আবুল ইসহাক এবং ফেরেশতা

বউটাকে মেরেও শামিত্ম পায় না আবুল ইসহাক। জীবনে এই প্রথম সে বউয়ের গায়ে হাত তুলেছে। সাত বছরে প্রথম। কারণ কী? জরিনার অপরাধ কী? সে কি আর কারো সঙ্গে প্রেম করছে, না আর কারো বিছানায় ঘুমিয়েছে? না, সেসব কারণ নয়। কারণ আরো গূঢ়তর। কারণ জরিনা আবুল ইসহাকের কোয়ার্টার অফ এ মিলিয়ন পাউন্ড ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধুতে দিয়ে ধুয়ে ফেলেছে। কেমন করে? অন্যদিনের মতো সেদিন লটারির টিকিট কেটে আবুল ইসহাক প্যান্টের পকেটে রেখেছিল। পরে ও টিকিট সে ছোট টেবিলের ড্রয়ারে রাখে। প্রায় দশ বছর হলো একই নম্বরের টিকিট কাটে ও। ১০ ১৭ ২১ ২৫ ৪০ ৫০। দশ তারিখে ওর জন্ম। সতেরো তারিখে জরিনার। একুশ তারিখে ওরা বিয়ে করেছে। এখন জরিনার বয়স পঁচিশ। ওর নিজের বয়স ছত্রিশ হলেও ওর আশা চলিস্নশ পেরোতে না পেরোতে ও লটারি জিতে ফেলবে। ত্রিশ বছর বয়সে ও এই নম্বর দিয়ে খেলা শুরম্ন করেছে। এখন ওর বয়স চলিস্নশের কাছাকাছি। ওর বিশ্বাস এখনই ও লটারি জিতবে এবং যখন ওর বয়স পঞ্চাশ হবে ওদের টাকা-পয়সার আর কোনো চিমত্মা থাকবে না। একজন গণক বলেছিলেন – চলিস্নশ বছর বয়সে আপনার অর্থপ্রাপ্তির যোগ আছে। তিনি আরো বলেছিলেন – আমার গণনা মিথ্যা হবে না, আপনি ওই বয়সে বেশকিছু টাকা পাবেন এবং যা দিয়ে আপনার বাকি জীবন বেশ ভালো চলবে। দুশো পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড পেলে বাকি জীবন খারাপ যাওয়ার কথা নয়। দেড়শো হাজারে একটা বাড়ি কিনবে। দুই কামরার সুন্দর ছোট বাড়ি। বাড়িটা ও আর জরিনা যখন হাঁটতে বেরোয় দেখেছে। সেল লেখা সেই বাড়ি। হানিসাকল রোডের শেষ মাথায়। প্রায় সেমি ডিটাচড একটি বাড়ি। সে-বাড়ি মাসখানেক খেটে একটি অসাধারণ বাড়িতে পরিণত করতে ওর সময় লাগার কথা নয়। বন্ধু রকিবুল ওকে সাহায্য করবে ও জানে। অতএব দুজনে গায়ে-গতরে খেটে বাড়িটার দাম বাড়িয়ে তিনশো হাজার করে ফেলবে এবং বাকি টাকা ব্যাংকে রেখে সুদ নেবে। না-হলে নিজে একটা ছোট ব্যবসা শুরম্ন করবে। সে-ব্যবসা ওর একার। সেখানে ও মালিক, চাকর সব। হিসাব তো ঠিকই ছিল। গণকের কথাও সত্যি হয়েছিল। কেবল লটারির টিকিটটা যদি জরিনা প্যান্ট ওয়াশিং মেশিনে দেওয়ার আগে পকেট থেকে বের করে নিত তাহলে সবই সত্যি হতো। দোষ যে জরিনার তাও নয়। ইসহাক সবসময় অজিফা শরিফের ভেতরে লটারির টিকিট রাখে। প্রথমে দোকান থেকে কিনে পকেটে রাখে তারপর অজিফা শরিফের ভেতর চালান করে। আর সেই অজিফা শরিফ থাকে একটি স্পেশাল ড্রয়ারে। যেখানে আতর, তসবিহ, আকিক পাথর এসব রাখে ও। মোটামুটি নামাজ-রোজায় একজন ভালো মুসলমান আবুল ইসহাক। খেটে খায় সারা বছর। একটা দোকানের কাজকাম দেখে। জিনিস বিক্রি করে। বিক্রির হিসাব রাখে। ট্রাক থেকে ভারী-ভারী মাল টেনে নামায়। দোকানি তাকে যে-বেতন দেয় তা দিয়ে চলে যায় মোটামুটি। জরিনা কিছু করে না। ইসহাক বলে – থাক, কী আর করবা? বাচ্চা নেই, কাচ্চা নেই। দুইটা মানুষ আমরা। আমার রোজগারেই চলবে। আর লন্ডনে কাজ করবার মতো পড়াশোনা বা বিদ্যাবুদ্ধি জরিনার নাই। ক্লাস নাইন পর্যমত্ম পড়াশোনা। কোনো একটা ফাক্টরিতে কাজ হয়তো পেতে পারে কিন্তু আবুল ইসহাক বলে – কী দরকার, বাড়িতেই থাকো। মা-বাবার একটি ছেলে আবু ইসহাক। ওদের কেউ আর নেই, দেশে পিছুটান বলতেও তেমন কেউ নেই। আবুল ইসহাক জরিনার চেহারা দেখেই বিয়ে করেছিল। বড়-বড় চোখ, মিষ্টি শ্যামলা মেয়ে। এখন সুস্থ-সবল এই দুটি মানুষ দাম্পত্যজীবনে ভালোই আছে। জরিনা বাড়ি গোছায়, ঘর গোছায়, রান্না করে, বাজার করে এবং নামাজ-রোজা এসবে বেশকিছু সময় ব্যয় করে। লন্ডনে জরিনার একজন মামা থাকেন। মার খেয়ে জরিনা এককাপড়ে সেখানে চলে গেছে। আবুল ইসহাক রাগ দেখিয়ে চিৎকার করে বলেছে – আর কোনোদিন এই বাড়িত আসবি না। অলক্ষ্মী মেয়েমানুষ। একটা ট্রাউজার মেশিনে দিতে পকেট দেখতে হয় সে জ্ঞানবুদ্ধিও তোর নাই? রেগে জরিনাকে এরপর কষে মার দিয়েছে। আর বলেছে – আজ থেকে এই বাড়ির দরজা তোর জন্য বন্ধ। মার খেয়ে কোনো কথা বলেনি জরিনা। সেও কি এই খবরে কষ্ট পায়নি? তারও কি এমন ঘটনায় প্রচ- জ্বালা-যন্ত্রণা হচ্ছে না? মার তো সেই জায়গায় কিছুই না। তবু সে কাঁদতে-কাঁদতে বলেছে – ঠিক আছে। আর আসব না।

মামাবাড়ি যাওয়ার ৩৬ নম্বর বাসে চেপে সে রওনা দিয়েছে। ছোট একটা পার্সে দশ পাউন্ড এবং বাড়ির চাবি। এই নিয়ে চলে এসেছে ও। এক ঘরের কাউন্সিলের বাড়িতে ওরা থাকে। একটি ঘর, রান্নাঘর আর ব্যালকনি। যে-ব্যালকনিতে টবে সবুজ মরিচ, টমেটো ফলায় ও। সেই বাড়িটা যা ওরা দুজনেই দেখেছে এবং কিনতে চেয়েছিল, সে-বাড়ি হারানোর কষ্ট, বাকি টাকা হারানোর কষ্ট এত বেশি যদি শরীর কেটে নুন লাগিয়ে দিত আবু ইসহাকের তাতেও বোধকরি কিছুই যেত-আসত না। একটা সুন্দর নিজের বাড়ি! ইস ভাবতেও বুকটা কেমন ফুলে যায় আর এখন সেই বুক ওর ব্যথায় টনটন করছে। নিজের বাড়ি সাজাত, পেছনের বাগানে ফুল আর সবজির চাষ করত। কত কী যে হতো সেখানে ভাবছে আর চোখ মুছছে।
মামি বাঁকা চোখে দেখে বলেন – পুরম্নষ ভাগ্যে জন আর নারী ভাগ্যে ধন। তোর কপালে এত টাকা নাই। মামা বলেন – থাক থাক, তুমি আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিও না। তারপর বলেন – থাক, যতদিন জামাইর মাথা ঠিক না হয় থাক। তারপর তার কথা অনেকটা এরকম – হায়রে হায়রে দুশো পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড। ইস! মামা কপাল চাপড়াতে-চাপড়াতে চলে যান। জরিনা ক্লামত্ম-করম্নণ মুখে শুয়ে-শুয়ে মামার বাড়ির ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে সবসময় পকেট পরীক্ষা করে তারপর কাপড় ওয়াশিং মেশিনে দেয়। সেদিন কেন সে পকেট পরীক্ষা করেনি। তারপর বালিশে মুখ রেখে কাঁদতে থাকে।

আবুল ইসহাক সাতদিনের ছুটি নিয়েছে শোক সামলাতে। ছুটি তার পাওনা ছিল। দুজনে মিলে দেশে যেত তারা। একটা মসজিদে টাকা দান করে ফিরে আসত। তারপর বাকি জীবন কী আরাম।

দুজনে মিলে হজটাও সেরে ফেলত। গণক বলেছিল তাকে – হাতের রেখা বদলায়। তবে আপনার টাকাপ্রাপ্তির রেখা এত পরিষ্কার, মনে হয় না এটা কোনো কারণে বদলাবে। কেন বদলে গেল? কেন সে পেল না টাকা – এই কথা ভাবতে-ভাবতে আবুল ইসহাক প্রায় মাথা খারাপ করে ফেলল। সে এখানে-ওখানে ঘুরল। খেল কি খেল না, মনে করতেও পারে না। কেমন যেন ভোঁতা সবকিছু। কী হতো আজ আর কী হলো। বারবার হাত দেখে। হাতের রেখাগুলো ওর মুখস্থ। হৃদয়, জীবন, মসিত্মষ্ক, ভাগ্য। এর মধ্যে কোনটা যে টাকার রেখা ও ঠিক জানে না। তবে আছে কোথাও। না-হলে গণক এমন কথা বলবেন কেন? হঠাৎ বাসের শব্দে ও চোখ তোলে। কখন যে বাসে চেপে ট্রাফালগার স্কয়ারে এসেছিল মনে করতে পারে না। পায়রার ওড়াউড়ি দেখে। দেখে চারপাশের জনস্রোত। যে-যার মতো পথ চলছে, হাসছে, কথা বলছে, চুপ করে আছে। ও ভাবছে ওদের নিশ্চয় ওর মতো কষ্ট নেই। তারপর আবার ফিরে যায় পুরনো ভাবনায়। একসময় ভাবে ফিরে যাবে। কাল থেকে আবার কাজে যাবে ও। জরিনাকে আনার কোনো ইচ্ছা আছে মনে হয় না। মামা বলেছিলেন – বাবা, জরিনা এখানে আছে। ওর জন্য কোনো চিমত্মা করবা না। ও তো কখনো আসতেই চায় না। এখন যখন এসেছে থাক কিছুদিন। মামা-মামি দুজনেই কাজ করেন। অবস্থা ভালো।

না, জরিনার জন্য চিমত্মা করছে না। কেবল চোখের সামনে ভাসছে সে-বাড়িটা, একটা ছোট গাড়ি আর ব্যাংকের টাকার অঙ্ক। নিজের একটা ছোটখাটো ব্যবসা।

কতদিন আর মন খারাপ কইরা থাকবা। কাম-কাজ করো। মন ভালো করো। দোকানদার তাকে বলে। আবুল ইসহাক কথা বলে না, কাজে হাত লাগায়। ওর এই খবর কারা যেন আবার কাগজে দিয়েছে। – হাত ফসকে চলে গেল বড় মাছ। তারপর বেশ ফলিয়ে ওর লটারির টিকিট হারানোর গল্প লিখেছে। এখন বোধকরি লন্ডনের অনেকেই ওর নাম জানে।
ঠিক একমাস চলে গেছে। জরিনা এখনো মামার বাড়িতে। মামা জরিনার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল কেবল – আর কয়টা দিন থাক। মাথা ঠান্ডা হবে। যতদিন মন চায় থাক। জুলাই মাসের গরমে ও হাঁসের ডিমের মতো টপটপ বড় দিনে জরিনা সপ্তাহে দুটো রোজা করে। মামি কাজে যায়। ছেলে আর মেয়ে য়ুনিভার্সিটিতে। জরিনা ওদের জন্য রাঁধে। ওরা উপভোগ করে। কাজেই ওর যাওয়া নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। ছেলেটা মাঝে-মাঝে আসে। মামার মেয়েটা বাড়িতেই থাকে। চারঘরের বাড়িতে জরিনাও একটা ঘর পেয়ে যায়। সেদিন ও রোজা ছিল। তারপর মামার বাড়ির কার্পেটে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়তে-পড়তে জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়েছিল একসময়। লোবানের আতরের গন্ধ ওর চারপাশে। আর হালকা বাতিটা ঘরের ভেতরে একটা জোছনার মতো আলো এনে দিয়েছে। জরিনা এসবের ভেতর নামাজ পড়তে-পড়তে আর প্রার্থনা করতে-করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না।

হঠাৎ দেখে ওর শাশুড়ি খাটের একপাশে বসে আছেন। বলছেন – কেমন আছো গো জরি? আহারে, আমার পোলাডা ঠিকমতো খায় না, ঘুমায় না। কী করো তুমি এখানে। নিজের বাড়ি। চাবি তোমার হাতে। সোজা গিয়া হাত-পা ধইরা মাফ চাও। ও-ই তো তোমার ইহকাল-পরকালের মালিক। আবছা অন্ধকারে জরিনা শাশুড়িকে দেখছে। পাঁচ বছর হলো তিনি মৃত। শাশুড়ি আবার বলছেন, মনে আছেনি গো জরি, আমার বেড়ালটারে রম্নটি বানানোর বেলুন ছুইড়া মারছিলা। বেড়ালটা পরে মারা যায়। জানি, তুমি ইচ্ছা কইরা মারো নাই। কিন্তু বেড়ালের অভিশাপগো জরি। কতদিন এ-অভিশাপ থাকব কে জানে। তাই বড় মাছটা তোমার হাত ফসকাইয়া চইলা গেছে। তোমার কোলে সমত্মান আসে নাই। তুমি জানো না গো জরি আমার বেড়াল টুনি তখন পোয়াতি ছিল। কী করবা কও। দোষ তোমার না। এরপর শাশুড়ি চুপ করে থাকেন। খানিক পর বলেন, এখন আমার সময় হইছে তোমাদের সংসারে আসার। কেমনে আসি কও তো জরি? জরি মুখ দিয়ে কোনো শব্দ করতে পারে না। কেবল অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলতে চায় – মা গো আমি আপনার টুনিরে মারার জন্য বেলুন ছুড়ে মারিনি। কেবল আমি একটু ভয় দেখাইতে চাইছিলাম গো মা। আমি জানতাম না আপনার টুনি পোয়াতি। মা, মা, কেমন করে আমি অভিশাপমুক্ত হবো মা। জরিনা এইসব বলতে-বলতে বিছানায় উঠে বসে। কেউ নেই। সব অন্ধকার। মামার বাড়িতে এখন আর কোনো শব্দ নাই। জরিনা যখন সত্যিই জেগে ওঠে, কেউ নেই চারপাশে তখন। শাশুড়ির ছায়াও নেই। শাশুড়ি ওকে মেয়ের মতো ভালোবাসত। তাই কোনোদিন বউ বা বউমা না বলে ডেকেছে জরি বলে। বলে জরি – যেমন করে পারেন আপনি একবার আসেন মা। তারপর চেয়ে দেখে অন্ধকারের পাতলা জোছনা। ওপারের জগৎ থেকে মা কেমন করে আসতে পারে জরিনা ভাবতে থাকে। হয়তো ওপারের জগতে মাও ভাবছেন তিনি কেমন করে ওদের সংসারে আসবেন? জরিনা কী ভাবতে-ভাবতে ক্লামত্ম শরীরে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালবেলা যখন সূর্য ওঠেনি, যে-সময়টাকে বলে সুবেহসাদিক, ইসহাক দরজা খুলে বাইরে আসে। মনে হয় ওর মা ওর খুব কাছে বসেছিল। যে-মাঠটায় ও মাঝে-মাঝে হাঁটতে যায় সেদিকে যাবে বলে আলোছায়ায় হাঁটতে থাকে। কেউ নেই রাসত্মায়। ভোর পাঁচটায় কে থাকবে? সকলে আসে আটটার পরে। যারা কুকুর হাঁটাতে আসে তারাও এত সকালে মাঠে আসে না। ইসহাককে দেখে গাছগুলো বোধকরি একবার ঘুম থেকে জেগে ওঠে আবার ঘুমিয়ে যায়। একটি বড় পাতার গাছের তলায় বেঞ্চ পাতা। ইসহাক বসে। হাঁটতে ভালো লাগছে না। বসে-বসে কী সব ভাবছে। ভাবছে মাকে, ভাবছে বাবাকে। যারা এখন আর ওর জীবনে নেই। জরির মুখও মনে পড়ছে। কঠিন মনটা এখন বোধকরি খানিকটা নরম। তবু সে ভাবছে এখন যাবে না জরিকে আনতে। কবে যাবে তখনো জানে না।

যেখানে গাছপালা একটা রেখার মতো সবুজ সিণগ্ধ ছায়া-ছায়া ঘন গভীর রহস্য তৈরি করেছে ঠিক সেইখানে সাদা পাখির মতো কে যেন। ওদিক দিয়ে দূরের বনের দিকে একটা পথ চলে গেছে। জায়গাটা দিনের বেলাতেও অাঁধার-অাঁধার। অনেক সময় ওইখানে সমুদ্র থেকে পাখি আসে। তারা মাঠে ঘুরে নেচে আবার আকাশে চলে যায়। সাদা পাখি, নীল পাখি, আর ডোরাকাটা পাখি। জরিনা কখনো-কখনো পাখিদের দিকে তাকিয়ে বলে – ওরা সব কোথায় থেকে আসে বলো তো? ইসহাক উত্তর দেয় – কী জানি, বোধকরি আকাশ থেকে। না-হলে সমুদ্র থেকে। মনে রেখো, আমরা যেখানে আছি সেখান থেকে সমুদ্র দূরে নয়। আর এখনকার পাখিটা যেন একটা বিশাল আলবাট্রসের মতো। পাখিটা একটু-একটু করে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। সূর্য ওঠেনি। বা উঠবে। কিন্তু তার আলো মাঠের রহস্য তখনো দূর করেনি। কী ভাবছিল হঠাৎ বুঝতে পারে পাখিটা আর সেখানে নেই। সারা মাঠে বা মেডোতে সিণগ্ধ সকাল। এমন মাঠ ঢাকায় দেখেনি ও। দেশের বাড়িতেও দেখেনি। এরা বলে মেডো। এখানে হাঁটতে গেলে নানা সব চিমত্মা চলে আসে। এ-মাঠ আবুল ইসহাকের প্রিয়।
পাশে কখন যে একজন মানুষ এসে বসেছে ইসহাক বুঝতে পারেনি। সাদা কাপড়। লোকটা চেয়ে আছে মাঠের দিকে। কেমন নূরানি চেহারা। ফকফকা দাড়ি। অনেক সময় সে চুপচাপ বসে। তারপর হঠাৎ শোনে লোকটার কথা – আপনার দুটো চোখ…
আমার দুটো চোখ?
হ্যাঁ, এমনি বললাম। আমার ছোট ভাইয়ের দুটো চোখ হঠাৎ খারাপ হলো। লাখ-লাখ টাকা খরচ করেও চোখের দৃষ্টি আর ফিরে পেল না। এখন একটা অন্ধকার জগতের অধিবাসী। আপনার দুটো চোখের জন্য আপনি কত টাকা খরচ করবেন?
দৃষ্টি ফিরে পেতে?
ধরম্নন ওইরকমই কিছু।
বাড়িঘর, জমিজিরাত সব বেচে দুটো চোখ ভালো করতে চাইব। এ কদিন কারো সঙ্গে কথা বলতে ওর ভালো লাগেনি। এখন এই বিশাল পাখির মতো লোকটার কথার উত্তর দিতে ওর খারাপ লাগছে না। যেন পাখি থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা মানুষ।
আর যদি কিডনি খারাপ হয়? আমার মামাতো বোন তিরিশ লাখ টাকা খরচ করে কিডনি ঠিক করল। তারপর কী হলো জানেন, শরীর সেই কিডনি মেনে নিল না। সেই মাংসের টুকরা শরীর থেকে বের করে তারপর আবার ডায়ালিসিস। কতদিন বাঁচবে কে জানে।
আপনি এসব আমাকে বলছেন কেন?
আমরা যা বিনা পয়সায় পাই তার কি কোনো দাম থাকে। কিডনি, হার্ট, লিভার, কানের শোনা, চোখের দেখা, পায়ের হাঁটা, মুখের কথা, সুন্দর মসিত্মষ্ক সব হিসাব করলে কত টাকার জিনিস আলস্নাহ আমাদের দিয়েছেন বলতে পারেন? দাঁত, চোখ, কান, এসবের দাম কত হবে?
মিলিয়ন-মিলিয়ন পাউন্ড। মিলিয়ন-মিলিয়ন পাউন্ড। এসবের কি কোনো হিসাব আছে। ইসহাক বলে।
আপনার চোখের দেখার জন্য কত টাকা আপনি ব্যয় করবেন? লোকটা প্রশ্ন করে আবার।
যা আছে তার সর্বস্ব। উত্তর দেয় ইসহাক। – চোখের দেখা, কানের শোনা, পায়ের হাঁটা, কথা বলা, জিভের স্বাদ, চিমত্মার মাথা, হাতের ক্ষমতা এর কোনটা আপনি আমাকে দেবেন যদি আমি আপনাকে এক মিলিয়ন পাউন্ড দিই।
এর কোনোটাও আমি আপনাকে দিতে পারব না। যত টাকাই আপনি দেন না কেন, আমি এর কোনো কিছু দেব না। এগুলো আমার। আলস্নাহ এগুলো আমাকে দান করেছেন। আমি টাকার বিনিময়ে এর কোনো কিছু আপনাকে দেব না।
আমার বন্ধুর মেয়ে একটা অ্যাক্সিডেন্টে আর হাঁটতে পারে না। এখন কেবল হুইলচেয়ারে বসে থাকে। ও দুই মিলিয়ন পাউন্ড কমপেনসেশন পেয়েছে। বলে আমাকে – চাচা, যদি আবার আপনাদের মতো হাঁটতে পারি তাহলে এই দুই মিলিয়ন পাউন্ডের সব টাকা আপনাকে দিয়ে দেব। ইসহাক কথা শুনছে। কথা
শুনতে-শুনতে নানা কিছু ভাবছে।
ইসহাক লক্ষ করে পাশের লোকটা নেই। কেউ নেই পাশে। কেবল ঠিক যেদিকে সূর্য ওঠে সেদিকে দুই পাখা মেলে একটা পাখি উড়ে গেল। পাখিটা বড়, সাদা, আলবাট্রসের মতো। ইসহাক তাকায়, দুই চোখের পূর্ণ জ্যোতিতে চেয়ে দেখে। গাছপালা। পাখিরা। মাঠের ঘাস। উঠে দাঁড়ায়। দুই পায়ে হাঁটে। তারপর বিড়বিড় করে – মিলিয়ন পাউন্ড, মিলিয়ন পাউন্ড। এবার তার সুস্থ মাথা হিসাব করে তার নীরোগ সুঠাম শরীর, বলিষ্ঠ হার্ট, কাজ করার ক্ষমতা। লোকটা বলেছিল – দুই চোখের জন্য আমার ভাই মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করতে রাজি। অনেক বড় কারবারি। মিলিয়ন পাউন্ড কিছু না। টাকা থাকলেই কি সব পাওয়া যায়? যে-হুইলচেয়ারে বসে আছে কেবল আমাদের মতো হাঁটতে পারার জন্য কত টাকা সে দিতে চেয়েছিল?
ইসহাক চারপাশে তাকায়। এখনো কেউ মাঠে আসেনি। তার দুই পা কেমন যেন কাঁপছে। সে ভালো করে তাকায়। কোথায় গেল সেই লোক। সে কি এমন কোনো লোককে কল্পনা করেছে? লোকটা কি কল্পনার। না হলে কোথায় গেল লোকটা? প্রায় ছয় সপ্তাহ পরে ইসহাক পরিষ্কার মাথায় এখন সবকিছু দেখতে পাচ্ছে। যা আছে তার, যা নেই সে এমন কী? কেমন হালকা হয়ে ওঠে শরীরটা। ফুরফুরে বাতাসে হঠাৎ গানের মতো কী মনে পড়ে, শিস দেয় আপনমনে। মাথার ওপরের গাছ তখন একটু-একটু করে জেগে ওঠে ওকে জুলাইয়ের বাতাসে আরো একটু ফুরফুরে করছে। আর চারপাশের সেই গাছপাখি ভরা মেডোতে ইসহাক যেন নতুন করে নতুনভাবে অনেক বুঝতে পারে। বুকের কষ্টটা তেমন করে ওকে যন্ত্রণা বা দহনের নদীতে চুবিয়ে মারছে না। ইসহাক সেই নদী থেকে উঠে এসেছে। হালকা পায়ে মাঠের সরম্ন পথ ধরে হেঁটে বাড়ির দিকে আসে।
জরিনা কবে তুমি বাড়ি আসবে। জরিনা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
তুমি একটু মামির সঙ্গে কথা বলো।
মামি ফোন ধরেন। কোনো প্রকার ভণিতা বাদ দিয়ে বলেন –
বাবা দুলামিয়া সুখবর। আমাদের জরিনার বাচ্চা হবে বাবা।
কী বলছে মামি। এ কেমন করে সত্যি হবে। বলে কেবল – মামি জরিনাকে ফোনটা দেন। জরিনা ফোন ধরে – যেন আর্তচিৎকারে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের গলায় প্রশ্ন করে – জরিনা! সত্যি!
মামি চলে গেছেন। বলে জরিনা – গতকালই জানতে পারলাম। আমার তো আবার মাসিকের গোলমাল। ডাক্তার সাহেব বললেন, না, এটা কোনো গোলমালের ব্যাপার না। সত্যিই আপনার বাচ্চা হবে। দুজনে চুপচাপ অনেকক্ষণ। বলে ইসহাক খুশি-খুশি গলায় – জরিনা আলস্নাহ বড় মেহেরবান। আলস্নাহ আমাদের যা দিয়েছে তার পরিমাণ অনেক। আর আজকের এই খবর! আলস্নাহ মেহেরবান, রহমানুর রহিম, গাফুরম্নর রহিম। তিনি বিশাল। তিনি অফুরান।
যখন ইসহাকের উচ্ছ্বাস একটু কমে যায় বলে জরিনা খুবই স্বাভাবিক গলায় –
আমি ওর নাম রাখব হাসিনা। আমার শাশুড়ির নামে। ডাকব হাসি করে।
মেয়ে হবে কী করে জানলে?
আমি জানি। জরিনা বলে শামত্ম-গম্ভীর গলায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত