ছেলেটির মনে কোনো পাপ ছিল না

ছেলেটির মনে কোনো পাপ ছিল না
ছেলেটার সাথে প্রথম আমার দেখা হয় একটা পাঞ্জাবীর শো-রুমে।আমি পাঞ্জাবীর শো-রুমে গিয়েছিলাম ভাইয়ের জন্য একটা পাঞ্জাবী কিনতে।ছেলেটাকে আমি খেয়াল করিনি,যখন পাঞ্জাবী কিনে বেরিয়ে আসছিলাম, তখন ছেলেটা বলল,”আপু আমাকে একটা পাঞ্জাবী কিনে দিবেন?
“পিছন ফিরে দেখলাম ২১-২২ বছরের একটি যুবক।আমি ছেলেটির দিকে ভ্রুকুটি করে তাকালাম।কারণ ছেলেটার কথা শুনে আমি ভারী অবাক হই,বুঝতে পারছিলাম না একটা অপরিচিত মানুষকে পাঞ্জাবী কিনে দিতে বলছে কেন!ছেলেটা তখন একটা সরল হাসি দিয়ে বলল,”আপু আসলে আমি পাঞ্জাবী পছন্দ করতে পারি না,এতদিন ও সাথে করে নিয়ে এসে পাঞ্জাবী কিনে দিত।” বুঝতে পেরে আমি বললাম,”আজ ওনি আসেননি?” “নাহ,আগামী সপ্তাহে ওর বিয়ে তাই আসতে পারেনি।” “যাকে বিয়ে করছেন,তাকে সঙ্গে নিয়ে এসে কেনাকাটা করাই যায়।” ছেলেটা আবারও একটা সরল হাসি দিয়ে বলল,”বিয়ে ত আমার সাথে না,অন্যজনের সাথে হচ্ছে। ” এবার ছেলেটার কথা শুনে ছেলেটাকে একটু বোকা মনে হল।একজন অপরিচিত মানুষের সাথে কত সহজে ব্যক্তিগত কথা শেয়ার করছে।আমারও একটু কৌতূহল হল,সবকিছু জানার। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে পাঞ্জাবী কিনে কী হবে?”
“ও বলেছে আগামীকাল আমার সাথে দেখা করবে,আমি যেন পাঞ্জাবী পরে যাই সেটা বলে দিয়েছে।আর যদি কখনো আমাদের দেখা করার সুযোগ না আসে!” ছেলেটার কথা শুনে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিলনা ছেলেটা যে সত্যি সহজ-সরল আর প্রচন্ড বোকা। আমি জিজ্ঞেস করলাম “আপনার কষ্ট হচ্ছে না,ভালবাসার মানুষের অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাচ্ছে?” “নাহ আমি ত এখনও বেকার,ওরে বিয়ে করার মত সামর্থ্য ত আমার নেই।আর ও বলেছে বিয়ের পরেও আমাকে এখনকার মত ভালবাসবে।আর আমি ত চাই ও সুখে থাকুক।ও ভাল থাকলেই ত আমি ভাল থাকব। ওর যে হবু বর তার সাথে আমি কথা বলেছি,সেও অনেক ভাল।ঊর্মিকে ও খুব ভাল রাখবে আমায় বলেছে।ঊর্মির ভাল থাকাটাই আমার সব।ঊর্মির বাবাও খুব অসুস্থ, তাই ওর বিয়েটা করে নিতে হচ্ছে।ও বলেছে তা না হলে আমার জব পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতো। এখন ত আর ওর হাতে কোন অপশন নেই।”
আমি জানতে চাইলাম ঊর্মির সবথেকে অপছন্দের রঙ কী।ছেলেটা বলল লাল।তখন আমি বললাম আপনে এক কাজ করুন,একটা লাল পাঞ্জাবী নিয়ে যান। “এমা আপনে একি বলছেন,এতে ও খুব কষ্ট পাবে,৬ মাসের সম্পর্কের মধ্যে আমি ওর যা অপছন্দ এমন কিছু করিনি।আর আগামীকাল ওর সাথে আমার শেষ দেখা।ওর খারাপ লাগবে এমন কিছু ত করা যায় না।” “আমি ছেলেটাকে বুঝালাম, আপনে যদি আগামীকাল ওনার পছন্দমত সবকিছু করেন,তাহলে ত সে আপনাকেই ভুলতে পারবে না,তাহলে নতুন জীবনে সে সুখী কী করে হবে?তাদের পারিবারিক অশান্তি হবে,ওনার হাজবেন্ডের সাথে সম্পর্ক ভাল যাবে না।তখন ত আর ঊর্মি সুখে থাকবে না।” ছেলেটা আমার কথা শুনে কিছু সময় নীরব থেকে একটা লাল পাঞ্জাবি নিল,আমিই পছন্দ করে দিয়েছি, একবারে কটকটে লাল না,মেরুন।ছেলেটা যাওয়ার আগে নম্বর দিয়ে গিয়েছে ইচ্ছে করেই।
আমার রাতে শুয়ে শুয়ে কেন যেন মেয়েটার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হল।কিছু না ভেবেই ছেলেটাকে ফোন করে মেয়েটার নম্বর নিলাম।কোন কিছু চিন্তা না করেই মেয়েটাকে ফোন করি।প্রথম বারে রিসিভ হয়নি,তবে দ্বিতীয় বারে হয়েছে। মেয়েটা খুব সুন্দর করে সালাম দিল।আমি আমার পরিচয় আর ঘটনাটা খুলে বললাম। মেয়েটা যা বলল,তাতে আমি বিস্মিত হলাম। মেয়েটা বলল,”সত্যি বলতে আপু তুর্য আমার ভার্সিটির জুনিয়র। আমি যখন নিউ থার্ড ইয়ারে তখন ও প্রথম বর্ষে একই ডিপার্টমেন্টে।ঐ সুবাদে বড় আপু হিসেবে পরিচয়।মাঝেমধ্যে পুরাতন নোট দিয়ে সাহায্য করতাম,সিলেবাস ঠিকমত বুঝিয়ে দিতাম।তুর্য খুব লাজুক টাইপের ছেলে,আমার সামনে এসে তেমন কথা বলত না।ওর সাথে কথা বলার পরে বুঝেছিলাম,ও শুধু লাজুক না একটু বোকা।অবশ্য ছেলেটাকে বোকা বলা যায় না আবার যায়ও,তবে খুবই সহজ-সরল।
হঠাৎ একদিন ফোন দিয়ে বলল,”আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই,কিন্তু আপনে রাগ করতে পারবেন না।তখন আমি বললাম ঠিক আছে করব না।ও আমাকে যেটা বলল, এটা বলবে আমি ভাবিনি।ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,আমি আপনাকে খুব ভালবাসি।আপনে যদি রিজেক্ট করেন তাহলে হয়ত আর পৃথিবীতে বেঁচে থাকা হবে না।বিশ্বাস না হলে ভিডিও কল করছি,দেখেন।ভিডিও কল দেওয়ার পরে আমি অবাক হলাম,ওর হাতে তিন পাতা স্লিপিং পিল!দরজা-জানালা সব বন্ধ। এই টাইপের সরল মানুষ নিয়ে খুব মুশকিল,আবেগের বশে সবকিছু করে ফেলতে পারে।তাই কিছুক্ষণ চিন্তা করে হ্যাঁ বলি,আমি চাইনি আমার জন্য অকালে একটা জীবন ঝরে যাক।আমার নিজের উপর বিশ্বাস ছিল যে আমি ওরে আদর,স্নেহ দিয়ে ঠিক করে দিতে পারব।আমার অনেক আগেই বিয়ে ঠিক হয়েছিল,যেটা আমি কাউকে জানাইনি।
এমনকি তুর্যও জানত না,ওরে আমি ছোট ভাইয়ের মতই দেখি। যার সাথে আমার আগামী সপ্তাহে বিয়ে তার সাথে আমার সম্পর্ক প্রায় ৭ বছর,সম্পর্কে ফুফাতো ভাই হয়। ওর অনুমতি নিয়েই তুর্য যাতে নিজের কোন ক্ষতি না করে সেজন্য এভাবে কথা বলতে হয়েছে। এখন তুর্যও আমার কথা মেনে নিয়েছে,এটা কেবল সম্ভব হয়েছে আমার আদর আর স্নেহের কারণে।ওরে আমি সবসময় ছোট ভাইয়ের মতই দেখেছি।আমি জানতাম আমি এটা পারব।” মেয়েটার কথা শুনে কিছুতেই মেয়েটাকে দোষ দেয়া যায় না।মেয়েটাকে দেখার লোভ হচ্ছিল খুব।আমি মেয়েটাকে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিয়ে বলি একটা ছবি পাঠাতে।মেয়েটা আমাকে পরেরদিন একটা ছবি পাঠায়।মেয়েটা দেখতে অসম্ভব রকমের সুন্দর। এক কথায় যে কোন ছেলে এই মেয়ের প্রেমে পড়তে বাধ্য।
সময়ের সাথে সাথে এসব আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার পরে এই ঘটনা নিয়ে কখনো আর ভাববার অবকাশ পাইনি।কিন্তু ওদের সাথে আমার আবারও দেখা হয় ৪ বছর পরে।ততদিনে আমি ছেলেটার মুখ ভুলে গিয়েছি।ছেলেটা যখন সামনে এসে বলল,আপু কেমন আছেন?তখন আমি একটু অবাক হয়েই তাকাই।ছেলেটা তখন আমাকে সব মনে করিয়ে দিল।চার বছর পরেও ছেলেটার ঠোঁটে সরল হাসি আর চোখে-মুখে সহজ-সরল ভাবটা ফুটে আছে।একটুও পরিবর্তন হয়নি।ছেলেটা রাস্তার ঐপাড়ে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে তাকে দেখিয়ে বলল,”আপু আপনে কী অনুমান করতে পারবেন ঐ মেয়েটি কে?”
লক্ষ্য করে দেখলাম খুব সুন্দর একটা সিল্কের শাড়ী পরা মেয়ে একটা দুই আড়াই বছরের মেয়ে বাচ্চার হাত ধরে আছে।আমি হেসে বললাম,”বিয়ে করেছেন কবে?” “এইত ৭ মাস হয়।” আমি এই কথা শুনে বেশ অবাক হলাম বিয়ে হয়েছে সাত মাস আর সেখানে দুই আড়াই বছরের বাচ্চা কী করে সম্ভব। আমি প্রশ্ন করলাম, “সাথের বাচ্চাটা কে হয় আপনার?” বলল ও আমাদের মেয়ে সিনহা। ছেলেটা তখন বলল,”আপু ও ঊর্মি,ওর বিয়ের ৩ বছরের মাথায় ওর স্বামী বিমান দূর্ঘটনায় মারা যায়।এটা জানার পরে আমি ওরে আমার কাছে নিয়ে আসি।কারণ এখন ত আমার সামর্থ্য আছে ওরে ভাল রাখার,তাহলে ও খারাপ থাকবে কেন!ও প্রথম দিকে কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না।একটা সময় আমার পাগলামীর কাছে হার মানে,আর এখন আমরা একসাথে আছি।”
“আপনার পরিবার মেনে নিল?”
“পরিবার বলতে শুধু মা,প্রথম দিকে মায়ের একটু খারাপ লেগেছিল।পরে ঊর্মিকে দেখে সব মেনে নিয়েছেন।”
ছেলেটার সহজ স্বীকারোক্তি আমাকে মুগ্ধ করে। মেয়েটার সাথে কথা বলি।মেয়েটা শুধু বলল,”শেষ পর্যন্ত আর ওর পাগলামির সাথে পেরে ওঠিনি।” একটা মানুষ বিশ্ব জয় করার পরে যতটা আত্মতৃপ্তি পায়,ছেলেটার চোখেমুখেও আমি সেইটা ই দেখতে পেলাম। আমি কিছুই বলিনি,শুধু বিনিময়ে একটা হাসি দিয়ে চলে এসেছিলাম।জীবনে কখনো কখনো এমন একজন পাগল খুব প্রয়োজন, যে বিপদের দিনে এসে হাত ধরবে।হোকনা একটু বোকা,সহজ-সরল তাতে কী!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত