম। জীবনে হয়ত ভালবেসে হেরেছি তবে বাস্তবতার কাছে আমি কিছু শিখেছি।
নিত্তিয়ার আর অভ্রের কথা বলা গুলো দিন দিন বাড়তে লাগলো। আর নিত্তিয়ারও কথা বলতে এখন ভালই লাগছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই নিত্তিয়া প্রথমে অনলাইনে গেল আর অভ্রকে সুপ্রভাত দিয়ে অন লাইন থেকে চলে আসলো। নিত্তিয়ার দিন বদলাতে শুরু করলো। সামনে যে ওর পরীক্ষা সেটা ওর মনেই হচ্ছে না। কথা বলার ফাঁকে অভ্র নিত্তিয়ার নাম্বারটা নিয়ে নিলো আর নিত্তিয়াও বিশ্বাস করে তাকে নাম্বার দিলো। একদিন রাতে নিত্তিয়া পরছিল তখনই তার ফোনটা বেজে উঠলো। মোবাইলে অচেনা নাম্বার দেখে নিত্তিয়ার মনে হলো এই হয়ত অভ্র। কিন্তু কেন মনে হলো সেটা নিত্তিয়া জানে না?
— হ্যালো।
— নিত্তিয়া বলছো।
— হুমম তাহলে তুমি অভ্র।
— চিনলে কেমন করে?
— কিছু কিছু জিনিস চিনতে বা বুঝতে কোন কারন লাগে না। আর আপনাকে তো শুধু আমি নাম্বার দিয়েছি, অন্য কাউকে তো দেই নি।
— বাব্বা তাহলে তো আমি স্পেশাল কেউ।
— হতেও পারেন।
— সত্যি।
— জানি না।
এভাবে নিত্তিয়া আর অভ্রের মাঝে কথা বাড়তে শুরু করছে। আর নিত্তিয়াও অভ্রকে নিয়ে তার ভবিষ্যৎ সাজাতে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যৎটা তার কোন দিকে মোড় নিবে সে ভাবতেও পারছে না। কথা বলা বাড়ার সাথে সাথে নিত্তিয়ার পরীক্ষার দিন গুলো এগিয়ে আসলো। আজ তার কলেজে বিদায় অনুষ্ঠান কিন্তু নিত্তিয়া বলছিল অভ্রকে আসতে কিন্তু অভ্রের নাকি কাজ আছে। নিত্তিয়া অনেক সেজেছে অভ্রের জন্য কিন্তু অভ্র আসে নি। তাই নিত্তিয়ার মন এখন খারাপ। হঠাৎ নিত্তিয়ার ফোনে একটা কল আসলো আর দেখে অভ্র ফোন দিয়েছে।
— হুমম বলেন।
— আমার উপর কি খুব রাগ হয়েছে?
— আপনার উপর রাগ করতে যাবো কেন? তাছাড়া আমি কে যে আপনার উপর রাগ করবো? বা আমি রাগ করলে আপনার কি?
— প্রশ্ন গুলোর উত্তর যে তুমি জানো এটা আমিও জানি।
— অভ্র একদম হেয়ালি করবেন না বললাম।
— আরে হেয়ালি করছি না তবে আজ তোমাকে দেখতে বেশ লাগছে।
— ওই মানে কী? আপনি এখন কোথায়?
— জানি না।
আর কিছু বলতে পারে নি নিত্তিয়া কিন্তু অভ্র ফোনটা কেটে দিয়ে বন্ধ করে দিলো। নিত্তিয়া বুঝতে পারলো অভ্র তাকে দেখছে। যদিও নিত্তিয়ার মনে অনেক প্রশ্ন তবু এখন তার একটু লজ্জা লাগছে।সবার সাথে মজা করেই বিদায় অনুষ্ঠানটা শেষ করলো। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল নিত্তিয়ার। আর পড়াশুনার চাপও বেড়ে গেল কিন্তু এখন পড়া গুলো যেন তার অগুছালো হয়ে আছে। কাল নিত্তিয়ার পদার্থ পরীক্ষা আর আজ সে অনলাইনে আছে অভ্রের অপেক্ষায়। সে একটু পর পরই ম্যাসেজ চেক করছে। একটু পরই অভ্র আসলো।
— ওই কতক্ষন লাগে নেটে আসতে?
— কেন?
— কেউ যে অপেক্ষা করে আছে এটা কি বুঝেন না?
— হুম তবে কাল না তোমার পরীক্ষা।
— হুমম।
— তবে পড়াশুনা বাদ দিয়ে অন লাইনে কি করছো?
— আপনার সাথে কথা বলছি।
— কেউ কিছু বলছে না।
— কেউ তো দেখতেই পারছে না কারন আমার বইয়ের ফাকে মোবাইল নিয়ে রাখছি
— ওই এতে তোমার পরীক্ষা খারাপ হবে।
— আপনি আছেন তো।
— নিত্তিয়া তোমাকে আমার কিছু বলার আছে?
— যা বলবে আমার সাথে দেখা করে বলতে হবে।
— কিন্তু?
— ৪ দিন পর আমার শেষ পরীক্ষা । আর আমি পরীক্ষার হল থেকে বার হয়ে যেন আপনাকে দেখতে পাই।
— কিন্তু??
— আমি কিছু জানি না তবে এটা আমি চাই।
— ওকে।
এরপর আস্তে আস্তে তাদের কথার মাত্রা বাড়তেই লাগলো তবু অভ্র নিত্তিয়াকে এড়িয়ে চলে যা নিত্তিয়া সহ্য করতে পারে না। আজ পরীক্ষা শেষ করে নিত্তিয়া অপেক্ষা করছে অভ্রের জন্য। কারন আজ যে তার অভ্র তাকে কিছু বলবে। কেউ পিছন থেকে ডেকে উঠলো। পিছনে তাকাতেই দেখে অভ্র দাঁড়িয়ে আছে। কারন অভ্রের ছবি নিত্তিয়া আগে দেখেছে।
— এই যে নিত্তিয়া আমি তোমার কথা মত সামনে চলে আসলাম। নিত্তিয়া কি বলবে? ও একটু লজ্জা পাচ্ছে। তখন নিত্তিয়াই বলল…
— আপনি কি যেন বলতে চান?
— আসলে নিত্তিয়া তোমাকে কিভাবে যে বলবো?
— চোখ বন্ধ করে বলে ফেলেন।
— আসলে নিত্তিয়া তোমার কাজিনের বিয়েতে আমাদের এক বন্ধুর সাথে বাজি ধরে আমি তোমার সাথে বন্ধুত্ব করি।
আসলে তুমি নাকি কোন ছেলের সাথে প্রেম করতে চাও না। তাই আমি তোমার সাথে কথা বলি কিন্তু আমি জানতাম না যে তোমার মনে আমার জন্য এত্তোটা জায়গা তৈরি হবে। পারলে আমায় মাফ করে দিও আর ভাল থেকো।
নিত্তিয়া অনেকটা থমকে গেল কিন্তু কি ভেবে যেন অভ্রকে ডাক দিলো।
— অভ্র।
— হুমম বলো।
— একটা মেয়ের মনে জায়গা করা কঠিন কিন্তু সেই জায়গাটা অপূর্ণ রাখাটা কষ্টকর। আর কখনো কোন মেয়ের মন নিয়ে বাজি না ধরার অনুরোধ রইলো।
অভ্র কিছু বলতে যাবে তখনই নিত্তিয়ার হাতটা কাজ করলো। অভ্র শুধু তার গালে হাত দিয়ে রাখছে। তখন নিত্তিয়া বলল ” আমার কথা হয়ত ভুলে যাবেন তবে হয়ত আপনার মনে থাকবে আজকের দিনটা ” আর অভ্রের দিকে তাকালো না বরং চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির পথ ধরলো। হয়ত নিত্তিয়া “ভালবেসে ঠকেছে তবে নতুন কিছু শিখেছে”। রাজ ও নিত্তিয়ার মত হাজার হাজার ছেলেমেয়ে আছে যারা স্বার্থপরতা আর বাজির সম্পদ হয়েছে। সবাই শুধু তাদের ব্যবহার করে চলেছে কিন্তু মন থেকে বুঝার চেষ্টা করে না। আর এমন ভাবেই হাজার হাজার মানুষের রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত