অপেক্ষা

অপেক্ষা
যদি বিয়েই না করতে পারবে তাহলে ভালোবাসছো কেনো?
– রিলেশনের প্রথমেই তোমাকে আমি বলেছিলাম পাঁচ বছরের আগে আমি বিয়ে করতে পারবো না। কিন্তু রিলেশনের দুইবছর যেতে না যেতেই তুমি বিয়ে করতে বলছো। যেটা আমার পক্ষে অসম্ভব।
– তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল ভেবেছিলাম আমার পরিবার আমাকে অনেকদূর পর্যন্ত পড়াশোনা করাবে। তাই তোমার ওমন অবাস্তব শর্ত মেনে নিয়ে তোমার সাথে রিলেশন করেছিলাম।
– তোমার কাছে অবাস্তব মনে হলেও আমার কাছে চরম বাস্তব এটা।
– আমি ওতো কিছু না জানি না,বুঝিনা। আমার শুধু তোমাকে চাই। তোমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে আমি কোনোদিনও বিয়ে করে নিজের স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবো না।
– মেনে নিতে হবে,এছাড়া কোনো উপায় আমাদের নেই। নিয়তি হয়তো চায় আমরা আলাদা হয়ে যাই।
– বিয়ের পর দুইবছর আমরা খুব ভালোভাবে চলতে পারবো। সেরকম টাকা নিয়েই আমি বাসা থেকে বের হবো। তুমি শুধু একবার হ্যাঁ বলো।
– না,কখনো না। এটা আমি কখনোই করবো না।
– আমি দশলাখ টাকা বাসা থেকে নিতে পারবো। যেটা দিয়ে আমাদের দুতিন বছর খুব ভালোভাবে চলে যাবে। তারপর তোমার স্ট্যাডি শেষ হলে তুমি না হয় কিছু করবে।
– তুমি হয়তো দশ লাখ টাকা নিয়ে পালালে তোমার পরিবারের কোনো ক্ষতি হবে না। তাদের ঠিকঠাক চলে যাবে। যেমন টা এখন চলছে। কিন্তু আমি যদি আমার পরিবারকে ছেড়ে চলে যাই, তাহলে আমার পরিবারের অনেক কষ্ট হবে চলতে। তুমি তো জানো আমি সারাদিন টিউশনি করি। মাস শেষে যা পাই তার অর্ধেকটাই আমি বাড়িতে দেই পরিবারের প্রয়োজনে খরঁচ করি। আর বাবার চাকরিটাও শেষ পর্যায়ে যেকোনো সময় চলে যেতে পারে। এমন অবস্থায় আমি আমার পরিবারকে একা ফেলে নিজের সুখের জন্য তোমার সাথে যেতে পারবো না।
– তুমি তো বলতে আমাকে খুব ভালোবাসো। আমার জন্য সবকিছুই করতে পারবে। এটাই বুঝি তোমার ভালোবাসা? নিজের ভালোবাসার মানুষকে দূরে ঠেলে দিচ্ছো।
– তোমার যা খুশি ভাবতে পারো। আমার কিছু যায় আসে না। আমার পরিবারের জন্য আমার জীবনটাও আমি ত্যাগ করতে পারি। সেখানে আমার ভালোবাসা তো খুব তুচ্ছ।
– একটা মেয়ে সারাজীবন দুঃখ নিয়ে জীবন পাড় করবে। আর সেটার জন্য দায়ী থাকবে তুমি।
– কখনোই না। আমার বিশ্বাস আমাকে ছাড়া তুমি খুব সুখেই জীবন পাড় করবে। প্রথম প্রথম হয়তো কষ্ট হবে। কিন্তু একসময় স্বামীর আদর,ভালোবাসা পেলে সবঠিক হয়ে যাবে।
– আমি সবার মতো না এটা তুমি ভালো করেই জানো।
– তবুও এটাই হবে।
– আমার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমাকে কখনো ফোন কিংবা মেসেজ দিবে না।
– আচ্ছা দিবো না।
– আমার সাথে যোগাযোগ করার কোনো চেষ্টা করবে না।
– ঠিক আছে করবো না।
– আমি যদি মরেও যায় কখনো তুমি জানতে পারবে না।
– প্লিজ এভাবে বলো না।
– ভালো থাকো তুমি।
সোডিয়াম আলোর হলুদ রাস্তায় হাঁটছি আমি। পূবের আকাশের সূর্যটা ডুবে গেছে অনেক আগেই। ড্রিম লাইটগুলো আলোকিত শহরটাকে আরো আলোকময় করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মানুষের ঘরে ফেরার নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। দিনশেষে মানুষ যেখানেই থাকুক না কেনো। রাত হলে সে তার পরিবারের কাছে ছুটে আসে। আপন মানুষের টানে।
আজকে তানিয়ার সাথে সব সম্পর্কের মায়াজাল ছিন্ন করে চলে আসলাম। আমি বুঝতাম মেয়েটা আমাকে খুব করে ভালোবাসে। কিন্তু বাস্তবতার কাছে আমার হাত বাঁধা। জ্বলন্ত সিগারেট হাতে উদেশ্যহীনভাবে হেটে চলেছি। সিগারেট যেমন ক্রমে ক্রমে ছোট হয়ে আসছে তেমন করে আমার পৃথিবীটাও ছোট হয়ে আসছে। আজকে আমার কান্না করার দিন,আজকে আমার কষ্টের দিন। তবে কেউ কখনো কোনোদিন জানতে পারবে না তানিয়া নামের মেয়েটাকে আমি কতোটুকু ভালোবাসতাম। এটা শুধু আমার ভিতরেই থাকবে। তানিয়ার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরেও সে আমাকে ফোন দিতো। অনেক গালাগাল করতো আমাকে। আমি মুখ বুঝে সব সহ্য করতাম। মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে অনেক খারাপ কথা বলতে।
– বলতো, তুইতো আমাকে বিয়ে করলি না। চল আমার সাথে হানিমুনে চল। আমাকে একটা বাচ্চা দিবি তুই। আমি তোর কাছ থেকে বাচ্চা নিবো। আরো অনেক কিছুই বলতো যেগুলো ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমিও বুঝতাম এগুলো ওর পাগলামি। একসময় সব ঠিক হয়ে যাবে। এভাবে বিয়ের ছয়মাস পর্যন্ত তানিয়া আমার সাথে নিয়মিত কথা বলতো। হঠাৎ করেই তার ফোন আসা বন্ধ হয়ে গেলে। কিছুদিন পর আমি ট্রাই করলাম তাঁর নাম্বারে কিন্তু বন্ধ পেলাম। এভাবে মাঝে মাঝেই ফোন দিতাম বাট ফোন বন্ধ পেতাম। প্রায় একবছর কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে যখন ফোন দিলাম তখন তানিয়া রিসিভ করলো। কেমন আছো?
– ভালো
– তোমাকে আমি অনেক ফোন দিয়েছি কিন্তু নাম্বার টা বন্ধ পেয়েছি।
– বন্ধ রেখেছিলাম
– কেনো?
– যাতে অপ্রত্যাশিত কেউ ফোন দিতে না পারে।
– তোমার সাথে কিছু সময় কথা বলতে চাই।
– সরি,আমার হাসবেন্ড দাঁড়িয়ে আছে আমার জন্য।
– যখন সময় পাও তখন ফোন করো।
– চেষ্টা করবো।
– আমি অপেক্ষায় থাকবো।
এর পর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ একটা বছর। আমি প্রতিনিয়ত তানিয়ার ফোনের অপেক্ষায় থাকতাম। তাকে আপন করে পাওয়ার জন্য নয়। মন খুলে একটু কথা বলার জন্য। আমার দুঃখের কথা গুলো তাকে বলার জন্য। কিন্তু তানিয়া আমার অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটায় নি। টিউশনির জন্য যাচ্ছিলাম,হঠাৎ দেখতে পেলাম একটা মেয়ে বাচ্চা কোলে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। হয়তো ঘুরতে এসেছে।
একি! এটাতো আমার তানিয়া। তখনই তাঁর পেছনে একজন সুদর্শন ছেলে গাড়ি থেকে নেমে বাচ্চাটাকে নিজের কোলে তুলে নিলো। আমি আবার ভুল করলাম তানিয়াতো অনেক আগেই অন্য কারো হয়ে গেছে। তানিয়া বাচ্চাটা তার হাসবেন্ডের কোলে দিয়ে স্বামীর হাতটা পরম ভালোবাসায় শক্ত করে ধরে পথ চলতে শুরু করলো। আমিও আমার পথে চলতে লাগলাম আর ভাবতে লাগলাম। এজন্যই হয়তো তানিয়া আমার অপেক্ষাটা অসমাপ্ত রেখেছে। স্বামীর ভালোবাসা পেয়ে হয়তো সে ভুলে গিয়েছে আমার অপেক্ষার কথা। আমার কথায় সত্যি হয়েছে। সে তার স্বামীর ভালোবাসায় সবকিছু ভুলে গিয়েছে। সাথে আমাকেও। যদিও আমি চেয়েছিলাম আমাকে মনে রাখুক। কিন্তু এটাই হয়ে আসছে।
আমরা শুধু শুধু কারো জন্য অনুতপ্ত হই। মনে করি আমার জন্যই হয়তো সে অনেক দুঃখে আছে। আমাকে সবসময় মনে করে। কিন্তু সেই সময় টা তাদের হয় না। স্বামী,সন্তান,সংসারের কাজকর্ম নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকে। আমাদের মতো দুইটাকার ছেঁচড়া সস্তা প্রেমিককে খুব সহজেই ভুলে যায়। কিন্তু আমরা খুব সহজে ভুলতে পারিনা।
যেমনটা আমি পারিনি আমার ভালোবাসার মানুষটাকে ভুলে যেতে। কিন্তু সে ঠিকই আমাকে ভুলে গিয়েছে।
আমি অপেক্ষায় থাকবো তাঁর ফোনের। যদিও জানি সে কোনোদিন আমাকে ফোন দিবে না। তবুও আমি অপেক্ষায় থাকবো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত