বিসর্জন

বিসর্জন
সানজানা বেলকোনিতে বসে তার মায়ের সাথে কথা বলছে। ঈদের আর মাত্র ২ দিন বাকি। আমি ওর পেছনে দাড়িয়ে আছি। মা আর মেয়ের কথোপকথন শুনছি। বুঝতে পারছি গলাটা ধরে আসছে সানজানার। আমার উপস্থিতি টের পেয়েছে সে। চোখজোড়া হাত দিয়ে মুছে নিলো সে। কাপা কাপা গলায় বললো,আম্মু রাখি তাহলে। বলেই ফোনটা রেখে দিলো সে। আমি পেছন দিক থেকে ওকে জড়িয়ে ধরি। সানজানা চুপ করে আছে। আমাকে অনুভব করছে নাকি কোন এক চাপা কষ্টকে আলিঙ্গন করছে তা আমি বুঝতে পারছিনা। সানজানা মায়ের সাথে কথা বলছিলে বুঝি? মায়ের কিছু হয়েছে? শরীর খারাপ? নাকি বাবার কিছু হয়েছে? সানজানা স্পস্টবাদী। হাসিমাখা মুখে বললো আরে না। কি বলো এসব। কারো কিছু হয়নি। এরই মধ্যে মায়ের ডাক পড়েছে। দৌড়ে গেল মেয়েটা। আমার মা যা বলে সবটাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সানজানা।
মা তাকে বাড়ীর সব কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। শোন বউমা আমার মেয়ে জামাই আসবে,তারপর বড় বউমার মায়ের বাড়ীর লোকজন আসবে। রান্নাটা যেন ভালো হয়। আর ঢাকা থেকে তোমার দেবর মাহিন আসবে। সারা বাড়িতে লোকজন থাকবে সবার সাথে ঠিকমত কথা বলো। আর ক্লান্তি আসলেও যেন কেউ বুঝতে না পারে। জ্বী মা সব মনে থাকবে। আমি রুম থেকেই সব শুনতে পেলাম। সারাটা দিন কাজ করে সানজানা। বিয়ের মাত্র দুইটা বছর হলো। এরই মধ্যে মেয়েটা কেমন শুকিয়ে গেছে। রাতে খেয়ে রুমে আসতেই দেখলাম সানজানা ঘুমিয়ে পড়েছে। ওর চোখদুটো ছলছল করছে। আচ্ছা মানুষ কষ্ট পেলে কি ঘুমের মধ্যেও কাদে? আমি জানিনা। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। হঠাৎ জেগে উঠলো ও। সরি রোহান আমার শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছিলো তো কখন ঘুমিয়ে গিয়েছি বুঝতে পারিনি। আমি জানি সানজানা এই বাড়ীতে এই মুহূর্তে বন্দী পাখির মত আছে। বাবা মায়ের একটা মাত্র মেয়ে।
বিয়ের পর থেকে খুব একটা বাবার বাসায় যাওয়া হয়না ওর। রোহান আমি তোমার বুকের মধ্যে মাথাটা রাখি? আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিবে?আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আর ও ঘুমাচ্ছে। ইশ কেমন হয়ে গেছে চেহারাটা।সারাটা দিন গাধার খাটুনি। ওদিকে বড় ভাবী একটুও কাজ করতে চায়না। কত বার বলি কে শোনে কার কথা। মায়ের উপর কোন কথা বলতে পারিনা আমি। সানজানা ঘুমিয়ে পড়েছে ততক্ষনে।আস্তে আস্তে বেড থেকে উঠলাম। মায়ের ঘরে নক করলাম,মা আসবো একটু। বাবা রুমে বসে পত্রিকা পড়ছেন। বাবাই বলে উঠলেন,রোহান হ্যারে বাবা আয়। গিয়ে বসি মায়ের পাশে। মা আমি কিছু কথা বলতে চায়। হ্যা বল রোহান কি বলবি।
মা আমি বলছিলাম কি এবার ঈদে সানজানাকে তার মায়ের বাসায় পাঠালে হতো না। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। আমাকে কিছু বলতেও পারছেনা। চুপচাপ শুধু চোখের জল ফেলে। মা আমার দিকে রাগী চোখ নিয়ে তাকালেন। ছোটবেলা থেকে মাকে ভীষন ভয় পায়। কিন্তু আজ ভয় পেলে চলবেনা।আমাকে বলতে হবে। মা দেখ,তোমারও তো মেয়ে আছে। ভেবে দেখ তোমার মেয়ে তোমাদের সাথে ঈদ করতে আসবেনা।
তোমার মেয়ের বাড়ির লোক তাকে আসতে দিচ্ছেনা। কেমন লাগবে তোমার? তোমার তো তিন ছেলে, দুুই মেয়ে। কেউ একজন পাশে না থাকলে তোমার কষ্ট হয় মা। আর সানজানা বাবা,মা বৃদ্ধ। দেখারও কেউ নেই। সারাটাদিন বাসার কাজ করে,অক্লান্ত খাটুনির পর আমার দিকে চেয়ে থাকে মা। ওর অসহায়ত্ব চোখের দিকে আমি তাকাতে পারিনা মা। স্বামী হয়ে আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব না মা। ও আমাকে মুখ ফুটে কিচ্ছু বলেনা। কিন্তু চোখের ভাষা আমি বুঝি। মা দরকার পড়লে কাল থেকে বাসার সব কাজ আমি করবো। থালা বাসন পরিষ্কার থেকে শুরু করে সব আমি করে দেব। তবু তুমি সানজানাকে তার বাবার বাসায় যাওয়ার অনুমতি দাও। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি কাদছেন। আমাকে বুকে নিয়ে বললেন,আমি বুঝতে পারিনিরে বাবা। তুই সকাল হলেই বউমাকে বাবার বাসায় যাওয়ার ব্যবস্থা করবি। আমি মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি।
সকাল সকাল সানজানার ব্যাগ গোছাতে লাগলাম। কি ব্যাপার রোহান ব্যাগ গোচাচ্ছো যে। কোথাও যাবে নাকি। আমি একগাল হেসে বললাম,চাদের দেশে। খারাপ বলিনি নিশ্চয়। প্রত্যেক মেয়ের কাছেই তার বাবার বাড়ী চাদের দেশ। এই রোহান, তুই ও সবকিছু গুছিয়ে নে তো বাবা। এবার শ্বশুর বাড়ী গিয়ে এক সপ্তাহ থেকে আসবি। পাশ থেকে বললেন আমার মা। আমি বলি,মা তুমি কি বলছো আমিও যাবো? হ্যারে বাবা বউমার সাথে তুইও যাবি। তার বাবা মায়ের সাথে এবারের ঈদটা উদযাপন করবি। মা সানজানার হাতে হাজার দুয়েক টাকা গুজে কপালে চুমু দিয়ে বললেন সাবধানে থেকো বউমা। তোমার বাবা মাকে আমার সালাম দিও। সানজানা আমার কাছে চুপটি করে এসে বললো,রোহান আমি কি ঘোরের মধ্যে আছি। আমি ওর হাতে চিমটি দিই।
ওহু,,বলেই চিৎকার। সোজা পৌছে গেলাম শ্বশুর বাড়ির দরজায়। কলিং বেল দিতেই শ্বাশুরী দরজা খুলে দিলেন। কিরে মা তুই। হ্যা মা এবার ঈদ তোমাদের সাথেই করবো। তোমার জামাইও এসেছে। আমি সালাম করে এগিয়ে গেলাম। শ্বশুর মশাই সানজানাকে দেখেই বুকের মধ্যে পুরে নিলেন। কেন জানি সজোরে কাদছেন তিনি। আমি বুঝতে পারছি এ কান্না মেয়েকে কাছে পাওয়ার আনন্দের কান্না। মা বাবা আর মেয়ে মিলে চলছে খুশির অশ্রু বিসর্জন। আমি পাশের রুমে গিয়ে বসি। দেওয়ালে টানানো একটা ছবি। বেশ পুরোনো। সানজানা আর ওর বাবা মা। একসাথে। সানজানা ঠিক মাঝখানে। মেয়েদের জীবনটায় কি কঠিন তাইনা! একসময় চেনা জানা আপন মানুষগুলোকে ছেড়ে পাড়ি দিতে হয় অচেনা একটা জায়গায়।একদিকে বাবা মা মেয়ের জন্য চোখ ভেজায় অন্যদিকে মেয়ে বাবা মায়ের মায়ের জন্য।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত