প্রতিবেশী

প্রতিবেশী
– এই তৃষা টিভির সাউন্ড ছোট কর না। দেখিস না আজান দিচ্ছে, তোর আন্টিরা নামাজ পড়বে তো। আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে 9xm চ্যানেলটা চেঞ্জ করে সাউন্ড ছোট করে দিলাম। পাশের বাসা এমি আর সীমাদের। মাঝের টা আমাদের। এইখানে আমরা প্রায় আট বছর হলো ভাড়া থাকি। ওরাও সেইম, আরো বেশি। আমরা সবাই সেইম এইজ এর না। তাও সবাই বেশ ভালো বন্ধু। আমাদের মায়েরাও। আন্টিদের সাথে গল্প না করলে আমার মার ঠিক ভাত হজম হয় না।
-এই তৃষা যা তো, তোর আন্টির থেকে একটা ডিম আর কাচাঁমরিচ নিয়ে আয়। আর আলু গুলো নিয়ে যা। আন্টিকে আলু দিতে হেসে আন্টি বলে,
-এইসব আবার ফেরত দিতে হয়? ডিম আর কাচাঁমরিচ নিলাম। দেখলাম আন্টি ট্রেতে ইফতার সাজাচ্ছে সাথে পুডিং। আমি মাকে এসে বললাম,
-নুডুস বানাবে নাকি?
-হুম।
-বানাতে হবে না। আন্টি ইফতার দিবে।
রোজার মাস এলে আমার আর সৌরভের বেশ লাগে। মজার মজার ইফতার খেতে পারি। আমাদের ও বানায় মা প্রায়। ইফতার পার্টিও বসে আমাদের বাসায়। রাতের বেলা কারেন্ট চলে গেলে আমি আর সৌরভ ছাদে উঠি সাথে এমি আর সীমাকেও ডাকি।সাবাই মিলে আড্ডা হয় অনেকক্ষন।
সেদিন মা বাজারে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। এক বয়স্ক লোক মাকে বাসায় দিয়ে আসে কিন্তু ওনি ঘরে আসে না। কারণ সামনের রুমে আমাদের বুদ্ধের আসন ছিলো। বেশ অবাক লাগল। আন্টিরা তো নামাজ পড়ে এসে বসে আড্ডা দেয়।
আমার পিসির বাসায় বেড়াতে গেলাম। ওনি বেশ মুসলিম বিদ্বেষ। কথায় কথায় ওদের গালাগালি করে ওরা নাকি বিশ্বাসের যোগ্য না। কারণ পিসো এক লোকের সাথে শেয়ারে দোকান দিয়েছিল সে লোক টা সব টাকা মেরে দোকান ওনার নামে করে ফেলে। ওনি মুসলিম ছিলো তাই ওরা একদম মুসলিম পছন্দ করে না। ওনার শাশুড়ী বলে, স্বজাতি ছেড়ে অন্য জাতির সাথে ব্যবসা করলে এমন হয়। কিন্তু আমার মামার সাথে জাহেদ আংকের ওয়ার্কশপ এখন প্রায় বিশ বছর। আমি আর মা মাসির বাসায় যাই। যাওয়ার সময় সৌরভকে চাবি দিয়ে যেতে ভুলে যাই। ও ফোন করলে মা ওকে বলে এমি দের বাসায় বসতে। এদিকে আমার চার তলায় উঠে দেখি মাসিরা নেই। আমার খুব গলা শুকিয়ে উঠে মাকে বলাতে মা আন্টিদের পাশের বাসায় বেল দেয়। এক আগাগোড়া পর্দা করা মহিলা দরজা খুলে। আমরা একটু বসতে চাইলে ওনি এমন রিয়েক্ট করে যেন আমরা কোন মানুষ না কিন্তু ওনি আমাদের অনেকবার দেখেছে। একটু পানি দিতে বললে ওনি বলে,
-ওরা সবাই রোজা। এখন বিধর্মীদের পানি খাওয়াবে না ওরা। কথা টা শুনে আমি প্রায় কান্না করে দিলাম। নিচের নেমে দোকান থেকে বোতল কিনে পানি খেলাম। সৌরভ কে ফোন দিলে ও বলে,
– তোমরা না আসলেও চলবে। আমি শরবত খাচ্ছি, একটু আগে নুডুস বানিয়ে দিলো আন্টি। এখন আন্টির সাথে ক্রিকেট দেখছি। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আন্টিও তো রোজা রাখছে। আমি বসে বসে বই পড়ছিলাম। সৌরভ তাড়াহুরা করে বাসায় ডুকল।তখন তিনটা। এক্সাম দিয়ে এসেছে। আবার বের হয়ে যাচ্ছিল। আমি বললাম,
-কিরে ভাত খাবি না?
-আরে দিদি টাইম নেই। এক বড় ভাইয়ে ফোন দিয়েছে এক ডেলিভারি রোগীর ব্লাড লাগবে এ নেগেটিভ। সেখানে যাচ্ছি। এসে খাবো। মা তখন চিৎকার করে উঠল।
– আমি রাত দিন কষ্ট করে খাওয়াচ্ছি আর তুমি গিয়ে গিয়ে মানুষকে রক্ত দাও। না খেয়ে গেলে দিবি কিভাবে?
– মা, না খেলেও রক্ত থাকে। আমি যদি অন্যকে দিই এক দিন আমার বোনের লাগলে অন্য কেউ দিবে।
রাতের বেলায় সৌরভ এসে মুখ ভার করে বসে থাকে। অনেকক্ষন জিজ্ঞেস করার পর কিছু বলে না। এমি আর সীমাও এলো। সবাই মিলে জানতে চাইলে ও বলে,
– এত কষ্ট করে গেলাম। ব্লাড ও অর্ধেক দিয়েছি। তখন এক লোক এসে সিরিজ টেনে খুলে ফেলে। অন্য ধর্মের লোকের রক্ত তাদের বাচ্চার শরীরে যাবে না। দরকার হলে মারা যাবে, তাও। শেষে আমি আমার আরেক ফ্রেন্ডকে ফোন করে এনে ব্লাড দেওয়াই। বলতে গিয়ে কান্না করে দিলো। আমরা সবাই চুপ করে শুনি ওর কথা। প্রতি মাসের দশ তারিখ সকালবেলা আমার মা মন্দিরে পালা ছোয়াং পাঠায়। রাতে তরকারি রান্না করে রাখে সকাল পাচঁ টায় উঠে ভাত রান্না করে। এক দিন সাতটায় ভান্তেরা খাবার নিতে আসে। মা তখনও ঘুম। সীমার মা আমার মাকে ডেকে দেয়। মা তড়কা মেরে উঠে। সাতটা বেজে গেছে ওরা এসে গেছে এখন কি করবে। এত গুলো তরকারি গরম দিতে হবে। দুই হাড়ি ভাত রান্না করতে হবে।তখন আন্টি বলে
-আপনার চুলায় তরকারি গরম দেন। আমার এইখানে ভাত বসিয়ে দেন। আমি দেখছি। আধাঘন্টায় সব রেডি হয়ে যায়। একদিন কলেজে গিয়ে দেখি খুব মারামারি হচ্ছে। কারণ একই ক্লাসের ছেলেরা ঘুড়তে গেলে একজন নাকি ভগবানের মূর্তির উপর পা দিয়ে ছবি তোলে। বুকে হাত দিয়ে সেক্সুয়াল পোজের ছবি তোলে ফেসবুকে দেয়। তাই অন্য ছেলেও কোরানে পা দিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে দিসে। এই নিয়ে মারামারি। আমি কিছু বুঝতে পারার আগেই কয়েক টা ছেলে আমাকে ঘিরে ধরে।
– এই, এইটাকে মার, এইটাও বিধর্মী। আমাদের ধর্মকে অপমান। ওদের মেরে তবে শান্তি। আমি বললাম,
– তো তোমরা অন্য ধর্মের বিশ্বাস কে অপমান করেছো কেন? তবে রে, বলে আমার দিকে পাথর ছুড়ে মারে। আমার মাথায় লাগে আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ি তখন আমাদের ইসলাম হিস্ট্রির প্রফেসর এসে সামনে দাঁড়ায়।
-তোমরা ওকে মারতে চাইলে আগে আমায় মারতে হবে। ওরা চলে যায়। স্যার আমাকে তুলে টিস্যু দিয়ে রক্ত মুছে দেয়। আমি স্যারকে বলি,
-স্যার একই ধর্মের মানুষের এত ভিন্নতা কেনো? এক জন কত আপন যেন নিজের প্রাণের মানুষ। আবার অন্য কেউ যেন রক্ত চায়। কিছু মানুষকে দেখলে বিশ্বাসই হয় না এদের ধর্মের মানুষের সাথে ছোটবেলা থেকে পাশাপাশি বড় হচ্ছি, একসাথে ক্লাসে পড়ছি। এক ধর্মের মানুষের এত ভিন্নতা? স্যার বলে,
-ধর্ম দিয়ে মানুষ বিচার করা বোকামি। মানুষ ধর্ম বানায় না। ধর্মের বিশ্বাস তার জায়গায় স্থির। কে তাকে কিভাবে নিচ্ছে সেটা হচ্ছে মানুষের দোষ সেখানে ধর্মের দোষ নেই। ধর্ম বিশ্বাস সৃষ্টিকর্তা মানা মানুষরা যদি মানে এই পুরো পৃথিবী তার সৃষ্টি। তাহলে কেন একই মানুষকে শত্রু ভাববে? যারা মানুষ হয়ে মানুষকে শত্রু ভাবে তারা ধর্ম কে মানে না গ্রহণ করে না বিশ্বাস করে না তার একটা ভুল মতবাদকে ঘিরে ঘুরতে থাকে সেটা যেকোন ধর্মের মানুষ। কোন ধর্ম কখনো সহিংসতা লিখে যায় নি। কোন ধর্ম অন্যকে আঘাত করে শিখিয়ে যায় না। যেমন আম এক ফল জাতীয় প্রজাতি। সেটা স্বার্বজনীন। কিন্ত একেক গাছের আম একেক রকম। স্বাদ ভিন্ন। সেটা নির্ভর করে গাছের উপর। তেমনি অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নির্ভর করে পরিবারের শিক্ষায় উপর। আমি জানি আমের সাথে ধর্মে তুলনা হাস্যকর ব্যাপার। তবে তোমাকে বুঝাতে বললাম। এত কিছুর মধ্যে খারাপের চেয়ে ভালো বেশি বলে এখনো মানবতা আছে। আমি বাসায় চলে এলাম। রাতে ব্যাথায় ঘুমাতে পারছিলাম না। 3 টার দিকে দেখি মা উঠে পাশের বাসার ওখানে যাচ্ছে। আমি বললাম,
-কোথায় যাচ্ছো?
-আরে আশে পাশের সবাই সেহেরি খেতে উঠছে। সীমাদের লাইট জ্বলছে না। তোর আন্টি কাল আমার থেকে ঘুমের ওষুধ নিয়ে গেছিল তাই ঘুম ভাঙ্গছে না হয়ত। মা আস্তে আস্তে জানলায় বাড়ি দিচ্ছে।
-ও দিদি, ও দিদি উঠেন না। সেহেরি খাবেন না? আন্টির আওয়াজ ও শোনা যাচ্ছে,
-অবুক দিদি ডেকে দিছেন ভালো হয়ছে।
আরো কথা হচ্ছে ঠিক বুঝছি না। তবে কেমন যেন একটা শান্তির আর সুখের অনূভুতিতে বুক টা হাল্কা হয়ে যাচ্ছে।
আমি তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আসলেই ‘ধর্ম দিয়ে মানুষ বিচার করা বোকামি,ভালোর সংখ্যা বেশি তাই আমরা এখনো মানবতার গল্প শোনায়।’

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত