পালস অক্সিমিটার

পালস অক্সিমিটার
‘এসপিওটু কত দেখাচ্ছে?’ রেহনুমা পালস অক্সিমিটারের ক্ষুদ্র স্ক্রিনে তাকিয়ে আগের চেয়েও অস্থির হয়ে উঠলো। কপাল গড়িয়ে একফোঁটা ঘাম টুপ করে বিছানায় পড়লো। উঠে জানালার কাছে পৌঁছে একবার নিচে তাকালো। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে বেলায়েতের। ফোন বের করলো সে। ‘তোর ভাই মইরা যাওনের পর গাড়ি নিয়া আইবি তুই?’ ফোনের ওইপাশ থেকে কিছু একটা বলা হলো, রেহনুমার অস্থিরতা বাড়লো শুনে। ফুল স্পিডে ফ্যান চলছে মাথার উপর। রেহনুমা বিছানার পাশে বসলো। বেলায়েতের হাতের কব্জি মুঠো করে ধরে কপালে হাত বুলিয়ে দিলো। রাতুল গাড়ির জন্য নিচে গিয়েছে প্রায় দশ মিনিট হয়েছে। এলাকা লকড। গাড়ি ঢুকবেনা। গলির মাথায় পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। অনেক বলে কয়ে একটা রিক্সা নিয়ে এসেছে সে। ফোন বের করে কানে দিলো,
‘ভাবী, রিক্সা আনছি..’
‘তো ওইখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? উপরে আয়। ওরে আমি একলা নামাইতে পারবো?’
রাতুল দৌঁড়ে উপরে এলো। এই বাসায় লিফট নেই। বেলায়েতকে দুইজনে ধরে বিছানায় বসালো। রাতুলের বয়স পনের। এইটুকুন ছেলে বয়সে তার এগার বৎসর বড় ভাইটাকে সিঁড়ি বেয়ে নামাতে কতটুকুনই-বা হেল্প করতে পারবে। রেহনুমা প্রচণ্ড অসহায়বোধ করলো। বেলায়েতের কাঁধ জড়িয়ে ফিসফিস করে বললো, ‘একটু চেষ্টা করো হাঁটতে মনি বেলায়েত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দরজা পেরোলো রাতুল আর বউয়ের কাঁধে হাত রেখে। ভাইয়ের কোমর জড়িয়ে রাতুল বললো, ‘ভাবী, রহমত চাচারে ডাক দিই?’ রেহনুমা একবার অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। এই ছেলে মাস্ক না পড়েই বাইরে গিয়ে রিক্সা নিয়ে এসেছে। পুলিশ ওকে ধরে পিটায়নি এটাই আশ্চর্যের। বোকামার্কা ছেলে। ভ্রুঁ বাঁকা করে যান্ত্রিক স্বরে বললো, ‘কেউ আসবেনা রাতুল।’
এভারেস্ট চূড়োয় উঠাই একমাত্র কষ্ট নয়, মাঝে মাঝে তিন তলা থেকে নামার চেয়েও এভারেস্ট চূড়োয় উঠা সহজ। রেহনুমা রিক্সায় বেলায়েতকে বসিয়ে একহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রিক্সাওয়ালাকে তাগাদা দিলো, ‘মামা, কাছের হসপিটাল.. উড়ায়ে নিয়া যান’ একহাতে পালস অক্সিমিটারটা ধরে বেলায়েতের হাতের আঙুলে বসালো সে। এইটটি টু পার্সেন্ট। বেলায়েত একবার জোরে শ্বাস নিলো। রেহনুমা মাথায় হাত বুলালো তার। রাতুল রিক্সার পেছনে দৌঁড়াচ্ছে। বেলায়েত রিক্সাওয়ালার মাথা থেকে দুই বিঘত উপরে দূরে অঙুলি নির্দেশ করে ক্ষীণস্বরে ফিসফিস করলো, ‘আব্বু উড়ছে.. ওই দেখো রেহনুমা অসুস্থ বেলায়েতের ঘর্মাক্ত কপালে চুমু খেলো। তারপরে পেছনে তাকালো একবার। রাতুল দৌঁড়াচ্ছে। ওর মুখমণ্ডল ভেজা, সমুদ্রস্নান করে এলেও এত ভেজেনা গা। ও গো.. মানুষের উড়ার ক্ষমতা নেই। মানুষ শুধুই দৌঁড়ায়। কুকুরের মতোন দৌঁড়ায়।
রাতুল দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হাঁপিয়ে উঠলো একদম। এই তো বাসার কাছে পৌঁছে গিয়েছে সে। সমস্ত শরীর ভিজে আছে ওর। ভাবী এইভাবে বাসায় ঢুকতে দেবেনা। বলবে, ‘যাও.. সামনে কোথাও পুস্কনি থাকলে গোসল দিয়ে আসো।’ মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেবে। রাতুল দাঁড়িয়ে থাকবে। একটু পর বেলায়েত দরজা অর্ধেক খুলে ফিসফিস করে বলবে, ‘আয়.. চট করে ওয়াশরুমে ঢুকে যা। রেনু দেখলে তুইও মার খাবি, আমিও খাবো।’ আজ এমন হবেনা। রাতুল জানে আজ এমন হবেনা। ভাইয়া আর ভাবীর ঝগড়া লেগেছে আজ। রাতুল তখন ক্রিকেট খেলছিলো কাছের মাঠেই। হুট করে রহমত চাচার ছেলে আবীরের ফোন, ‘তোর ভাইয়া আর ভাবী লাগছে আবার.. আয় তাড়াতাড়ি’ রাতুল দৌঁড় দিলো। পাঁচ মিনিট লেগেছে মাঠ থেকে দৌঁড়ে বাসার সামনে আসতে। গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে একটু দম নিলো সে। তখনই তিনতলার বারান্দায় রেহনুমার লালচে মুখ উঁকি দিলো। সঙ্গে ঝালচে চিৎকার।
‘এ্যাই.. তুই এখুনি যা, একটা রিক্সা নিয়ে আয়। এই বাসায় আমি আর দুই মিনিটও থাকবোনা। হাবলার মতোন তাকিয়ে থাকবিনা। নিচে নেমে কানপট্টির উপর দুইটা দেবো। এক্ষুনি যা রাতুল পাত্তা দিলোনা। রেহনুমা মাসে কয়েকবার এমন করে বাসা ছেড়ে রিক্সায় চড়ে বসে। রাতুল কয়েকবার জোরে জোরে দম নিয়ে গেইট খুলে সিঁড়ি বেয়ে সোজা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। বেলায়েত দরজা খুলতেই রাতুল চোখ পাকালো, ‘কি হয়েছে আবার? কি বলছো তুমি?’ বেলায়েত হতাশ স্বরে বললো, ‘তুই বাচ্চা মানুষ, বুঝবিনা। যা, রিক্সা নিয়ে আয় একটা। রেনুর সাথে উঠে বসবি রিক্সায়। তোকে নামিয়ে দিতে চাইবে। তুই নামবিনা। আঁচল ধরে বসে থাকবি। বুঝেছিস?’ রাতুল ফিক করে হেসে নিচে নামলো। রিক্সার খোঁজে। ওই যে একটা রিক্সা যাচ্ছে। ‘এ্যাই খালি রেহনুমা বেলায়েতের আঙুল মুঠোয় নিয়ে বসে রইলো চুপচাপ। ঘুমে বেলায়েতের চোখ জড়িয়ে আসছে প্রায়। রেহনুমা জাগিয়ে রাখতে চাইলো। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো, ‘গ্রামের পুকুরে সর্বোচ্চ সময় ডুব দিয়ে থাকার রেকর্ড আছে না তোমার? তোমার আব্বুকে হারিয়ে দিয়েছিলে একবার। আর একটু সময় ডুব দিয়ে থাকো মনি। আরেকটা বার জিতে গেলে তোমার কাছে কখনোই কিছু চাইবোনা আর। ও মনি।’
বেলায়েতের চোখ থেকে দুই ফোঁটা অশ্রু ডানদিক বেয়ে কানের ছিদ্রে প্রবেশ করলো। বেলায়েত নড়ে উঠলো একবার। রেহনুমা স্বামীর হাতের তালু চেপে ধরে রেখে তাড়া দিলো, ‘মামা, উড়ান দেন না ক্যান? উড়ায়ে নিয়া যান না আমার রিক্সাওয়ালা একবার পেছনে তাকালো। আজ রিক্সার ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী। পুলসিরাত পার হওয়ার কষ্ট চেপে বসেছে একেকটা পায়ের গোড়ালিতে তার। রেহনুমা হুড় ফেলে দিলো। বাতাস আসুক। প্রচুর বাতাস দরকার। পরিপূর্ণ শুদ্ধ বাতাস। হাওয়ায় চুল উড়ে উড়ে বেলায়েতের মুখে এসে পড়ছে। বেলায়েত ঘ্রাণ পাচ্ছেনা আজ। রেহনুমা চুলে শ্যাম্পু করছেনা আজকাল বুঝি! কেন ঘ্রাণ পায়না বেলায়েত। সেদিনও তো পেলো। বেলায়েত কয়েকবার জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলো। বুকের ভেতর গিজগিজ করা শব্দ। বাতাস নেই কোথাও! আহ.. আহা রে কষ্ট! রেহনুমা থরথর করে কাঁপা বেলায়েতের ঠোঁটজোড়ায় আঙুল ছুঁয়ে দিলো।
‘নাম, নিচে নাম’ রাতুল গোঁ ধরে বসে রইলো। রেহনুমা হতাশ হলো। এই পর্যন্ত যতবার বের হয়েছে বাসা থেকে সে, ততবার রাতুল এসে রিক্সায় চেপে বসেছে। শুধু চেপে বসলে ধাক্কা দিয়ে নিচে নামিয়ে দেওয়া যেত। সে শুধু বসে নেই। বামহাতে রেহনুমার শাড়ির আঁচল মুঠো করে ধরে বসে আছে। কোনোমতেই আঁচল ছাড়ানো গেলোনা। রেহনুমা হতাশ স্বরে বললো, ‘মামা, চলেন রাতুল ফিক করে হেসে দিলো। রিক্সা চলছে। রেহনুমা অন্যদিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। রাতুলের সাথে সে কথা বলবেনা। রাতুল আরেকটু চেপে বসলো রিক্সায়। একটা হাঁচি দিয়ে আঁচলের একপাশ মুখে লাগাতেই রেহনুমা চট করে ফিরলো। ‘এ্যাই.. ছিহ.. মুখে লাগাবিনা আঁচল। তোরা দুই ভাই জন্মের খবিশ। তোর ভাই বেশী খবিশ। আঁচল ছাড়।’
রাতুল মুচকি হেসে আরেকটু প্যাঁচিয়ে নিলো হাতে আঁচলটা। সে জানে একটু পর আঁচল দিয়ে তার পুরো শরীরটাই প্যাঁচিয়ে দেওয়া হবে। কাজটি সে নিজে করবেনা। করবে পাশে বসা প্রচণ্ড মমতাময়ী এই মেয়েটা। রাতুল মা বাবাকে পায়নি জন্মের পর। একটা গাঢ় বিষাদ চেপে ধরবে বলেই হয়তোবা নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি বিধাতা বড়ই দয়া দেখিয়েছেন। রেহনুমাকে এনে দিয়েছেন। তাদের ছোট্ট সংসার। এক আঁচলের তলায়। রাতুল জানে একটু পরই এই আঁচল তার সারা গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হবে। কেননা আকাশে মেঘ করেছে। বৃষ্টি হবে। হুড় টেনে দেওয়ার পরও বাতাসের ঝাপটায় ভিজে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। রেহনুমা ভিজতে দেয়না রাতুলকে। জ্বরে মানুষ মরে যায়না। একটাসময় মানুষ মরতো সামান্য জ্বরেও। এখন মরেনা। রেহনুমা তবু দেয়না। নারী আশংকা করে দুনিয়াবি সমস্ত বিপদ- আপদ- গজব শুধুমাত্র তার আঁচলতলায় সংসার পাতা মনুষ্যগুলির জন্য নাজিল হয়।
রাতুলের ধারণাই ঠিক। ঝুম বৃষ্টি নামলো। রেহনুমা তাড়া দিলো, ‘মামা, রিক্সা ঘুরান। বাসায় যাবো।’
দমকা বাতাসে বৃষ্টির ছিঁটে মুখে পড়তেই রেহনুমা আঁতকে উঠে ধমক দিলো রিক্সাওয়ালাকে, ‘প্লাস্টিক নাই ক্যান মামা আপনার রিক্সায়? আজব তো। মানুষ মারবেন?’ রাতুল গুটিশুটি মেরে রইলো হুড়ের নিচে। ওর সমস্ত শরীর আঁচলে ঢাকা। রেহনুমা হাত বুলিয়ে দিলো গায়ে। রাতুল জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলো বারকয়েক। রেহনুমার গায়ের ঘ্রাণ আলাদা। এই ঘ্রাণে বড্ড ঘুম পায়। ‘মামা, এইতো, এইখানে নামায়ে দেন বেলায়েত চোখ খোলার চেষ্টা করলো। সমস্ত শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসছে ওর। রিক্সা থেকে নেমে রেহনুমা পেছনে তাকালো। রাতুল এখনো এসে পৌঁছায়নি। দৌঁড়াচ্ছিলো সে। ইমার্জেন্সির সামনে ভীড়। রেহনুমা অসহায়ের মতোন একবার ইমার্জেন্সির সামনে গিয়ে চট করে ফেরত এলো রিক্সায়। রিক্সাওয়ালা মামা তাগাদা দিলো। এখন মানুষ হসপিটালের সামনে দাঁড়াতে চায়না বেশীক্ষণ। রাতুল না এলে একা কিছু করতে পারবেনা রেহনুমা। রাতুল এলো একটু পর।
রেহনুমা পালস অক্সিমিটার চেক করলো আরেকবার। বেলায়েতের ডানহাতের মধ্যমা আঙুলের মাথায় লাগানো ছোট্ট যন্ত্রটা এখন অবধি রেহনুমাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। যতবার তাকিয়েছে বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটিয়েছে কেউ। এই বুঝি স্ট্রেইট হয়ে গেলো লাইন.. এই বুঝি সব শেষ! রাতুল ইমার্জেন্সিতে গিয়ে হল্লাকল্লা করছে। অল্প বয়স। রক্ত গরম। ভাইকে চোখের সামনে বিনে চিকিৎসায় মরতে দেখা- কে সহ্য করবে। হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগটা কেন করা হয়। ইমার্জেন্সির অর্থ কী! অপেক্ষা করুন? রেহনুমা বেলায়েতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে রইলো। কমে যাচ্ছে সংখ্যাগুলো ক্রমশ। অসহায়ের মতোন ডুকরে কেঁদে উঠলো সে, ‘মনি.. ও মনি, আমি রাগ করে বাসা ছাড়তাম তোমার অকারণ খরচার জন্য। দুনিয়ার সবাইরেই তোমার হেল্প করা লাগবে কেন! খুব রাগ হতো আমার মনি। ঝগড়া বাঁধাতাম রোজ। আমি জীবনে তেমন কোনো ভালো কাজ করি নাই।
তুমি তো করছো। আল্লাহ তোমারে নিয়ে যাচ্ছে ক্যান? ও মনি বেলায়েত দুইবার জোরে জোরে নড়ে উঠলো। হা করে শ্বাস নিতে চাইলো। রেহনুমা ডাক দিলো, ‘ও রাতুল ‘হ্যা ভাবী, বলো রেহনুমা তার পাজরে মুখ গুজে থাকা রাতুলের গায়ে আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো, ‘তোর ভাইয়ার সাথে কেন ঝগড়া হয়েছে আমার জানিস?’ রাতুলের শীত করছে রিক্সায়। আঁচল ভিজে গিয়েছে প্রায় বাতাসের ঝাপটায়। রেহনুমা ফিক করে হেসে বললো, ‘তোর ভাই আজকেও সাড়ে ছয়হাজার টাকা দিয়ে আসছে কারে যেন। খুব নাকি বিপদে পড়ছে। হতদরিদ্র মানুষ। টাকা ফেরত দেবে দশ দিনের ভেতর।’  ‘দেবেনা।’ ‘জানি আমি। প্রতি মাসে এমন করে দেয় সে। একটা টাকাও ফেরত আসেনা। আমাদেরও তো সংসার আছে। তোর ভাই বুঝতে রাজি নয়। আমি চিৎকার করলে চুপ থাকবে। বকলে চুপ থাকবে। ভাব দেখে মনে হবে, সে শুধরে গিয়েছে একদম। আর কখনো এমন কাজ করবেনা। কিন্তু যে লাউ সেই কদু।’
রাতুল আঁচলের তলা থেকে আওয়াজ দিলো, ‘ভাইয়া একটা বোকা’ রেহনুমা মিষ্টি করে হাসলো। কেমন যেন একটা গর্বমাখা হাসি। রাতুল ওই হাসি দেখতে পেলোনা। শুধু আওয়াজ শুনলো, ‘যখন বড় হবি আরো, তুইও তোর ভাইয়ার মতোন বোকা হবি। বুঝলি?’ ‘আমি বোকা হবোনা। আমার বোকা হতে ভালো লাগেনা।’ রেহনুমা শব্দ করে হেসে উঠলো। ‘তোর ভাইকে আবার এসব বলে দিসনা। লাই পেয়ে যাবে।’ রাতুল আঁচলের তলায় মাথা দুলায়। রিক্সা থামে। দরজায় বেলায়েত দাঁড়িয়ে। রেহনুমা চোখ কপালে তুলে বললো, ‘দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছো ক্যান দানবীর মুহসিন? সরো, জায়গা দাও।’
বেলায়েত সরে দাঁড়ালো। একগাল হেসে রাতুলের কানে ফিসফিস করলো, ‘কতদূর গিয়েছে? আমড়াতলা পর্যন্ত তো! নাকি?’ রাতুল কিছু বলার আগেই ডাইনিং থেকে আওয়াজ আসলো। ‘মনি বেলায়েত শূন্য দৃষ্টিতে উপরে তাকিয়ে আছে। ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনের ফুটপাতে শুয়ে আছে সে চিৎ হয়ে। রিক্সাওয়ালা নামিয়ে দিয়ে গিয়েছে। নামানোর সময় ছুঁয়েনওনি। শ্বাসকষ্টের রোগীকে ছুঁতে নেই। আর বেশীক্ষণ দাঁড়াতেও পারবেন না হসপিটালের সামনে তিনি। চারোপাশে অসুখ। রাতুল ইমার্জেন্সি বিভাগের সামনের দুইটা কাঁচ ভেঙে ফেলেছে ইতিমধ্যে। প্রচুর হৈ চৈ শুনা যাচ্ছে ফুটপাত থেকেও।
রেহনুমা বেলায়েতের ডান হাতের মধ্যমার মাথায় তাকিয়ে রইলো অশ্রু সজল চোখে। পালস অক্সিমিটারে স্ট্রেইট হচ্ছে ক্রমশ রেখাটা, সংখ্যা উঠানামা করছে। বেলায়েত কেঁপে উঠলো দুইবার। ঝাঁকুনি খেলো শরীরটা। অন্যসময় হলে ফুটপাতে ভীড় ঠেলে দেখার মতোন একটা দৃশ্য হতো। আজ হলোনা। সবাই দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটছে। কেউ দাঁড়াচ্ছেনা। কয়েকটা সংখ্যা আর একটা বয়ে চলা আঁকাবাঁকা লাইনের উপর একটা মানুষ দাঁড়িয়ে। ফুরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা শুধু। দেখার মতোন একটা দৃশ্য বটে। রেহনুমা শক্ত করে বেলায়েতের হাত মুঠো করে ধরলো। বেলায়েতের শরীরটা কয়েকবার একটানা ঝাঁকুনি দিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেলো। পালস অক্সিমিটারে লাইনটা স্ট্রেইট.. রেহনুমা হাত ধরে বসে রইলো বেলায়েতের হা করা মুখের দিকে তাকিয়ে।
গালের একপাশ বেয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে। লুঙ্গির একপাশ ভেজা। রেহনুমা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চিৎকার করলোনা। দুইটা কাক উড়ে গেলো বৈদ্যুতিক পিলারের কাছ থেকে দূরে। একটা ছোট্ট বাচ্চা এগিয়ে এলো। গায়ে কাপড় নেই। প্যান্টের একপাশ ছেঁড়া। নাকে ময়লা। হাতে একটা পলিথিন। পলিথিনের ভেতর প্লাস্টিকের বোতল।
রেহনুমার কাছে এসে বসলো বাচ্চাটা। বস্তা একপাশে রেখে। চিৎ হয়ে পড়ে থাকা মানুষটির দিকে একবার তাকিয়ে আশ্চর্য হলো সে। মানুষটির ডানহাতের আঙুলের মাথায় কিছু একটা থেকে আলো বের হচ্ছে। ‘ব্যাঙের মানিকের লাহান ঢোক গিললো বাচ্চা। একটু ইতস্তত করে গিয়ে যন্ত্রটা ছুঁয়েও দেখলো। রেহনুমা যান্ত্রিক চোখে তাকালো বাচ্চাটির দিকে।
বেলায়েতের ডানহাত ধরে বসে আছে কোনো এক দেবদূত। পুরো শহর দূরত্ব নিয়েছে। দেবদূতের আগ্রহ মানুষটি নয়, যন্ত্রটি। রেহনুমা হাত বাড়িয়ে যন্ত্রটা খুলে দেবদূতের ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে আটকে দিলো। পালস অক্সিমিটার চালু হয়েছে। এসপিওটু ৯৯ পার্সেন্ট। কিছুক্ষণ আগের স্ট্রেইট লাইনটা আবারো বেঁকে গিয়েছে। বাচ্চাটি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আঙুলের মাথায়। টিব টিব। কিছুই বুঝতে পারছেনা সে। টেরও পাচ্ছেনা তার আঙুলচূড়োয় অনবদ্য সবুজ একটা জীবন। রেহনুমা মুগ্ধ হলো। বেলায়েতের মৃত্যুর পর কখনো আর মুগ্ধ হবে ভাবেনি সে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত