নীরার আংটি

নীরার আংটি
রাত সাড়ে তিনটে।এসময় যদিও আমার বাইরে থাকার কথা নয় তবে একটা বিশেষ কারণে আমাকে বেড়োতে হয়েছে।সেই এগারোটায় বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম।এখন বাসার দিকেই ফিরছি। রাতের শহরটা বড্ড সুন্দর হয়।এই যেমন আজকে হয়ে আছে।আমার বেড়োনোর সময় থেকেই ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিলো।আকাশের গর্জনের শব্দটা ধীরে ধীরে বিকট আকার নিচ্ছে। মনে হচ্ছে খুব জোড়ে বৃষ্টি হবে। বৃষ্টির মাত্রাটা হঠাৎ করেও খুব বেশী হয়ে গেলো।আমি তড়িঘড়ি করে সাইকেল থেকে নেমে রাস্তার পাশের দোকানের ছাউনির নিচে সাইকেলটা রেখে দাঁড়িয়ে আছি।
দোকানটা বোধহয় চায়ের হবে।একটা চুলো পাশে, তার মধ্যে কয়লা এখনো ধীরে ধীরে পুড়ছে।বৃষ্টির সাথে আসা বাতাস এই কয়লাগুলোর মধ্যে আগুনের সঞ্চারণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।কয়লা গুলো আবার একে অপরকে আগুন ধার দিচ্ছে।একজনের গায় আগুন লাগলে যে সবার গায়েই লাগে।একটা বেঞ্চ উলটো করে দোকানের সাটারের সাথে রাখা।আমি বেঞ্চ টা নামিয়ে নিয়ে বসে পড়লাম।না জানি আরো কতক্ষণ এখানে থাকতে হয়,এই বৃষ্টি তাড়াতাড়ি থেকে যাওয়ার মতন নয়।
যায়গাটা একেবারে এই এলাকার বাজারের মোড় ।দেখেই বোঝা যাচ্ছে সারিসারি দোকানপাট একটার পর একটা সাজানো।আমার থেকে খানিকটা পাশে স্পষ্ট নিয়ন মিট মিট করে জ্বলছে। বৃষ্টির পানি নিয়নের গায়ে পড়ে টিপ টিপ পড়া পানি লালচে বর্ণের দেখা যাচ্ছে।একটা গাছের ছোট্ট ডাল বাতাসে বার বার আমার আর নিয়নের মাঝখানে দেখার বিঘ্নতা সৃষ্টি করছে।মনে হচ্ছে ডালটা গিয়ে ভেঙে দিয়ে আসি।তবে এই মাঝরাতে গাছে উঠে কোমড় ভাঙলে কেউ দেখার থাকবে নাহ কিংবা কেউ দেখে ফেললে নির্ঘাত চোর ভেবে তাড়া করবে।তারা তো আর আমার নিয়ন দেখার অনুভুতিটা আচ করতে পারবে নাহ।আজকে বরং যতটা পারা যায় অতটাই সন্তুষ্টি।এই নিয়ন লাইটের অনেক গুণ জানেন তো।কত কবিতা আর গানের ছন্দে এটার ব্যাবহার।কত শত গল্পের বিরহের লাইন গুলো এই নিয়নের নিচে এসে জমা হয়। আমারো না একটা গল্প আছে।হ্যা,ভালোবা সার।
আমি অভ্র আর ওর নাম নীরা।আজ থেকে প্রায় ছ’বছর আগে রাস্তার ধারের ফুসকার দোকানে ওকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।বন্ধুর া মিলে অনেক খুজে খুজে ওর ঠিকানা বের করেছিলাম।সে কি পাগলামো, তখন বড্ড পাগল ছিলাম বটে।সেই দিনগুলো বড্ড সুন্দর ছিলো সত্যিই।একবার তো ওর পিছে পিছে আমি আর আমার বন্ধুরা মিলে বাড়ির গেট অবদি চলে গেছি।সে কি ভয় ওর।এতগুলো ছেলেকে একসাথে ওর পিছনে হাটতে দেখে বাসায় গিয়ে ওর বাবাকে ডেকে এনেছিলো।
একদম বোকাসোকা মেয়ে,বাকী আর পাঁচজনের থেকে একটু আলাদা।নাই বা হবে কেনো,ওর বাবা যে কলেজের লেকচারার।মেয়েকে বড্ড যন্তে বড় করেছে।কোনো ছেলেকে ওর আশে পাশে আসতে দেয় নাহ।ওকেনছোট বেলা থেকেই মেয়েদের স্কুলে পড়িয়েছেন।ক্লাসের সব থেকে ভালো ছাত্রী। কিন্তু আমার তখন এসব মাথায় আসেনি নীরা কি বা কেমন।আমার নীরাকে বড্ড পছন্দ হয়েছিলো,ব্যাস শেষ।অমম বয়সে কি কারোর এপাশ ওপাশ ভাববার কথা।মন যা বলেছে,যখন যা ইচ্ছে করেছে করেছি।সে সময় আমার পাগলামো আর কীর্তিকলাপের গল্প পুরো ক্লাসে বিখ্যাত ছিলো।একদিকে নীরা সবচাইকে ভদ্র অপরদিকে আমি ছিলাম ক্লাসের সবচাইতে দুষ্টু।
ক্লাস শেষ করে প্রতিদিন ওর স্কুলের সামনের ফুসকার দোকটার পাশে এক প্লেট ফুসকা নিয়ে বসে থাকতাম।ওদের স্কুল টা ভেতরে হওয়ায় ওখানে কোনো বাইরের লোকজনের যাতায়াতের অনুমতি ছিলো নাহ।আমার এই একটাই যয়গা ছিলো ওকে দেখার।নাহলে ওর বাবার মোটা চাকার গাড়িটা স্কুল শেষ না হতেই ওদের স্কুলের সামনের গেটে এসে দাঁড়ায় থাকতো।একসাথে একই সময়ে ছুটি হওয়ায় মাঝে মাঝে আমার আসতে একটু দেরী হয়ে যেতো।সেদিন আর ওকে দেখা হতো নাহ।তবে বেশীর ভাগ সময় শেষ ক্লাসটা গণিত স্যারের হতো।আমার আবার অতো হিসেব নিকেশ মিলতো না সহজে তাই ক্লাসের আগেই চুপচাপ বেড়িয়ে চলে আসতাম।
ঐদিনের কাহিনী টা মনে পড়লে বড্ড হাসি পায়।ওকে মনের অনুভুতি জানানোর দিন।সেদিন তো পাগলামো টা আমার মাথায় চড়ে গিয়েছিলো।গত ছয়দিন থেকে আমি ওকে দেখি নাহ।দেখিনা বলতে ও ক্লাস শেষে ফুসকা খেতে আসে নাহ।আমি ফুসকাওয়ালা মামাকে জিজ্ঞেস ও করেছিলাম কিন্তু ওর কোনো খবর নাই।আজকেও অর্ধেক ক্লাস করে ব্যাগটা স্কুলের বাথরুমের ভেতর দিয়ে পাড় করে আর পিয়ন আংকেলকে কিছু বকসিস দিয়ে পালিয়েছি।স্কুল পিয়নের সাথে আমার আবার পুরো দিনের সম্পর্ক।নিয়মিত তাকে চায়ের জন্য ১০ টাকা করে দিতেই হবে।নতুবা তার কাছে আবার নালিশের লম্বা একটা ফর্দ আছে।সেগুলো প্রিন্সিপালের রুমে গেছে আমার আর রক্ষে নাই।
দুই ঘন্টা ধরে ফুসকার দোকানে বসে আছি।আর এক ঘন্টা পর নীরার ছুটি।টেনশনে টেনশনে আমার মাথা কাজ করছে নাহ,মামার ফুসকা একপ্লেট নিয়ে ফুসকা খেয়েছি দু তিনটে বাকী ৫ ৬ কাপ টক সাভার করে দিয়েছি।
ভয়পাচ্ছি একটাই নীরা যদি আজকেও না আসে তাহলে আমার সহ্যের মাত্রা টা পার হয়ে যাবে।নাহ!এতটা সহ্য করতে পারবো নাজ।আজকে ও না আসলে আমি সোজাসুজি ওদের বাসায় চলে যাবো।এতক্ষণে ছুটি হয়েছে।আজকেও গাড়িটা দাঁড়ায় আছে। এই গাড়ির আজকে রক্ষে নাই।এর জন্যে কতবার যে নীরাকে দেখা মিস করে ফেলেছি।আজকেও যদি ডিস্টার্ব দেয় তাহলে মাথা গরমের মাত্রা টা বেড়ে যাবে।বন্ধুদের পাঠিয়ে দিলাম কিছু ব্যবস্থা করতে।ওরা কিজানি করেছিলো সেবার গাড়িওয়ালা আংকেল কেনো জানি ওখানেই দাঁড়িয়ে চিল্লাপাল্লা করছিলেন।মনে হয় ফাজিলগুলো চাকার হাওয়া বের করে দিয়েছিলো।
এইতো নীরা আজকে এসেছে।এদিকেই আসছে।স্কুল গেট থেকে বেরিয়ে নীরা সোজাসুজি ফুসকার দোকানের দিকে আসছে।ওকে দেখার পর ছ’দিন ওকে না দেখার যন্ত্রণাগুলো কোথায় যেনো হারিয়ে গেলো।ওর এই চোখদুটো আর গালের নিচের দিকটার বড় তিলটা আমাকে বার বার মুগ্ধ করে।কি করে যে এতো সুন্দর ও! আমি সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম।আজকে সবটা বলতেই হবে আমার।ও আমার কাছাকাছি হওয়ার সাথে সাথে এক হাত বড় কলিজা নিয়ে বুকে ফুলিয়ে আসা আমি কেনো জানি ভীত হয়ে চুপসে গেলাম।ও আমার পাশ কেটে চলে গেলো। সচারচর ভয় আমি পাইনা,তবে ভালোবাসার পথে জীবনের প্রথম এগোচ্ছি একটু আধটু বুক তো কাঁপবেই।আমি ফের বুকে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওর দিকে এগোতেই ও দেখে ফেলল, আমার দিকে এগিয়ে এসে আমাকে হাত দিয়ে ইশারা করে বললো,
-কি ব্যাপার?সমস্যা কি আপনার?
-কই কি সমস্যা?কোনো সমস্যা নেই তো।
-কোনো সমস্যা না থাকলে আমার পেছনে পেছন ঘুরছেন কেনো?সেদিনও দেখলাম কতগুলো বন্ধু নিয়ে আমার গেট অবদি চলে গিয়েছিলেন?প্রতিদিন বিকেলে আমার বাড়ির পাশে এসে ক্রিকেট খেলেন,খেলবেন তো বুঝলাম আমার জানালার পাশে তাকিয়ে থাকেন কেনো?ব্যাপার খানা কি সোজাসাপ্টা বলে দিলেই পারেন?(ও এক নিঃশ্বাসে এসব বলে দিলো।)
-(এই সেরেছে রে,ও বোধহয় সবটা ধরতে পেরে গেছে) আস..লে, মানে আমি, আমি!..আমরা।(মনে মনে,ধুর এইসব কি বলছি)
-কি আমি আমি করছেন?যা বলার সোজাসুজি বলুন এসবের কারণ কি আপনার? আমার আর সময় নেই যেতে হবে।
-(একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে,আর সাথে কিছুটা সাহস)তুমি গত ক’দিন কোথায় ছিলে?এখানে আসোনি যে?
-আপনি কি এটা বলার জন্যে এতক্ষণ থেকে বসে আছেন?
-(এই রে,এই মেয়েটা কি করে জানলো)আমি এতক্ষণ বসে আছি তোমাকে কে বললো?
-(আমার দিকে রাগী চেহারায় চোখ বড় বড় করে)যেটা বলার জন্য আছেন সেটা বলুন,নাহলে আমি যাই।
-(আবার একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে,চোখ বন্ধ করে) দেখো আমি তোমাকে গত তিনমাস ধরে দেখছি।আমি তোমার সাথে থাকতে চাই!আমি তোমাকে ভালোবাসি।(এক নিঃশ্বাসে)
-ও আচ্ছা।তা এটা বলার জন্যে এতো দেরী করলেন যে?
-(দেরী করলাম মানে কি?এই মেয়েটার কথাবার্তা কেমন মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে)আসলে এই কয়দিন তোমাকে না দেখে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারিনি।তাই জিজ্ঞেস করছি?
-ঠিক আছে। এই নিন এটা ধরুন।কাল থেকে মামার দোকানে বাক্সের নিচে চিঠি রেখে যাবেন।এখন বাসায় যান।
আমাকে একটা চিঠির বাক্স থামিয়ে ও দৌড়ে চলে গেলো।সেদিন আমার মাথায় কিচ্ছু ঢোকেনি।আমি যাকে ভালোবাসি সে এতো সহজে এতো তাড়াতড়ি আমার হবে নিজের কাছেই কল্পনা মনে হয়েছিলো।পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম ও আমার ওর দিকে তাকিয়ে থাকা লক্ষ করতো, আমার থেকে বেশী ও আমার কর্মকান্ড চুপ করে করে শুনত।ওদের কাচের জানালার এপাশ থেকে আমি ওকে দেখতাম ঠিকই তবে ও আমাকে দেখছে এটা কোনোদিনও বুঝতে পারিমি।নীরা ওর বন্ধুদের দিয়ে আমার খোজ খবর নেয়ায়।আমি আবার দুষ্টু হলেও সবার সাথে সম্পর্ক ভালো রেখেছিলাম।
দাঁড়োয়ান,পিয়ন থেকে শুরু করে স্যার ম্যাডাম রা সবাই আমাকে পছন্দ করতো।স্যাররা পছন্দ করতো ভালো ছাত্র হিসেবে নয় বরং ভালো ডাকপিয়ন হিসেবে।স্যারদের সব চিঠিপত্র আমাকে দিয়েই তো রুমপা ম্যাডামের কাছে পাঠাতো।রুমপা ম্যডাম ছিলো আমাদের পুরো স্কুলের মধ্যে সবচাইতে সুন্দরী ম্যডাম।অবিবাহিত থেকে সংসারের বোঝা টানতেই স্কুলের চাকরীটা নিয়েছিলেন।আমি ছাড়া রুপমা ম্যাডামের আবার কাছের মানুষ খুব কমই ছিলো।আমি যে তার কাজের মানুষ ছিলাম, তার সব কাজকর্মে সাযাহ্য করতাম,ক্লাসেও গান শোনাতাম ফাযলামো করতাম।এইজন্যেই তিনি আবার আমাকে চিঠিপত্র পাঠালে তেমন কিছু বলতেন নাহ।তারও বিয়ের ইচ্ছে ছিলো তবে সংসারে বাবা মা আর ছোট্ট ভাইয়ের পড়াশুনার জন্যে নাকী এখনো বিয়ে করেন নি।
সময় গুলো বড্ড মিস করি এখন।স্যারগুলোর হয়তো এতোদিনে বাচ্চাদের দায়িত্বেশীল বাবা হয়ে সংসারের দায়িত্ব সামলাচ্ছে কিংবা কেউ কেউ বুড়ো হয়ে ইজি চেয়ারে বসে উপন্যাসের পৃষ্টা ওল্টাচ্ছে,রুপমা ম্যাডামও হয়তো বিয়ে করে সুখেই সংসার করছে। নীরা সেবার আমার দুষ্টুমির থেকে ভালোমানুষির খবর নাকি বেশী পেয়েছিলো।এরপর থেকে সেও আমার দিক তাকিয়ে থাকত,আমার কথা ভাবত।ও ধীরে ধীরে আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলো।এরপর আর কি, শুরু হলো আমাদের প্রেম।
প্রেমের যত রকম সংজ্ঞা আছে তার সবটা পেরিয়ে আমি ভালোবাসা শুরু করলাম নীরাকে।প্রতিদিন যাওয়ার সময় একটা চিঠি মামার দোকানে ফেলে যেতাম ও নিয়ে যেতো,আবার ওর রাখা চিঠি আমি নিয়ে যেতাম।ফুসকাওয়ালা মামা সে সময় আমাদের প্রেমের অন্যতম মাধ্যম ছিলো।তার ফুসকার গাড়িটা আমাদের দু’জনের জন্যে ছিলো ডাকবাক্স।নীরা এই উপকারের জনে ওনাকে একবার তিন চারটে সার্ট আর লুঙ্গি, ওনার বাচ্চাদের জন্য কাপড় খেলনা, ওনার স্ত্রীর জন্যে শাড়ি কইনে দিয়েছিলো।সেবার এতকিছু পেয়ে তার মুখের হাসিটা দেখার মতো ছিলো।নীরা পারেও বটে।
একবার তো স্কুল পালিয়ে ঘুরতে যাওয়ার প্লান করলাম।তবে ওর বাবার দামী গাড়িটা মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ালো।ক্লাস শেষ না হতেই গেটে এসে দাঁড়িয়ে রইলো।আমরা প্লান করে একপাশে কাচ আমরা ভেঙে দিয়ে পালিয়েছিলাম।সেই সময় ওদের স্কুলে শুরু হলো তদন্ত, কে করেছে না করেছে।ওর ড্রাইভার আংকেল তো বেচারা বড্ড ভয় পেয়ে ওর বাবাকেও জানায় নি।আমি আর নীরা এদিকে দিব্যি ঘুরে বেড়িয়েছি।ওর বাবা সময় মতন বাড়ি না পৌছায় পরে ড্রাইভারকে অনেক গালাগাল করেছিলো নাকি।পড়ে নীরা ওনাকে বাঁচিয়ে দিয়ে অন্য কথা বলে কাটিয়ে দিয়েছে।বড্ড ভালো মেয়েটা।কারোর যন্ত্রণা নাকি ওর সহ্য হয়না। এভাবে আমাদের ভালোবাসা স্কুল জীবনের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে পৌছালো।এবারো ওর বাবা ওকে মেয়েদের কলেজে ভর্তি করায়।আমি বেচারা কি আর করি আমার স্কুলেই থাকলাম।নিজের স্কুল ছেড়ে অন্য কোথাও যাবার ইচ্ছা আমার ছিলোনাহ।অনেক বন্ধুরা ভিন্ন ভিন্ন কলেজে ভর্তি হয়েছে।আমার কাছের বন্ধুর মধ্যে দুই একজন ও গেছিলো।বাকী কয়েকজন থেকে গেছি।
নীরার বাবা কথা দিয়েছিলো এস এস সি তে ভালো করলে ওকে ফোন কিনে দিবে।ওর রেজাল্ট বরাবরই ভালো ছিলো।রেজাল্টের বিনিময়ে ও পেলো নতুন ফোন।আমাদের প্রেম এখন আরো একধাপ এগিয়ে।প্রতিদিন সারা রাত কথা, সারাদিন অকারণে চলে মেসেজিং।কলেজে উঠে একজন ভালো টিচারের কাছে ওর নতুন প্রাইভেট দেয়া হয়েছিলো।আমি বাসায় বাহানা করে ঘুরে ফিরে নীরার ওই সারের কাছেই পড়তে যাই।ছেলে মেয়েদের ব্যাচ যদিও আলাদা তবে ওর পড়া শেষ হওয়ার সাথেই আমার সময় শুরু হতো।
প্রতিদিন দেখা হতো এভাবেই।মাঝে মাঝে প্রাইভেট ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে যেতাম।ভার্সিটির ক্যম্পাস আবার ওর প্রিয় যায়গা ছিলো।কেননা ওর জীবনের বড় ইচ্ছে ও ওর বাবার মতো লেকচারার হবে,তবে ভার্সিটির।প্রতিবার ওকে ঘুরতে নিয়ে বেড়োলে ও বাহানা করবেই আগে ভার্সিটি যাবো তারপর অন্য কোথাও।আমিও ১ম পর্যায়ের প্রেমিক পুরুষ, প্রেমিকার মন রাখার দায়িত্ব শতভাগ পালন করি সবসময়। দেখতে দেখতে দু’বছর পেরোলো।কলেজের সময় শেষ করে আমরা ভার্সিটি জীবনের পদার্পণ করলাম।নীরা যেহেতু ভালো ছাত্রী আর ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে তাই ও ওর পছন্দ মতো ভার্সিটিতে ভর্তি হলো, আর আমিও ভর্তি হলাম একই ভার্সিটির অন্য একটা ডিপার্টমেন্টে।আমার রেজাল্ট একটু খারাপ থাকায়য় একটু খারাপ বিষয় পেয়েছিলাম।তবে নীরার সাথে একই ক্যাম্পাসে থাকবো বলে ওসবের তোয়াক্কা করিনি।
এতোদিনে আমরা অনেক বড় হয়েছে। নীরার সেই রোগা পাতলা হ্যাংলা অভ্র আজ মুখে দাঁড়ি নিয়ে পাঞ্জাবি পড়ে সেজেগুজে একদম পরিপাটি হয়ে ক্যাম্পাসের দিক রওয়ানা দিয়েছে।আজকে যে আমাদের ভালোবাসার পাঁচ বছর পুর্ণ হতে চললো।ফুলের দোকানে আধ ঘন্টার মতন দাঁড়িয়ে থেকে ফুলের তোরা সাজিয়েছি।বাহ দেখতে বেশ লাগছে ফুলগুলো।কতগুলো ফুল একসাথে সজিয়ে দিয়েছে, দেখতে বেশ ভালোই লাগছে।ও দু’দিন আগে ওর জন্য একটা আংটি কিনেছি।প্রতিবার ওকে ভিন্ন ভিন্ন গিফট দিলেও আংটি টা বিশেষ দিনে দেবো বলে আর দেয়াই হয়নি।
প্রতিবার ওর আংটি চাওয়ার সময় কখনো ঘাস বা কখনো ওর চুল কিংবা কখনো ওর ওরনার সুতো দিয়ে আংটি বানিয়ে পড়িয়েছি।আজকে সত্যিকারের আংটি পড়িয়ে ওকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে চাইবো।ওকে দেয়ার জন্যে চিঠিও লিখেছি একটা।গত কয়েক বছরে এই মোবাইলের বদৌলতে চিঠিতে অনুভুতি বলার সুযোগ টা পাওয়া হয়নি।তাই এবারকার দিনটাকে ওর জীবনের সেরা দিন বানাবো বলে এত্তসব প্লান আমার।বন্ধুদের বলে কয়ে ভার্সিটির একপাশে ওদের দিয়ে বেলুন ফুল দিয়ে সাজিয়েছি।ওই যায়গাটা আজকে নীরার আর আমার জন্যে বরাদ্দ।ওখানে প্রবেশের অনুমতি কারোর নেই।কয়েকটা ছবিও পাঠিয়ে ওরা।গাছ গুলো কত্ত সুব্দর কঅরে সাজিয়েছি।যাক ওদেরকে এর জন্য বড়সর একটা ট্রিট দিতেই হবে।
আমি আজকে নীরার দেয়া নীল রঙের পাঞ্জাবিটা পড়েছি।বার বার সেটার দিকে তাকাচ্ছি আর নীরার কথা ভাবছি।নীরা দেখলে নিশ্চই নায়ক নায়ক বঅলে খিল্লি করবে।আর আমিও বলবো তাহলে নায়িকা খুজে দেও একটা।তারপর সাথে থাকেই ওর প্রতিবাদস্বরূপ কিলো ঘুষির স্বীকার হতে হবে। আমি নিশ্চিত ও হয়তো আজকে আমার দেয়া লাল শাড়িটাই পড়বে।লাল শাড়িটা কেনার সময় থেকে ওকে এটা পড়ে দেখতে কেমন লাগবে ভেবে ভেবে আমার সময় ফুরাচ্ছে নাহ, কতক্ষণে যে ওকে লাল শাড়ির টাতে দেখবো আর অন্তরটা একটু শান্তি পাবে। দূর থেকে মুখে টর্চলাইটের আলো পড়ছে।একজন বয়স্ক রোগা পাতলা লোক।বড় বড় মোচ,মাথার উপরে ছাতা ধরে আর হাতের টর্চলাইটের আলোটা আমার দিকে ফেলতে ফেলতে এগিয়ে আসছে,,,
-এই যে শোনছেন?কেডা আপনে?এতো রাইতে এইহানে কি?
-(লোকটা সময় পেলো না আসার আর।নিজের স্মৃতি গুলো একটু অনুভব করছিলাম আর ওনার এখনি আসতে হয়)জ্বী চাচা বলেন?
-তা বাপজান, এইহানে কি করেন এতো রইতে?
-কি আর করবো চাচা বাড়ি যাচ্ছিলাম বৃষ্টিটা বেশী হয়ে গেছে,আর আমার কাছে ছাতাও নাই তাই বসে আছি আরকি।
-তা আপনের বাড়ি কোনহানে?
-এইতো বয়েস কলেজটার পাশেই।
-এতো রাইতে একলা একলা আসমানের পানে দেইহা কি চিন্তা করেন বাপজান?
-(কিছুটা নড়ে বসে)আপনি কি এখানকার সিকুরিটি গার্ড?
-হ বাবা,কি করমু আর।তিনটা মাইয়া,পড়ালেহা করে। খরচপাতি মেল্লা লাগে।দিনে রিক্সা চালাই আর রাইতের বেলা এই দোকান পাহাড়া দেই।
-তা আপনে ঘুমান কখন?ঘুমেরও তো প্রয়োজন আছে চাচা।এই শরীরে বেশী ভাঁড় দিয়েন নাহ,যে রোগা পাতলা শরীর আপনার।
-ঘুমাই বাবা, সহালে ১২ টা পর্যেন্ত গাড়ি চালাই।তারপর রাস্তায় গাছের তলে গাড়িটা রাইখা একটু ঘুমায় লই।ঘুমান হইলে ফের গাড়ি টান দেই। তা বাবা তুমি থাকো এহেনে,আমি ওইপাশে একটু দেইক্ষা লই,চোর বাটপার ভইরা গেছে দেশটায়।তুমি সাবধানে থাইকো বাবা,বৃষ্টি কমার সাত সাত চইলা যাইয়ো।এলাকাটা বেশী ভালা নাহ।আর কুকুর গুলা আবার অচেনা লোকদের দেখলে কাপড় টামড় দেতে পারে।
-ঠিক আছে চাচা।আমি বৃষ্টি কমলেই চলে যাবো। লোকটা না বড্ড সহজ সরল।এই শরীরে যে এতো খাটাখাটনি করে ভাবা যায়নাহ।বাবার মূল্য টা কি আর কতটুকু কষ্ট সহ্য করে একজন বাবা তা এই লোকটাকে দেখে শেখা উচিৎ।
বৃষ্টিটা কমলো মনে হচ্ছে।যাই বাড়ির দিকে যাই।এই মাঝরাতে কুকুরের তাড়া খাওয়া কিংবা ডাকাতের খপ্পরে পড়ার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই।বেঞ্চ টা আগের মত উলটো করে রাখলাম, সাইকেলটা নিয়ে তাড়াতড়িই করেই যায়গাটা পার হলাম।যদিও এখনো হালকা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে, এতে শরীর ভেজার কথা নয় তবে জলদি বাসায় যেতে হবে।
বাসায় আসতে আসতে আধভেজা সার্টটা খুলে রশিতে ঝুলিয়ে দিলাম।বাসার সবাই জানে আমি কোথায় গিয়েছিলাম তাই এতোরাতে আসলেও কিচ্ছু বলবে নাহ কেউ।ভেজা কাপড় পালটে এসে শুয়ে পড়লাম।টেবিলের ওপর থেকে চিঠি আর আংটিটা হাতে নিয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছি। সেদিন আমি যাওয়ার পর দেখলাম নীরা আমার সাজানো যয়গাটায় নাই।বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলাম কেউ কিচ্ছু বলেনা।মাথা বড্ড গরম হয়ে গেলো সাথে টেনশন ও হচ্ছে।
ওর একজন বান্ধবীকে ফোন দিয়ে শুনতে পাই নীরার এক্সিডেন্ট হয়েছে।কোনোমতে নিঃশ্বাসটা ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দৌড়ে হাসপাতালের দিক গেলাম।হাসপাতালে যা দেখছি তার জন্যে আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম নাহ। নীরা সুন্দর করে লাল শাড়ি পড়েছে,কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ। খোপায় কি সুন্দর করে সাদা ফুল গুলো সাজিয়েছে।তাকে দেখতে তো মন্দ লাগছে না,তবে সবাই ওর শরীরে অতোসোব যন্ত্রের তার ওতো ক্লীপ প্রবেশ করাচ্ছে কেনো?এতো সুন্দর করে সাজানো সাদা ফুলগুলো ওর রক্তে লাল হয়েছে তাই বলে কি অগুলো ওর খোপা থেকে খুলে ফেলতে হবে?ওর খোপায় হাত দেয়ার অধিকার এই সাদা ফতুয়া পরা লোকদের কে দিয়েছে? নীরা?ও নীরা?কি হয়েছে তোমার?নীরা আমি এসে গেছি তো।আজকে না আমাদের ভালোবাসার জন্মদিন, তুমি আমাকে একা রেখে এখানে এসে কেনো শুয়ে আছো?
আমার আইসিইউর দরজার ছোট কাচের এপাশে চিল্লাপাল্লা করতে দেখে নীরার বাবা মা আমাকে সরিয়ে দিলেন।আমি নিজের সব চিন্তার ভাড় সামলাতে না পেরে আইসিইউ এর সামনের ফ্লোরে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। চোখ খোলার পর দৌড়ে নীরার কাছে গেলাম।সেদিন ওরা আমাকে একবারের জন্যেও নীরার কাছে যেতে দেয়নি।দূর থেকেই নীরার শরীরটা ওই সাদা বিছানায় কাতরাতে দেখিতে হয়েছে।আমার নীরার সাথে ওরা আমাকে একটু কথা বলতে অবদি দেয়নি। নীরার জোড়ে জোড়ে নিশ্বাসের শব্দ আমার কান পর্যন্ত আসছিলো।আমি দৌড়ে ডাক্তারকে ডেকে আনলাম।কি জানি হাত দেখলো, দেখে বললো নীরা নেই!মানে কি?এইতো নীরা সুয়ে আছে।নীরা নেই মানে?কি বলতে চান আপনি? বাবা একটু সান্ত হও এদিকে আসো।(নীরার বাবা)
-কি শান্ত হবো?নীরা নাই মানে আমার নীরা এখানেই আছে?এইতো আমি ওকে দেখছি।
নীরা? ও নীরা কথা বলো?দেখো তোমার অভ্র তোমার জন্য কি নিয়ে এসেছে।তুমি না বার বার বলতে,তোমার সত্যিকারের অংটি দেবার সময়টা কবে আসবে?দেখো আজকে কোনো ঘাসের আংটি আনিনি, তোমার জন্য সত্যিকারের আংটি এনেছি, ওঠো না দেখো!ও হ্যা সেই ক্লাস ফাকি দিয়ে তোমাকে কত চিঠি লিখতাম নাহ,তারপর তো আর লেখার সময় পাইনাই।আজকে দেখো কত্ত আবেগ দিয়ে চিঠি লিখে এনেছি।তুমি পড়বে না নীরা ওঠোনা!
তুমি আমার সাথে ঘুরি ওরাতে চেয়েছিলে না?আমিতো তোমার জন্যে কত্তগুলো রং বেরঙের ঘুরি কিনে রেখেছি।তুমি আমার সাথে ঘুড়ি না উড়িয়ে নিজেই উড়ে চলে গেলে নীরা?তুমি না কারোর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারতে নাহ,আজকে তোমার সামনে যন্ত্রণায় তোমার অভ্র কাঁদছে তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না? সেদিন কাঁদতে কাঁদতে আমি আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম।চোখ খুলে নীরার কাছে গিয়ে দেখি নীরা ওই বিছানায় আর নাই।জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ওর পয়ারিবাররা নাকি নীরাকে বাড়িতে নিয়ে গেছে।আমিও তাড়াহুড়া করে ওদের বাসার দিকে রওনা দিলাম।
গিয়ে দেখি বাসার সবাই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।কাঁদবে নাই বা কেনো নীরা যে ওদের একমাত্র সন্তান।এজন্যেই তো ওর বাবার কাছে জেদ করে আমার সাথে সম্পর্কটাকে বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে যেতে রাজি করিয়েছিলো।এতক্ষণে আমি সবটা বুঝতে পারছি।চুপ করে একপাশে বসে কাঁদছিলাম।নীরার শেষ গোসলের পর আমাকে একবার দেখতে দিয়েছিলো।কি মায়াবী দেখা যাচ্ছিলো ওর চেহারাটা।কালো সুরমায় ওর কালো চোখ আর সাদা কর্পুরে ওর লালচে চেহারাটা এখনো আমার চোখে ভাসলে চোখের কোণে পানি চলি আসে।নিজে সামলে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে নাহ।
আজকে নীরার জন্মদিন।নীরাকে হারানোর এই এক বৎসর কিভাবে কাটিয়েছি আর আমি কতটা পরিবর্তন হয়েছি কতটা শক্ত করে নিজেকে আগলে রেখেছি তা বোঝানো সম্ভব নয়।
প্রতিবারের মত আজকেও রাত বারোটার পর ফুল নিয়ে নীরাকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলাম আজ।নীরার অভ্যেস ছিলো আমি ওকে কিছু দিলে ও আমাকে রিটার্ন গিফট দিতো।এবার পরিবর্তন শুধু নীরার পক্ষ থেকে এবার আর আমার কাছে রিটার্ন গিফট কিছু আসেনি। লাল বাক্সটাতে রাখা নীরার চিঠি আর আংটিটা প্রতিবার ওর কাছে যওয়ার সময় নিয়ে যাই।ও যেনো বুঝতে পারে আমি এখনো নীরার হয়েই আছি,এখনো ওকেই ভালোবাসি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত