একজন মা কখনও হয় বাবা

একজন মা কখনও হয় বাবা
অফিস শেষে রোজ সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে নায়লা। বাসায় তার ছোট দু’টো সন্তান। স্বামী ছাড়া সন্তানদেরকে লালন করা কতটা কঠিন নায়লা বেশ অনুভব করে। বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য মধ্যবয়সী এক মহিলা রয়েছেন বাসায়। তবুও সারাদিন মন পড়ে থাকে বাসাতেই। সারাদিন অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা নায়লা যখন বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকায় সব ক্লান্তি যেন মিলিয়ে যায় নিমিষেই। বেঁচে থাকার অবলম্বন বলতে নায়লা কেবল তার বাচ্চাদেরকেই বুঝে। এই মুখ দু’টোই তার ভালো থাকার কারণ।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেই ছোট মেয়ে ইরা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এলো। নায়লা শঙ্কিত চেহারায় জিজ্ঞেস করলো, ‘কি
হয়েছে তোমার ইরা?’ ‘ইশান ভাইয়া আমাকে মেরেছে।’ বলতেই আবার কেঁদে ফেললো ইরা। ইশানকে ডাকতেই বললো, ‘মা, ইরা আমার পেন্সিল ভেঙ্গে ফেলেছে।’ গোমড়া মুখের ইশানকে কাছে টেনে নিল নায়লা। ‘ইশান বাবা, আমি তোমাকে একটা পেন্সিল কিনে দিব। কিন্তু এখন তোমরা দু’জন আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে।’ ইরা এবং ইশান দু’জনেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। ‘তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে বলো? আমার যা কিছু সব তো তোমাদের দু’জনের জন্যই। তোমরা এভাবে আমাকে কষ্ট দিলে আমি কিন্তু দূরে চলে যাব।’ পাঁচ বছরের ইরা মন খারাপ করে মাথা নিচু করে বললো, ‘আমি আর কখনও ভাইয়ার পেন্সিল ভাঙ্গবো না।’ ছেলেমেয়েকে পরম আদরে বুকে টেনে নিল নায়লা। ‘আমি তোমাদের দুজনকেই খুব ভালোবাসি। আশা করি, তোমরাও একে অপরকে ভালোবাসবে।’
তিন বছর আগে নায়লার স্বামী কোয়াসিম সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ইশানের বয়স তখন পাঁচ। আর ইরা তখন বাবা হারানোর কষ্ট কিছুই বুঝে না। এতটুকু বয়সে বাবা হারানোর শোক যেন ছেলে মেয়েকে কখনও গ্রাস করতে না পারে, তার জন্য চেষ্টার কমতি রাখেনা নায়লা। নায়লার বাবা-মা অনেক বার চেয়েছেন নায়লা নতুন করে জীবনটা শুরু করুক, আবার বিয়ে করুক। শ্বশুর শ্বাশুড়ি চাইতেন কোয়াসিমের ছোট ভাই কল্লবের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বাড়ির বউ বাড়িতেই রাখতে। নায়লা স্পষ্ট কন্ঠে জানায়, ‘কল্লবকে আমি কখনও কোয়াসিমের ভাই হিসেবে দেখিনি, আমার নিজের ছোট ভাই হিসেবে দেখেছি। আর দৃষ্টিতে যেমন করেই দেখি না কেন আমি আর কাউকে কখনোই বিয়ে করবো না, এটাই আমার সিদ্ধান্ত।’
শত বুঝানোর পরেও নায়লার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে সক্ষম হলো না কেউ। দু’টো ছেলেমেয়েসহ নায়লা নিজে দিনদিন বোঝা হয়ে উঠলো দুই পরিবারের লোকের কাছেই। সবার খিটখিটে আচারণে ছেলেমেয়েরাও মনের দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়লো। বাধ্য হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগাদা অনুভব করলো নায়লা। অনেক দিন লেগে গেল একটা চাকুরি জোগাড় করতে। অফিস শেষে রোজ সন্ধ্যা করে বাড়ি ফেরা নিয়ে খুব আপত্তি করে বসলো শ্বশুর শ্বাশুড়ি। উপায়হীন হয়েই স্বামীর স্মৃতি জড়িত বাড়ি ছাড়লো নায়লা।
আজ নায়লার এগারতম বিবাহ বার্ষিকী। শেষ চার বছর যাবৎ নায়লার জীবনে বিবাহ বার্ষিকী বলে কোনো শব্দ উচ্চারিত হয় না। ভুলে থাকতে চায় সে এই দিনটাকে। কিন্তু ফেসবুকে নোটিফিকেশন বাক্সে পুরানো মেমোরি কড়া নাড়ে আর প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয় এই বিশেষ দিনটার কথা। কষ্ট হয় এটা ভেবে যে, এই আনন্দের দিনটাই তাকে বিষাদে ডুবিয়ে দেয়। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, কোয়াসিমের চতুর্থ মৃত্যু বার্ষিকীও আজ। কোয়াসিম নেই, এই কথাটা সবসময় ভুলে থাকতে চায় সে। বিবাহ বার্ষিকীর এই আনন্দের দিনেই পৃথিবী ছাড়ে কোয়াসিম। উপহারসামগ্রী কেনা শেষে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছে নায়লাকে অবাক করে দেওয়ার জন্যই তাড়াহুড়ো করে রাস্তা পার হচ্ছিল কোয়াসিম। কিন্তু পরিণামে এভাবে সে সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিদায় হবে কেউ ভাবতে পারেনি। বাহিরে ঝুম বৃষ্টি। কথা ছিল, আজকের দিনে ছেলেমেয়ে ও নায়লার সঙ্গে কোয়াসিমও থাকবে। মজা করে রান্না করবে নায়লা, পরিবারের সবাই মিলে আনন্দের সহিত খেতে বসবে। খাবার টেবিল গল্প, আড্ডা আর মাতামাতিতে ভরে উঠবে। ক্লান্ত হয়ে গেলে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়তে চাইবে।
বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে কোয়াসিম নায়লার চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর অনুভূতি জড়ানো কন্ঠে বলবে, ‘আমাকে আরও একটা বছর সহ্য করা ও সঙ্গ দেওয়ার জন্য তোমাকে অাবারও ধন্যবাদ নায়লা।’ নায়লার চুপ থাকা দেখে কোয়াসিম হেসে বলবে, ‘তবে এটা কিন্তু সত্যি যে, আমরা বুড়ো বুড়ি হওয়ার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলাম।’ অথচ আজ কোয়াসিমের চলে যাওয়ার দিন। কথা ছিল আজ কোনো বিষাদ থাকবে না। শুধু আনন্দে ঘেরা একটা দিন হবে। কোয়াসিম এভাবে কখনও চলেও যাবে না, রবে বৃদ্ধ বয়স অব্দি। আগলে রাখবে পরিবারের সকলকে মায়া আর ছায়া দিয়ে। স্বপ্ন তো কতই থাকে জীবনে। সব কি আর পূরণ হয়! ছোট্ট জীবনে না পাওয়ার ক্ষোভটাই যেন কারো কারো জীবনে বেশি রয়ে যায়। নায়লা নিজেকে তেমনই একজন মনে করে। তবুও চোখ বন্ধ করে সে যেন কোয়াসিমকেই সবসময় পাশে দেখতে পায়।
কোয়াসিমের সঙ্গে ভালোবেসে ঘর বাঁধে নি নায়লা। পরিবারের পছন্দেই সংসার জীবন শুরু হয় তার। সম্পূর্ণ এই অপরিচিত মানুষটাই তার কাছে একসময় প্রিয় আশ্রয় এবং প্রশ্রয় হয়ে উঠে। দুঃখ-কষ্ট, হাসি-আনন্দ মিলিয়ে খুব সুখেই দাম্পত্য জীবন কাটতে থাকলো। ভালোবাসার ফসল হিসেবে বিয়ের দুই বছর পরেই কোল আলো করে আসে ইশান। একটা প্রবাদ আছে, অতি সুখ কপালে সয় না। নায়লার জীবনেও কথাটা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ইরার বয়স যখন দুই তখনই ইরা তার বাবাকে হারায়। মাত্র সাতটা বছর নায়লা কোয়াসিমের সঙ্গ পায়। আর এই সাতটা বছরই নায়লার পুরো জীবনটা দখল করে বসে। কোয়াসিমকে এখন সে তার সন্তানদের মাঝে খুঁজে পায়। এই যুগে একজন মহিলার পক্ষে একা তার বাচ্চাদের লালন করাটা খুব কঠিন বিষয়। সমাজে একজন একা মহিলাকে ভালো দৃষ্টিতে দেখা হয় না।
সেদিন নায়লা অফিসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। মাথা ঘুরে পড়ে যায়। বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আর কাজের চাপ সব মিলিয়ে নিজেকে সামলে নিতে পারে নি সে। মোটামুটি সুস্থ হলে অফিসের এক সহকর্মী তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যায়। গত মাসে নায়লার পদন্নোতির খবরটা এখনও আশেপাশের অনেকেই জানেন না। অথচ নায়লাকে একজন পুরুষ মানুষ বাসায় পৌঁছে দেওয়ার খবরটা সেদিন’ই ছড়িয়ে গেল আশে পাশের সবার আলাপে।
‘আগেই বলেছিলাম ভাবি, একে তো বিধবা তারপর আবার পরিবারের কেউ সঙ্গে নেই এমন মেয়ে মানুষকে বাসা ভাড়া দিয়েন না। ছেলেমেয়ের কাছে আদর্শ মা হওয়ার জন্য এরা কোনোদিন বিয়েও করে না আবার গোপনে পুরুষদের সঙ্গে ঢলাঢলি করতেও ছাড়ে না।’
বাড়িওয়ালির কাছে নিজের মনের কথা ব্যাখ্যা করে চলছেন নায়লার পাশের বাসার গৃহিণী। তার কথার সারাংশ এটাই যে, শুরু থেকেই তিনি বুঝেছিলেন নায়লা ভালো মেয়ে নয়। আর এরকম স্বামী ছাড়া বিধবা মহিলারাই সমাজে অপকর্ম ঘটায়। বাড়িওয়ালি প্রশ্ন করলেন, ‘এই ঘটনার আগে কি করে বুঝলেন আপনি নায়লা ভালো মেয়ে নয়?’ ‘ভাবি কি যে বলেন না, এত বয়স হলো আর এতটুকু বুঝতে পারবো না! আপনি কখনও দেখেছেন নায়লার শ্বশুরবাড়ি থেকে তার দেবর ছাড়া আর কেউ এসেছে? বাবা মা তাও তো তেমন আসে না। শুনেছি শ্বশুর শ্বাশুড়ি দু’জনই বেঁচে আছে। চরিত্র ভালো না তাই তো শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ আসে না। দেবরের সাথে ঢলাঢলি আছে বলেই কেবল সে আসে।’
শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে আসার পরে নায়লার শ্বশুর শ্বাশুড়ি কেউ আসে নি একবার নাতি-নাতনিকে দেখার জন্য। কেবল দায়িত্ববোধ থেকে কল্লবই মাঝেমধ্যে এসে দেখে যায়। কল্লবের সঙ্গে নায়লার বিয়ের কথা উঠলে কল্লবও এ বিয়েতে মত দেয় নি। নায়লাকে সে কখনও বড় বোন ছাড়া অন্য দৃষ্টিতে ভাবতে পারবে না, কড়া কন্ঠে জানিয়েও দিয়েছিল। তবুও এই প্রস্তাবটাই যেন এখন তাদের মধ্যেকার ভাইবোনের সম্পর্কটাকে একটু নড়বড়ে করে দেয়।
প্রায়ই নায়লাকে অনুরোধ করে কল্লব ওবাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য।
নায়লা হেসে বলে, ‘কার কাছে যাব কল্লব? কোয়াসিম মারা যাওয়ার পরে আমার শ্বশুর শ্বাশুড়িও যেন পর হয়ে গেল। অথচ আমি কখনও ভাবতেও পারিনি, তারা আমাকে এতটা পর করে দিবে।’ ‘মা বাবার উপরে রেগে থেকো না। ওটা তো তোমাদেরও বাড়ি। ওখানে ভাইয়ার সব স্মৃতি জমা আছে৷ তোমাদের অধিকার আছে।’ প্রসঙ্গ পাল্টাতে নায়লা প্রশ্ন করে, ‘তৃণা কেমন আছে? তোমরা বিয়ে করবে কবে?’ হেসে জবাব দেয় কল্লব, ‘এখনও বোধহয় মাস ছয়েক লেগে যাবে। তৃণার পরিক্ষা শেষ হলেই ওদের বাড়ি বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবো তোমাকে দিয়ে।’ ‘আমাকে?’ ‘নিশ্চয়ই তুমি যাবে। ভাইয়া তো আর নেই। তাছাড়া আমার বড় কোনো বোনও নেই। তুমিই তো আমার বড় বোন হয়ে আমাদের বাড়িতে এলে। দায়িত্বটা যে তোমাকেই নিতে হবে।’
নিজের বাবা মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয় নায়লার। কারণ একটাই, ছেলে মেয়ের পেছনে এভাবে নায়লার নিজের জীবনটা শেষ করার বিষয়ে তাদের কোনোই সম্মতি নেই। তবুও দায়বদ্ধতা থেকে মাঝে মাঝে এসে দেখে যায় নাতি নাতনিকে। কখনও কখনও নিজকে খুব একা আর অসহায় মনে হয় নায়লার। মনে হয়, চারপাশে শুধুই শূণ্যতা। কোয়াসিম আর দুই সন্তান ছাড়া এ জীবনে অর্জন বলতে আর কিছুই খুঁজে পায় না সে। সন্তানদের সামনে মন খারাপ করার সুযোগও নেই। জোর করে হাসিখুশি থাকার অভিনয় করে চলে প্রতিনিয়ত। সন্তানরা একদিন অনেক বড় হবে, এটাই তার এখন স্বপ্ন। ব্যালকনিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে নায়লা। বাহিরে চাঁদের আলো। এমন আলোতে কোয়াসিমকে নিয়ে চাঁদ দেখার কত শত স্মৃতি জমে আছে ভাবতেই চোখ জোড়া ছলছলিয়ে উঠলো তার।
‘মা?’ ইশানের ডাকে তাড়াতাড়ি চোখের জল আড়াল করে হাসিমুখ করে ফিরে তাকায় নায়লা। ‘কিছু বলবে ইশান?’ ‘আচ্ছা মা, আজ স্কুলে ক্লাসটিচার জিজ্ঞেস করলেন বড় হয়ে কি হতে চাই।’ ‘তারপর তুমি কি বললে?’ ‘আমি কিছু বলতে পারি নি। কারণ আমি তো জানি না আমি বড় হয়ে কি হব। আচ্ছা মা, আমি বড় হয়ে কি হব?’ নায়লা হেসে ইশানকে কাছে নিয়ে এলো। ‘তুমি বড় হয়ে ঠিক তোমার বাবার মত হবে। একজন মানুষের মত মানুষ হবে। যে চলে গেলেও এঁটে থাকবে আশেপাশের সব মানুষের মনে।’ ‘আমিও বাবার মত হতে চাই।’ দূরে দাঁড়িয়ে ইরা শান্ত স্বরে বললো। নায়লা ছলছল চোখে খুশিতে হেসে উঠে বললো, ‘অবশ্যই তোমরা তোমাদের বাবার মত হবে।’
রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে সকালের নাস্তা তৈরিসহ বাচ্চাদের ও নিজের টিফিন তৈরি করা হলো নায়লার প্রথম কাজ। বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে নিজে অফিসে পৌঁছে যাওয়ার পরে বাচ্চাদের ও বাসার সব কাজের দায়িত্ব থাকে মধ্য বয়সী এক মহিলার উপরে। বিশ্বস্ত এই মহিলাকে বাড়িওয়ালির মাধ্যমেই জোগাড় করে নায়লা। আশেপাশের সবার কথা উড়িয়ে দিয়ে নায়লা প্রতিনিয়ত একজন দায়িত্বশীল মা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে চলছে। একা চলা খুব কঠিন আর এই কঠিনের সঙ্গেই প্রতিদিন মুখোমুখি হয় সে। নানান জনে নানা কথা বলে, মন খারাপ হয়, চোখে জল জমে, ভেতরে ব্যথা অনুভব হয় তবুও থেমে যায় না নায়লা। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব দুঃখ মাড়িয়ে চলে সে।
আগামীকাল বাবা দিবস। এই দিবসকে কেন্দ্র করে স্কুলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। স্কুলে সবাই যে যার বাবাকে নিয়ে কথা বলবে, সবার বাবা উপস্থিত থাকবে, ছবি আঁকবে। তাদের বাবা সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে না ভেবে ইশান আর ইরার বেজায় মন খারাপ। নায়লা সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে অফিসে চলে যায়। স্কুলে ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা চলছে। বাবা দিবসে কি ছবি আঁকবে অনেকক্ষণ ভেবে চুপচাপ দু’জন মিলে ছবি আঁকা শুরু করলো। ছবি আঁকা শেষ হলে সবার ছবিগুলো সংগ্রহ করতে লাগলেন একজন শিক্ষিকা। সবাই নানান ধরণের খুব সুন্দর ছবি এঁকেছে কিন্তু তিনি বেশ অবাক হলেন যখন দেখলেন ইশান আর ইরা একজন মহিলার ছবি এঁকে নিচে লিখে রেখেছে ‘আমার বাবা’ বাচ্চাদের ভুল শুধরে দিতে বললেন, ‘ছবি দু’টো খুব সুন্দর হয়েছে। কিন্তু এখানে আমার মা হবে। তোমরা ভুল করে বাবা লিখে ফেলেছো।’
ইরা চুপ করে রইলো। ইশান বললো, ‘না ম্যাম, আমরা ঠিক লিখেছি।’ শিক্ষিকা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা তোমাদের মায়ের ছবির নিচে বাবা কেন লিখলে?’ ‘আমাদের বাবা নেই। আমাদের মা’ই আমাদের মা এবং বাবা।’ না চাইতেও জল জমলো শিক্ষিকার চোখে। হেসে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের ছবিগুলোর একটা ছবি তুলতে পারি?’ ইরা হাসিমুখে বললো, ‘অবশ্যই ম্যাম।’ অফিসের কাজের চাপে খুব ক্লান্ত লাগছে নায়লার। ক্লান্তি দূর করতে ফেসবুকে ঢু মারার জন্যই মুঠোফোনটা হাতে নেয় সে। নিউজফিডে চোখ পড়তেই দেখে ইশান আর ইরার একজন শিক্ষিকা একটা ছবি পোস্ট করেছে। ছবিতে ইশান আর ইরা তাদের আঁকা ছবি নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে।
ক্যাপশনে লেখা, ‘আজ বাবা দিবসে এমনও মা’দেরকে জানাই অনেক অনেক শুভেচ্ছা। যারা একজন মা হয়েও সন্তানদের জীবনে বাবার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।’ ছলছলিয়ে উঠলো নায়লার চোখ জোড়া। কিছুতেই সে জল আঁটকে রাখা যাচ্ছে না। চোখ ভিজে জল নামছে। কষ্টে নয়, আনন্দে। কোয়াসিম মারা যাওয়ার পরে সন্তানদের লালন করার দায়ভার তার উপরই পড়ে। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখন যে মা থেকে সে বাবা হয়ে গিয়েছে বুঝতেই পারেনি।
গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত